• সূর্য সেনগুপ্ত

গল্প - ফিরে এলাম


আমি লিফটের কাঠের দরজাটা খুলে কোলাপসিবেল গেটে হাত দিতেই লিফটের ভেতরের দিকে নজর গেল। যা দেখলাম সেটা সাধারণত লিফটের মধ্যকার দৃশ্য নয়। আমার গা-টা শিরশির করে উঠল। একটা ছেলে – ২৫/২৬ বছর বয়স হবে, লিফটের পেছনে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসে আছে। একটা পা ছড়ানো, অন্য পা-টা শরীরের দিকে গোটান। চোখ দুটো বোজা। মাথায় অবিন্যস্ত কেশরাশি, ঘাড়টা তার বাঁ দিকে হেলানো।

আমি লিফটে প্রবেশ করে বললাম, অ্যাই! কোন সাড়া নেই। এবার গলাটা বেশ তুলে বললাম, আরে, তুমি লিফটের মধ্যে বসে বসে কি করছ? ঘুমোচ্ছো নাকি? এবারও সাড়া নেই। আমার ভয় করে উঠলো। বুকের ভেতর ধুক ধুক শব্দ জোরে বাজতে শুরু করেছে। তবু আমি ঝুঁকে পড়ে ছেলেটার কাঁধে হাত ছোঁয়াতেই তার ঊর্ধ্বাঙ্গ বাঁ দিকে কাত হয়ে পড়ল, তার মাথাটা মেঝেতে ঠুকে গেল সশব্দে আর আমি কি করবো তা বুঝবার আগে লিফটটা শোঁ শব্দ করে ওপরের দিকে চলতে লাগল।

আমি জীবনে কোনদিন এত ভয় পাইনি। আমি কোলাপসিবেল গেটটা বন্ধও করিনি আর ওপরে উঠবার সুইচটাও টিপিলি তবু ...... আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কোলাপসিবেল গেটটাকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার শুরু করে দিলাম, এই যে কে আছেন ...... এই যে ...... এমনি আরো কি কি বলেছিলাম মনে নেই। লিফটটা সোঁ সোঁ করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পেছনে কি হচ্ছে ঘুরে দেখবার সাহস আমার ছিল না। তবু প্রায় জোর করে একটুখানি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম ছেলেটা ঠিক ঐ ভাবেই পড়ে আছে আর একটা মাছি ভনভন কড়ছে ওর মুখের কাছে । ও যে মরে গেছে তাই নিয়ে আমার ...... একটা অস্বাভাবিক আওয়াজ করে লিফটটা থেমে গেল।

আমি দ্রুত লিফটের দুটো দরজা খুলে চাতালের ওপর এসে দাঁড়ালাম। আমার পেছন দিকে তাকাবার কোন সাহস ছিল না। আমি থাকি থার্ড ফ্লোরে। এটা কোন ফ্লোর বুঝতে পারছি না। আমি ঠিক করলাম আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাব আর পথে যার সাথে প্রথম দেখা হবে তাকে বলব যে আমাদের লিফটে একটা মৃতদেহ পড়ে আছে, এক্ষুনি পুলিশে ...... - শুনছেন! আমার পেছন থেকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো আর আমার হার্টটা গলায় এসে আটকে গেল। আমি প্রস্তরমূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে আছি, আবার সেই কণ্ঠস্বর – শুনছেন! একটা পুরো মিনিট বয়ে গেল। অসম্ভব সাহসে ভর করে ফিরে তাকালাম। দেখলাম ছেলেটা সোজা হয়ে উঠে বসেছে। ঘোলা দৃষ্টি, একটা হাত আমার দিকে বাড়ানো। কিযে হল আমার মধ্যে, আমি এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে ওর হাতটা ধরলাম। ও আমার হাতে ভর দিয়ে কাঁপা কাঁপা শরীরটাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। - কি হয়েছিল? আমি কণ্ঠস্বরে অনেকটা দরদ এনে বললাম। - আমি ফিরে এলাম। আমার যাবার কথা ছিল না। ও আমার হতে ধরে ধরে লিফটের বাইরে বেরিয়ে এলো। সামনের ফ্ল্যাটটাকে দেখিয়ে বলল, আমি এই ফ্ল্যাটে থাকি। সিক্স বাই ফোর। ওদের ভুল হয়েছিল, যাবার কথা ছিল সিক্স বাই থ্রী’র। বলে ছেলেটা একটু দম নিলো। আমি ওর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি বলতে যাচ্ছিলাম কোথা থেকে...... আমার মুখ বন্ধ করে দিয়ে ঠিক সেই সময় সিক্স বাই থ্রী’র ভেতর থেকে তীব্র কান্নার রোল ভেসে এলো।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮