• অনন্যা ব্যানার্জী

গল্প - রাতের আতঙ্ক


শেখর ও রিয়ার বিবাহিত জীবন চলছিল আপন গতিতে। ছোট ছোট আনন্দ ও স্বপ্ন পূর্ণ ছিল তাদের জীবন পথ। রিয়ার মা হওয়ার সুসংবাদটা ও আসে হঠাৎ ই। কিন্তু তারপরেই আসে সেই দুঃসংবাদ। সেই সিঁড়িতে পড়ে যাওয়া আর সাথে সাথে মিসক্যারেজ হয়ে যাওয়া। এই ঘটনা পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয় শেখর ও রিয়ার জীবন। রিয়ার মনকে গ্রাস করে এক শূন্যতা। সে দিনে দিনে নিমজ্জিত হয় অবসাদের গভীরে। অনেক চেষ্টা করেও শেখর রিয়াকে ফিরিয়ে আনতে পারে না স্বাভাবিক জীবন স্রোতে। ডাক্তারের কথামত আজকাল শেখর তাই বেশী সময় কাটাতে শুরু করেছে রিয়ার সঙ্গে। রিয়ার ভালবাসা ও ভালোলাগাকে এখন শেখর প্রাধান্য দিয়েছে তার জীবনে‌। শেখরের বিশ্বাস এইভাবেই সে ফিরে আসবে আবার স্বাভাবিক জীবনে।

শেখর ও রিয়া এবারের লম্বা ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিল গণপতিপুলের সমুদ্র সৈকতে।পুণে থেকে সাত ঘণ্টা ড্রাইভ করে দুপুরে যখন তারা রিসোর্টে পৌঁছায়, স্বভাবতই দুজনেই খুব ক্লান্ত। রিসর্টটি একদম সমুদ্রের লাগোয়া দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে রিয়া। জল তার বড় পছন্দ। সেই ছোটবেলা থেকেই। আর সমুদ্র তাকে সর্বদা আকৃষ্ট করে। রিয়ার সঙ্গে থেকে থেকে আজকাল পাহাড় প্রেমী শেখর ও ভালবাসতে শুরু করেছে এই সুদূর প্রসারিত সমুদ্রকে। এমনকি বিয়ের পর হনিমুন করতেও ওরা কন্যাকুমারী গিয়েছিল। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময় সমুদ্র সৈকতে বসে এক অপরূপ আনন্দে ছেয়ে যায় তাদের মন। জলের মধ্যে তখন চলে এক অবর্ণনীয় রঙের খেলা। মনে হয় যেন কোন চিত্রকার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকে দিয়েছে এই প্রকৃতি। গণপতিপুলেতে সমুদ্রের রঙ গাড় সবুজ। আর তা আকাশের নীলের সঙ্গে মিশে একটা অভিনব সৌন্দর্য সৃষ্টি করছে নিরন্তর। অবাক চোখে রিয়া দেখছিল এই দৃশ্য কটেজের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। কখন হঠাৎ পেছন থেকে এসে দাঁড়িয়েছে শেখর।

"কি দেখছ এতো মুগ্ধ হয়ে?" - প্রশ্ন করে শেখর। "বাড়িতে ফোন করে পৌঁছ সংবাদ ও দিতে পারছি না গো। নো সিগনাল দেখাচ্ছে। আজকের যুগে আমরা যেন সারা পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি, ভাবতে ই অস্বস্তি হচ্ছে। তুমি ভেতরে চলো। ঠাণ্ডা লাগবে তা না হলে।" "জানি না কেন জান আমার মনে হয় আগের জন্মে আমি কোন জলের প্রাণী ছিলাম। বা হয়তো জলপরী। তাই সমুদ্র ও নদী আমাকে এত টানে। চলো ঘরে যাই।" - বলে ঘরে পা রাখে রিয়া। "শেখর কিরকম একটা অস্বস্তিকর গন্ধ পাচ্ছ এই ঘরটাতে?" - প্রশ্ন অরে রিয়া। "গন্ধ!! কই না তো। বরং রুম ফ্রেসনারের গন্ধটা নাকে আসছে। ওতেই কি তোমার অস্বস্তি হচ্ছে?" - জিজ্ঞাসা করে শেখর। "না গো, তা ছাড়া একটা গন্ধ আছে। রজনীগন্ধার। তুমি প্লীজ জানালাটা একবার খুলে দাও। আমার মনে হয় তাতে অস্বস্তি কমবে।" "যথা আজ্ঞা" - বলে শেখর চলে যায় পশ্চিমের জানালাটা খুলতে। জানালাটা খুলতে একটু বেগ পেতে হয় কারণ মনে হয় অনেকদিন বন্ধ এই জানালা। খুলতেই সমুদ্রের হাওয়া এসে আছড়ে পড়ে মুখে, চোখে। রিয়া ও এসে দাঁড়াল পাশে। অনতিদূরে আরেকটি কটেজের জানালা। সেটা অবশ্য বন্ধ এখন। আর কোণাকুণি দেখা যাচ্ছে গাড় নীল সমুদ্র। খুব রমণীয় দৃশ্য। পর্দাটা টেনে শেখর বাথরুমে চলে যায়। রিয়ার অস্বস্তিটা এখনো যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে দুটো চোখ যেন তাদের ওপর নজর রাখছে। রিয়া ভাবে মনের ভুল হবে। সুটকেসটা টেনে জিনিস বার করতে মন দেয়। কিন্তু অস্বস্তিটা যাচ্ছে না কিছুতেই। অগত্যা পর্দা সরিয়ে আরো একবার বাইরেটা দেখে নেয় রিয়া। না এদিকটা পুরো রিসর্টের শেষ প্রান্তে। ফলে এদিকে কেউ বেশী আসে না। সমুদ্র দেখা যায় বলে খানিক জোর করেই এই ঘরটা বুক করেছে তারা। ম্যানেজার কিছুতেই এই ঘরটা দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলেন "এখনো কাজ চলছে এই ঘরে। তাও আপনারা বেশী জোর করছেন যখন, থাকুন। কি আর বলবো?" ঘরটা পাবে শুনে আনন্দে নেচে ওঠে রিয়ার মন। ঘুর ম থেকে উঠেই সকালে সমুদ্র দেখতে পাবে। রাতে শোয়ার সময় শুনতে পাবে সমুদ্রের গর্জন। ইট কাঠ প্রস্তরের শহরে বড় হওয়া রিয়ার কাছে এ এক অদ্ভুত অনুভূতি।

সামনের ঘরটার দিকে নজর যেতে রিয়ার মনে হয় কোন এক মেয়ে যেন তাকে দেখে পর্দার আড়ালে চলে গেল। রিয়া আরো একবার ভাল করে দেখার চেষ্টা করে সামনের কটেজের বন্ধ জানালার ওপারে। অন্ধকারে কিছু দেখতে পায়না আর। "কি হল? যাও ফ্রেশ হয়ে নাও, খাওয়ার এসে পড়বে যে কোন মুহূর্তে" - শেখরের কথায় সম্বিত ফিরে পায় রিয়া। "হ্যাঁ তাই যাচ্ছি" বলে সে এগিয়ে যায় বাথরুমে। "না, এই মুহূর্তে শেখরকে এসব বললে, ও হাসবে রিয়ার ওপরে। নজর রাখার ব্যাপারটা সত্যি হয়তো তার মনের ভুল। আর পাশের ঘরে মহিলা থাকাটা তো খুব স্বাভাবিক।ওরা ও তাদের মতই হয়তো ঘুরতে এসেছে এখানে। কিন্তু রিয়াকে দেখে উনি লুকিয়ে পড়লেন কেন। এইসব ভাবতে ভাবতেই রিয়া কল খুলে মুখে চোখে জলের ঝাপটা দেয়। ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে জুড়িয়ে যায় শরীর। "কিন্তু চোখ খুলেই আয়নায় এ কার প্রতিফলন?" - কিছু ভাবার আগেই জ্ঞান হারায় রিয়া। আওয়াজ পেয়ে ছুটে আসে শেখর। "কি হল? কি হল তোমার? " - বলতে বলতে শেখর রিয়াকে কোলে করে এনে শুইয়ে দেয় খাটে। চোখে জলের ছিটে দিতে আস্তে আস্তে চোখ খোলে রিয়া। "কে যেন আমাকে দেখছে জানো এখানে আসার পর থেকে"- ভয়ার্ত কণ্ঠে জানায় রিয়া চোখ খোলা মাত্র। শেখর বলে -"এসব হচ্ছে মানসিক চাপ ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। রিয়া, এখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই। কেন তোমার মনে হচ্ছে অন্য কেউ দেখছে, তার গন্ধ পাচ্ছ। তুমি একটু চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করো। একটু ঠাণ্ডা দুধ খেয়ে নাও। তাহলে ঘুম আসবে। আমি জানি তোমার ভাল লাগবে।" অগত্যা রিয়া বাথরুমের কাঁচে যে মেয়ের প্রতিফলন দেখেছিল সে ব্যাপারে আর কিছু বলে না শেখরকে। পাছে ও আরো রাগ করে। কিন্তু চোখ বুজেও মনে শান্তি পাচ্ছে না রিয়া। মনটা বার বার চলে যাচ্ছে পর্দার পেছনে ও আয়নায় দেখা ওই মহিলার দিকে।

"কে উনি? কি চান উনি?" - এইসব চিন্তা আচ্ছন্ন করে রেখেছে রিয়ার মন। শেখর এসে একটা ওষুধ দেয় রিয়াকে। রিয়া জানে এটা ঘুমের ওষুধ। কিন্তু ঘুম তার আসছে না আজ। ওষুধ খেয়েও কোন ফল হয়না তাই‌। এখন প্রায় বারোটা। পাশে অকাতরে ঘুমোচ্ছে শেখর। রিয়া কোন সাড়াশব্দ না করে বিছানায় উঠে বসে।

সন্ধ্যায় পাওয়া সেই রজনীগন্ধার গন্ধটা আবার যেন নাকে আসে রিয়ার। এবার আরো তীব্র। সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে ভেসে আসছে একটা টানা গোঙানির শব্দ। রিয়ার মাথাটা ঝন্ ঝন্ করছে। ও দরজা খুলে বেরিয়ে যায় বারান্দায়। এখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজ ছাপিয়েও কানে আসছে একটা হালকা গোঙানির শব্দ। শব্দটা আসছে পাশের কটেজটা থেকে। রিয়া খালি পায়েই এগিয়ে যায় ওই কটেজটার দিকে। হ্যাঁ, এবার আরো স্পষ্ট হচ্ছে আওয়াজটা। একটা মেয়ে যেন খুব কাঁদছে। সঙ্গে সাহায্যের অনুরোধ করছে একভাবে।দরজার কাছে পৌঁছে রিয়া দেখে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। কিন্তু একটানা আসছে গোঙানির আওয়াজ। রিয়া মন থেকে সব ভয় মুছে ফেলে ধাক্কা দেয় দরজায় সজোরে। "শুনছেন, কি হচ্ছে? দরজাটা খুলুন। তা না হলে আমি পুলিশ ডাকবো।" কোন উত্তর পায়না রিয়া। শুধু মেয়েটির গোঙানির আওয়াজ আসতে থাকে ক্রমাগত। এবার একটা পোড়া গন্ধ আসতে থাকে আর ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে ঘরের ভেতর থেকে। ধোঁয়াতে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে রিয়ার। দরজা ধাক্কাধাক্কি করে ক্লান্ত রিয়া বসে পড়েছে মাটিতে এবার। ধোঁয়া এসে ধূসর করে দিয়েছে আশপাশ। হঠাৎ পেছন থেকে শেখরের গলা ভেসে আসে -"রিয়া, রিয়া, তুমি এখানে কি করছো? আমি তোমাকে সারা কটেজ খুঁজে বেড়াচ্ছি।" রিয়া কিছু বলার আগে শেখর বলে -"কিরকম একটা পোড়া গন্ধ এখানে। তুমি পাচ্ছ?" রিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। "এতক্ষণ ধরে একটি গোঙানি শুনতে পাচ্ছিলাম ভেতর থেকে। এখন মনে হয় সব শেষ করে দিল ওরা। সেই মেয়েটা শেখর যাকে সন্ধ্যায় আমি জানালায় দেখেছি। নিশ্চয় তার কোন বিপদ হল।" শেখর উঠে আরো দুবার দরজা ধাক্কাধাক্কি করে, কিন্তু কোন ফল হয়না। শেখর রিয়াকে ঘরে বসিয়ে কল করে রিসেপশনে। না কেউ সাড়া দিচ্ছে না ফোনের। শেখর পুলিশে কল করবে ভাবছে। তখন মনে পড়ে এখানে তো কোন মোবাইল কানেকশন আসছে না সেটা তারা দেখেছে সন্ধ্যা থেকে। অগত্যা ঘরে সব আলো জ্বালিয়ে দুজনে বসে থাকে। সেই রাতে আর ঘুম হয়না কারুর। সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আবারো একবার ওই কটেজের কাছে যায় তারা। এখন সূর্যের রশ্মিতে ঝলমল করছে কটেজ। কোন পোড়া গন্ধ বা কিছু পোড়ার চিহ্ন ও নেই এখন। শেখর দরজায় কান লাগায়। অনুমান করতে চায় ভেতরের অবস্থা। না কোন কিছু অস্বাভাবিক চোখে পড়ে না। জানালার পর্দাও টানা। ফলে ভেতরের কিছু দেখা যাচ্ছে না।

বেলায় ম্যানেজার এলে সব কথা খুলে বলে শেখর ও রিয়া। সব শুনে ম্যানেজারের মুখ বিবর্ণ হয়ে পড়ে। সে বলে -"বেশ কিছু বছর আগে, এই কটেজে এসে আশ্রয় নিয়েছিল এক আদিবাসী মেয়ে কুসুম তার বিয়ের রাতে। বিয়ের সময় পণ দিতে না পারায় সে লগ্ন ভ্রষ্টা বলে কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা গ্রামে। বাবা মা কে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পালিয়ে যায় এই মেয়েটি বধূর সাজে। রাতে ছুটতে ছুটতে এসে সে আশ্রয় নেয় এই কটেজে। সে শরণাপন্ন হয় এই রিসর্টের ম্যানেজারের। এর আগে এখানে অনেকবার নাচতে এসেছে সে। তার দুঃখের কথা শুনে তাকে আশ্রয় দেয় এখানের ম্যানেজার, বিজয় দেশপান্ডে। শোনা যায় ওই মেয়েটিকে পছন্দ করতেন তিনি মনে মনে। এর আগে এখানে অনেকবার আদিবাসী নাচের আসরে কুসুমকে নাচতে দেখেছেন ম্যানেজার বিজয় দেশপান্ডে। কিন্তু এই আশ্রয় দেওয়ার কথা গোপন থাকে না বেশীদিন। এক অমাবস্যার রাতের অন্ধকারে এসে ওদের দুজনকে শুদ্ধ পুরো কটেজ পুড়িয়ে দেয় গ্রামবাসী। ঘটনার আকস্মিকতায় কোন কিছু টের পায় না কুসুম ও বিজয়। তারা দগ্ধ হয়ে মারা যায় সেই রাতে। তারপর থেকে ওই কটেজ ও তার পাশের কটেজটি বন্ধ রাখা হয়। অমাবস্যার রাতে পাশের কটেজ থেকে অনেকে শুনেছে তাদের আর্তনাদ। তাইতো এই দুটি কটেজ সবসময়ের জন্য বন্ধ রাখতে চেয়েছে ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু আপনারা নাছোড়বান্দা হয়ে ওই পাশের ঘরটিতে থাকতে অনুরোধ করলে আমরা না করতে পারিনা। সায়েন্স এর ছাত্র শেখরের মন মানতে চায়না এই কথাগুলো।এইকথা শুনে হতবাক হয়ে পড়ে শেখর ও রিয়া।

"তা হলে গতকাল রাতে পাওয়া আওয়াজ ও গন্ধের ব্যাখ্যা কি?" - অস্ফুটে প্রশ্ন ভেসে আসে শেখরের মুখ থেকে।

না এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। ওই ঘরটি খুলে ও ভেতরে যেতে পারে না তারা। ধুলোর প্রলেপ ওখানে প্রায় দুই আঙুল সমান। দরজা খুলতেই একটা বন্ধ স্যাত স্যাতে হাওয়া এসে লাগে নাকে। ভেতরে বাসা করেছে বাদুর। হয়তো সাপ ও থাকতে পারে। কোন মানুষের থাকার চিহ্ন নেই সেখানে। আর একদিন ও ওখানে থাকে না শেখর ও রিয়া। সেদিনই ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে পুণের উদ্দেশ্যে। এই ঘটনা তবুও রয়ে যায় তাদের মনের গভীরে। আজ ও কখনো কখনো আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যায় তাদের মাঝরাতে ওই রাতের কথা ভেবে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮