• শর্মিষ্ঠা বসু

গল্প - অনেকটা নাটকের মত

সেবার পুজোয় ঠিক করলাম দেশের বাড়িতে যাব। অবশ্য এ ব্যাপারে আমার থেকে সুতপার উৎসাহ অনেক বেশি ছিল। সুতপা আদ্যপান্ত শহরে বড় হওয়া মেয়ে, কোনদিন গ্রাম দেখেনি। আমার কাছে গ্রামের গল্প, গ্রামের পুজোর, পুজোর গল্প শুনে জেদ ধরেছিল এবারের পুজোটা ও দেশের বাড়িতে কাটাবে। নববিবাহিত সুন্দরী স্ত্রীর কথা অগ্রাহ্য করার মতন পাষণ্ড আমি নই, তাই মহালয়ার আগের দিনই চলে এলাম দেশের বাড়িতে।


আমি গ্রাম ছেড়েছি বহু বছর হল । স্কুল, কলেজ, চাকরি সবটাই কলকাতায় মামাবাড়িতে থেকে। ছুটি ছাটায় দেশের বাড়িতে এসেছি বটে তবে একটানা থাকিনি বহুদিন। ছাত্র জীবনে গ্রুপ থিয়েটার করতে গিয়ে সুতপার সঙ্গে আলাপ, তারপরে চাকরি পেতেই বিয়ে ।এই পর্যন্ত আমার জীবনকাহিনী আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির মতই সাদামাটা । থিয়েটার শুরু করেছিলাম শখে , পরে সেটাই নেশা হয়ে দাঁড়ায় । এ ব্যাপারেও সুতপাকে পাশে পেয়েছি। ও নিজে ভাল অভিনেত্রী, নিয়মিত অভিনয় করে, অভিনয় নিয়ে পড়াশুনা করে প্রচুর , সুতরাং চাকরি, অভিনয় সংসার সব একসঙ্গে চালিয়ে যেতে খুব অসুবিধা হচ্ছিলো না আমার ।


গ্রামে ঢুকতেই মনটা নেচে উঠল আমার। মাথার ওপর মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ, টুপটাপ শিউলির ঝরে পড়া, চারদিকে পুজোর গন্ধ, সব মিলিয়ে মন ভাল হয়ে গেল বেশ । নতুন পরিবেশে এসে সুতপাও খুশি ছিল খুব। দুপুরে সর্ষে বাটা দিয়ে ইলিশ ভাপা খেয়ে চমৎকার ভাতঘুম দিলাম একটা। ঘুম থেকে উঠে সবে চা নিয়ে বসেছি ,মা ডেকে পাঠালেন নিজের ঘরে। গিয়ে যা শুনলাম তাতে হতভম্ব হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় অবশ্যই ছিলনা। এই গ্রামের রাজপরিবারের ছোটকুমার জয়ন্ত নারায়ণ আজ বিকেলে আমাকে সস্ত্রীক চা পানের আমন্ত্রন জানিয়েছেন ।


শিবসুন্দরপুরের রাজবাড়ীর নাম হয়ত সবার জানা নেই , তবে এই গ্রামে এরাই এখনও হর্তা কর্তা বিধাতা ।দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার কালীনারায়ণ চৌধুরীর বংশধর এরা ! জমিদারী প্রথা উঠে গেলেও এ গ্রামের সবাই এখনও এদের ঈশ্বর জ্ঞানে পুজো করেন । এ বাড়ির দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করেই সাতদিন ধরে মেলা চলে বড় দীঘির মাঠে, নাটমন্দিরে যাত্রা, থিয়েটার হয় রোজ । স্বয়ং বড় কুমার, মেজকুমার, ছোট কুমার সপরিবারে আসেন সেই থিয়েটার দেখতে। আগের মতন জাঁকজমক না থাকলেও ছোট কুমার জয়ন্ত নারায়ণ দুঁদে ব্যবসায়ী, জমিদারী ঠাট বাঁট অনেকটাই বজায় রেখেছেন তিনি ।


গ্রামে থাকলেও রাজবাড়ীর ভেতর কখনও যাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার । অবশ্য সে সুযোগ এ গ্রামে খুব কম মানুষেরই হয়েছে। অর্থ,বংশমর্যাদা, সব কিছুর কারণে এরা এখনও সাধারন গ্রামবাসীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন।


বাগান আর সিংহদরজা পেরিয়ে শ্বেতপাথরের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে খানিকক্ষণ দাঁড়ালাম আমরা ।বিশাল টানা বারান্দা , সোনালী কারুকাজ করা মোটা থাম, উল্টো দিকের দেয়ালে পূর্ব পুরুষদের অয়েল পেন্টিং ,মহার্ঘ চিনে মাটির ফুলদানিতে রঙ্গিন ফুল, বারান্দার দু কোণায় দুটো বিশাল বড় গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম আমি আর সুতপা। বারান্দা থেকে সবুজ ঘাসে মোড়া বাগান দেখা যাচ্ছে, অসাধারণ কিছু শ্বেতপাথরের মূর্তি আর ফোয়ারা সারা বাগান জুড়ে। মনে মনে ছোট কুমারের রুচির তারিফ না করে পারলাম না । একজন মাঝবয়েসী কর্মচারী আমাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে বৈঠক খানায় বসাল ।কার্পেটে মোড়া বিশাল বৈঠক খানা , চারদিকে অজস্র সোফা, কৌচ তাতে সিল্কের ওপর জরির কাজ করা তাকিয়া ইতস্তত ছড়ান , মাথার ওপর ঝাড় লন্ঠন ।কিছুক্ষণ পরেই জয়ন্তনারায়ন এসে ঢুকলেন ঘরে। ধবধবে গাত্রবর্ণ , চোখে রূপোলী চশমা, পরনে হাল্কা বেগুনী সিল্কের ড্রেসিং গাউন । নমস্কার, প্রতিনমস্কার আর প্রাথমিক আলাপচারিতার পরেই আমাকে ডেকে পাঠাবার আসল কারণ জানালেন ছোট কুমার । এবার অষ্টমীর রাত্রের নাটকটি যাতে আমার পরিচালনায় ওনার সদ্য প্রয়াত স্ত্রীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে হয় তার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন আমাকে ।



আমি গ্রামে না থাকলেও গ্রামের খবর রাখতাম ! দার্জিলিং কনভেন্টে পড়া জয়ন্তনারায়ণের স্ত্রী অলকানন্দার গল্পও মায়ের কাছে শোনা ! তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা , অসামান্যা রূপসী অলকানন্দা অসীম সাহসী এক নারী ! অশ্বারোহণ , পর্বতারোহন , শিকার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন তিনি ! সে সময় পর্দাপ্রথার বিশেষ প্রাবল্য না থাকলেও অন্য রাজবধূরা পর্দানসীনই থাকতেন ! ব্যতিক্রম অলকানন্দা ! গ্রামে আসার পর থেকেই গ্রামবাসীদের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন তিনি !


অচিরেই সকল গ্রামবাসীর চোখের মণি হয়ে ওঠেন ছোট বৌরানী ! তারপরে কলকাতায় পিত্রালয়ে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ জ্বরে মারা যান একদিন ! গোটা গ্রাম শোকস্তব্ধ হয়ে যায় এই আকস্মিক মৃত্যুতে !


রুপোর পাত্রে ভুরিভোজ খেয়ে সেদিন আনন্দে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরলাম আমি আর সুতপা ।ইতিমধ্যে ছোট কুমার আমাদের অলকানন্দার ঘর আর লাইব্রেরি তে নিয়ে গেছেন আর একটানা বলে গেছেন অলকানন্দার জীবনের বহু না জানা কাহিনী।


শোবার ঘরে ঢুকে অলকানন্দার পেন্টিংএর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম আমি আর সুতপা ! অনিন্দ্যসুন্দর এক দেবীমূর্তি যেন , মাথায় একরাশ কাজলকৃষ্ণ কেশরাশি ! রূপকথার গল্প শোনার মতো অলকানন্দার জীবনের গল্প শুনছিলাম আমরা! কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন জয়ন্তনারায়ণ ! বেদনার্ত মুখ , গলার স্বর বুজে আসছে কষ্টে , আবেগে ! অতীতের স্মৃতির পাতা ওল্টাতে গিয়ে ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়ছিলেন কিছুটা !



রাত্রে খাওয়া সেরে স্ক্রিপ্ট টা নিয়ে মনেমনে নাড়াচাড়া করলাম বেশ খানিক ক্ষণ। নাটকের অনেক উপাদান আছে অলকার জীবনে, চরিত্রটা কে একটু কনভিন্সিং করা দরকার । বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম একটা । মনের মধ্যে চরিত্রটা নিয়ে নাড়াঘাটা চলছে ক্রমাগত। হঠাৎএকটা উগ্র ফুলের গন্ধে চমকে উঠলাম। এটা হাসনুহানার গন্ধ না ? এখানে তো হাসনুহানার গাছ নেই কোন। নিজের অজান্তেই গায়ে কাটা দিল আমার । আর পেছনে তাকাতেই শরীর হিম হয়ে গেল । আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখলাম এক নারীমূর্তি, অবিকল আজকের দেখা সেই অলকানন্দার মতন। চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ছে । দুরন্ত ক্রোধে জ্বলজ্বল করছে দুচোখ ! একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে এলো আমার পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে ! চারদিকে ঘন অন্ধকার , ঝিঁঝি ডাকছে একটানা ! দূরে কোথাও একটা নিশাচর পাখি ডেকে উঠলো আচমকা ! ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো সেই ছায়াশরীর !


সারাদিন নাটকের রিহার্সাল নিয়ে ব্যস্ততায় কাটছিলো আমাদের ! পার্শ্বচরিত্র জোগাড় হয়ে গেলো কয়েকজন , নেপথ্য সংগীতের ব্যবস্থা করতেও বিশেষ সমস্যা হলোনা ! কিন্তু রাত বাড়লেই ভয় করতো আমার ! এর মধ্যে আরো দুদিন এসেছে অলকানন্দা ! পরনে আগুনরংএর শাড়ি ! ক্ষীণ রক্তধারা বেরিয়ে আসছে কপাল বেয়ে ! কি যেন বলতে চায় এই কায়াহীন ছায়া !


সুতপাকে কথাটা বলতেই অবশ্য একদম উড়িয়ে দিল ও । আজন্ম শহরে বড় হওয়া সুতপা ভুতপ্রেতে বিশ্বাস করত না মোটেই ।‘ ওটা লুসিড ড্রিম ! মানে তুমি অ্যাওয়ার যে তুমি স্বপ্ন দেখছো ! কি বলবো বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকি আমি ! “ অপঘাতে মরলে ভূত হয় !জলে ডোবা , আগুনে পোড়া , গলায় দড়ি ! অলকানন্দা মারা গেছে অসুখে তাই ভূত হওয়ার প্রশ্নই নেই ! আমাকে সান্তনা দেওয়ার ছলে কথাটা বেমালুম উড়িয়ে দিলো সুতপা!


মহাষ্টমীর রাত্রি । রাজবাড়ীর নাটমন্দিরের সামনে আজ উপচে পড়া ভীড় । সারা গ্রাম ভেঙে পড়েছে আজ নাটক দেখতে । আজ অলকানন্দার মতই সেজেছে সুতপা । পরনে আগুনরঙা বেনারসি , হাতে চুড়ি, বালা , কঙ্কণ, গলায় সাতনরী হার । হারমনিয়ামের আওয়াজ শুরু হতেই স্টেজে ঢুকল সুতপা ।সংলাপ বলছে এখন । কিন্তু একি, এ সংলাপ তো আমার লেখা নয় । এসব কি বলছে সুতপা ।কেমন যেন ধকধক করে জ্বলছে ওর দু চোখ ,চোখে হিংস্র দৃষ্টি । নেপথ্যে সুরেলা হারমোনিয়াম আর তবলার লহরা । সুরে সুরে মাতোয়ারা চারদিক। হঠাৎতবলার তালে তালে নাচতে শুরু করল সুতপা । এক দানবীয় শক্তি যেন ভর করেছে ওর মধ্যে। ভয়ে, বিস্ময়ে আমি তখন স্তব্ধ, মূক । কেমন অচৈতন্যের মত নাচছে সুতপা। সারা গ্রামের লোক স্তব্ধ হয়ে দেখছে ঐ দৃশ্য । নাচতে নাচতে স্টেজ থেকে নেমে এল সুতপা , তারপরে সোজা গিয়ে দাঁড়াল জয়ন্তনারায়নের সামনে। নিষ্ঠুর, কঠিন মুখ। দৃঢ় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করেছে জয়ন্তনারায়ন কে । ‘’সুতপা’, আমি চীৎকার করে ডাকার চেষ্টা করি , কিন্তু গলা দিয়ে এত টুকু স্বর বেরোয় না আমার। পা দুটো ও কেউ যেন শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে,নড়তে পারছি না এতটুকু । ‘’ খুন, খুন করেছ আমাকে, বল, স্বীকার কর । আরও কঠিন হয়েছে সুতপার বাহু বেষ্টনী ,রক্তে এখন মহাপ্রলয়ের উন্মাদনা , ঘৃণার আগুন বেরিয়ে আসছে দুচোখ ভেদ করে ।‘’ তুমি খুন করবে আমাকে, আর আমি চুপ করে থাকব। ধ্বংসের উন্মাদনায় জ্বলছে সুতপার চোখ। সব কষ্ট ,অন্যায় , অপমানের প্রতিশোধ যেন আজই নেবে সে। স্থবির হয়ে দেখে যাই সবটা ।যেন ছায়া ছবির দৃশ্য দেখছি কোন । অলকানন্দার ছায়াই ফুটে উঠেছে সুতপার মধ্যে । হঠাৎকোমর থেকে একটা বোতাম টেপা ছুডি বের করে সুতপা। রক্তলোলুপ এক পিশাচিনীর মতন জড়িয়ে ধরেছে জয়ন্তনারায়ণকে । ‘’বল, কি দোষ ছিল আমার,বল," হিশ হিশিয়ে উঠেছে সুতপা।


একটু সরে এলো সুতপা তারপরে হঠাৎ চিৎকার করে বললো “ মুক্তি দাও আমায় , ওই গুমঘরের ভয়ানক নির্জনতায় বড় কষ্ট হচ্ছে আমার , আমায় মুক্তি দাও ! হাউহাউ করে এখন কাঁদছে সুতপা ! ওর করুণ কান্না স্তব্ধ হয়ে দেখছে সব গ্রামবাসী ! চারদিক নিস্তব্ধ ,শুধু মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে একটা রাতজাগা পাখি !


জয়ন্তনারায়ণ তাকিয়ে ছিল সুতপার দিকে ! এ কি বলছে মেয়েটি ? না কি ভুল শুনছে আজ সে ? মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে কেন এখন ? আজ অবিকল অলকার মত লাগছে সুতপাকে !খোলা চুল, দু চোখে কাজল ,সিঁথিতে জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর । উঠে দাঁড়াল জয়ন্ত নারায়ন ,থর থর করে কাঁপছে এখন !সারা শরীর ভিজে গেছে ঘামে। ‘’ বলব, সব বলব আমি।” ছোটকুমার এর কণ্ঠে মিনতির সুর স্পষ্ট ।


হঠাৎআকাশ ঢেকে গেল কাল মেঘে ।শুরু হল প্রবল বর্ষণ ।ঝোড় হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সব ।ধুলোয় অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ ।চতুর্দিকের জ্বলে থাকা আলোগুলো

নিভে গেল দপ করে । চারদিকে শুধু ঝড়ের আওাজ, কোলাহল আর কান্না ।


সেদিন রাত্রে অনেক কষ্টে প্রায় অচেতন সুতপাকে নিয়ে নদীর পথ ধরে বাড়ি ফিরলাম আমি আর মা ! চারদিকে ঘন অন্ধকার , মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে , নিশ্চুপ বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসছে প্যাঁচার কর্কশ চীৎকার , কীটপতঙ্গের ডাক !


সেদিনই রাতে জ্বর এল সুতপার ।ভুল বকতে লাগল অনবরত ।পরদিন ডাক্তার, ওষুধ আইসব্যাগ, কিছুই কাজ করল না আর । বিকেলের ট্রেনে সুতপাকে নিয়ে ফিরে এলাম কলকাতায় ।আগের রাতে অবশ্য আরেকবার দেখেছিলাম অলকানন্দাকে । সেই ভয়াবহ ঘটনার রাতেই আবার এসেছিল সে ।চারদিক আবার ভরে উঠেছিল হাসনুহানার উগ্র গন্ধে ।কিন্তু সে রাতে বড় করুণ ছিল অলকানন্দার দৃষ্টি । বড় ক্লান্ত,বিষণ্ণ অসহায় এক নারী , অধরপ্রান্তে ক্ষীণ হাসির আভাস ।



পরদিন সকালে উঠে জয়ন্তনারায়ণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম আমি ! এক রাতেই যেন অনেক বেড়ে গেছে ছোটকুমারের বয়স ! রুক্ষ , অবিন্যস্ত চুল উড়ছে হাওয়ায় , উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি , মুখময় খোঁচা খোঁচা দাড়ি ! আমাকে দেখে হাত তুলে নমস্কার করলেন জয়ন্তনারায়ণ ! তারপর হঠাৎ আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন শিশুর মতন ! “ আই অ্যাম রেস্পন্সিবল ফর হার ডেথ ! আমি খুন করেছি ওকে ! কলকাতায় অসুখে ওর মৃত্যুর খবরটা মিথ্যে ! ওটা আমার নির্দেশেই রটানো হয়েছিল ! আজীবন শুধু আঘাত পেয়েছে ও ! আমার অভিশপ্ত জীবনের সঙ্গে ওর জীবনটা জড়িয়ে গেলো ! আসলে মঞ্জিষ্ঠা আত্মহত্যার ভয় দেখাচ্ছিলো আমায় ! সেদিন হঠাৎ কি যে হল !! কাটারি দিয়ে মাথায় আঘাত করতেই ....... ! “দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে পড়েছেন জয়ন্তনারায়ণ !


হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে কাঁদছেন অনবরত ! “ আমি চাইনি , আমি সত্যিই চাইনি !” কান্নার দমকে কেঁপে উঠছে ছোটকুমারের শরীর !


বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষন তারপরে বেরিয়ে আসি রাজবাড়ী থেকে ! কেন জানিনা বড় কষ্ট হচ্ছিলো ছোটকুমারের জন্য ! মাতৃআজ্ঞা পালন করতে বিবাহে সম্মত হয়েছিলেন জয়ন্তনারায়ণ ! শুধু যৌবনের ভালোবাসার প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকার জন্য কোনোদিন মর্যাদা দেননি স্ত্রীকে ! আজ বুঝতে পারছেন কত বড় ভুল করেছেন সেদিন ! তার নিস্করুণ অবহেলায় , নির্মম ঔদাসীন্যে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে অলকানন্দা ! ঠকে গেছেন তিনি নিজেও ! অনাস্বাদিত রয়ে গেছে দাম্পত্যের মধুময় দিন ! আজ তাই ভয়ঙ্কর অন্ধকার ভবিষ্যতের চিন্তা ছাপিয়েও অপরিসীম আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হচ্ছেন তিনি !


বেরিয়ে আসার সময় যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলাম অলোকানন্দাকে ! অপূর্বসুন্দর এক দেবীপ্রতিমা , অভিমানে ছলছল দুই চোখ ! পৃথিবীর সব দেনাপাওনা , হিসেবনিকেশের গন্ডী ছাড়িয়ে এখন পাড়ি দিয়েছে অনন্তের পথে ! শরতের সকালে প্রথম রোদের স্বর্ণাভায় ঝলমল করছে চারদিক ! শিউলি বিছানো নির্জন পথ ধরে বাড়ির দিকে এগোই আমি !


গুমঘর থেকে অলকানন্দার বডি উদ্ধার আর জয়ন্তনারায়নের জেলে যাওয়ার খবর পেয়েছিলাম মায়ের কাছেই । তবে সেই রাত্রে ঠিক কি ঘটেছিল সেকথা সুতপাকে জিজ্ঞেস করিনি কখনো । সে বার ওর সুস্থ হতে সময় লেগেছিল অনেকদিন। বহু কৌতূহল থাকা সত্ত্বেও জানা হয়নি কোথায় পেয়েছিল ঐ বোতাম টেপা ছুরিটা। শুধু মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করেছি সুতপার কাছে। ওর জন্যই হয়ত সেদিন গুমঘর থেকে মুক্তি পেয়েছিল অলকানন্দা। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, পরাজয় আর ব্যর্থতার গ্লানি ভোলার জন্যই নারীত্বের অবমাননায় ক্ষতবিক্ষত অলকানন্দা এসেছিলো সুতপার মধ্যে দিয়ে !


এর পরে আর একবারই দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম! সুতপা আর যায়নি কখনো, যেতেও চায়নি কোনোদিন ! মা কে নিয়ে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছিলাম কলকাতায় !


চলে আসার আগে রাজবাড়ীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম কিছুক্ষন ! ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে শিবসুন্দরপুরের রাজবাড়ী ! ইটকাঠপাথরের প্রাসাদের গায়ে এখন অসংখ্য বট অশ্বথের চারা ! সযত্নে লালিত বাগান এখন জঙ্গলাকীর্ণ ! চতুর্দিকে লতাঝোপের ঘন সমাবেশ আর কাঁটাবন ! এই বাড়িতেই আঁকা আছে এক তরুণী বধূর পদচিহ্ন ! আজ কোথায় অলকানন্দা ? কোথায় বা তার পরিবারের সবাই ?


হঠাৎ চোখের সামনে ছবির মতন ভেসে ওঠে এক নারী ! অসামান্য রূপলাবণ্য , অধরে ক্ষীণ হাসি , দূরে যেন দেখতে পাই রাজকীয় এক পুরুষ , সুদর্শন , সুগঠিত দেহ , উন্নত নাসা , অনুশোচনায় বিদীর্ণ হৃদয় !


রাধামাধবের মন্দির থেকে ভেসে আসে সন্ধ্যারতির শঙ্খঘন্টাধ্বনি! ধীর পায়ে এগিয়ে যাই আমি ! পিছনে পড়ে থাকে ঘুঘুডাঙার মাঠ , নির্জন নদীর ঘাট আর শিবসুন্দরপুরের ভগ্ন রাজপ্রাসাদ কুৎসিত , ভয়াবহ , নৃশংস এক অতীতের সাক্ষী হয়ে !

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮