• শোভন কাপুরিয়া

গল্প - কালাপানি


প্রত্যেকদিনের মতোই বাসটা বেশ ভিড়, তবে এসি বাস বলে একটু বাঁচোয়া। সামনের সিটে বসে থাকা বুড়ো লোকটা উঠে যেতেই মনোজ জলদি সেই সিটটা দখল করলো। আ:, পায়ের আরাম হলো এতক্ষণে, সেই এসপ্ল্যানেড থেকে দাঁড়িয়ে থেকে এতক্ষণে বসতে পেল সে। তার গন্তব্য প্রতিদিনের মতোই পরিবেশ ভবন, সেখানেই চাকরি করে সে। আমাদের গল্পের মূল চরিত্র মনোজ দাস, বয়স খুব বেশি হলে ২৮-২৯, পরিবেশ ভবনে বিগত চার বছর কাজ করছে। কম অভিজ্ঞতা হলেও তার কাজের দক্ষতা আর কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা দেখে মনোজের বস মিঃ বোস তাকে প্রমোশনের জন্য মনোনীত করেছে। তবে আজ মনোজ অন্যদিনের তুলনায় আগেই হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা করছে কারণ মিঃ বোসের মনোজের সাথে কোনো একটা ব্যাপারে জরুরী কথা বলার আছে।অবশেষে বাস থেকে নেমে মনোজ পরিবেশ ভবনে ঢুকল।

********

- "স্যার, আসতে পারি?" মনোজ অমিতাভ বোসের কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে বললো। অমিতাভ তার কম্পিউটারে কিছু একটা দেখছিলেন গম্ভীর মুখে, মুখে কিছু না বলে হাতের ইশারায় মনোজকে ভেতরে আসতে বললেন। মনোজ চেয়ারে বসতে বসতে বোঝার চেষ্টা করল যে বোস কি দেখছেন কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারলোনা। এরকম ভাবে ২-৩ মিনিট কাটলো, কিন্তু বোস তখনো একইভাবে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে আছেন। মনোজ খুব ভালো চেনে এই বোস কে, কোনো সিরিয়াস ঘটনা না ঘটলে বোস এরকম করেননা। কিছুক্ষণ পরে বোস গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন "অতীন ঘোষকে চেন তুমি?" মনোজ বলল "হ্যাঁ , কিন্তু ওনার সাথে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি।" বোস কিছু একটা ভেবে বললেন "নন্দীপুর গ্রাম কি চেন?" মনোজ মাথা নাড়িয়ে না জানাল। "ব্যাপারটা খুলেই বলি তাহলে" বলে অমিতাভ বলতে শুরু করলেন -


"কলকাতা থেকে ১০০ কিমি উত্তরে এই নন্দীপুর গ্রাম অবস্থিত। গ্রাম বলতে ছোট জনপদ, খুব বেশি হলে ১০টি পরিবার থাকে ওই গ্রামে। তো ওই গ্রামটার কাছেই একটা বড় জলাশয় আছে.. নাম কালাপানি , গ্রামে জলের যা প্রয়োজন তা ওখান থেকেই মিটতো। মিটতো বলছি , তার কারণ কয়েক মাস ধরে জলাশয়ের জল দূষিত হচ্ছে। ভাগ্য ভালো যে, গ্রামের মধ্যে আরেকটা জলাশয় আছে। সেটা ছোট হলেও আপাতত পরিবার গুলোর প্রয়োজন মিটে যাচ্ছে কিন্তু গরম কালে সেটা পুরোই শুকিয়ে যায়, তাই বড় জলাশয়টার দূষণের কারণ জানা দরকার ছিল। অতীন কে আমরা পাঠাই গত মাসের ১০ তারিখ, মানে ১০ ফেব্রুয়ারি। অতীন গিয়ে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৫ তারিখে রিপোর্ট দেয় আমাদের যে গ্রামের কাছেই একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি হচ্ছে আর সেখান থেকেই সম্ভবত বর্জ্য পদার্থ এসে জমা হচ্ছে জলাশয়টাতে। কিন্তু তারপরে ১০-১৫ দিন চলে যায়, আমরা অতীন কে যোগাযোগ করতে পারিনা। তারপরে মার্চের ২ তারিখ ওই গ্রাম থেকেই একজন ফোন করে বলে যে জলাশয়ের মধ্যে অতীনের মৃতদেহ ভেসে উঠেছে। " এই অবধি বলে অমিতাভ জলের বোতল থেকে একটু জল খেলেন। মনোজের মুখেও ভয়ের ছাপ, গলা শুকিয়ে গেছে তার। অমিতাভ আবার বলতে লাগলেন "তোমার কাজে আমি খুশী, তাই আমি চাই তুমি ওখানে কয়েকদিনের জন্য যাও আর জানার চেষ্টা কর অতীন কিভাবে মারা গেল আর জলাশয়ের দূষণের প্রকৃত কারণই বা কি? ফিরে আসলেই তোমার প্রমোশন পাক্কা। তুমি ১০ তারিখে রওনা দাও, তোমার টিকিট তোমাকে দিয়ে দেব আজ। " প্রোমোশনের কথা মনোজের ভালো লাগলেও তার মনে এক অজানা ভয় উঁকি দিতে লাগল। কিন্তু সেই ভয় ঠিক কি জন্য তার মনে এলো তা সে বুঝে উঠতে পারেনি।



*******


নন্দীপুর বাস স্ট্যান্ডে যখন নামলো মনোজ, তখন বাজে দুপুর একটা। এবছর মার্চেই যেন মনে হচ্ছে মে মাসের গরম। মাথার ওপর সূর্যের তাপে জলীয় বাষ্পে পরিণত হওয়ার উপক্রম, সঙ্গে ভাগ্যিস ছাতা এনেছিল সে। ছাতা মাথায় দিয়ে সে এগিয়ে গেল রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে, একজন রিকশাচালক দাঁড়িয়ে আছে। মনোজের উদ্দেশ্যে সে বললো "বাবু, কোথায় যাবেন!" মনোজ বললো "পথের সাথী গেস্ট হাউসে।" লোকটা রাজি হলো। রিকশায় উঠতে যাবে মনোজ, হঠাৎ তার চোখ পড়ল দুরে দাড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে। খুব সুন্দর করে তার দিকেই তাকিয়ে হাসছে সে। মনোজের একটু অবাক লাগল তাই সে চোখ ফিরিয়ে নিলো, রিক্সা কিছুদূর যাওয়ার পরে সে আবার মেয়েটাকে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু কোথাও দেখতে পেলনা তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আশেপাশের ছোট ছোট ঘর বাড়ি সরে গিয়ে চোখে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত, গরম থাকলেও সবুজ দেখে তার চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল। তবে গ্রামটাতে জনবসতি বেশ কম মনে হলো যদিও প্রচুর ছোট ছোট বাড়ি দেখতে পেল। - দাদা, এই কালাপানি জলাশয়টা কোনদিকে? মনোজ প্রশ্নটা করেই ফেললো। রিক্সাওয়ালা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল "আপনি নতুন এখানে তাই না বাবু? জলাশয় আর কি করে বলি! এত খারাপ জল না! তবে একটা...." কথা শেষ হোলোনা তার, গেস্ট হাউসের সামনে এসে থামলো রিকশাটা। মনোজ নেমে লোকটাকে বললো "তুমি কিছু একটা বলছিলে!" রিকশাওয়ালা প্রসঙ্গ পাল্টে বললো "কিছু না..... আপনি তো কয়েকদিনের জন্যই নিশ্চয়ই আছেন এখানে তাই...। চলি।" লোকটা যে কি বলতে চাইল তার মাথামুণ্ডু মনোজ কিছুই বুঝলোনা। গেস্ট হাউসের ভেতর থেকে একটা লোক হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো মনোজের দিকে - "অধমের নাম দিবাকর কুণ্ডু, আপনার আসার খবর পেয়ে সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আসুন!" মনোজ গেস্ট হাউসে ঢোকার সময় খেয়াল বসেই পেছনে তাকিয়ে চমকে উঠলো, সে দেখলো বাসস্ট্যান্ডের সেই মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে ফের হাসছে।

********

রাতে খাওয়া দাওয়া ভালোই হলো মুরগির ঝোল আর ভাত দিয়ে। হাত মুখ ধুয়ে মৌরী মুখে দিয়ে মনোজ সেই মেয়েটির ব্যাপারে দিবাকরকে জিজ্ঞাসা করলো। প্রথমে মেয়েটার ব্যাপারে শুনে তার মুখটা যেন কেমন হয়ে গেল, কিন্তু তিনি তা সামলে নিয়ে বললেন "আপনি দেখেছেন বুঝি! ও কালাপানির ওদিকে থাকে। ওই বাড়ি বাড়ি কাজকর্ম করতে এদিকে আসে, ওর নাম রাজনন্দিনী।" মনোজের খুব হাসিই পেল এই ভেবে যে ঝি এর নাম নাকি রাজনন্দিনী! আর কথা না বাড়িয়ে মনোজ নিজের ঘরের দিকে এগোলো, কাল আবার ওই ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাবটার সেলস অফিসে যেতে হবে! রাতে ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখল মনোজ। সে দেখলো কালাপানির সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে আর কালাপানির জল থেকে উঠে আসছে এক নারীমূর্তি। তার সর্বাঙ্গ শুধু ভেজা শাড়িতে আবৃত, সমস্ত শরীর যৌবনের প্রাচুর্যে ফেটে পড়ছে। মেয়েটি কাছে আসতেই মনোজ তাকে চিনতে পারল, রাজনন্দিনী। তার বুকের ঘনঘন ওঠানামা মনোজকে পাগল করে তুললো আর মনোজ তাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে গেল। হঠাৎ সে দেখলো জলের স্তর যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে আর তার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রচণ্ড ঘেমে মনোজ বিছানায় উঠে বসলো। কি ভয়াবহ স্বপ্ন! হঠাৎ সে শুনতে পেল বাইরের ঘরে দিবাকর যেন কারো সাথে কথা বলছে, সে বলছে " যত জলদি সম্ভব কাজ শেষ করতে হবে, নাহলে আমাদের কেউ বাঁচাতে পারবেনা!"

******

"কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে যে আমরা অতীন বাবুকে খুন করিয়েছি?" সেলস অফিসে বসে থাকা মোটাসোটা কোট পরা লোকটা বললো মনোজের উদ্দেশ্যে। - দেখুন, আমি আপনাদের অভিযোগ করছিনা কিন্তু উনি আপনাদের সাথে দেখা করে এসেছিলেন আর তারপরেই ওনার মৃতদেহ পাওয়া যায়! - ওই ঘটনার পরে আমরাও প্রোঅ্যাক্টিভ হয়ে চেক করিয়েছিলাম যে সত্যিই আমাদের সাইটের ওয়েস্ট কালাপানি অবধি যায় কিনা। রিপোর্ট আজ বা কাল আসবে। রিপোর্ট দেখে তারপরে না হয় ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমরা খুন করাইনি। ওই শরীরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল, মনে হচ্ছিল কেউ যেন শরীরটা শুষে নিয়েছে। তাছাড়া, এই সাইট নন্দীপুর গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরে তাই দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ আর বেশ কয়েকটি পরিবার চলেও গেছে গ্রাম থেকে। গ্রাম প্রায় খালি। তেমন কোন তথ্য না পেয়ে মনোজ হতাশ-ই হোলো। মনোজ সেখান থেকে বেরিয়ে ভ্যান রিক্সা নিয়ে ৩০ মিনিটে এসে পৌঁছালো গেস্ট হাউস থেকে একটু দূরে। মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল মনোজের, শরীর কেউ শুষে নেবে কিভাবে? একটা সিগারেট ধরিয়ে মুখে দিতে যাবে ঠিক এইসময় একটি নারী কণ্ঠ শুনতে পেল। - শুনছেন? মনোজ পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা বেশ কাছে এসেই দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার শরীরের গড়ন ভালো করে বুঝতে পারছে মনোজ, সে নিজেকে সামলে বললো- - আমায় বলছেন? - (হেসে) আর কেউ আছে এখানে?.. আপনি পথের সাথীতে উঠেছেন না! মেয়েটার হাসিতে এমন কিছু আছে, যা মনোজের স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দিল। - আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ফলো করছেন! - যদি বলি আমার আপনাকে পছন্দ হয়েছে? - ঠিক হজম হোলোনা। মেয়েটা খুব একটা না হেসে বললো "আমি জানি আপনি অতীন বাবুর ব্যাপারে জানার জন্যই এসেছেন কিন্তু এটা কি জানেন যে শুধু উনিই না,গত ১০-১১ মাস ধরে প্রতি মাসেই এই গ্রামের কারোর না কারোর মৃতদেহ কালাপানিতে পাওয়া গেছে! আমার মনে হয় ওই কালাপানির মধ্যে অদ্ভুত কিছু একটা আচে!" এবার মনোজের বুকের ভেতর কেমন যেন শিরশির করে উঠল, তাহলে কি অতীনদার মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? মনোজ জিজ্ঞাসা করলো "আপনি চিনতেন অতীনদা কে?" মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে জানালো যে দু-একবার সে দেখেছে। না:, রহস্যের জট আরো পাকিয়ে উঠলো। সে একটু কিছু ভেবে মেয়েটা কে বললো "আমায় কালাপানি জলাশয়টা দেখাতে পারবে?" মেয়েটার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসিটা মনোজের চোখ এড়ালো না, সে নিজের সেই ভাবটা আশ্চর্য ভাবে আড়াল করে বললো "কালকেই চলুন! এখন যাই কাজ আছে!" বলে সে চলে গেল। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগতে লাগল - শেষ ১১ মাসে ১১টা মৃত্যু আর তার মধ্যে ১১তম হোলো অতীন দা। বোসের কথা অনুযায়ী ১০টা পরিবার এ গ্রামে আছে, তাহলে কি প্রত্যেকটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ মরেছে?

তার মনে হোলো হয়তো ওই রিকশাওয়ালাটা হয়তো কিছু জানে, ও হয়তো মনোজ কে কিছু বলতে চাইছিল। ওকে খুঁজে বের করার জন্যে আবার মনোজ বাসস্ট্যান্ডের দিকে পাড়ি দিল কিন্তু সে লক্ষ্য করলোনা দিবাকর তার পিছু নিয়েছে।

********

- আমি এগ্রামে থাকিনা বাবু, শুধু রিকশা চালাই মাঝেমাঝে এখানে। থাকতাম এখানে! - তুমি কিছু একটা আমাকে বলতে চাইছিলে কালাপানি নিয়ে। - গরীব মানুষ! কি বলতে কি বলিছি। - কথা ঘুরিওনা, তুমি কিছু জানো কালাপানি নিয়ে। - (হঠাৎ চোখ একটু বিস্ফারিত হলো) বাবু, পেছনে তাকাবেন না। দিবাকর আমাদের লুকিয়ে দেখছে। লোকটা সুবিধার না একদমই। উড়ো খবর আছে, আপনাকে মারার জন্যেই এখানে ডাকা হয়েছে।

মনোজের শরীরে ঠাণ্ডা রক্তের স্রোত বয়ে গেল, তাকে মারার জন্য কি বোস পাঠালেন? - দিবাকর মারবে? - সব কটা খুনের পেছনে ওরই হাত আছে। আমি অতীন বাবুকে ও সাবধান করেছিলাম কিন্তু শোনেনি! - ওর লাভ খুন করে? - সে জানিনা! কিন্তু শেষ খবর অনুযায়ী অতীন বাবু ওর সাথেই কালাপানির দিকে গিয়েছিল। - রাজনন্দিনী কে চেন?

লোকটা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল, সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল "আপনি ওই মেয়েটার সাথে মিশেছেন? বাবু, পারলে আজ-ই পালিয়ে যান! নাহলে আপনি মারা পড়বেন!" সে দৌড়ে পালাতে লাগল আর বলতে লাগলো "ওর খপ্পরে পড়বেন না!" বাসস্ট্যান্ডে একা দাঁড়িয়ে থাকল মনোজ, মেয়েটা প্রচণ্ড রহস্যময়ী। কি উদ্দাম তার যৌবন, তার দুর্নিবার আকর্ষণ মনোজকে কেমন বশ করে ফেলেছে। কিন্তু রাজনন্দিনীর সাথে এসবের কি সম্পর্ক? ওর কাছেই কি আছে অতীনদার মৃত্যু রহস্যের চাবিকাঠি!

হঠাৎ সে দেখলো বেশ কিছুটা দূরে দিবাকর দাঁড়িয়ে আছে আর তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সেই সেলস অফিসের লোকটা। মনোজ নিজেকে আড়াল করে নিলো একটা বন্ধ গুদামের পিছনে, দুজনে কি কথা যেন বলছে। কিন্তু দিবাকরের সাথে এর সম্পর্ক কি? তার মানে কি দিবাকর এই লোকটার কথাতেই কি খুন গুলো করছে? লোকটা এবারে মোবাইল বের করে কানে দিল। কাকে ফোন করছে? মনোজের ফোন বেজে উঠলো -

- মনোজ বাবু, রিপোর্ট এসেছে যে আমাদের জন্য কালাপানি দূষিত হচ্ছে না। - হুম। বলে সে ফোনটা রেখে দিল। আজ রাতে মনোজ দিবাকরকে চেপে ধরবে বলে ঠিক করলো!

*********

খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে মনোজ আর দিবাকর। মনোজ অন্যমনস্ক ভাবে কিছু একটা ভেবেই চলেছে। দিবাকরের সেদিকে হুঁশ নেই, গোগ্রাসে গিলতে ব্যস্ত সে। হঠাৎ তার খেয়াল হোলো যে মনোজ খাচ্ছে না। - আরে, খাচ্ছেন না কেন? - (সে কথার উত্তর না দিয়ে) আপনার সাথে ওই সেলস অফিসের লোকটার কি যোগ? - (একটু গম্ভীর হয়ে) যদি বলি, সে জেনে আপনার কাজ নেই। - অতীনদার মৃত্যুর পেছনে আপনাদের হাত আছে আমি জানি। পুলিশে খবর দেওয়ার সময় এসেছে। - (শয়তানি হাসি দিয়ে) আর কি লোকাবো? একটা গল্প বলি আপনাকে। মন দিয়ে শুনবেন। বলে তিনি বলতে শুরু করলেন - "কালাপানির কাছে একটা পোড়ো বাড়ি আছে। সেটা একটা রাজবাড়ী ছিল এককালে, রাজা ছিলেন চন্দ্রবাবু। তার এক মেয়ে ছিল, কথায় বলে সে নাকি অসম্ভব সুন্দরী ছিল। মেয়েটি ছিল জাদুকরী। কিন্তু সে একটা নিচু জাতের ছেলেকে ভালবেসে ফেলে, রাজা তা জানতে পেরে ছেলেটা কে খুন করিয়ে দেয়। মেয়েটাও সেই রাগে কালাপানি তে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে, কিন্তু মরার আগে সে অভিশাপ দেয় যাতে এই এলাকায় যেন কেউ থাকতে না পারে। তার অতৃপ্ত আত্মাকে রাজা ঐ বাড়িতেই তিন তলার এক ঘরে বন্দী করে দেয় মন্ত্রপূত করে। কিন্তু ১১ মাস আগে যখন এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কাজ শুরু হয়, ওদের কিছু লোক এখানে মদ নিয়ে ফুর্তি করতে এসে ভুল করে ঘরটা খুলে দেয় আর তার পর থেকেই এই সব শুরু হয়! প্রত্যেক মাসে একজন করে মারতে তো হবেই নাহলে...." - মেয়েটার নাম কী ছিল? কিসের অভিশাপ? মনোজ এতক্ষণ দেখেনি যে ওর পেছনে সেলস অফিসের লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে। সে হঠাৎ মনোজের মুখে রুমাল চেপে ধরে বলল "সব কি এখানেই জেনে নেবেন? বাকিটা কালাপানি তে গিয়েই জানবেন!" মনোজ অজ্ঞান হতে লাগলো ধীরে ধীরে।

*******

জলের শব্দ কানে আসছে মনোজের, শীতল হাওয়া তার সারা শরীরে এসে লাগছে। মনোজ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে কোথায় আছে। চোখ দুটো চাইলেও সে খুলতে পারছেনা, কতক্ষণ এভাবে সে রয়েছে তাও বোঝার উপায় নেই। ঘুমের ঘোরটা কমলেও চোখ দুটো বেশ ভারী হয়ে রয়েছে। হঠাৎ তার মুখের ওপর জলের ছিটা বেশ কয়েকবার দেওয়া হলো আর মনোজ ধড়মড়িয়ে উঠলো। চোখ খুললেও সে কিছু দেখতে পেলনা প্রথমে। আজ তো অমাবস্যার রাত, শুধু জলের শব্দই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার দৃষ্টি আঁধারে সয়ে গেল আর তার মনে হোলো সে এক বিস্তৃত জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে। মনোজের হাত পা অবশ্য বাঁধা ছিলনা তাই সে জলদি দাঁড়িয়ে পড়ল। "কে আছেন এখানে?" চিৎকার করে উঠল মনোজ, সেই শব্দ দিগন্ত বিস্তৃত জলাশয়ের উপর ছড়িয়ে পড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। "দিবাকর বাবু!!" আবার সে চিৎকার করলো। না:, কেউ কোথাও নেই। এই মানুষ বর্জিত ধূ ধূ প্রান্তে একা এবার প্রচণ্ড ভয় করতে লাগলো মনোজের। হঠাৎ মনোজের মনে পড়ল দিবাকররা কি যেন বলেছিল রাজবাড়ীর কোনো একটা মেয়ে আর তার অভিশাপ! রাজনন্দিনীর কথাই কি..... তার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো একটি নারীকন্ঠ শুনে- - কী মনোজ বাবু, আপনি এয়েচেন? ভালোই হলো , আপনার কালাপানি দেখার ইচ্ছে ছিল তো। - আপনি? এত রাতে আপনি কি করছেন এখানে? - আমার তো অসুবিধা হয়না। আমারই তো জায়গা এটা। এই জলাশয়ের মধ্যেই তো থাকি আমি! মনোজের রক্ত ভয়ে জল হয়ে গেল, সে তোতলা হয়ে বললো - - মানে? জলাশয়ের মধ্যে? - (পৈশাচিক এক অট্টহাসি হেসে) বা রে, ঝাঁপ দিয়ে এখানে মরলাম বলেই তো এখানে থাকি! - মানে সেই রাজার মেয়ে তুমি? - বাবা যখন ওকে মেরে ফেললো, আমি রাগে দু:খে কালো জাদু শিখি। ঝাঁপ দেওয়ার সময় এক কালো জাদুর অভিশাপ আমি এই জলাশয়ে দিয়ে যাই! - কি অভিশাপ? কারণ আমায় জেনে স্যার কে বলতেই হবে! সে এবার হাসলো, হাসিটা ঠিক সুবিধার ঠেকলোনা মনোজের। রাজনন্দিনী এবার নিজের বুকের ওপর থেকে আঁচল নামিয়ে দিতে লাগলো আর আস্তে আস্তে পেছনে কালাপানির দিকে যেতে লাগলো। তাঁর চোখে কামনার আগুন, তাতে যেন মনোজ বশীভূত হতে লাগলো আর সেও মেয়েটিকে অনুসরণ করতে লাগলো। মনোজ লক্ষ্য করলো মেয়েটির গলায় একটা ছোট্ট পাথর জ্বলজ্বল করছে কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। মেয়েটি বলল - - তুমি আমায় ভোগ করার স্বপ্ন দেখোনি? - হ্যাঁ, দেখেছি তো! রাজনন্দিনীর উদ্ধত যৌবনের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে মনোজ এতটাই আকুল হয়ে পড়ল যে সে লক্ষ্যই করেনি যে রাজনন্দিনীর পায়ের পাতা কখন যেন উল্টে গেছে।

*******

এখন রাজনন্দিনী আর মনোজ কোমর জল অবধি নেমে গেছে কালাপানির, জলের তীব্র শব্দ হলেও কোন এক জাদুবলে মনোজ আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। মনোজের কোনো হুঁশ নেই যে সে কোথায় চলেছে, কারণ ততক্ষণে মনোজ সম্পূর্ণ আয়েশে তাকে ভোগ করে চলেছে। হঠাৎ রাজনন্দিনী তাঁর কানে ফিসফিস করে বললো "তুমি আমার এই মাসের শিকার!" এইকথা শুনে মনোজের চটকা ভাঙ্গল, চোখ খুলে চমকে উঠলো সে.... কোথায় কে? চারদিকে অন্ধকারের মধ্যে কালাপানিতে কোমর জলে সে একাই দাঁড়িয়ে। ভয় পেয়ে সে জল থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু সে অনুভব করলো কেউ যেন তার পা টেনে ধরেছে জলের ভেতর থেকে আর সেও যেন আস্তে আস্তে কালাপানির ভেতর ডুবে যাচ্ছে। এই সময় দিবাকর কুণ্ডু এসে দাঁড়িয়েছে কালাপানির পাড়ে। মনোজ বাঁচার শেষ আশা নিয়ে তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করলো - - আমার কি দোষ? আপনি কেন এমন করলেন? - (হেসে) কোনো দোষ নেই আপনার। আপনি ভুল জায়গায় এসেছিলেন ব্যাস! - মানে? - এই কালাপানির অভিশাপ কি জানেন? যদি প্রতি মাসে একজন করে শিকার রাজনন্দিনীর প্রেতাত্মাকে না দেওয়া হয় তাহলে ওর কালো জাদু তে এই কালাপানির জলস্তর বেড়ে গিয়ে আশেপাশের সমস্ত এলাকা আর গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আর আমার সব এখানে , তাই যবে থেকে ওই রাজবাড়ীর ঘরটা খুলে যায় ভুল করে, তবে থেকে আমি গ্রামের পুরুষদের এইভাবেই ওর হাতে তুলে ওকে সন্তুষ্ট রাখছি।

মনোজ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলোনা, আরো একবার টান পড়লো পায়ে আর সে নিজেকে সামলাতে না পেরে কালাপানির জলে ডুবে গেল।

দিবাকর এতক্ষণ সব দেখলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে, পেছন থেকে সেই সেলস অফিসের লোকটা এলো- - দিবাকর, আর কতদিন এরকম ভাবে চলবে? তোমায় কিন্তু এই জন্যই টাকা দেওয়া হয় যাতে কালাপানির জল উথলে উঠে আমাদের প্রজেক্ট টা তছনছ না করে! এমাসের তো হোলো, পরের মাসে!

দিবাকর হাসতে হাসতে বলল "কোনো না কোনো বখরা তো পেয়েই যাব!"

সমাপ্ত

অমিতাভ বোসের সামনে একটা লোক বসে আছে। বোস বললেন - "তুমি রিকশা চালক, তোমার এই আজগুবি কথা কে বিশ্বাস করবে যে মনোজ এক ভূতের পাল্লায় পড়ে মারা গেছে!" রিকশাওয়ালা বললো "বিশ্বাস করতেই হবে আর এই জিনিসটা বন্ধ করতেই হবে।" বোস কিছুক্ষণ ভেবে মোবাইল ফোন থেকে একজনকে ফোন করে বললো "অভিষেক, একবার পরিবেশ ভবনে আসো তো, তোমার সাহায্য চাই!"

(অভিষেক সুর ফিরবে নীড়বাসনার পরের সংখ্যায় "কালাপানি ২" গল্পে)





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮