• পুষ্পিতা ভৌমিক

গল্প - বিপদে মোরে রক্ষা করো




গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোকে পড়িয়ে বাড়ি ফিরে ঝটপট স্নান ঘরে ঢোকে ঝিমলি।না আজও দেরি হয়ে গেল ওদের ছাড়তে ছাড়তে। একা একা করবেই বা কি ওরা?বাড়িতে আলাদা করে গৃহশিক্ষক রাখার সামর্থ্য নেই ওদের। ঝিমলি নিজ দায়িত্বে যেটুকু করে ওদের জন্য এই আর কি!স্নান সেরে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ও বলে ওঠে,"মা আজ কিন্তু ফিরতে রাত হবে।আজ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একটা পিকনিক করব খুব বায়না ধরেছে ওরা।ওমনি কানে আসে ওর মায়ের গলা,"লক্ষ্মী সোনা-মা যা করবি কর।কিন্তু একটু কিছু মুখে দিয়ে যা এখন। বেশিরভাগ দিন তো না খেয়ে বেরিয়ে যাস লাইব্রেরীতে।তারপর সারাদিন তো আর কিচ্ছু খাবিনা কাজের ঠেলায়।অনেক হল পরোপকার।নিজের দিকে তাকা,একটু সময় দে নিজেকে।চেহারার কি হাল হয়েছে দেখেছিস একবার নিজেকে?কোথায় বিয়ে দেব বল তোকে।পেত্নীর মত ধিঙ্গিপনা করলে হবে?"

সালওয়ারের ওড়না পিন-আপ করতে করতে ঝিমলি হেসে উত্তর দেয়,"আমি পেত্নী যখন তখন ঠিক একটা ব্রহ্মদত্তি ঠিক জুটে যাবে।তুমি চিন্তা করোনা।"এবার সামনে ভাতের থালা হাতে এসে দাঁড়ান মা,মেয়ের মুখে ভাতের গ্রাস তুলে দিতে দিতে বলেন, "পুরো বাবার মত হয়েছিস তুই,সবসময় পরোপকারের চিন্তা।মানুষটা আমাদের মধ্যে নেই ঠিকই কিন্তু তোর মধ্যেই বেঁচে আছেন উনি"_এই বলে কাপড়ের খুট দিয়ে চোখের কোণটা মুছে নেন।বেরিয়ে পড়ে ঝিমলি এবার মেঠো পথ ধরে সাইকেল নিয়ে গ্রামীণ লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে।দুইবছর আগে বাবা হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার পর বাবার চাকরিটা পায় ঝিমলি। তাই দিয়েই এখন চলে মা আর মেয়ের লাল-নীল সংসার।এসবের পাশাপাশি ঝিমলি গ্রামের বাচ্চাদের পড়ায়,দরকারি ওষুধপত্র বিতরণ করে নিজের মাইনের টাকা থেকে।সকলের কাছে ঝিমলি ভীষণ প্রিয় মিষ্টি ব্যবহারের কারণে।তবে বাবার অভাব বড্ড অনুভব করে ও। বাবাই তো বলত,"সকলের মধ্যে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে তবেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়।"বাবা হঠাৎ করে চলে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি। মাঝেমধ্যে খুব কান্না পায় ঝিমলির।পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় ও,বাবা নেই কিন্তু বাবার স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো!

যাইহোক কাজ সেরে বাচ্চাদের নিয়ে পিকনিকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ও।একেই শীতের রাত নটা বেজে গেছে বাচ্চাদের সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজে বাড়ির পথে পা বাড়ায় ঝিমলি। বটতলার পোড়ো বাড়িটার কাছে ওর পথ আটকায় একটা কালো অ্যাম্বাসেডর। গাড়ি থেকে নেমে কতগুলো মুখ-বাঁধা যুবক বলে,"কি দিদিমণি খুব পরোপকারের ঝোঁক বেড়েছে তাইনা?গতমাসে ওই মেয়েটাকে আমাদের মুখ থেকে না কেড়ে নিলে আজ আমাদের দলের শিবুর জেল-হাজত হতনা। আমাদের মুখের গ্রাস নিয়েছ। এখন চল রাত পরী হয়ে আমাদের সামনে..ওদের নোংরা ইঙ্গিত বুঝতে দেরী হয় না ঝিমলির।মনে পড়ে একমাস আগে শেষ ট্রেনে কাজ সেরে ফেরত আসার পথে ওরা গ্রামেরই মেয়ে শিউলির সর্বনাশ করতে চেয়েছিল ওই পোড়ো বাড়িটায় নিয়ে গিয়ে।ঝিমলি সেদিন একটা অসুস্থ বাচ্চাকে দেখে ফিরছিল তখন চিৎকার শুনে ওকে উদ্ধার করে।আজ রায় ঘোষণা হয়েছে।অপরাধী শাস্তি পেয়েছে তাই ওদের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছে ওর উপর।কিন্তু অতর্কিত আক্রমণের সামনে কি করবে ঝিমলি।

এমন সময় চোখ পড়ে দুর থেকে একটা সাইকেল নিয়ে এগিয়ে আসছে একটা অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি হাতে টর্চ। আস্তে আস্তে সামনে এসে দাঁড়ায় সেই মূর্তি ঘায়েল হয় অপরাধীরা।তারপর মিলিয়ে যায় সেই ছায়া শুধু রেখে যায় একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া।ঝিমলির কানেকানে কেউ যেন বলে ওঠে,"বিপদেআপদে এভাবেই তোর পাশে থাকবো l মা।বাড়ি যা তোর মা চিন্তা করছে।ওর মুখ থেকে অস্ফুটে একটাই শব্দ বেরিয়ে আসে"বাবা"।আজ ছায়া আর কায়ার তফাৎ খুঁজতে যাওয়া বোকামি বাবাকে নতুন করে খুঁজে পাবার পরশ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে ঝিমলি।দূরে কোনও বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসে বাপ-বেটির ভীষণ প্রিয় একটা গান"আমি ভয় করবো না ভয় করবোনা/দুবেলা মরার আগে মরবনা ভাই মরবনা"।


(নীড়বাসনা আয়োজিত ভৌতিক/ অতীন্দ্রিয় ইভেন্টে 'গল্প' বিভাগে এই গল্পটি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। )


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮