• শ্রাবস্তী সেন

গল্প - স্বপ্ন


মিনিমাম ছয় ফুট লম্বা তো হতেই হবে। তার কমে তো চলবেই না। গায়ের রঙ নিয়ে অত মাথাব্যথা নেই। ফরসা হলে ভালো, না হলে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণও চলে যাবে। চোখ, মুখ হবে শার্প। নিজের বেশভূষা নিয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হতে হবে। ভালো চাকরি তো থাকবেই, ওটা না বললেও চলবে। কিন্তু যথেষ্ট রকমের রসিক হওয়া দরকার। হ্যাঁ এগুলো তো মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন হতেই হবে তার মতো সুন্দরী মেয়ের স্বামী হতে গেলে। হ্যাঁ, সুমনা খুব ভালো করেই জানে যে সে সুন্দরী। ছোটবেলা থেকে আত্মীয় – অনাত্মীয় সবার মুখে সে নিজের রূপের প্রশংসার কথা শুনে আসছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার আশেপাশে কাউকে সুমনা খুঁজে পায়না যে ওর রূপের কাছে আসতে পারবে। যখনই সেজেগুজে কোনও অনুষ্ঠানে যায় লোকজনের নজর তার দিকেই পরে। আর সেই নজরে মিশে থাকে যে মুগ্ধতা, তাকে একরকম উপভোগই করে সুমনা। বরং এই ব্যাপারে নিজের দিদি সুনন্দাকে একটু করুণার চোখেই দেখে সে। দিদি সুশ্রী হলেও সুমনার মতো ডানাকাটা সুন্দরী নয়। গতবছর যখন রাহুলদার সঙ্গে বিয়ে হল দিদির, সুমনার মনে হয়েছিল দিদির যোগ্যতা অনুযায়ী রাহুলদাকে পেয়ে দিদি বর্তে গেছে। বিয়ের আসরে বা দিদির বউভাতে রাহুলদাদের বাড়িতে বহু লোককেই বলতে শুনেছে যে কনের চেয়ে তার বোনকে বেশী সুন্দর দেখতে। এসব শুনে দিদিকে বোধহয় কোথাও অনুকম্পা দেখিয়েছে সুমনা নিজের অজান্তে। যদিও বিয়ের পর রাহুলদার সঙ্গে দিদি বেশ ভালোই আছে। ছোট্ট, ছিমছাম একটা সংসার ওরা দুজনে মিলে গুছিয়ে নিয়েছে রাহুলদার কর্মস্থল নয়ডাতে। সুমনা বাবা মার সঙ্গে একবার গেছিলো। দিদির সংসার তার বেশ ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে রাহুলদা আর দিদির সাবলীল সম্পর্কটাকেও।

আর দুমাস পরে সুমনার পরীক্ষা। সোসিওলজিতে মাস্টার্স করছে সে। বাড়িতে বাবা-মা বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন এবার বিয়ের জন্য। যদিও ছোট থেকে এতোগুলো বছর কেটে গেছে, বহু ছেলের মুগ্ধ দৃষ্টি, প্রেম নিবেদন সবই পেরিয়ে এসেছে সে, তবু কাউকে তার মনে ধরেনই। অগত্যা বাড়ীর লোকই ভরসা। তবে মনেমনে নিজের জীবনসাথীর যে ছবি সে কল্পনা করে রেখেছে, যে ক্রাইটেরিয়ার লম্বা লিস্ট সে করে রেখেছে, তার সাথে মিলে গেলেই হোল।

দিনগুলো বেশ গতে কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধলেন বাবা অর্ধেন্দু মিত্র। অর্ধেন্দুর রিটায়ার করতে আর এক বছরও বাকি নেই। সব মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারের মত অর্ধেন্দুও চাইছেন রিটায়ার করার আগে ছোট মেয়ে সুমনাকে পাত্রস্থ করতে। সেদিন টিফিন টাইমে অফিসে দীর্ঘদিনের সহকর্মী দীপকবাবুকে সেই কথাই বলছিলেন। আর অর্ধেন্দুর কথা লুফে নিলেন দীপকবাবু। নিজের ভাইপোর জন্য তারাও পাত্রী খুঁজছেন। দীপকবাবুর দাদা দুবছর আগে গত হয়েছেন। একটাই ছেলে গৌরব, ধানবাদে কর্মরত। মা ও ছেলের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। গৌরবের মা কখনো ছেলের কাছে ধানবাদে থাকেন, আবার মাঝেমধ্যে কলকাতায় এসে দীপকবাবুদের পৈতৃক বাড়িতে কয়েকদিন কাটিয়ে যান। বর্তমানে রাজশ্রী মানে গৌরবের মা কলকাতাতেই আছেন। গৌরবও দুদিনের জন্য বাড়িতে আসছে সামনের সপ্তাহে। যদি অর্ধেন্দুরা চান তাহলে সামনের সপ্তাহে মেয়ে দেখতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্ধেন্দু যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। তিনি সেখানেই দীপকবাবুকে সপরিবারে বাড়িতে এসে সুমনাকে দেখে যেতে বললেন।

হঠাৎ করে এরকম একটা প্রস্তাব তার জীবনে আসবে সুমনা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি। বাবা যেরকম উচ্ছ্বসিত হয়ে রয়েছেন সেখানে সে বেশি কিছু বলতে পারছেনা। মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলো গৌরবের কোন ও ছবি ওনারা দেখেছেন কিনা? মা উল্টে বলে দেন ছেলে ভালো, বাড়ীর লোকেরা এত ভালো, এগুলোই আসল। ছেলেকে কেমন দেখতে তা নিয়ে তাঁদের অতো মাথাব্যথা নেই। দিদি, জামাইবাবুও বাবা-মাকে সমানে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সমস্ত পরিস্থিতি যেন সুমনার বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে রবিবার দিন পাত্রপক্ষের সামনে বসতে রাজি হল। যখন কোন দিক দিয়ে কিছু জানতে পারছে না, ঠিক করলো নিজেই সামনে থেকে দেখে চক্ষু-মনের বিভেদ ঘুচিয়ে নেবে। রবিবার বিকেলে দীপকবাবুরা ঠিক সময় মতন চলে এলেন। ওনারা চারজন এসেছেন। দীপকবাবু ওনার স্ত্রী তাপসীদেবী, গৌরব ও তার মা রাজশ্রীদেবী। সুমনাকে ওর মা বেশ খানিকক্ষণ আগেই তৈরি হতে বলে গেছেন। অবশ্য তৈরি হওয়ার সেরকম কিছু নেই। মা একটা হাল্কা হলুদ রঙের ঢাকাই শাড়ি বার করে দিয়েছেন। তার সঙ্গে কানে ছোট দুল, গলার একটা চেন, ও হাতে দুগাছা হালকা চুড়ি। সুমনা ঠিক করে প্রথমদিন বেশী সাজগোজের দরকার নেই। বাইরের ঘরে বাকি সবাই অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। যথাসময়ে মা এসে সুমনাকে নিয়ে গেলেন সেখানে। হাল্কা হেসে সবাইকে প্রণাম করে বসলো চেয়ারে। কিন্তু একি? গৌরবের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো সে। কোন ভাবেই এর সঙ্গে তার স্বপ্নের হিরোর সাথে কোন মিল নেই। গৌরবের হাইট হবে বড়জোর পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি মতন। গায়ের রং হাল্কা শ্যামবর্ণ। মাথার পেছনে হাল্কা টাক রয়েছে। গড়পড়তা বাঙালি ছেলেদের মতন রয়েছে ছোট্ট এক নেয়াপাতি ভুঁড়ি। এমনিতে গৌরব বেশ হাসিখুশি, সাবলীল। সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কথা বলছে। বরং গৌরবকে দেখার পর থেকে আড়ষ্ট হয়ে গেছে সুমনা। গৌরবের বাড়ীর লোকেরা অবশ্য বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করেনি তাকে। দু-একটা মামুলি প্রশ্নের পর সবাই ওদের দুজনকে আলাদা করে কথা বলতে বলে। বাড়ীর লোকেদের অনুরোধে গৌরবকে নিয়ে নিজের ঘরে আসে সুমনা। কথা আর কি বলবে সে? বাইরের ঘর থেকে আসার সময় মনে হচ্ছিল পা দুটো আর চলছেনা। গলার কাছে কান্নাটা যেন দলা পাকিয়ে আটকে রয়েছে। এ কি হচ্ছে তার সঙ্গে? যাইহোক গৌরবও তাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করেনা। ওই হবি কি? চাকরি করতে চায় কিনা? এই ধরণের কিছু মামুলি প্রশ্ন করে। বেশ ভদ্র ভাবেই সে সুমনাকে জিজ্ঞেস তার গৌরবকে কিছু জিজ্ঞেস করার আছে কি না? সুমনা না বলায় সে আবার বসার ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু সুমনা আর সেখানে ফিরে যায়না। সবাই ভাবে সুমনা বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। কিন্তু গৌরব চলে যাওয়ার পরেই দরজা বন্ধ করে কান্নায় ভেঙ্গে পরে সে।

এদিকে গৌরবের বাড়ীর লোকেরা জানিয়ে দিয়ে যায় যে সুমনাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুভদিন দেখে ওদের বিয়েটা দিতে চান ওনারা। বাড়িতে যেন একটা উৎসবের মেজাজ দেখা যায়। সবাই গৌরব ও তার বাড়ীর লোকের ব্যবহারে মুগ্ধ। সবাই সারাক্ষণ বিয়ের কি কি প্রস্তুতি নিতে হবে,তার আলোচনায় ব্যস্ত। আলাদা করে কেউ আর সুমনাকে জিজ্ঞেস করেনা গৌরবকে তার কেমন লেগেছে? সে এই বিয়েটা করতে চায় কি না? নিজেকে বড্ড খেলো লাগতে থাকে সুমনার। কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা সে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙ্গে পড়তে থাকে। এতদিনের এত স্বপ্ন যে এরকম তাসের ঘরের মতন ভেঙ্গে পড়বে তা সে কোনদিনও কল্পনাও করতে পারেনি। বাড়ীর সবার ওপর খানিকটা অভিমান করেই সে ঠিক করে এই বিয়ে সে করবে। বিয়ের দিন তার পাশে গৌরব যে কতটা বেমানান ,সেটা সে সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবে। তার মতন সুন্দরীর যে গৌরবের চেয়ে অনেক ভালো পাত্র জুটত ,সেটা সেদিন সবাই দেখলেই বুঝতে পারবে। যদিও দু বাড়ীর লোকজন চেয়েছিল তারা বিয়ের আগে ফোনে কথা বলুক, গৌরব ব্যস্ত থাকায় সেটা সম্ভব হয়না ,আর সুমনা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

যথাসময়ে বিয়ে হয়ে যায় সুমনার। বিয়ের দিন সত্যি অপরূপা লাগছিলো তাকে। বিয়েবাড়ি শুদ্ধু লোকজন ওর রূপের খ্যাতিতে মুগ্ধ। শ্বশুরবাড়িতেও আত্মীয়স্বজনরা তার রূপের প্রশংসায় মুখর। সবকিছুই ঠিক মতন চলতে থাকে। বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে গৌরব বেশ চুপচাপ ছিল। সুমনা যেন খানিকটা এড়িয়েই যায় তাকে। গৌরবের পক্ষে বেশিদিন ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়, তাই কোনোরকমে অষ্টমঙ্গলা করেই তাদের চলে যেতে হবে ধানবাদে। প্রথমটায় রাজশ্রীদেবী মানে তার শাশুড়ি যাবেন ওদের সঙ্গে, কিন্তু তিনি আবার দু সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসবেন, কলকাতায় কিছু কাজ আছে বলে।

আজন্ম যারা কলকাতায় থেকেছে তাদের পক্ষে প্রথমবার কলকাতা ছেড়ে বেরোনোটা একটা বিরাট ব্যাপার। তার ওপর সেই বেরোনোটা যদি এক অপছন্দের লোকের জন্য হয়, তাহলে তো আর তার চেয়ে বড় দুঃখের আর কিছু নেই। সুমনার অবস্থাও সেইরকম। এতদিনের পরিচিত একটা শহর, বন্ধুবান্ধব সবাইকে ফেলে চলে যেতে হচ্ছে, তাও কিনা ওই ভ্যাবলা গৌরবের জন্য, এই ব্যাপারটা সে কিছুতেই মানতে পারছেনা। আবার বাবা, মা, দিদি এদের ওপর একটা অভিমানও কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। এরা সবাই চক্রান্ত করে একজন অযোগ্য লোকের সঙ্গে তার জীবনটা জড়িয়ে দিলো। তবে একটা ব্যাপার হল গৌরব তাকে খুব একটা বিরক্ত করেনি এই কদিনে। গায়ে পরে গল্প করা বা কোনোকিছু সুমনার মতের বিরুদ্ধে করতে বলা, সেসব কিছুই সে করেনি। বরং কিছুটা হলেও সে বোধহয় বুঝতে পেরেছিল সুমনা এই বিয়েটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, তাই একটু দূরে দুরেই থাকছিল সে। নির্দিষ্ট দিনে সুমনা ধানবাদ এসে পৌঁছল। কলকাতা শহরের সঙ্গে অনেক তফাৎ রয়েছে। গৌরবের কোয়ার্টার শহরের এক প্রান্তে। এখানে গৌরবদের অফিসের কোয়ার্টারগুলো একটা ক্যাম্পাসের মধ্যে, তার বাইরে জায়গাটা বেশ ফাঁকা। সামনে দিয়ে হাইওয়ে চলে গেছে। সেটা পেরোলে বিশাল মাঠ। তবে এখানের প্রকৃতির মধ্যে যেন একটা রুক্ষতার ছোঁয়া রয়েছে। গৌরব পরের দিনই অফিস জয়েন করে। শাশুড়িকে বরং সুমনার বেশ ভালো লেগেছে। সারাদিন সব কিছু গুছিয়ে দিচ্ছেন, সুমনার সঙ্গে নানান বিষয়ে গল্প করছেন। সব মিলিয়ে মানুষটা বেশ নির্ঝঞ্ঝাট। এখানে সুমনার বিশেষ কাজ নেই। সকালে গৌরব বেরিয়ে যাওয়ার পর রান্নার লোক এসে রান্না করে দেয়। গৌরবের খাবারটা রান্নার লোকই টিফিন ক্যারিয়ারে গুছিয়ে রেখে যায়। দুপুরে অফিসের একজন লোক এসে খাবারটা নিয়ে যায়। আরেকজন ঠিকে লোক আসে , বাড়ীর সব কাজ করে দেয়। গৌরব ফেরে প্রায় আটটা- সারে আটটা নাগাদ। তারপর খানিকক্ষণ ওরা তিনজনেই সামনের বারান্দায় বসে গল্প করে, এইভাবেই সময় কেটে যায়।

গৌরবকে সুমনা যত দেখে তত অবাক হয়। এমনিতে সবার সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহার করে। সুমনাকে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে তার হবি কি? কি খেতে ভালবাসে? কি ধরণের গান শুনতে ভালবাসে বা কি সিনেমা দেখতে ভালবাসে? বোঝাই যায় সুমনার খেয়াল রাখার ব্যাপারে ভীষণ রকম চিন্তিত।এইভাবেই দেখতে দেখতে দুই সপ্তাহ কেটে যায়, আর শাশুড়ি কলকাতায় ফিরে যান। শাশুড়িকে ট্রেনে তুলে দিতে সুমনাও গেছিলো গৌরবের সাথে। ফিরে এসে গৌরব তাকে বলে এতদিন মা ছিল বলে সে কিছু বলতে পারেনি , তবে তার মনে হচ্ছে সুমনার তার সাথে এক ঘরে থাকতে অসুবিধে হচ্ছে। তাই এবার থেকে সে অন্য ঘরে থাকবে, যতদিন না সুমনা নিজে তার সঙ্গে এক ঘরে থাকতে চাইছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হয় যে বিয়ের পর থেকে এক ঘরে থাকলেও গৌরব কিন্তু আলাদা একটা সোফাতে শুতো। গৌরবের কথায় সুমনা হঠাৎ যেন একটা মুক্তি অনুভব করলো। বাপের বাড়িতে সে যেমন নিজের ঘরে একা থাকতে পারত, এখানেও সেরকম থাকতে পারবে জেনে তার খুব ভাল লাগলো।

সেদিন রাতে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। কিরকম যেন অস্বস্তি হচ্ছে। প্রথমটায় একটু অবাক হলেও পরে বুঝতে পারে নিজের বাড়িতে তার একা ঘরে থাকা আর এখানে থাকার মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। বাপের বাড়িতে সে ওই ঘরে আজন্ম থেকেছে। অনেক ছোট থেকে ওই ঘরটা ছিল শুধু তার। সেটা অন্য কারুর সঙ্গে তাকে ভাগ করতে হয়নি। আর এখানে আগের দিন ও কেউ ছিল ওর সঙ্গে এই ঘরে। সে যেন তার নিঃশব্দ অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়ে গেছে সারা ঘরে। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ঘুম আসেনা সুমনার। বিছানায় শুয়ে সমানে ছটফট করতে থাকে সে। নিঃশব্দ রাতে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। কেন জানে না ভীষণ কান্না পেতে থাকে তার। একবার ভাবে পাশের ঘরে গিয়ে গৌরবকে ডেকে বলবে এই ঘরে এসে থাকতে। কিন্তু গৌরবের কাছে হেরে যেতে হবে এই ভেবে নিজেকে নিরস্ত করে সে। কোনোরকমে রাতটা কেটে যায়, ভোরের দিকে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিল বুঝতেই পারেনি। ঘুম ভাঙতে বেশ বেলা হয়ে যায়। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে গৌরব রান্নাঘর থেকে দুকাপ চা করে নিয়ে আসছে। সুমনার দেরি দেখে নিজেই করে নিয়েছে।

সারাদিন ভীষণ বাজে লাগে সুমনার। অন্য দিন তাও শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করে সময় কেটে যেত, আর আজ যেন সময় আর কাটতেই চায়না। গৌরব অবশ্য নিজের কর্তব্য করতে ভোলেনি। অফিস থেকে দুবার ফোন করে খোঁজ করেছে সুমনা ঠিক আছে কি না। এই লোকটাকে নিয়ে কি করবে সুমনা বুঝে উঠতে পারেনা। একেক সময় মনে হয় এর থেকে যদি সুমনার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতো , তাহলেও একটা মানে ছিল। কিন্তু এর ভালোমানুষি তো আরও অসহ্য লাগছে। একেক সময় ইচ্ছে হয় মানুষটার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে, মানুষটার পছন্দ- অপছন্দ সব জানতে। কিন্তু তখনই যেন দুজনের মাঝখানে একটা দেওয়াল এসে পথ রোধ করে দাঁড়ায়। সঙ্কোচের সেই দেওয়াল পেরিয়ে আর এগোতে পারেনা সুমনা।

এখানে আশেপাশে বেশ কিছু মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। যদিও বেশির ভাগই তার থেকে বয়সে বড়, দু একজন তার সমবয়সী রয়েছে। তবে সবারই বাচ্চা রয়েছে বলে তারা বেশির ভাগ সময়ই বেশ ব্যস্ত থাকে। ফলে সুমনার একাকীত্ব যেন আর কাটতেই চায়না।

সেদিন সকাল থেকে মেঘ করেছে। গৌরব সেদিন সকালে উঠেই ধানবাদের বাইরে একটা জায়গাতে গেছে অফিসের কাজে। জায়গাটা অনেকটা মাইথনের কাছে। সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসবে বলে গেছে। সারাদিন সুমনার একা একা আর সময় কাটতে চাইছেনা। তারপর বাইরেও মেঘলা হয়ে আছে, মাঝে মাঝে হাল্কা বৃষ্টি হচ্ছে,কেমন একটা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। সবমিলিয়ে কেমন যেন মন খারাপ করা পরিবেশ। তবু সারাদিন সে চেষ্টা করে নিজেকে যতটা সম্ভব ব্যস্ত রাখার। সামনের বারান্দায় টবে কটা গাছ পুঁতেছে। তাদের পরিচর্যা করে কিছু সময় কাটায়। খানিকক্ষণ বই পড়ে। কিন্তু বিকেল থেকে শুরু হয় ভীষণ ঝড়। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে। ঝড়ের দাপটে জানলা- দরজা বন্ধ করে রাখলেও , মনে হচ্ছে সব যেন ভেঙ্গে পড়বে। ঝড় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং হয়ে গেছে। সুমনা কোনোরকমে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরে বসে আছে। বেশ কিছুক্ষণ ঝড় চলার পর নামে অঝোরে বৃষ্টি। এখানে আসার পর এরকম বৃষ্টি সুমনা কক্ষনো দেখেনি। আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টিতে দুহাত দূরে সব কেমন আবছা লাগছে। সুমনার ভীষণ ভয় করতে থাকে। মনে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে দৌড়ে গিয়ে কারুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কোনও মানুষের সাহচর্য তার এখন ভীষণ ভাবে দরকার। কিন্তু সেতো সম্ভব নয়। আর চিন্তা হতে থাকে গৌরবের জন্য। তার তো সন্ধেবেলা ফেরার কথা। এই বৃষ্টিতে কিকরে ফিরবে? এক অজানা আতঙ্কে মনটা কেঁপে ওঠে। এই বৃষ্টিতে রাস্তায় কোনও বিপদ হবে না তো? নিজের অজান্তেই ভগবানকে ডাকতে থাকে সুমনা। দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে থাকে।

একেকটা মুহূর্ত যেন একেকটা ঘণ্টা মনে হয়। চিন্তায়, অবসাদে সুমনা যেন এক অচল পাথরের মতো বসে থাকে। যতরকম দুর্ভাবনায় মনটা যেন উথাল পাতাল করছে। একসময় সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে কার জন্য কার জন্য এত চিন্তা করছে সে? গৌরবকে তো সে স্বামী বলে মেনে নিতেই পারেনি। তার যেরকম স্বামী পাওয়ার স্বপ্ন ছিল, তার সঙ্গে তো গৌরবের কোন মিল নেই। সুমনার এই মনোভাব কিছুটা হলেও গৌরব আঁচ করতে পেরেছিল।তাই সে সরে গেছিলো সুমনার কাছ থেকে। মুখে কিছু বলেনি, শুধু নীরবে নিজের সব দায়িত্ব কর্তব্য সেরে গেছে। কেন মানতে পারেনি সুমনা গৌরবকে? কি কমতি ছিল গৌরবের? এইসব প্রশ্নগুলো যেন কুরে কুরে খেতে থাকে সুমনাকে। নিজের ছেলেমানুষির জন্য ধিক্কার দিতে থাকে নিজেকে। একবার শুধু একবার সুযোগ পেলে ও চেষ্টা করবে নিজের সব ভুল শুধরে নিতে।

রাত ক্রমশ বাড়তে থাকে। বৃষ্টি মাঝেমাঝে একটু কমছে আবার তেড়ে আসছে। বৃষ্টি যেন বন্ধ হওয়ার কোন নামই নিচ্ছেনা। চারিদিক ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। একটানা বৃষ্টির আওয়াজ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। হঠাৎ বাইরের দরজায় জোরে ধাক্কার আওয়াজ আসে। কেউ যেন জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে প্রায় রাত দুটো। এইসময় কে এলো? সুমনার প্রচণ্ড ভয় করছে। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে কোনোরকমে টলতে টলতে সে আসে দরজার কাছে। গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বেরতে চাইছেনা। কোনোরকমে জিজ্ঞেস করে “কে”? বাইরে থেকে গৌরব চেঁচিয়ে বলে, ‘সুমনা দরজা খোলো’। একি শুনছে সুমনা? সত্যি গৌরব ফিরে এসেছে? না কি ওর মনের ভ্রম? যন্ত্রচালিতের মতন হাতটা যেন চলে যায় দরজার লকে। কোনোরকমে দরজা খোলে সে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে গৌরব। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে গেছে। আর না, আর নিজেকে সামলাতে পারেনা সুমনা। গৌরবকে ধরে অঝোরে কান্নায় ভেঙ্গে পরে সে। গৌরব তাকে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

বিকেলে তারা গাড়িতে করে ঠিক সময়েই রওনা দেয়। কিন্তু কিছু রাস্তা আসার পরেই ,এই বৃষ্টিতে গাড়ি আটকে যায়। বাকিরা গাড়িতেই অপেক্ষা করতে থাকে,কিন্তু গৌরব পারেনা। বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুমনার মুখটা। অচেনা, অজানা জায়গায় সারারাত কি করে একা থাকবে সুমনা? সবাইকার বারণ অমান্য করে গৌরব হাঁটা শুরু করে। বেশ কিছুটা আসার পর একটা রিক্সা পায়। তাতে খানিকটা এসে আবার নেমে হাঁটতে শুরু করে সে। অন্ধকার রাস্তায় বেশ কয়েকবার হোঁচট খায়,একবার পরেও গেছিলো। হাতে পায়ে দু একটা জায়গায় কেটেও গেছে। তবু সে উঠে আবার হাঁটতে থাকে। তারপর এই মাঝরাতে এসে পৌঁছয় বারিতে।রাস্তায় আসতে আসতে অনেকবার মনে হয়েছে, সে বোকামো করছে। এই রিস্ক নেওয়াটা তার একদমই উচিৎ হয়নি। তবু মনের জোর করে চলে এসেছে সে।এখন মনে না এলেই ভুল করতো সে। জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার যা সে আজ পেয়েছে, তার কাছে এইটুকু কষ্ট তো তুচ্ছ।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮