• ত্রিদেব চৌধুরী

প্রবন্ধ - আঁধারের যাত্রী

লা নেই কওয়া নেই, দুপুর ঠিক আড়াইটেয় হাতঘড়িটা থেমে গেল। হঠাৎই। অবশ্য কোন ঘড়িই আজ পর্যন্ত বিগড়ানোর আগে কখনো নোটিস দিয়েছে কিনা মোহন ঠিক মনে করতে পারছিল না। গাড়ির চাকায় সদ্য পেষা ইঁদুরের লেজটা রাস্তার ওপর তখনো একটু একটু নড়ছিল। সেদিকে চোখ পড়তেই নোটিসের ব্যাপারটা মাথা থেকে সরে গেল তার। একটা অন্য কথা মাথায় এল। দুম করে ঘড়ি থেমে যাওয়াটা খুব খারাপ লক্ষণ। দাদু সব সময় বলেন। আরো অনেক কিছু জানেন দাদু। তাঁর পরামর্শ মতই মোহন কখনো মই এর তলা দিয়ে হাঁটে না। কালো বেড়াল রাস্তা কাটলে সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। অন্য কেউ ঐ জায়গাটা আগে পেরোলে তখন দোষ কেটে যাবে। শুনশান রাস্তায় যদি অনেকক্ষণ কেউ না আসে? তার ও উপায় আছে। দাদু বলেই দিয়েছেন। বাঁহাতের আঙুল তুলে শূন্যে কাটাকুটি করতে হয়। তাতেই দোষ কেটে যায়। দাদুর মুখেই শোনা। এরকম আরো অনেক কিছু আছে যা মোহন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। হাতের ঘড়ি থেমে যাওয়াটা হল জীবন থেমে যাওয়ার প্রতীক। মানে আজই তার শেষ দিন। খেল খতম। অন্য কেউ হলে হয়ত দোকানে গিয়ে ব্যাটারি বদলে, টাইম ঠিক করে নিয়ে যেখানে যাচ্ছিল সেখানে চলে যেত। কিন্তু মোহন অন্য রকম। এসব ব্যাপারে সে খুব সিরিয়াস। আজই শেষ দিন? ভাবতে ভাবতেই তার গলা শুকিয়ে এল। হাত পা কাঁপতে শুরু করল। বয়স সবে পঁচিশ পেরিয়েছে। কত সাধ পূর্ণ হওয়া এখনো বাকি। তার বাড়ি থেকে তিনটে বাড়ি পেরিয়ে কমলার বাড়ি। কমলাকে সে ভালোবাসে। যদি ও এখনো বলাই হয় নি। রাতে ঘুমোবার আগে প্রায়ই স্বপ্ন দেখে তার বউ কমলা পুকুর থেকে হাঁসগুলোকে তাড়িয়ে ঘরে ফেরাচ্ছে। কমলার লাজুক চোখদুটো যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল মোহন। চারপাশের আলো ক্রমেই নিভে আসছিল। চোখে অন্ধকার দেখছিল সে।

জ্ঞান ফিরে এলে দেখল নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। মরে নি। মায়ের মুখ গম্ভীর। পড়ে গিয়ে নাকি মাথায় হালকা চোট লেগেছে তার। বাবা বলল, গ্রামের সোনামণি নাকি তাকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছে। সোনামণি? সোনামণি হাসদাঁ? হে ভগবান! সর্বনাশের আর কী বাকি রইল তবে? সোনামণির বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। আগে পিছে কেউই নেই। সবাই মরে গেছে। পড়ে আছে কিছু জমিজমা ঘরবাড়ি। তাতেই চলে যায়। তবে কিনা গোটা ঈশ্বরপুর গ্রামেই তার খুব বদনাম। সোনামণি কালা জাদু জানে। কারো দিকে সে একবার কুদৃষ্টি দিলে অপরপক্ষের বাঁচার আর কোন উপায়ই তখন থাকে না। এই তো আদুরী-বউদির ছেলেটা। মাত্র সতেরো বছর বয়স। পেটে ব্যথা উঠে দুদিন ভুগল। তিন নম্বর দিনেই খালাস। জাদু টোনা ছাড়া আবার কী? গ্রামে কোন অঘটন ঘটলেই সবার নজর সোনামণির দিকে যায়। যাবেই তো। ও যে ডাইনি। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে শুরু করে প্রাণনাথ জেঠু সবাই বলে সোনামণি ডাইনি। প্রাণনাথ তো খুব ভালো লোক। লোকের আপদে বিপদে টাকা ধার দেয়। কেউ কেউ বলে জেঠু নাকি চড়া সুদ নেয়। সে তো নেবেই। অমনি অমনি কি কেউ কাউকে টাকা দেয় নাকি? মোহন নিজে দেবে? কক্ষনো না। অবশ্য কাউকে ধার দেবার মত টাকা তার কাছে কোনদিনই ছিল না। নেই ও। পঞ্চায়েত প্রধান বাবাকে বলেছে মোহনকে নাকি জিপি তে চাকরি দেবে। যদি দেয় তবে সে ও একদিন বড়লোক হতে পারবে। বোনের বিয়ে দিতে হবে। মণ্ডলকাকু মানে প্রধান বাবাকে নাকি বলেছে ‘মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করো না খুড়ো। আমি তো রয়েছি।’ এসব মানী লোকেরা সবাই যদি বলেন সোনামণি ডাইনি, তবে সেটাই ঠিক। নইলে কি ওনারা বলতেন?

জ্ঞান ফিরে আসার পর সব ধরণের চেতনা বা অনুভূতি একসাথে ফিরে আসে না। একে একে আসে। মোহন এতক্ষণ খেয়াল করে নি, ঘরের বাইরে কারা যেন নিচু গলায় একসাথে কথা বলছে। সে কান পাতল। নারী কণ্ঠে কান্নার মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছিল। তারপর সব শব্দ আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল। ঠিক তখনই ঘড়ির কথাটা মনে এল। বাঁ হাতের কব্জিটা চোখের সামনে তুলে দেখল ঘড়িটার কাঁচে দু’জায়গায় চিড় ধরেছে। কিন্তু, সেটা চলছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। সেকেন্ডের কাঁটার অগ্রগতি দেখতে দেখতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই জানে না।

এটা গল্প বটে, আবার সত্যি ও বটে। কুসংস্কারের এমন সব ঘটনা আমাদের দেশের গ্রামে-গঞ্জে প্রায়ই ঘটে চলেছে। কুসংস্কার কাকে বলে? এর সঠিক সংজ্ঞা কেউই বলতে পারবেন না। কোন সংস্কারটা ‘কু’ আর কোনটা নয় সেটা বলা খুব শক্ত। অভিধান বলছে, কুসংস্কার হচ্ছে ভ্রান্ত ধারণা বা বিশ্বাস। আমার ছাদের টবে যেহেতু আজ লাল গোলাপ ফুটেছে, সুতরাং আপনার ছেলে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে - এরকম একটা কথা হয়ত কেউই মেনে নেবেন না। হাঁচি বা টিকটিকির ডাকের সাথে তেমনি শুভাশুভের কোন যোগসূত্র আজো খুঁজে পাওয়া যায় নি। সুতরাং আজকের জন্য দুটোই ভুল ধারণা - কুসংস্কার। যেদিন প্রমাণ মিলবে সেদিন মানব। একটি বাচ্চা মেয়ে ছোট বেলায় বিশ্বাস করত জোড়া শালিক দেখলে দিনটা ভালো যাবে। বেজোড় হলেই মুশকিল। অনেক বুঝিয়ে ও যখন ফল হল না, মেয়েটির বাবা তখন বললেন, আজ থেকে সবকিছু একটা খাতায় লেখা শুরু হোক। লাইন টেনে খাতায় একটা টেবিল তৈরি করা হল। তাতে তিনটে হেডিং এভাবে থাকবে:-

১) তারিখ ২) ক’টা শালিক দেখেছি ৩) শুভ বা অশুভ বিশেষ কিছু ঘটেছে কিনা।

অবাক কাণ্ড, এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দিন কয়েক শালিক শাস্ত্র লেখার পর মেয়েটি দুই শালিক তিন শালিকে বিশ্বাস করাই ছেড়ে দিল। আবার দেখুন, আমরা কালো বেড়ালকে অশুভ বলে জানি। প্রাচীন ইজিপ্টে কিন্তু একেই শুভ বলে ভাবা হত। কপাল ভালো, বেড়াল নিজেই জানে না তার কত বদনাম। জানলে লজ্জায় ঘৃণায় কবেই গলায় দড়ি দিত।

এটা সবাই মানবেন যে আমাদের জীবনটা বড় অনিশ্চিত। কাল কী হবে কেউ জানি না। আমার মেয়েটা ডাক্তার হতে পারবে কিনা জানি না। ছেলের বৌ টা মনের মত হবে কিনা তা ও জানি না। অথবা, জব ইণ্টারভিউ দিয়ে চাকরি পাব কিনা বলতে পারছি না। আগামী সপ্তাহের মিটিং এ নতুন বিজনেস ডিল টা ফাইনাল হবে কিনা বলা শক্ত। এসব নানা অনিশ্চয়তা মনের ভেতর চাপ সৃষ্টি করে, স্ট্রেস বাড়ায়। এর থেকে মুক্তি পেতেই আমরা জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হই। তিনি যা বলেন সেইমত ছোটখাটো ‘দাওয়াই’ প্রয়োগ করি। গ্রহরত্নের পেছনে দৌড়োই। নিজেকে বোঝাই, এসব করলেই বা কী? কিছু ক্ষতি তো হচ্ছে না। তাছাড়া অনেক কিছুই মিলেছে তো।

যাঁরা জীবনে অনেকটাই সফল, সেই সেলিব্রিটিদের ও এর থেকে মুক্তি নেই। ক্রিকেট খেলতে নেমে অন্তত: হাফ-সেঞ্চুরি জুটবে কিনা, জানি না। সিনেমায় অভিনয় করছি, ছবি হিট হবে না ফ্লপ - বলতে পারছি না। রাজনীতিতে সফল হব কিনা - কে জানে! বড় মানুষদের চাপ ও বড়। কুসংস্কার ও বড় হয়ত।

বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাই অমুক বাবা তমুক মায়েরা প্রায়ই আবির্ভূত হচ্ছেন এবং পাবলিকের মনে কুসংস্কারের জড় মজবুত করছেন। তাঁদের চেম্বারে ও লাইন লেগে আছে। খবরের কাগজে দৈনিক, সাপ্তাহিক রাশিফল বেরোচ্ছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র ভুল না সত্যিই তাতে কোন দম আছে সে তর্কে না গিয়ে ও বলা যায় যে কায়দায় পত্রপত্রিকায় রাশিফল লেখা হয় তাতে সবার ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু মিলে যাবে। সে আপনার রাশি যাই হোক না কেন। অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানির মত। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। একটি বিখ্যাত দৈনিক কাগজের মার্চ মাসের কোন এক সপ্তাহের রাশিফল নিম্নরূপ। (শুধু দুটো রাশি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।) ভবিষ্যৎ বাণী কেন মূল্যহীন, সেটা ব্র্যাকেটে বলা আছে।

কন্যা কারও সঙ্গে জমি ক্রয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। (হতেই পারে। এটা রিয়েল এস্টেট এর সিজন।) দীর্ঘ দিন আটকে থাকা কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা। (বহুদিন আটকে থাকা কাজ শেষ হবার সম্ভাবনা সব সময়ই আছে।) কুটুমদের সঙ্গে অশান্তি হতে পারে। (সব বাড়িতেই হতে পারে।) বাকপটুতার জন্য সুনাম অর্জন করতে পারেন। (কোন গুণ থাকলে তার জন্যে প্রশংসা পাওয়াটাই স্বাভাবিক।) শেয়ারে অর্থ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। (জানা কথা। বেশির ভাগ লোকই শেয়ারে টাকা খোয়ায়।) কোনও জিনিস চুরি হতে পারে বা হারাতে পারে। (চুরি তো যে কোন সময় হতেই পারে। বেছে বেছে শুধু কন্যারাশির লোক কেন? সবার সাথেই হতে পারে।) ব্যবসায় কোনও ভাল লোকের জন্য বিপদ থেকে উদ্ধার। ( ভালো মানুষেরা সবসময় লোকের উপকারই করে থাকেন।) সংসারের কোনও কাজ সপ্তাহের মধ্য ভাগে সেরে ফেলুন। (ভালো কথা। মেলা না মেলার কোন ব্যাপার নেই। এরকম ভবিষ্যৎবাণীর এটাই সুবিধা।) চাকরির স্থানে কাজের দায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। (কাজের দায়িত্ব সবসময় বেড়েই চলে) প্রেমের জন্য বাড়িতে বিবাদ। (সবার বাড়িতেই হতে পারে।) অংশীদারি ব্যবসায় নজর দিন। (এই না বললেন ব্যবসায় কোনমতে বিপদ থেকে উদ্ধার পাব। আবার ব্যবসা করতে পরামর্শ দিচ্ছেন!) বাঁকা পথে আয় না করাই ভাল হবে। (সাধারণ নীতির কথা।) এই সপ্তাহে প্রিয় কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে আঘাত পেতে পারেন। (আঘাত আমরা পেয়েই থাকি। প্রিয়জন বলেই সেটাকে আঘাত ভাবি। অন্য কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তত কষ্ট হয় না।)

কুম্ভ বেহিসাবি খরচের জন্য সংসারে অশান্তির আশঙ্কা। (লাগাম ছাড়া খরচ করবেন আর এ নিয়ে ঝগড়া হবে না?) প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোথাও ভ্রমণের পরিকল্পনা। (হতেই পারে) কর্মক্ষেত্রে কোনও কারণে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। (আজকাল কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা সবার জন্যেই সত্য।) ছোটখাটো চোট লাগতে পারে। (খুব স্বাভাবিক কথা।) বাড়তি কোনও খরচের জন্য বাড়িতে অশান্তির সম্ভাবনা। (আগেই একবার বলা হয়ে গেছে।) আত্মীয়ের সঙ্গে অশান্তি হতে পারে। (সবারই হয়। আত্মীয় নিয়ে সুখী কে?) তবে ব্যবসার দিকে কোনও অর্থ সাহায্য পাবেন। (অর্থ ছাড়া কি ব্যবসা হয়?) বাড়িতে কোনও সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। (সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ সাধারণত: কোর্ট অব্দি গড়ায়।) শত্রুর জন্য কাজের ক্ষতি। (শত্রু সবারই আছে। তারা ক্ষতিই করে বলে জানি।) সামাজিক কোনও কাজের জন্য সম্মান বাড়তে পারে। (ভালো কাজের ফল তো থাকবেই।) কর্মস্থান পরিবর্তন নিয়ে কোনও চিন্তা। (ট্রান্সফার বা জব চেঞ্জ এর টেনশন অনেকেরই আছে।) সন্তানের পড়াশোনার ব্যাপারে কোনও চিন্তা হতে পারে। (সব বাড়িতেই এ নিয়ে চিন্তা করা হয়।) বিপদে বন্ধুর সাহায্য পেতে পারেন। ( বিপদে তো বন্ধুরাই হাত বাড়িয়ে দেয়। সব সময় না ও দিতে পারে। ‘পেতে পারেন’ বললে সুবিধা এই যে সাহায্য জুটুক চাই না জুটুক, জ্যোতিষশাস্ত্র তো নির্ভুল প্রমাণিত হবে।)

বাকিগুলো নিজেরা পড়ে নেবেন এবং বিশ্লেষণ করে নেবেন। নিউজপেপার যে কাগজে ছাপা হয় সেটা সরকার থেকে পত্রিকা প্রকাশকদের সুলভ মূল্যে দেওয়া হয়। বাকি খরচ সরকার বহন করেন। সরকারের কোষাগার তো আপনার আমার টাকায় সমৃদ্ধ হয়। অর্থাৎ ট্যাক্সদাতাদের অর্থে। সেই কাগজে এসব মূল্যহীন কথা ছেপে কী লাভ?

সবাই কুসংস্কার-গ্রস্ত হন না কেন? বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে যাদের মনে নেগেটিভ ফিলিং খুব বেশি, যারা অবসাদ, টেনশন, অ্যাংজাইটি ইত্যাদিতে ভুগছেন, যাদের ভেতর আত্মবিশ্বাসের অভাব - তাদেরকেই কুসংস্কার বেশি কাবু করে। আরো জানা যাচ্ছে, পুরুষদের তুলনায় মহিলারাই নাকি বেশি প্রভাবিত। এর একটা ব্যাখ্যা ও গবেষকেরা দিয়েছেন। কোন ঘটনার কন্ট্রোল যদি আপনার হাতে না থাকে তবে আপনি ভাগ্যে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, তুকতাক করে ‘দোষ’ কাটাতে চেষ্টা করবেন। সোজা কথায় কুসংস্কার-গ্রস্ত হয়ে পড়বেন। ভারতীয় সমাজে নারীরা সবাই এখনো যোগ্য আসন পান নি। আমাদের দেবী-বন্দনা দুর্গাপুজোয় শুরু, সেখানেই শেষ। চারদিনের ব্যাপার। বছরের বাকি দিনগুলোতে লাইফের ওপর তাঁদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁরা ভীতা, নির্যাতিতা, অত্যাচারিতা। এবং ফলস্বরূপ - ভাগ্যে বিশ্বাসী। কুসংস্কারাচ্ছন্ন।

কুসংস্কার দুই প্রকার। নিরীহ ও বিপজ্জনক। যেমন হাঁচির পাল্লায় পড়ে দু’মিনিট দেরিতে ঘর থেকে বেরোলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু ডাইনি বলে কাউকে পুড়িয়ে মেরে ফেললে তখন সেটা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গত কার্যকারণ সম্পর্ক বিহীন এই আপাত নিরীহ কুসংস্কার আসলে কিন্তু সাইলেন্ট কিলার। জনগণের মনে ডাইনি তত্ত্বে ঘোর অবিশ্বাস থাকলে কারো সাধ্য হত না একজন লোককে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়ে মেরে ফেলতে। তবেই দেখুন, যাকে নিরীহ বলে ভাবছি আসলে সেটা ততটা নিরীহ নয়। ছোটখাটো কুসংস্কার আমরা প্রায়ই এই বলে মেনে নিই, আচ্ছা, এতে তো কারো কোন ক্ষতি হচ্ছে না। মানলেই বা কী? সমাজের সব লোকের মনে যখন এভাবে ভ্রান্ত বিশ্বাস মজবুত হবে ‘ডাইনি’ হত্যার মত নারকীয় কাজের ও কোন প্রতিবাদ তাদের ভেতরে জাগবে না। কুসংস্কার এভাবেই আমাদের রোবট বানিয়ে দেয়। ব্রেনওয়াশ করে ছাড়ে।

সামগ্রিক কুসংস্কারের ফায়দা দুষ্ট লোকেরা সব যুগেই নিয়মিত তুলে এসেছে। প্রাচীন ইউরোপে যেসব নারীরা চার্চের বিপক্ষে আওয়াজ তুলতেন উইচ বা ডাইনি আখ্যা দিয়ে তাঁদের মেরে ফেলা হত। ভারতে ও এই জঘন্য ক্রাইম বহুদিন থেকেই চলে আসছে। উইচ হাণ্টিং এর নামে নিরপরাধ নারীকে হত্যা করার পেছনের কারণ কখনো যৌন লালসা, কখনো সম্পত্তি হাতানোর চক্রান্ত, কখনো বিরুদ্ধ রাজনীতিকে খতম করা আবার কখনো পারিবারিক প্রতিশোধ। একজন নারীই একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। অত্যাচার করে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারলে পুরো পরিবারটাই ধ্বংস হয়ে যায়। ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, ছত্তিসগড়, তেলেঙ্গানা, বিহার, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, আসাম, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ -দেশের এসব জায়গাতেই মহিলাদের ওপর ডাইনি নামের অত্যাচারটা সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে সব রাজ্যে এখনো ডাইনি-প্রথা বিরোধী আইন গড়ে ওঠে নি। কেন্দ্রে ও নেই। যে পশ্চিমবঙ্গ একদিন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল সে পশ্চিমবঙ্গ আজ কোমায় চলে গেছে। তবে শুধু আইন করে সবকিছু আটকানো যায় না। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, ঝাড়খণ্ডে ডাইনি-প্রথা বিরোধী আইন থাকলেও ডাইনি অপবাদে হত্যার ঘটনা সেখানেই সবচেয়ে বেশি। কেন এমন হচ্ছে?

প্রথম কথা, আইন অন্ধ। তাকে প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়। আইনশাস্ত্র বলে, হাজার দোষী ছাড়া পেয়ে যাক তবু একজন ও নির্দোষ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পান। ‘ডাইনি’ কে তো আর একা একজন কেউ মারে না। অনেক লোক মিলে মারে। এরাই মাতব্বর। গ্রামের বাকি লোক কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকার দরুণ এদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিতে চট করে এগিয়ে আসে না। ‘বিচারের বাণী (তাই) নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ অনেক সময় আবার ঘটনার রিপোর্টিং দেরীতে হয়। কারণ, নির্যাতিতার বাড়ির লোকের মনে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহসের অভাব, সামাজিক চাপ ইত্যাদি। ফলে অনেক সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। মধু মুণ্ডা বনাম স্টেট অফ বিহার মামলাতে এটাই হয়েছিল। পুলিস ও এসব কেসে খুব একটা পাত্তা দেয় না, নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে বলে। বিভিন্ন এনজিও দের তরফে এমন অভিযোগ প্রায়ই করা হয়।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আইনের দাঁত নখ ততটা ধারালো নয়, যেমনটা হওয়া উচিত ছিল। ঝাড়খণ্ডের আইনে এর শাস্তি হচ্ছে তিন থেকে ছ’মাসের জেল অথবা এক থেকে দু’হাজার টাকা জরিমানা - অথবা দুটোই। এতে কি আর কেউ ভয় পাবে?

তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যুৎসই সর্বভারতীয় আইনের অভাব। তবে, ঘুরেফিরে একটা কথাই স্পষ্ট হয়। এসবের মূল কারণ - কুসংস্কার।

তার মানে, কুসংস্কার দূর করা একান্ত প্রয়োজন। কুসংস্কার মোটেই নিরীহ জিনিস নয়। কুসংস্কার একধরণের ক্রাইম। বেছে বেছে সমস্ত তথাকথিত পিছিয়ে পড়া অঞ্চলেই ডাইনি হত্যার প্রকোপ বেশি। মানে শিক্ষার অভাব। ডাইনি হত্যা নামক কুপ্রথার বিরুদ্ধে ছোট ছেলেমেয়েদের এখন থেকেই সচেতন করে তোলার জন্যে তাদের পাঠ্যপুস্তকে এ নিয়ে একটা চ্যাপ্টার থাকা দরকার। আছে কি?

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব রহস্যের সমাধান বিজ্ঞান এখনো করে উঠতে পারে নি। তার চলার পথটা ভীষণ কঠিন। ঘোর অন্ধকারে হাওয়ার মাঝে নিবু নিবু মোমবাতির আলোয় কোনমতে পথ খোঁজার চেষ্টা করা। কোন কিছু মুখ বুজে মেনে না নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন উত্থাপন করাই বিজ্ঞানের কাজ। গাছ থেকে আপেল পড়ার ঘটনা যুগ যুগ ধরে সবাই দেখে এসেছিলেন। একমাত্র নিউটনই এ নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন তোলায় মাধ্যাকর্ষণের সত্যকে জানা সম্ভব হয়েছিল। আবার আইনস্টাইন যদি নিউটনের তত্ত্বে সন্দেহ প্রকাশ না করতেন তবে রিলেটিভিটির থিওরি হয়ত আমাদের অজানাই থেকে যেত। যুক্তির পথ বড় দুরূহ। তবু অজ্ঞানতার সাথে অসম লড়াইয়ে যুক্তিই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার। আর তার জন্যে দরকার লজিকাল চিন্তাধারা। কুসংস্কার আমাদের জ্ঞানলাভের কাহিনীর ভিলেন।

শুধু দেশের সুনাগরিক হিসেবে নয়, মানবসন্তান হিসেবে ও আমাদের দায়িত্ব সত্যান্বেষীদের অনুসরণ করা। নিজের ভেতর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্তরে সুস্থ যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তোলা। এ এক মহাযাত্রা। শুরু আছে, শেষ কোথায়, কেউ জানে না। তবু চলতেই হয়। এই পথেই মুক্তি।

“ঐ যারা দিনরাত্রি, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী” - চলুন এবার তাঁদের পায়ে পা মেলাই।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮