• দেবাশিস ভট্টাচার্য

প্রবন্ধ - ভূত, আত্মা এবং বিজ্ঞান



বিশ্বাসীরা জানেন, ‘ঠিক দুপুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা’ । ঠিক কবে যে কোথায় ভূত ঢেলা মারল সে আর জিজ্ঞেস করলে কেউ বলতে পারেনা বটে, তবু বেচারা ভূতের বদনাম করতে কেউ ছাড়ে না । বড় বড় ভূত-পণ্ডিতরা বলেন, ভূত তো থাকতেই হবে, না হলে মরার পর পরাণটা যাবে কোতায় বাওয়া ? এই যে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি, মনে মনে কবিতার লাইন মেলাচ্ছি কি বিরিয়ানির রেসিপি ভাবছি কি শত্রুকে জব্দ করার প্ল্যান কষছি, এই নিরেট জড়দেহে সে সব কীভাবে সম্ভব হত, যদি না দেহের ভেতর একটা গোটা আত্মা ঢুকে বসে থাকত ? জড়দেহের কাজ ফুরলে সেই আত্মাই তো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, মজা করে একটু ঢিল-টিল ছোঁড়ে, বন্ধ জানলা খুলে দেয়, আর খোলা জানলাগুলো খালি বন্ধ করে দেয় । এইটুকু বলেই ভূত-পণ্ডিত মশায় এদিক ওদিক তাকিয়ে চোখ মটকে বলবেন, ইয়ে, জানেন তো, বিজ্ঞান কিন্তু আজও প্রমাণ করতে পারেনি, ভূত নেই, বা আত্মা নেই ! কিন্তু, 'আত্মা’ তো আমাদের বিজ্ঞান চর্চার ভেতর থেকে উঠে আসা কোনও ব্যাপার নয়, এ হল স্রেফ বহুদিন ধরে চলে আসা একটি মিথ্যে ধারণা মাত্র । আধুনিক বিজ্ঞান তাকে প্রমাণই বা করতে যাবে কোন দুঃখে, আর নাকচ করার কষ্টই বা শুধুশুধু স্বীকার করতে যাবে কেন ? আমি যদি হঠাৎ বলি, আমার ছাদে রোজ রাতে গোলাপি হাতিরা সব ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, এবং ধুতি পাঞ্জাবি পরা কাঁকড়া বিছেরা ক্রিস্ট্যালের গ্লাসে জ্যোৎস্না-রস পান করতে করতে মহানন্দে গল্প গুজব করে, অমনি দলে দলে বৈজ্ঞানিক তা প্রমাণ বা নাকচ করতে নেমে পড়বেন ? কেন,তাঁদের হাতে খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই বুঝি ? তবে হ্যাঁ, এসব কথা এভাবে দুম করে বলে দেওয়ার কিছু বিপদও হয়ত থাকতে পারে। এ থেকে আবার কেউ কেউ ভেবে নিতে পারেন যে, 'আত্মা' বোধহয় তাহলে বিজ্ঞানের আওতার বাইরের এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার । না, একদমই না । বরং, কালচারাল অ্যানথ্রপলজি বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের গবেষণার মধ্যে দিয়ে এই মিথ্যে ধারণাটির প্রকৃত স্বরূপ ও তার আবির্ভাবের কারণ বিষয়ে অনেক কিছুই জানা গেছে ও যাবে । আসলে, 'আত্মা'-র ধারণাটি হল 'প্রসেস' বা প্রক্রিয়াকে 'সাবস্টেন্স' বা বস্তু বলে ভুল করবার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত । প্রাণ বামন যে আছে সেটা দেখতেই পাচ্ছি, অথচ দেহ সম্পর্কে যা জানা আছে তা দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করতে পারছি না, অতএব ওগুলো নিশ্চয়ই দেহের মধ্যে ঢুকে থাকা এক সূক্ষ্ম বস্তু --- এইরকম এক যুক্তি শৃঙ্খল হয়ত আদিম মানুষের চিন্তাকে চালিত করেছিল । জীবিতের তুলনায় সদ্যমৃত মানুষের (বা অন্য প্রাণীর) দৈহিক তফাৎ কিছুই বোঝা যায় না, অথচ সে আর সাড়া দেবে না, কথা বলবে না, ভালবাসবে না,এমনকি রাগও করবে না । তাহলে নিশ্চয়ই কোনও এক রহস্যময় সূক্ষ্ম বস্তু আছে, যার নাম দেওয়া যাক 'আত্মা' --- দেহের মধ্যে তার থাকা বা না থাকাই তফাৎটা গড়ে দিচ্ছে ! আধুনিক মানুষ জানে যে বাইরে থেকে দেখতে এক হলেও আসলে জীবিত ও মৃত দেহের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ, এবং ওই দৈহিক তফাতটাই হল প্রাণ-মনথাকা বা না থাকারও কারণ, কিন্তু আদিম মানুষের পক্ষে তা বোঝা অসম্ভব ছিল ।তারা না জানত শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা, না বুঝত আধুনিক শারীরবিদ্যা ও কোষ-তত্ত্ব, না ছিল তাদের হাতে মাইক্রোস্কোপ । তারা তাই বুঝতে পারে নি যে প্রাণ-মন হল আসলে 'দেহ' নামক এক মহা জটিল বস্তু-সমবায়ের 'ফাংশন' বা ক্রিয়া --- জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পারিপার্শ্বিকের সাথে বিভিন্ন স্তরে অবিরাম চলতে থাকা এক আশ্চর্য মিথষ্ক্রিয়া । এই অতি গভীর ও সমৃদ্ধ প্রক্রিয়াকেই প্রাচীন মানুষ দেখেছিল এক সূক্ষ্ম বস্তু রূপে । এমন নয় যে তারা আমাদের চেয়ে বোকা ছিল । তারা জানত, ভেতরে ঢুকে থাকা বস্তু অন্য বস্তুর ধর্মকে পালটে দিতে পারে । কলসির ভেতরে জল ঢাললে তার ওজন বেড়ে যায়, আবার তা বার করে নিলে সে ওজন কমেও যায় ।জলের মধ্যে নুন বা চিনি মেশালে স্বাদ নোনতা বা মিষ্টি হয়ে যায়, আবার নানা প্রক্রিয়ায় আলাদা করে নিলে সে স্বাদ চলেও যায় । কাজেই, 'আত্মা' নামক সূক্ষ্ম বস্তু ঢুকে পড়ে দেহে প্রাণ-মন সঞ্চার করবে আর বেরিয়ে গিয়ে তাকে মড়া বানিয়ে দেবে, এ চিন্তা তাদের কাছে খুব বেশি অসম্ভব বলে মনে হয় নি । প্রাচীন মানুষের ক্ষেত্রে এইসব ভুল দোষের ছিল না, বরঞ্চ এগুলো তাদের চিন্তাশীলতা, অনুসন্ধিৎসা ও কল্পনাশক্তিরই প্রমাণ । কিন্তু, একুশ শতকের পৃথিবীতে কলেজে ফিজিক্স পড়ান, আর অন্ধকার রাস্তায় ‘বলহরি হরিবোল’ শুনে রাম নাম জপেন ......... না মশায়, এই ভদ্রলোককে ক্ষমা করা কঠিন ।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮