• বর্ণালী মুখোপাধ্যায়

গল্প - কিস্যা ভুতো কা

আমার নাম জন। আসলে জনি বা জনার্দন অমর- আকবর বা অ্যান্টনি যা কিছুই হতে পারতো কিন্তু জন নামটা আমি নিজে নিয়ে নিয়েছি। আমি ফুটপাত বালক। বাপ মায়ের ঠিক নেই,এই বারোতেই বেশ লায়েক। দু এক ডবকা আন্টি আমাদের ডেনড্রাইট ছাড়িয়ে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য ফ্রি স্কুল স্ট্রীটের কোণায় ম্যারপ বেঁধে, আলো জ্বালিয়ে ,রাতবিরেতে টর্চার করতো,ঠিক কায়দা করে সটকে গেছি। পার্কস্ট্রিটের কবরখানা থেকে টাটকা ফুল হাপিশ করে ট্রিঙ্কাসের সামনে বেচে দিই। সিগন্যালে গাড়ি আটকালো ধরুন, গাড়ির ভিতর এট্টু আধটু ,ইয়ে- মানে -চুম্মা চাপাটি চলছে আর কি,আমি অমনি জানলার কাঁচে নাক সাল্টিয়ে ঠকঠকাই---তারাও সস্তার বিদিশি ফুল আদিখিলা করে কিনে ফেলে। আমার রাতের মহফিল জমে যায়। গোপাল আমার সাকরেদ। ওকে বলেছিলাম -'কবর স্তানে ঘুরছিস যখন একটা ইংরিজি নাম নে। রকি!'


গোপালের মা কার একটা বাচ্চা ফুটপাতে ফেলে রেখে ভিক্ষে করে। পার্ক হোটেলে ঢোকার মুখটাতে। ওদের নাকি ভেটকিপুরে দুবিঘে জমি ছিল।তাই তার বেশ জমিদারী হালচাল। সে নাক সিঁটকে বলে-'আমি শালা তোর মতো বেজম্মা নই। ঝেতি বল কেনে,এক নাতি মারবো। আমি আমার বাপের গোপাল নস্কর। ঐ থাকবো। ' তাই থাক।


আমি ফাইটটা অতো ভালো দিতে পারি না বলে কথাটা চেপে গেছি।


কবরস্তানে ঢোকা আসান কম্ম নয়। বখরা দিতে হয় দারোয়ানকে।তবে ভাঙা পাঁচিল টপকেও ঢুকে পড়ি অনেকদিন। তখন দারোয়ান টেরটি পায় না।


সন্ধের আবছায়াতে আম্মো ঘুরি। তারাও ঘোরে। তাদের আলাদা গন্ধ, অন্য মেজাজ। যারা পুরোনো হতে হতে মোটামুটি ছেঁড়া ক্যালেন্ডার তারা অনেকেই খুব খেঁকুড়ে টাইপ। হবে না? সাত কুলে কেউ নেই,বড় বড় গাছগুলো অবদি এদের হাঁটুর বয়সী। সেই কবে বডি কঙ্কাল থেকে ধুলো হয়েছে,কে তাদের মনে রাখবে!


এদের কবরে শুকনো পাতার ঢিপ,সাপের ঘর।বেচারাদের কিস্যু জোটে না। এক পিস জারবেরা কি দুটি পাতা,কিচ্ছুই না --কিসমৎ পুরো ঠনঠন গোপাল।এদের কেউ খুব উদাসীন,আবার একএকজন যেন চন্ড। ধরুন কাকটা উড়তে গিয়ে একটু হেগে নোংরা করলো,আমি হয়তো তখনই গোপালকে নিয়ে পাশের কবরে ফুল- মোমবাত্তি কুড়োচ্ছি ---দিল ধাক্কা মেরে।


আমিও জন,ফুটের ছেলে,তেড়ে বলি‘-এটা কি হলো বস!’


-‘সাট আপ নেটিভ! কুত্তার বাচ্চা, দেবো ঘাড় মটকে’’?এরকম কি সব বলে ভয় দেখায় আর আমি হাসি।


জমিদার গোপালটা কিন্তু ডরকে মারে প্যান্ট ভিজিয়ে নেংটি বনে যায়,বিড়বিড়িয়ে মণ্ত্র পড়ে।


আমি বলি-'তোর ভেটকিপুরের মা কালিতে হবে না বে,খিসমাস টি তে মানতের গিঁট বাঁধ।'


-'তুই থাক শালা'-বলে গোপাল পাঁই পাঁই করে পালায়।


আমি নাকের কাছে ডেনড্রাইটের মৌতাত নিই। ঝিমঝিমে অন্ধকার নেমে আসে,রাস্তার তিনবাত্তি জ্বলে উঠলে গোরস্তানের হাওয়া রুকে যায়। নেশা জমতে না জমতেই কয়েকটা বেআক্কেল আমার দিলটা উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ধরাম করে বডিটা আছড়ে ফেলল শানে,দেখি পা আটকে গিয়েছে বুনো লতায়। । আমি বলি-'কেন দিল্লাগি করছো কাকা। তোমরা থাকো,আমিও থাকি।'


স্টিফেন বলে এক ঘাটের মরা আমার ভালো দোস্ত। সত্যিই গঙ্গার ঘাটে হাওয়া খেতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মরেছিল ব্যাটা,তার হনেওয়ালি বিবি জাহাজ চেপে আসছিল কলকাত্তা,সেই আনন্দে একটু বেশি টেনেছিল না কি। যা হোক,এখন তো সে পুরো হাওয়া।রোজ বাতেলা ঝাড়তো তাকে না কি হেব্বি দেখতে ছিল।আমি বলেছি-'দেখাও দিকি কেমন ছিলে?' তোএকদিন অনেক কষ্ট করে শরীর ধারণ করে আমাকে দেখালো। কি বলবো,পুরো খ্যাঁকশেয়ালের মতো দেখতে। ফর্সা খ্যাঁকশেয়াল। আমি তো বহুত হাসলাম। সে রেগেমেগে বলে -একদিন তোর রক্ত খাবো।


আমি হলুদ দাঁত বের করে হাসি-'ফ্যাকফ্যাক। আমার রক্ত কই?সব ডেনড্রাইট।'


সে তখন পাশে বসে বলে -'বিড়ি থাকলে দে দিকি নি। '


স্টিফেন হাওয়ার তৈরি,তায় হাওয়া টানে ভসভস। বলে-'তুই কোনদিন ভয় পেলি না বল। '


আমি বললাম,-'দ্যাখো সাব,কিতাব- উতাব , পুলিশ আর পাগলা কুত্তা ছাড়া কিছুতে ডর নেই। '


সে খেঁকিয়ে বললো-'আর আদমি কে ডরাস না কালা কুত্তা?'


স্টিফেন গালি দেওয়া শুরু করলেই মারধোর শুরু করে। আর আমি কেটে পড়ি।


আজ ডরোথি ম্যাডামের জনমদিন। তার নাতনি টাটকা গোলাপ রেখে গিয়েছে। সেই মেয়ে হেভি সুন্দর। আমি চোখ ফারকে দেখছি বলে ডরোথি ম্যাডাম কান মুলে দিয়েছে। বলেছে-বাস্টার্ড! আরও ইংরিজি গাল পেড়েছে, অতো বুঝি নি। আমি বললাম-'টাচ করি নি তো!দূর থেকে দেখছি তো খালি ।'

মেমসাহেব অমনি-' খবরদার' বলে একটা ঘূর্ণি তুলে দিয়েছে চোখে বালু ঢুকিয়ে। আঁখ কড়কড় তখন থেকে। যা হোক,সন্ধে নেমে এলো । আমি হলুদ গোলাপ গুলো তুলে নিলাম। গোপাল আসে নি ,যেমন ওর আদত, ডরপুকটাকে বাইরে গিয়ে আধা হিস্সা দেবো,আধা নিজের কাছে রাখবো, ভাবলাম।

হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে কেমন শীত শীত হয়েছে শহরটা। আমার গেঞ্জি তে পাঁচটা ফুটো,সেই পাঁচফুটোতে পাঁচ আঙুল ঢুকিয়ে শিরশিরোচ্ছে হাওয়া। আজ সানডের দিন নয়। দৌড়ে দৌড়ে ফুলগুলো বিকতে সময় লাগছে অনেক।


কাঁচের জানলার ওপারে এক কাপ কফি আর গোলাপী কেক খাচ্ছে একটা মেয়ে। এই দোকানটা ফ্লুরি। এর পাশে ওৎ পেতে থাকলে মোটামুটি ফুলগুলো হিল্লে হয়ে যায় জানি। তারপর ফুটো গেঞ্জি দেখে দু পাঁচ রুপেয়া উপরি । তাই এদিকটা চলে এলাম। শালা গোপালটা ভ্যানিশ পুরো।কিন্তু ঐ কফি খাওয়া মেয়েটা কে আমি আজই দেখেছি। ডরোথি ম্যামের নাতনি। আমি ভাবলাম সটকে পড়াই ভালো, ফুল গুলো চিনে নেয় যদি? কিন্তু ,ততক্ষণে সে বেরিয়ে এলো,আমিও সরল মুখে বলে দিলাম-ফালয়ার ম্যাম!বিটুফুল রোজেস!


সে অবাক হয়ে ফুল গুলি দ্যাখে,বিশেষ করে নিচের দিকে বাঁধা রিবনটা।কি ভাবে। তারপর বলে-'নো! আই ডোন ওয়ান ---'


এমন সময় আমার পিছন থেকে কে যেন বলে -'মুঝে দে দো!'


ঘুরে দেখি,উফ!কি দেখতে মাইরি, একটা ছেলে। লম্বা,কোঁকড়া চুল,পুরো রিতিক।


জিনের প্যান্ট,হাঁটুর কাছে শখ করে ছেঁড়া। আমারও আছে একটা ঐরম। সাদা কলার গেঞ্জি,পকেটের কাছে একটা লোক ঘোড়ায় চড়া--


সে বললো-কিৎনা?


আমি জন,বারো পেরিয়ে তেরো,ফুটের ছেলে,বললাম দোসো রূপেয়া।


জানি জানেমনের সামনে রিতিক বেশি কপচাবে না। যা চাইবো দিতেই হবে।


ডরোথি ম্যামের নাতনি কেমন গাল ফুলিয়ে রাস্তার অন্যফুটে দেখছে। বুঝলাম,লম্বু আসতে দের কর দিয়া।


লম্বু তাড়াতাড়ি দুটো একশোর কড়কড়ানি নোট আমার হাতে ধরিয়ে ফুলগুলি নিয়ে বললো-সামান্থা,আই এম রিয়েলি সরি। ইউ নো আই গট স্টাক ইন দ্য জ্যাম ,ইউ নো দ্য ব্লাডি ট্রাফিক হেয়ার--


-আজ তুমি এলে না,আমি একা সিমেট্রিতে


-মিটিং ছিল ডিয়ারি। এই ফুল গ্র্যানির জন্যই,লেটস গো । ওর ফোটোর সামনে সাজাবো চল।


ঐ মেয়েটা বোধহয় ছেলেটাকে সত্যিই দিল দিয়েছে। এটুকুতেই গলে যেন আমুল আইসকিরিম।


বললো-'চলো। জানো, সেম ইয়েলো রোসেস আমিও গ্র্যানিকে দিয়েছিলাম। সি ওয়াজ ভেরি ফন্ড অফ ইয়েলো রোসেস--,‘


-‘আই নো বেবি’


ওরা হাত ধরাধরি করে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে লাগলো গাড়ির দিকে।


আমি দেখি রাসেল স্ট্রিটের পুরোনো ফার্নিচারের দোকানটার সামনে একটা ভাঙা চেয়ারে ডরোথি ম্যাডাম বসে আছে। আমার দিকে কটকট করে তাকিয়ে আছে, রাগের ঠ্যালায় মেমসাহেবের চোখদুটো যেন দম মারা গুলির আগুন।


‘গুস্তাখি মাফ হো মেডাম,’ বলতেই বুড়ি উঠে দাঁড়ালো,যেন কবরখানার পুরোনো বটের গাছ!


আমি আর ওখানে না দাঁড়িয়ে, মানে মানে কেটে পড়লাম।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮