• পার্থ সেন

বড়গল্প - সুলতান


"আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন বাতাসে--

তাই আকাশকুসুম করিনু চয়ন হতাশে।

ছায়ার মতন মিলায় ধরণী,

কূল নাহি পায় আশার তরণী,

মানসপ্রতিমা ভাসিয়া বেড়ায় আকাশে।"

[১]

সিতারগঞ্জ ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার এগোনোর পর বৃষ্টিটা প্রচন্ড জোরে এলো। কাঠগোদাম থেকে আসার পথে সারা রাস্তা বৃষ্টি হয়েছে, কখনো জোরে কখনো আস্তে, কিন্তু এই রকম জোরে হয়নি। মিনিট পাঁচেক এগোনোর পর আমাদের বাসটা দাঁড়িয়ে পড়ল। বরং বলা ভালো, বাধ্য হয়ে দাঁড়াতে হল। হিমালয়ের কোলে এমন বৃষ্টির তান্ডব আমি আগে দেখেছি। তবে এই রকম করে বৃষ্টির মাঝে বাসে আটকে পড়া আমার আগে কখনো হয়নি। কাঁচে ঘেরা বাস, তবে এসি সেই ভাবে কাজ করছে না, কাঁচ খুললেই বৃষ্টির অঝোর ধারা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আবার কাঁচ বন্ধ করে থাকা যাচ্ছে না। যদিও ঘড়ির কাঁটা সময় দেখাচ্ছে চারটে আটান্ন, কিন্তু মেঘ আর বৃষ্টির জন্য চারদিক ঝাপসা হয়ে এসেছে, বলতে গেলে ঘন গাছ আর পাঁচ ফিট দূরে একটা নীল তেরপল লাগানো একটা আস্তানা ছাড়া আর কিছু নজরে আসছে না। আমাদের বাসটা রাস্তার একটু পাশ করে দাঁড়িয়েছে, রাস্তার ধারে লম্বা গাছ, কিন্তু তবু বাসের ছাদ থেকে বৃষ্টির যা শব্দ কানে আসছে তাতে আমি বৃষ্টির বেগ বেশ বুঝতে পারছি। আমাদের বাসের কন্ডাক্টর বলছিল ‘এই বৃষ্টি নাকি চট করে ধরবে না’। পাশ থেকে এক ভদ্রলোক যাকে দেখে আমার একটু ‘মাতব্বর’ লাগছিল তিনি মন্তব্য করে বসলেন ‘লাগ রহা হ্যায় বাদল ফাট গিয়া’। যেটাকে ইংরাজিতে ‘ক্লাউড বারস্ট’ বলে। ‘ক্লাউড বারস্ট’ আমি আগে দেখিনি, তবে শুনেছি, সেটা যদি সত্যি হয় সেটা আমার জন্য খুব একটা সুখের হবে না।

আমি দিল্লীতে থাকি, পেশায় একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার, দিল্লীর একটা টিভি চ্যানেলে কাজ করি, ফুল টাইম নয়। যেখানে ওয়াইল্ড লাইফ হলো আমার বিষয়। যদিও আমি পুরোপুরি ‘ফ্রি ল্যান্সার’ নই, তবুও নিজের তোলা ফটো আমি বিক্রী করি। তা এই পেটের প্রয়োজনে বছরের বেশির ভাগ সময়টাই আমাকে এই সমস্ত বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব, পশ্চিম ভারতের আনাচে কানাচে নাম না জানা বহু জায়গায় আমার পায়ের ছাপ পড়েছে পশু, পক্ষীর সন্ধানে, যদিও দেশের বাইরে যাবার সৌভাগ্য এখনো পর্যন্ত আমার হয়নি। প্রায় বারো বছর হয়ে গেল এই লাইনে, এতো দিনে খানিকটা চেনা পরিচিতি ও আমার হয়ে গেছে।

এখানে আসার পেছনে বিশেষ একটা কারণ ছিল, মাস খানেক আগে ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেল থেকে আমাদের চ্যানেলকে একটা বিশেষ কাজ দেওয়া হয়। ‘বারশিঙ্গা’ এক ধরনের জলাহরিন, যাদের মাথায় শিং গুলো শাখা প্রশাখা বিস্তার করে বারো থেকে কুড়িটা সুচালো অগ্রভাগ তৈরি করে। কোনভাবে বিজ্ঞানীরা মনে করেছেন এদের অস্তিত্বও নাকি এখন আশঙ্কিত অবলুপ্তির আওতায় এসে পড়েছে, তাই এদের ওপর এক বিশেষ ফিল্ম বানানো হচ্ছে। জনচেতনা বাড়ানো আবার সংরক্ষণের একটা মাধ্যম বলা যায়। মধ্যপ্রদেশের কানহা ন্যাশানাল পার্ক হল ভারতে বারশিঙ্গার সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। কিন্তু আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তরাখণ্ড আর নেপালের সীমানায় - শুকলাফাটা ন্যাশানাল পার্ক যেখানেও বারশিঙ্গা নেহাত কম সংখ্যায় নেই। আমার অবশ্য অন্য আর একটা ইন্টারেস্টও ছিল। যদিও জায়গাটা নেপালে আসে তবে এই জায়গাটাতে বাঘের সংখ্যা প্রচুর। আর আমাদের মতো ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফারদের কাছে বাঘের ছবি তোলাটা এক প্যাশন। আমরা ঘণ্টার পর ঘন্টা মশা বা অন্য পোকা মাকড়ের কামড় উপেক্ষা করে জঙ্গলের নানা স্ত্র্যাটিজিক পয়েন্ট আঁকড়ে বসে থাকি সেই অপরিসীম গাম্ভীর্যে দুলকি চালে চলতে থাকা, হলুদ কালো স্ট্রাইপ আঁকা, আপাত দৃষ্টিতে অলস সেই প্রাণীটার জন্য, বিজ্ঞান যার নাম দিয়েছে ‘প্যান্থারা টাইগ্রিস’। আর এই জায়গায় একটা সুবিধে, ভারতের সীমানা পেরোতে এখানে ভিসা লাগে না, পাসপোর্টটা সঙ্গে রাখলেই হয়। তাই আমার ক্যামেরা কাঁধে করে এদিক ওদিক করতে খুব অসুবিধা হয়না।

মুশকিলটা ছিল অন্য জায়গায়, যদিও শুকলাফাটা যেতে ভিসা লাগে না, আর আমার থাকার বন্দোবস্ত ও হয়েছিল শুকলাফাটার ফরেস্ট কটেজে। তাছাড়াও সেখানে বনবিভাগের অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে কয়েকটা কাজ আমার ছিল, যেটার জন্য নেপাল পৌঁছনো টা আমার জরুরী। বর্ডারে একটা চেকপোস্ট আছে, ভারতে বানবাসা আর ওপাড়ে নেপালে মহেন্দ্রনগর, সেখানে সীমানা পেরোনোর জন্য পারমিশান নেওয়ার অফিস। সেখানে একটা আবেদন পত্র জমা করতেই হয়। তারপর রিক্সা বা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে নেপালে প্রবেশ করতে হয়। আমার প্ল্যান ছিল বানবাসা পর্যন্ত বাসে যাওয়া, কিন্তু যা দেরী হয়ে গেল এখন সে অফিস খোলা পাবার কোন সম্ভাবনা নেই, তারপর যা বৃষ্টি! সুতরাং আজ রাতটা আমাকে এখানেই আশেপাশে কোথাও কাটাতে হবে। জানি না কোন হোটেল পাবো কিনা? ক্রমাগত বৃষ্টি আর প্রায় কুড়ি পঁচিশ মানুষের ভিড়ে বাসের ভেতরটা একেবারে অসহ্য হয়ে উঠছিল, শেষ পর্যন্ত বাস থেকে নামার একটা প্ল্যান করতেই হল। রাস্তার অন্য পাড়ে নীল তেরপল লাগানো সে আস্তানাটা বাস থেকে চোখে পড়ছিল, এখন দেখলাম সেটা প্রকৃতপক্ষে একটা ছোট খাবার দোকান, জনা দশেক মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার মধ্যে কিছু আমাদের বাসের সহযাত্রীও রয়েছেন। বাস থেকে নেমে কোনমতে দৌড়ে সেখানে এলাম, তবে সেই কয়েক সেকেন্ডের প্রবল বৃষ্টির ধারা মোটামুটি আমাকে ভিজিয়ে দিল। তবে মোবাইল আর সিগারেটের প্যাকেট এই দুটোকে কোন মতে ভেজা থেকে বাঁচাতে পারলাম। আমাদের বাসের কন্ডাক্টার ও ড্রাইভার দুজনেই সেখানে দাঁড়িয়ে, ওরাই বলছিল এই প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় মাঝেমাঝেই ল্যান্ডস্লাইড হয়, কখনো নাকি গাড়ির চাকাও পিছলে যায়। তাই বৃষ্টি যতক্ষণ না থামে বাসের দাঁড়িয়ে থাকাটাই নিরাপদ। অর্থাৎ, ঘন্টা খানেকের মধ্যে বৃষ্টি না ধরলে হয়তো আজ রাতটা এখানেই থাকতে হবে। কাছাকাছি খাকার জায়গা বলতে স্থানীয় মানুষের বাড়ি, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা সদয় হয়ে স্বল্প কিছু টাকার বিনিময়ে থাকতে দেন। পাহাড়ে এতোবার এসেছি, এটা আমি জানতাম, পাহাড়ের স্থানীয় মানুষরা অন্য রকম, শুধু থাকতে দেওয়া নয়, সাধ্যমত খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেন।

শেষ পর্যন্ত আমাদের আর এগোনো হল না, এক ঘণ্টা পরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ধারা যখন এতটুকুও কমল না, এখানে থেকে যাওয়াটাই আমার ঠিক মনে হল। রাত বাড়ছে, তারপর এমনিতেই আমার পক্ষে মহেন্দ্রনগর পৌঁছন আজ সম্ভব নয়। আমার কন্ডাক্টার ঠিক করে দিল, মিনিট পাঁচেক দূরে স্প্রিংডেল ন্যাচারাল রেসর্ট সেখানেই আমার থাকার ব্যবস্থা হল। দৈনিক মানসম্মত দামের একটু বেশী টাকা নিল, কিন্তু আমার তেমন বেশী লাগেনি। আমার সঙ্গে আমাদের বাসের আরো পাঁচজন এলেন, কোনমতে একটা ট্রেকার জোগাড় হল, তারপর তাতে মালপত্তর তুলে আমরা কোনমতে ফিট হলাম। রাস্তায় কোন আলো নেই, মাঝে মাঝে একটা দুটো ছোট দোকান, সেখান থেকে যতটা আলো আসছে। তারমধ্যে বৃষ্টি কিন্তু এক ফোঁটা কমেনি। দমকা হাওয়া আর এলোপাথারী ছাট আমাদের পুরো ভিজিয়ে দিচ্ছিল, তার ওপর ট্রেকার তো অটোর মতো, দুদিক খোলা। আমার ক্যামেরা অবশ্য ওয়াটার প্রুফ ব্যাগের মধ্যে থাকে, সেটাই নিশ্চিন্ত। এর মধ্যেও আমাদের ট্রেকারচালক আমাদের সতর্ক বাণী শুনিয়ে দিলেন – “এখানে সন্ধ্যের পর রাস্তায় একা একা একদম ঘুরবেন না। বন্য প্রাণী তো আছেই তাছাড়া রাস্তা খুব নিরাপদ নয়। নানা প্রজাতির সাপ আছে, তবে বিষাক্ত সাপ কম। নিরাপত্তার জন্য সব সময়ে পা ঢাকা জুতো পরাই ভালো। তাছাড়া এখন জুলাই মাস, বৃষ্টির সময়। বৃষ্টির সময় সাপ খোপ তো থাকতেই পারে!

থাকার জায়গাটা আমার কিন্তু বেশ ভালোই লাগল। ঠিক হোটেল নয়, কারুর বাড়ি। সেটাকে রেসর্ট বানিয়ে টুরিস্টদের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। এখন বৃষ্টির সেই প্রচন্ড বেগটা একটু কমেছে, তবুও ঘরের জানলা খোলা যাচ্ছে না, জানলা খুললে বৃষ্টির ছাট এসে ঘর, বিছানা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যদিও চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, তবে এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম হিমালয় কিন্তু এই জায়গাটাকে ঘিরে আছে। আর আমাকে তো হিমালয় এক অমোঘ টানে আকর্ষণ করে। যাহোক, এখানে কয়েকটা ঘর ভর্তি, কয়েকটা খালি, সেই গুলোতে আমরা ঢুকে পড়লাম। আর হ্যাঁ, সবচেয়ে উল্লেখজনক হল হোটেলের ম্যানেজার মনিময় ঘোষদস্তিদার, বাঙালি – তবে কলকাতার নয়। এলাহাবাদে জন্ম সেখানেই বড় হয়েছেন – তার পর চাকরীর সুত্রে বেশির ভাগ সময়ে এই উত্তরাখন্ড নয়তো উত্তরপ্রদেশে। মনিময়বাবু বেশ স্বাস্থ্যবান, সুদীর্ঘ, বলিষ্ঠ চেহারা, ভালোই বাংলা ভালো বলেন, তবে একটু টান আছে! ব্যবহার খুব ভালো। এখানেই থাকেন, ওনার ফ্যামিলি এলাহাবাদেতে থাকে। হোটেলের আর একটি ছেলের সঙ্গে পরিচয় হল – নাম মহেশ, সে বেশ সপ্রতিভ, চটপটে, ঘরে ঘরে জল, বাথরুমের জিনিস বা মাল পত্তর পৌঁছে দেওয়া তার কাজ। আমাদের হোটেলে যদিও কোন রেস্টুরেন্ট নেই তবে খাবার ব্যবস্থা আছে। চিকেন, ছোলার ডাল, আলু ভিন্ডি সবজি আর রুটির পাওয়া যাবে।

সিগারেটের প্যাকেটটা ভিজে গিয়েছিল, আর এখানে এত রাতে, এত বৃষ্টিতে সিগারেট পাওয়া যাবে না। সুতরাং মনিময়বাবুর কাছ থেকে ধার করতে হল। সিগারেট ধরিয়েছি, এমন সময়ে আর এক বাঙ্গালীর সঙ্গে পরিচয় হল, শ্যামসুন্দর হালদার, কলকাতার লোক নন, মুঙ্গেরের বাঙালী। ইনিও আমাদের রেসর্টে আছেন, ইনি একজন প্রানীবিদ, ইংরাজীতে যাকে বলে জু-লজিস্ট, প্রফেসর, পাটনা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত আছেন। ঘুরতে ভালোবাসেন, আর তার টানেই মাঝেমাঝেই হিমালয়ের পাদদেশে আসা হয়। কলেজে ছুটি, এখানে রয়েছেন দিন তিন চারেক। আরো তিন চার দিন হয়তো থাকবেন। কলকাতা থেকে কয়েকশো মাইল দূরে এই রকম বাঙালিদের একটা রিইউনিয়ন ব্যাপারটা ভেবেই কি রকম ভালো লাগছিল। কথা হলো খাওয়া শেষ হলে গল্প হবে, কাল সকালে ওঠার কোন তাড়া নেই।

রাতের খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে দশটা হলো। সারা দিন তেমন কিছু খাওয়া হয়নি, একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেল। এখানকার রুটি গুলো আটার নয়, জোয়ারের তৈরি, আকার টা দেখে মনে হয় কেমন অপরিণত হাতে তৈরি, তবে চিকেনটা অসাধারন হয়েছিল! সঙ্গে আবার এখানকার স্থানীয় এক ধরনের মিষ্টি ও খেলাম, ঘি আর সুজি দিয়ে তৈরি, বেশ ভালো।

দোতলার ব্যালকনিতে বসে কথা হচ্ছিল, আমাদের সঙ্গে চারজন অবাঙ্গালীও যোগ দিয়েছিলেন, শ্যামসুন্দরবাবুও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। চুপচাপ ছিলেন কিন্তু একটা জিনিস বেশ বোঝা যাচ্ছিল ভদ্রলোকের কিন্তু বেশ ভালো পড়াশোনা। আমি বনে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই পেটের সন্ধানে, তাই আমাকে জঙ্গলের অনেক তথ্য সংগ্রহ করতেই হয়। তা দেখলাম, তার মধ্যে বেশ কিছু ইনফরমেশন ওনারও জানা। এরমধ্যে এলোমেলো হাওয়া তার মধ্যে থেকে থেকে বৃষ্টির ছাট গায়ে আসছে, আমাদের সামনের টেবিলের ওপর একটা হ্যাজাক রাখা রয়েছে, সেটার আলো ও বেশ কমে এসেছে। একটু দূরে বারান্দার অপর প্রান্তে খুব স্বল্প ওয়াটের একটা আলো জ্বলছে। পুরো পরিবেশটা নিঃসন্দেহে একটু গা ছমছমে, কিন্তু আমি বেশ উপভোগ করছিলাম। এই ফরেস্টেরই ব্যাপারে কথা হচ্ছিল, মনিময়বাবু ওনার অভিজ্ঞতা থেকে নানান কথা বলছিলেন। আর আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল বাঘ। রাজেন্দ্রন বলে এক ভদ্রলোক যিনি আমার সঙ্গে একই বাসে ছিলেন, জানতে চাইছিলেন – “আচ্ছা, এখানে টুরিস্টরা বাঘ দেখতে পায়?”

মনিময়বাবু বললেন, “দেখুন বাঘ যদি দেখতে হয় তবে আপনাকে জঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষা করতে হবে। এই তো ইনি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, এনাকে জিগ্যেস করুন। উনি বেটার বলতে পারবেন! আর সে পারমিশান তো নরম্যাল ভিসিটারকে ফরেস্ট অফিসার দেবে না! আর এই সব কন্ডাক্টেড সাফারি ট্যুরে আপনি বাঘ দেখতে পাবেন না! যদি না তার জল তেস্টা পায় আর সেই সময়েই সে বেরিয়ে এসে নদীতে যায়। নয়তো দেখতে পাবেন না! আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট আপনাকে বেশি ভেতরে যেতে দেবে না। আসলে ওরা মানুষকে ভয় পায় তো!”

“তাহলে বাঘ নরখাদক হয় কিভাবে?” বাঘের ওপর আমি অনেক পড়াশোনা করেছি, করবেট, অ্যান্ডারসন বা রাস্কিন বন্ডের বই গুলো আমার বহুবার করে পড়া হয়ে গেছে, তাই বেশির ভাগ উত্তরই আমার জানা, কিন্তু আমার শুনতে বেশ ভালো লাগছিল।

“হয়। তবে সে পরিস্থিতিতে আসলে। নয়তো নয়! বাছুর, শম্বর আর ওদের প্রথম পছন্দ! মানুষের মাংস ওদের খুব পছন্দ নয়। আর খাবারের জন্য ওরা কখনো মানুষকে অ্যাটাক করে না! ভয় পেয়ে করে। সব সময়ে ওরা কিন্তু মারতে চায় ও না। একটা দেড়শ দুশো কেজির ওজন কারুর ওপর পড়লে সে তো এমনিতেই মরে যাবে। কিন্তু দে আর নট টিপিক্যালি ম্যান ইটারস! বাঘের বয়স বাড়লে তারা মন্থর হয়ে পড়ে আর তখন তারা হরিন ছেড়ে মানুষের পেছনে ধাওয়া করে। আসলে মানুষকে ধরা অনেক সহজ হরিনের থেকে।” ঠিক কথা, সেই সায়েন্সের বইতে পড়েছিলাম ছোটবেলায়, ইনফ্রাসনিক, আল্ট্রাসনিক শব্দ যেগুলো মানুষ পায় না কিন্তু প্রানীরা পায়। আর ঘ্রানশক্তিতেও অন্যান্য প্রানীরা মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে। যাহোক, নতুন একটা তথ্য শুনলাম যেটা আগে পড়িনি, মনিময়বাবু বলছিলেন “তাছাড়া মানুষের মাংস খুব একটা মিষ্টি নয়, সবচেয়ে ভালো মাংস হল বারশিঙ্গা, তবে সেটাকে ধরতে ওরা ভয় পায়। আসলে ওদের শিং গুলো এমন আঁকাবাঁকা”

“আচ্ছা! এখানে বাঘে এরকম মানুষ মারার ঘটনা ঘটে?”

“হয়, যে রকম সব জায়গায় হয় সে রকম এখানেও হয়। রিসেন্টলি কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে, আর সত্যি বলতে যতই বন্য প্রানী সংরক্ষনের আইন হোক পোচার তো থাকবেই। ব্যবসার জন্য কেউবা শখে ঢুকে পড়ে, লাস্ট চার পাঁচ মাসে কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে। বাঘে মানুষ মেরেছে। আর এদিকটায় শিক্ষার একটু অভাব, নিরাপত্তার ও সমস্যা। আর দুটো দেশের সীমানা বলে জায়গাটার সেই রকম ডেভেলপমেন্টও তেমন হয়নি। তার চেয়েও বড় কথা, ফরেস্টে কিছু এলাকা আছে সেখানে দুটো দেশের কোনটারই আইন খাটে না। আর পিলভিট, শুকলাফাটা আর দুধওয়া এই তিন জায়গা নিয়ে এতো বড় অরন্য আপনি এই গোটা সাবকন্টিনেন্টে আর একটা পাবেন না। তার ওপর গহন অরন্য, হিংস্র, বন্য পশু, পাখী, হিমালয়ের পাদদেশে প্রকৃতির তান্ডব, আর বর্ষার সময় সারদা নদী উত্তাল হয়ে ওঠে, দুকূল ছাপিয়ে বইতে থাকে। যদিও সাধারনত টুরিস্টদের ওপর বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই তবে ঘোরার সময় একটা কথা মনে রাখবেন, দলছুট হয়ে যাবেন না, কারন জঙ্গলের মধ্যে বিপদের সম্ভাবনা কিন্তু আছে”

আরো প্রায় আধ ঘন্টা মতো কথা হল। জানলাম জঙ্গলের মধ্যে সাফারি ট্যুর চলে, যেখান থেকে ট্যুর শুরু হয় কাল সেখানে যাবার জন্য মনিময়বাবু আমাদের একটা জীপ জোগাড় করে দেবেন। অবশ্যই যদি বৃষ্টি থামে আর আবহাওয়া ভালো থাকে। আমার ব্যবস্থা অবশ্য আলাদা, মনিময়বাবু আমাকে গাড়িতে চেকপোস্টে পৌঁছিয়ে দেবেন, সেখান থেকে আমাকে নেপালে ঢোকার পারমিশান পেতে হবে। আর বেশীক্ষন গল্প হলো না, বেশ রাত হয়ে গেছিল। শেষ যখন ঘড়ি দেখেছি মনে আছে সময়টা, তখন ঘড়িতে প্রায় পৌনে বারোটা।

রাত কটা জানি না, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, আমার নাম ধরে যেন ডাক শুনলাম, তার পর দরজার ঠকঠকানি, কি ব্যাপার? হাতের কাছে সুইচটা চেপে আলো জ্বালালাম, ঘড়িতে দেখলাম রাত তিনটে পঞ্চাশ। ঘোরটা কাটতে আবার শুনলাম, হিন্দীতে আমার নাম ধরে ডাকা হচ্ছে “মিঃ বসু, একবার দরজাটা খুলবেন, একটা দরকার আছে”। গলার আওয়াজ এবারে বুঝলাম, যিনি আমার নাম ধরে দরজা নাড়ছেন তিনি মিঃ শর্মা, কিছুক্ষন আগে যার সাথে পরিচয় হয়েছে, যিনি গত চার দিন ধরে এই রেসর্টে রয়েছেন, খুব সম্ভব আমার ঠিক পাশের রুমেই আছেন। দরজা খুললাম, “কি ব্যাপার এতো রাতে?”

“একটা জিনিস আপনাকে বলার ছিল”

“কি ব্যাপার?”

“আস্তে” ভদ্রলোক মুখে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন যাতে আমি আর কোন শব্দ না করি। চাপা গলায় বললেন “ভালো করে শুনুন তো, একটা আওয়াজ পাচ্ছেন?”

বেশী কষ্ট করতে হলো না, বৃষ্টির শব্দ এড়িয়ে অন্য শব্দটা পেলাম, অনেকটা অ্যালারমের শব্দের মতো, চিরির চিরির চির চির, চিরির চিরির চির চির, “কোন পাখীর আওয়াজ কি?”

“একদম ঠিক ধরেছেন, আপনি তো ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, ফরেস্ট আওলেট নাম জানা আছে?”

“ফরেস্ট আওলেট? মানে যাকে ব্লিউইটি বলে তো?”

“ঠিক, একদম ঠিক বলেছেন। তার আওয়াজ, এটা!”

“কিন্তু ব্লিউইটি তো এখন এক্সটিঙ্কট করে গেছে! তাকে পাবেন কোথায়?”

“একবার একটু এগিয়ে দেখবেন নাকি? একটা ফরেস্ট আওলেটের ছবি যদি নিতে পারেন আপনার ক্যামেরায় তাহলে হাজারে নয় একদম লাখে খেলতে পারবেন। যাবেন?”

একটা আকর্ষণ যে একদম ছিল না তা নয়, তবে আমার যতটুকু জানা ছিল, ফরেস্ট আওলেট ভারত থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। থাকলেও হিমালয়ের পাদদেশ এদের বসবাসের জায়গা নয়, গরমের জায়গা তাদের পছন্দ, মূলত মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যায় এদের আগে পাওয়া যেত। ছোট চড়াই পাখির চেয়ে একটু বড়, মাথা আর ঠোঁটটা দেহের তুলনায় একটু বড়, গায়ে খুব স্বল্প দাগ, শরীরের ওপরের অংশটা গাঢ় বাদামী, মুখটা বিবর্ণ আর হলুদ চোখ, আমি ফটোতে দেখেছি। বিশেষত্ব এদের একটাই, এদের গলার আওয়াজ। সেটা বেশ খুব অদ্ভুত, বইয়ে পড়েছি, এক ফ্রিকোয়েন্সি তে এরা বারে বারে ডাকতে থাকে। সেই কারনে এদের ‘ঘুমপাড়ানী প্যাঁচা’ বলা হয়।

তবে দু মিনিট আগে যে ডাক টা শুনেছি সেটা এদের কি না সেটা আমি নিশ্চিত নই। তবে মনিময়বাবুর সতর্কবানী মনে ছিল, অন্ধকারে একা বেরোনো মানে শুধু শুধু বিপদ কে ডেকে আনা। সুতরাং এড়িয়ে যেতেই হল, “আমার ঠিক এখন ইচ্ছে করছে না, আমরা বরং কাল সকালে যাই”

“কাল সকালে গেলে ফরেস্ট আওলেটকে আজকের জায়গায় পাবেন?”

“দেখুন এটা যে ফরেস্ট আওলেটের আওয়াজ সেটা কি সিওর করে বলা যায়? আপনার ভুল ও হতে পারে। তাছাড়া এই অজানা জায়গা, অন্ধকার, এই বৃষ্টির মধ্যে কেন একা বেরোনোর রিস্ক নেবেন, আর সত্যি বলতে এখন ছবি তোলার সময়ও নয়। সকালে সবাই মিলে কাল না হয় বেরোনো যাবে। এখন যান, একটু ঘুমিয়ে নিন, কাল অনেক ঘোরা আছে”

“ভুল আমার হয় নি, আপনি তাহলে যাবেন না, তাইতো?”

প্রত্যাখ্যান করতেই হল, তাতে ভদ্রলোক খানিকটা অসন্তুষ্ট হলেন সেটা বেশ বুঝতে পারলাম। কিন্তু এই অন্ধকারে, শেষ রাতে ফরেস্ট আওলেটের খোঁজে যাওয়ার আমার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই ছিল না। যাহোক, আলো নিভিয়ে আবার খাটে শুয়ে পড়লাম। ‘চিরির চিরির চির চির’ শব্দটা বার দুয়েক শোনা গেল, হঠাৎ আমার নাকে কেমন যেন একটা তীব্র গন্ধ এল। কেমন যেন ওডিকলোনের গন্ধ, বড় হোটেলে বাথরুমে সেই গন্ধ পেয়েছি, এত রাতে কি এই পাহাড়ি রেসর্টে রুম সার্ভিস স্টাফেরা ওডিকলোন ছড়াচ্ছে? জানি না! সারাদিন ধকলও অনেক গেছে। ক্লাউড বারস্ট, আমার আটকে পড়া, মনিময়বাবু, মিঃ শর্মা, ওডিকলোন এই সব ভাবতে ভাবতে আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেই জানিনা!

[২]

সকালে ঘুম ভাঙতে একটু দেরী হল। বৃষ্টি এখন থেমেছে, তবে আকাশ যেন গোমড়া, মুখভার। মহেশকে দেখলাম, সকাল সকাল উঠে দিনের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। এক কাপ চা জোগাড় করতে অসুবিধা হয়নি, নীচে এসে সিগারেট ধরিয়েছি মনিময়বাবুকে খুব ব্যস্ত হয়ে বেরোতে দেখলাম, আবার কানে ফোন, হিন্দীতে কথা বলছেন কারুর সাথে। আমাকে দেখে এক হাত তুলে অভিবাদন করলেন, তবে ফোনে কথা বলার জন্য আমার সঙ্গে কথা বলার ফুরসত হয়নি। আমিও কোন ডিসটার্ব করিনি, একমনে সিগারেটে টান দিচ্ছিলাম। কাল রাতে বৃষ্টির মধ্যে যেটা অনুমান করেছিলাম সেটা খুব একটা ভুল নয়। উত্তর এবং পশ্চিম দিকটা জুড়ে বিশাল উঁচু পাহাড়, সেদিকে আকাশ খুঁজতে গেলে বেশ অনেকটা ওপরে তাকাতে হবে। পুবদিকটাকেও পাহাড়, তবে অপেক্ষাকৃত নিচু, দেখে মনে হল জঙ্গল মূলত পুব দিকেই, দক্ষিন দিকটা পাহাড়ের ঢাল। আকাশ এখনো তেমনো পরিষ্কার নয়, জায়গায় জায়গায় বেশ কালো মেঘের আস্তরন। যদিও আমি আবহাওয়া বিশারদ নই, তবে এইটুকু বুঝতে পারছিলাম বৃষ্টি কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। তাই আমিও হোটেলের কাছাকাছিই ছিলাম। কারন, এখানে বৃষ্টি এসে গেলে কত তাড়াতাড়ি যে একটা মানুষ ভিজে যায় সেটা কাল নিজের চোখেই দেখেছি। যা হোক, কাল যেটা বুঝিনি এখন সেটা বুঝলাম। এই জায়গাটা একটা ছোট গ্রাম, তবে জনবসতি বেশী নেই, অল্প কিছু দোকানপাট আছে। সিগারেটটা শেষ করে চলে আসব ভাবছিলাম ঠিক এই সময়ে রেসর্টের সামনের চত্বরে একটা অপূর্ব নীল আর হলুদ বর্ণের পাখি এসে বসল। মাঝারি আকৃতি, দারুন উজ্জ্বল, গলার কাছে একটা লাল রঙের আভা, চোখ ফেরানো যাচ্ছিলো না। এতদিন ধরে ফটোগ্রাফি করছি, এই পাখি কিন্তু আমি দেখিনি। খুব সম্ভব হিমালয়ের কোয়েল, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘অফরাইসিয়া সুপারসিলিওসা’ বলে। আমি তো জানতাম সেও অবলুপ্তির আশঙ্কায় এসে পড়ছে, গুটি কয়েক পড়ে আছে এই হিমালয়ের কোলে। বার দুয়েক ডাকতেও শুনলাম, সেটাও খুব মিষ্টি, বড় ক্যামেরাটা সঙ্গে নেই, সুতরাং ছবিটা তুলতে মোবাইলের ক্যামেরা ব্যবহার করতে হল। ফটো তুলে নিয়েছি, ভাবছি ডাকটা রেকর্ড করে নেব, ঠিক এই সময়ে পেছন থেকে ডাক এল। মনিময়বাবু ব্যস্তসমস্ত হয়ে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে, “শুনেছেন কিছু?”

“কি ব্যাপার?”

“মিঃ শর্মা, আপনার পাশের ঘরেই আছেন, কাল রাতে আমাদের আড্ডাতেও ছিলেন, মনে আছে কি আপনার? বেশ বড় সড় চেহারা, চোখে চশমা”

এবারে ওঁকে থামাতেই হল, মিঃ শর্মাকে আমার ভালো করেই মনে আছে, তারপর মাঝ রাতের ঘটনাটা তো মনিময়বাবু জানেন না, “হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি, কি হল তাঁর?”

“সকাল থেকে ভদ্রলোক ঘরে নেই, হোটেলের ছেলেটা সকালে সাফ করতে এসে দেখে ঘরে তালা ঝুলছে, তা আধ ঘন্টা আগে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন এসেছিল, বলছে নাকি কোর এরিয়াতে ১৩ র কাছে একটা মারাত্মক ভাবে জখম বডি পাওয়া গেছে, বেঁচে আছে কিনা জানা যাচ্ছে না। তবে ওরা কাছাকাছি একটা হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে। পকেটে ক্রেডিট কার্ড, মানি ব্যাগ পাওয়া গেছে আর চেহারার বর্ণনাও মিলে যাচ্ছে। আমাদের হোটেলের গেস্ট সদানন্দ শর্মা”

মনে পড়ল, আজ ভোর চারটের সময় উনি আমাকে ওনার সঙ্গে বেরোনোর প্রস্তাব দিতে এসেছিলেন। তাহলে আমাকে না পেয়ে তিনি একা একাই বেরিয়ে পড়লেন আর তারপর আক্রান্ত হলেন। একবার ভাবলাম মনিময়বাবুকে বলি, আবার পরক্ষনেই ভাবলাম আমার কি দরকার আবার পুলিশ এসে আমাকে হাজার প্রশ্ন শুরু করবে। তবু জিজ্ঞাসা করতেই হল, “পুলিশকে জানিয়েছেন?”

“হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে আগে যখন দেখা হল তখন ওঁদের সঙ্গেই কথা হচ্ছিল। ওঁরা হেলথ সেন্টার হয়ে তারপর এখানে আসবে। থানা পুলিশের চক্করে আগে তো কখনো পড়িনি, তার মধ্যে কি যে বলি আপনাকে, হোটেলের মালিক এখন দেশে নেই, শ্রীলঙ্কায় ঘুরতে গেছে ফ্যামিলির সাথে। কি যে ঝামেলায় পড়লাম?”

চুপ করেই রইলাম, কোথায় যেন পড়েছিলাম সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা না থাকলে চুপ করে থাকাই ভালো। বরং প্রসঙ্গটা একটু বদলানোর চেষ্টা করলাম, “ঐযে কি কোর এরিয়া বললেন সেটা কত দুর এখান থেকে?”

“গাড়ী রাস্তায় দূর আছে, তবে ভেতর দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শর্টকার্ট রাস্তা আছে, আধ ঘন্টায় পৌছনো যায়। আমি এখানে এতদিন আছি, আমি কিন্তু সে রাস্তা জানি না। কিন্তু কথা হল এতো ভোরে শর্মা একা একা বেরোলোই বা কেন?”

“আচ্ছা মিঃ শর্মা কি করেন, বা কোথা থেকে এসেছেন এই সব কিছু জানেন?”

“গুরগাও থেকে এসেছে এইটুকু জানি, কিন্তু কি কাজ করে, বা এখানে চারদিন ধরে রয়েছে কেন সেই সব কিছু জিজ্ঞাসা করিনি”

মনিময়বাবুর ফোন বেজে উঠল, আমার আর কিছু বলা হলোনা, তবে আমার মন বলছে আমার বোধহয় আজকের দিনটাও এখানেই থাকতে হবে। থানা পুলিশ নিয়ে বিব্রত মনিময়বাবু আমাকে কতটা হেল্প করতে পারবেন আমি জানি না। তাছাড়াও যে পরিমান বৃষ্টি কাল রাতে হয়েছে, সকালে শুনলাম জঙ্গলের কিছু জায়গায় ধস নেমেছে। হয়তো কোন গাড়িও পাবো না। অগত্যা ঘরেই ফিরতে হল, কাল রাতের পরিচিত এক দুজনের সঙ্গে দেখা হল, কথা তেমন হয়নি।

স্প্রিংডেল ন্যাচারাল রেসর্টে পুলিশ এল তখন প্রায় এগারোটা। অনেক আগেই অবশ্য জেনে গিয়েছিলাম, কোর এরিয়া ১৩ তে যখন ফরেস্ট বিভাগের জনৈক কর্মী মিঃ শর্মার দেহ দেখতে পান, তখন তিনি মারা গেছেন। মাথার পেছন থেকে ঘাড়ে প্রচন্ড জোরে আঘাত লেগেছে, রক্তারক্তি হয়ে গেছে, পুলিশ এবং বনবিভাগের ধারনা কোন বন্য প্রানীর আক্রমন হয়েছে পেছন থেকে, সম্ভবত বাঘ। বাঘ ছাড়া এত নৃশংস আক্রমন অন্য কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনটে জিনিস এখানে বিশেষভাগে উল্লেখ্য, এক সাধারনত আক্রমনের পর বাঘ শরীরে অন্য অংশেও থাবা বসায়, তাতে শরীরের অন্য অংশেও আঘাতের চিনহ থাকে। এখানে কিন্তু শরীরে আর কোন ক্ষতচিনহ পাওয়া যায়নি। দুই, বনবিভাগের কর্মীরা বাঘের আক্রমনে বিধ্বস্ত মৃতদেহ আগেও অনেক দেখেছেন কিন্তু এই ক্ষেত্রে আঘাতের আধিক্য যেন কয়েকগুন বেশী, শর্মাজীর মাথাটা নাকি শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। শর্মাজী যথেষ্ট বলিষ্ঠ মানুষ, তাঁর দেহ থেকে মাথা আলাদা হয়ে যাওয়াটা তাঁদের কাছে একটু বিস্ময়ের। আর তিন, যেটা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, শর্মাজীর মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল তার থেকে মিটার পাঁচ দূরে একটা জাল পাওয়া যায়, যে রকম জাল সাধারনত পোচাররা পাখি ধরার কাজে ব্যবহার করে থাকে। প্রশ্ন হল, শর্মাজী কি তাহলে সে জাল নিয়ে শেষ রাতে ফরেস্ট আওলেট ধরতে গেছিলেন? মাঝরাতে অবশ্য আমি যে রকম উৎসাহ দেখেছিলাম তাতে সেটাকে সন্দেহ থেকে বাইরে রাখা যায় না।

পুলিশ ওনার হোটেল রুমে একটু খোঁজাখুঁজি করল, জানি না কিছু পেল কিনা! মনিময়বাবুকে বলতে শুনলাম, ওনার বাড়িতে খবর পাঠানো হয়েছে। বাড়ির লোক হয়তো আজ রাতেই এসে পড়বেন। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া আমার কোন ভূমিকা ছিল না, আর আমি সেটা বুঝে কারোর সাথেই কোন অতিরিক্ত কথা বলিনি। হ্যাঁ, অবশ্যই ঘুরতে এসে এটা একটা মানসিক আঘাত, আর ঘুরতে এসে এই ভাবে আটকে পড়া আমার কখনো হয়নি। প্রথমে বৃষ্টি তারপর এই রকম বন্য প্রানীর আক্রমন। বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে আর একবার তেড়ে বৃষ্টি এল, সুতরাং বাইরে বেরোনোর সব চেষ্টা বিফলে গেল। আমার এখানে চার থেকে পাঁচ দিনের প্ল্যান ছিল, তারপর আমার দিল্লী ফেরার কথা। কিন্তু হিসেব টা পুরো পাল্টে গেল। যদিও আমি কোথাও দায়িত্ববদ্ধ নই, সুতরাং দুতিন দিনের ব্যবধানে কারুর তেমন কিছু প্রবলেম হওয়া উচিত নয়। তবু আমাকে তো ফোটো বিক্রী করতে পেট চালাতে হয়, তাই নিজের প্রয়োজনে আমাকে নিউজ চ্যানেলে একটা খবর করতেই হল। মাঝে মাঝে সদানন্দ শর্মার কথা মনে হচ্ছিল না যে তা নয়, কিন্ত এই রকম পরিবেশ আমার মতো যাযাবর কে সব কিছু ভুলিয়ে দিতে পারে। সত্যি, বারেবারে এসেও আমার কাছে হিমালয় পুরোনো হয়না। আমি ব্যালকনিতেই বসেছিলাম, তিনদিক থেকে হিমালয় ঘিরে রেখেছে, আর তার সঙ্গে যেদিকে চোখ যায় সেখানে ঘন অরণ্য। অদ্ভুত নিয়ম জঙ্গলের! শুনেছি বৃষ্টির আসার আগে পাখিরা বাসায় ঢুকে পড়ে, তাই তাদের শব্দও খুব একটা পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে সেসব নিয়ম মেনে তো হচ্ছে না! আকাশে কালচে মেঘ, মাঝেমাঝে আকাশ চিরে বিদ্যুতের রোশনাই, কিন্তু তার ফাঁকে মাঝেমাঝেই চেনা বা অচেনা পাখির প্রাণ খুলে গলা সাধা শুনতে পারছিলাম। তাদের কত ডাক যে সারা দিনে রেকর্ড করেছি তার ইয়ত্তা নেই। নীচের ক্যান্টিনে পকৌড়া বানিয়েছিল, সঙ্গে চা ছিল, সদ্য কেনা গ্রিসমের একটা নভেল ও ছিল। হিমালয়ের সান্নিধ্যে এত ভালো পড়ন্ত বিকেল অনেকদিন আসেনি। আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল, একটা গলা শুনলাম আমার পেছন, বাংলায়

“শুনেছেন কি? শর্মা নাকি বেআইনি ভাবে বন্য প্রানী ধরে নিয়ে যেত” মুখ ঘোরালাম দেখলাম শ্যামসুন্দরবাবু। আবার বললেন “আপনার কাছে একটা সিগারেট হবে কি?” বলে আমার সামনের চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসলেন।

সিগারেট ধরালেন, আমিও ধরালাম, “পুলিশ কি বলছে সে রকম?”

“হ্যাঁ, নেপাল বর্ডার কাছে তো, আর এখান থেকে ধরাটাও সহজ। অভয়ারন্য দুটো দেশের মধ্যে এমন ভাবে ছড়িয়ে আছে চট করে বর্ডার পেরিয়ে যাওয়া যায়। তাই এখানে ভালো ব্যবসা ফেঁদেছিল। এই চত্বরে অন্য হোটেলেও বেশ কয়েকবার এসেছে আগে। পুলিশ তো বলছে কেস ক্লিয়ার, সকালবেলা বেড়িয়ে পাখি ধরতে গেছিল, বোঝেনি কোর এরিয়া তে ঢুকে পড়েছে, আর পেছন থেকে বাঘ এসে গেছে”

আমি নিজে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, বন্যপ্রানীরা আমার দুর্বল জায়গা। যদিও একটা মানুষের মৃত্যু ব্যাপারটা খুব এক্সট্রিম, তবু বন্য প্রানী নিয়ে ব্যবসা ব্যাপারটা আমি মন থেকে মানতে পারিনা। শ্যামসুন্দরবাবু আবার বললেন, “অবশ্য ফরেস্ট বিভাগ কনফার্ম করেনি যে এটা বাঘের কাজ”

“কেন?”

“আসলে এতো বৃষ্টি হচ্ছে ভালো করে পায়ের দাগ পায়নি। তবে বলছে পায়ের দাগ যেটা পাওয়া গেছে সেটা নাকি সাইজে একটু ছোট”

“কিন্তু এতো বৃষ্টিতে বাঘ বেরোল কি করে?”

“কি করবেন বলুন? বাঘের পেটে খিদে থাকলে সেতো আর গ্রীষ্ম বরষা দেখবে না”

কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর আবার নিজেই বললেন, “আর একটা কথাও শুনলাম, তাই ব্যাপারটা কেমন রহস্যজনক লাগছে”

একটু নড়ে চড়ে বসতেই হল, এখানে আবার রহস্য আসছে কোথা থেকে? ব্যাপারটা খুলে বলতে বুঝলাম। সাধারনত বাঘের পায়ের ছাপ যদি দেখা যায় যে কোন মানুষের মনে হবে এটা একটা দুপায়ের জন্তু। আসলে বাঘ তার সামনের পা আর পেছনের পা এমন ভাবে মিলিয়ে হাঁটে যে পেছনের পা টা ঠিক সামনের পায়ের ছাপের ওপরই পড়ে। তাই বোঝা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে যে পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে সেটা অপরিষ্কার হলেও এটা বোঝা যাচ্ছে কোন এক চতুষ্পদ প্রানীর আবির্ভাব হয়েছিল। এখন কথা হল, যদি বাঘ না হয় তাহলে কোন প্রানী? এতো বলিষ্ঠ? এতো শক্তিশালী?

সিগারেটটা তখনো শেষ হয়নি, হঠাৎ করে সেই কালকে রাতের তীব্র গন্ধটা আবার আমার নাকে এল। সেই ওডিকলোনের গন্ধ, বাধ্য হয়ে বললাম, “আচ্ছা এরা কি বাথরুমে ওডিকলোনের ছড়ায়? কেমন একটা গন্ধ আসছে না?”

শ্যামসুন্দরবাবু কেমন যেন সোজা হয়ে বসলেন, “আপনি ও পেয়েছেন গন্ধটা? আমি কদিন ধরেই পাচ্ছি এই সন্ধ্যে রাতের দিকে, আমি খোঁজ নিয়েছি এরা কিন্তু সেই রকম কিছু ব্যবহার করেনা”

“তাহলে গন্ধটা আসছে কোথা থেকে? বাইরে থেকে তো নয়, এখানেই হয়তো কেউ সেন্ট ব্যবহার করছে, উগ্র গন্ধ”

শ্যামসুন্দরবাবু উত্তর দিলেন না, কিন্তু ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি যেটা বুঝলাম, ওনার মনে কিছু কথা আছে, মিনিট খানেকের বিরতির পর আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন, অবশ্য জানিনা সেই প্রশ্নটা কেন করা হল “আপনি তো ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করেন, অ্যানাতলি সোকোলভের নাম শুনেছেন?”

আমার সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন, সুতরাং মাথা নেড়ে ‘না’ বললাম। শ্যামসুন্দরবাবু আবার বললেন, “এই ভদ্রলোক বিখ্যাত অরিন্থোলজিস্ট, পাখি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা। লাস্ট এপ্রিলে একটা রাশিয়ান জার্নালে একটা লেখা লিখেছিলেন এই পালিয়াকালান আর দুধুওয়া ফরেস্ট নিয়ে, আমি পড়েছিলাম। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন, অনেককিছুর মধ্যে উনি এটাও লিখেছেন তিনিও এই রকম তীব্র গন্ধ পেয়েছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন কোন প্রানীর গা থেকে আসে সেই গন্ধ। এখন কথা হলো, এমন কোন প্রানী? আমার জানা নেই, আপনি বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। তা আপনার জানা আছে?”

আমি চুপ করেই ছিলাম। প্রথম শুনলাম ব্যাপারটা, এই রকম গন্ধ আসছে, কোন প্রানীর দেহ থেকে? আমাদের আলোচনায় ছেদ পড়ল, মনিময়বাবুর গলা শুনলাম, কাজের ফাঁকেও একবার আমাদের সঙ্গে দেখা করে গেলেন “সরি স্যার, আজ একদম আপনাদের দেখতে পারলাম না! যা চলছে আর বলবেন না! শর্মার বাড়ি থেকে লোকজন আসতে আসতে কাল হয়ে যাবে। যা বৃষ্টি হচ্ছে, বাস গুলো পাহাড়ে জায়গায় জায়গায় আটকে যাচ্ছে। যা হোক, আপনারা সব খাওয়া দাওয়া ঠিক ঠাক করেছেন তো?”

দুচারটে এদিকে ওদিক কথার পর কাজের যেটা শুনলাম, মহেন্দ্রনগর যেতে হলে একটা কাঠের ব্রিজ পেরোতে হয়, প্রচন্ড বৃষ্টিতে সেটা নাকি আপাতত জলের তলায়। জীপে বা অন্য গাড়ি চলাচল আপাতত সে রাস্তায় বন্ধ রয়েছে। সুতরাং স্থলপথে নেপাল যাওয়ার প্ল্যানটা আপাতত বাদ দিতে হবে। আর একটা রাস্তাও নাকি আছে, সেটা নদী পথে, ছোট প্রপেলার লাগানো নৌকো চলে। প্রথমটায় একেবারেই অবাস্তব লেগেছিল, পাহাড়ি নদীতে নৌকা চলা ব্যাপারটা একেবারে বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি। তার ওপর আসার সময় বাস থেকে এক ঝলক উত্তাল সারদা নদীকে দেখেছি, সেখানে নৌকা চলা অসম্ভব। কিন্তু ব্যাপারটা পরে বুঝলাম। আসলে পাহাড়ের মাঝে আটকে পড়া একটা জলের ধারা, শাখানদী বলা যায়, আর সেটা পেরোলে মহেন্দ্রনগর পৌছনো যায়। আর সে পথে জলের তেমন বেগ নেই, আর বিপদেরও তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। আর মনিময়বাবু বনবিভাগে মাধ্যমে একটা আবেদন পত্র সই করিয়ে রাখবেন যাতে সীমানা পেরোনোর জন্য আমার পরে কোন অসুবিধা না হয়।

সত্যি বলতে মহেন্দ্রনগরে আমাকে পৌঁছতেই হবে, আগেই বলেছি সেখানে বনবিভাগের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ কাজ আছে, আর সেটা ছাড়া আমার এখানের আসার অন্যতম একটা অবজেক্টিভ পূরণ হবে না। আমার কাজটাও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। “তাহলে আপনি কি আমাকে জলপথ সাজেস্ট করছেন?”

“এছাড়া তো আমি আর কিছু উপায় দেখছি না”

“এমনি ওয়াইল্ড লাইফ থেকে কোন রিস্ক নেই তো?”

“না মোটরবোটে সেইসব রিস্ক নেই। আর মোটরের আওয়াজ সাধারনত বন্য প্রানীরা ভয় পায়, ওরা ধারে কাছে ঘেঁষবে না। আর তেজ থাকবে, ও তুখোড় ছেলে, সব মুখস্থ ওর।”

“কিন্তু এতো মাল পত্তর নিয়ে”

আমাকে শেষ করতে না দিয়েই মনিময়বাবু বললেন, “তারজন্য ভাববেন না, মাল আপনি সব রেখে যান এখানে। কোন চিন্তা নেই আপনার, পাহাড়ে জিনিস চুরি হয়না। আর কাজটা শেষ করে আবার এখানেই ফিরে আসুন”

এই প্রস্তাবটা অবশ্য আমার মন্দ লাগলো না, আমার কাজটা শেষ করতে দুই-তিন দিনের বেশী লাগা উচিত নয়। আর আমার কাছে কোন মহামূল্যবান বস্তু ও নেই, যেটাকে এখানে রেখে যেতে আমার আশঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ আছে।

মনিময়বাবু আবার বললেন, “ঠিক আছে আপনি সব গুছিয়ে রাখুন, কাল সকালে আমি বোট ব্যবস্থা করে দেব। আমি আসছি তাহলে এখন, ডিনারে দেখা হবে”

নীচ থেকে একটা আওয়াজ আসছিল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “নীচ থেকে আওয়াজ আসছে, এখনো কি পুলিশ রয়েছে?”

“না, নতুন একটা পার্টি এসেছে, দিল্লী থেকে, অল্পবয়স্ক কিছু ছেলে”

[৩]

প্রপেলার লাগানো ছোট হাওয়া বোট, পেছন থেকে খুব জোরে হাওয়া দেয়। অত জোরে হাওয়া আসলে এসে পড়ে জলে, আর তাতে উলটো পথে নৌকো এগিয়ে চলে। আমি ভেবেছিলাম স্টিমার টাইপ, কিন্তু এটা একেবারে সে রকম নয়। নৌকার গতিপথ বজায় রাখার জন্য সামনে একটা ছোট স্টিয়ারিং আছে, যার সাহায্যে নৌকার অগ্রভাগ সোজা থাকে। আগেই জেনেছিলাম আমাদের চালকের নাম তেজনারায়ন, বাইশ, তেইশ বছর বয়স। জন্মসূত্রে নেপালী, তবে কাজের সূত্রে বেশীর ভাগ সময় সীমানার এপাড়েই কাটায়, আর তাই হিন্দীটাও বেশ ভালোই বলে। ওর মুখেই শুনছিলাম পাহাড়ের মাঝখানে এই জলটা কেমন আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কাজেই পাহাড়ি নদীতে তুফান এলেও মাঝের এই জায়গাটা কিন্তু বেশ নিরাপদ। হ্যাঁ, বৃষ্টিতে জলের লেভেল বাড়ে, একটু স্রোতের মতো সৃষ্টি হয়, যে রকম আজ। আগে জানতাম না, ওর কাছেই শুনলাম এই জলের পথ নাকি সারদা নদী থেকেই আসছে আর সারদা নদী নাকি ঘাঘরা নদীতে গিয়ে মিশেছে। সুতরাং নদীপথে এখান থেকে গঙ্গাতেও পৌঁছনো যায়। তবে হ্যাঁ, খুব দরকার না হলে এরা এই রকম নৌকা চালায় না। আসলে নৌকার আওয়াজ আর পেছন থেকে ছিটকে আসা হাওয়া শান্ত জলকে এমন করে আলোড়িত করে তাতে মাছ বা অন্য জলজ জীব যথেষ্ট ডিসটার্বড হয়ে পড়ে।

আকাশের এখনো মুখভার, মেঘের আস্তরনে সূর্যদেব মুখ লুকিয়ে রেখেছেন। তবে কাল রাত থেকে আর তেমন বৃষ্টি হয়নি। একটু ছিটে ফোঁটা গায়ে আসছে, কিন্তু তেমন কিছু নয়। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে আজকে বিকেলের মধ্যে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। যা হোক, আমি কিন্তু একা আসিনি। আমার সঙ্গে আরো তিনজন সাথীও রয়েছেন। শ্যামসুন্দরবাবু এবং গতকাল দিল্লী থেকে আসা দুটি অল্প বয়স্ক ছেলে। আমি শুকলাফাটায় আজ থেকে যাবো, হয়তো আরো দুই রাত থাকবো। বাকীদের প্ল্যান আজ রাতেই আবার মাঝোলা মানে স্প্রিংডেল ন্যাচারাল রেসর্টে ফিরে আসা। জঙ্গলের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি সে পথেই ফিরব, নয়তো আবার মনিময়বাবু এই রকম নৌকার ব্যবস্থা করে দেবেন। শ্যামসুন্দরবাবু কাল থেকেই নেপাল নেপাল করছিলেন, তাই আমার কাছে যখন সুযোগটা এসেই গেল উনি ও সঙ্গে এলেন। আমার আপত্তি ছিল না, বরং ভালোই হল। বিদেশে সঙ্গে একজন নিজের ভাষা বলতে পারেন এমন কেউ থাকলে ভালোই হয়। তাছাড়া ফরেস্টে নানা ব্যাপারে শ্যামসুন্দরবাবুর বেশ ভালো পড়াশোনা। তাছাড়া বোটের ভাড়াটা আমাদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। আর আমাদের সঙ্গে রয়েছে দিল্লী থেকে আসা রাহুল আর অতুল। এরা আজ সকালে পিলভিটে কোর এরিয়া ঢোকার জন্য বড্ড পীড়াপীড়ি করছিল। কিন্তু একদিন আগেই শর্মাজীর ওপর অকস্মাৎ বন্য প্রানীর আক্রমনে বন বিভাগ সমস্ত সাফারি ট্যুর বন্ধ রেখেছে। রেসর্টে বসে বসে বোর হতে হবে, তাই আমাকে রিকোয়েস্ট করল, যদি আমার সঙ্গে জলপথে আসতে পারে। ওদের কাছে অ্যাট্রাকশনটা ছিল, জলপথে জঙ্গল ঘোরা আবার শুকলাফাটা মানে যেটা নেপালে আসে সেটাও দেখা। আমারও এদেরকে আপত্তি করার কোন কারন ছিলনা।

জলপথে ন্যাশানাল পার্ক ঘোরা আমার কাছে প্রথম নয়। আমি পেরিয়ার জলপথে গেছি, সুন্দরবন তো বেশ অনেক বার হয়ে গেছে, মানসেও নদীপথে অনেক টা সময় কাটিয়েছি, কিন্তু হিমালয়ের কোলে শুকলাফাটা আর পিলভিটের এই অনন্য সৌন্দর্য যিনি চোখে দেখেননি তিনি বুঝতে পারবেন না। জলের দুধারে ঘন জঙ্গল আর তার পেছনে স্বর্গীয় হিমালয় থেকে থেকে উঁকি দিচ্ছে, আর মাঝে মধ্যে এক একটা পাখি শিস দিয়ে উঠছে। প্রথম দশ মিনিট তো আমি ক্যামেরা চালুই করিনি। মনের ডিজিটাল অ্যালবামে মুহূর্তগুলোর পারমানেন্ট প্রিন্ট নিচ্ছি আমার ঘোর ভাঙ্গল, শ্যামসুন্দরবাবুর গলার শব্দে “দেখেছেন, কি সুন্দর!”

মুখ ঘোরাতে দেখলাম আমাদের নৌকা থেকে মিটার কুড়ি দূরে সাথে সাথে এক পাল গোলাপি মাথাওয়ালা হাঁস, এক একটা হাঁস প্রায় দেড় ফুটের কাছাকাছি লম্বা, খুব স্বাস্থ্যবান, সাঁতার কাটার ভঙ্গীটা অসম্ভব সুন্দর, আর একসাথে চলার পথে কেমন যেন একটা ছন্দ তৈরি করছে। এমন সুন্দর তাদের চলার প্যাটার্ন ঠিক মনে হচ্ছে একটা যেন ইংরাজিতে ‘এস’ অক্ষর টা রচনা হচ্ছে। শ্যামসুন্দরবাবুর আবার বললেন, “ভালো করে দেখুন শুধু এস নয় মনে হচ্ছে একটা সাইন তৈরি করছে, আর সাইনটা মনে হচ্ছে একটা সোওানের”। ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। জলের স্রোতের তরঙ্গে পুরোটা না বোঝা গেলেও এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম নদীতে চলার পথে একটা আশ্চর্য চিনহ তারা তৈরি করে চলেছে নিজেদের অজান্তে অথবা ভেবেচিন্তে! ক্যামেরাটা বার করতেই হল, এই রকম জিনিস আগে কখনো দেখিনি, হঠাৎ করেই মাথায় এল, “আচ্ছা শ্যামসুন্দরবাবু, দেখে মনে হচ্ছে না এরা পিঙ্ক হেডেড ডাক?”

“মনে তো হচ্ছে তাই”

“কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! পিঙ্ক হেডেড ডাক ইন্ডিয়া থেকে এক্সটিঙ্কট করে গেছে আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। এতোদিন হয়ে গেল এই লাইনে, এই রকম দেখতে প্রানীর নাম তো আগে কখনো শুনিনি, ছবিও দেখিনি”

“আমিও নয়” কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর আবার বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন এরা পিঙ্ক হেডেড ডাক”

দুদিন আগে রাতের কথা মনে পড়ে গেল, হয়তো সেই ফরেস্ট আওলেটের সন্ধানে শর্মাজী বেরিয়ে পড়েছিলেন ভোর রাতে, সেও কিন্তু বইয়ের পাতায় বা বিজ্ঞানীদের স্ট্যাটিস্টিক্সে ভারত থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আজ আবার পিঙ্ক হেডেড ডাক? তাহলে? এই সব বিলুপ্তপ্রায় প্রানীরা এখনো আছে? নেপাল আর উত্তরাখন্ডের সীমানায় গহন অরন্যে! নিশ্চিন্তে, নিরাপদে! শর্মা ঠিক বলেছিলেন, এই রকম বিলুপ্ত প্রানীর ছবি ক্যামেরায় ধরতে পারলে সে ছবি মহামূল্যবান হয়ে যাবে। আমার ক্যামেরায় ফোকাস করছি ঠিক এই সময়ে দেখি যে গোলাপী মাথার হাঁসেদের তৈরি ‘এস’ অক্ষরের মতো যে রাস্তাটা এতক্ষণ জলের ওপর দিয়ে চলছিল সেটা কেন কেমন করে জলের তলায় ডুবে যেতে শুরু করেছে। আর কি নিখুঁত জ্যামিতি আর অদ্ভূত প্যাটার্ন। পরেরজন আগে ডুবছে না, নিজেদের ক্রম তারা ঠিক বজায় রেখেছে। মনে হচ্ছে আমি যেন বিনা প্রস্তুতিতে অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখছি। আমি তাড়াতাড়ি করে শাটার টিপলাম, পরপর পাঁচবার, ফোকাসটা একটু অ্যাডজাস্ট করছি শেষেরটা যেটার জলের নীচে যেতে এখনো কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে, সেটাকে বড় করে ক্যামেরা বন্দী করতে, কিন্ত পারলাম না। ঠিক এই সময়ে আর একটা ঘটনা ঘটল যেটার জন্য আমি একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না।

আমার পাশ থেকে অতুল নামের ছেলেটি হঠাৎ করে একটি ঢ্যালা পাথর তুলে সেই হাঁসেদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথেই আমাদের চালক তেজ বলল, “বাবু আপনি এটা কি করছেন?” আমারও অত্যন্ত বিরক্তি লেগেছিল, তাই আমিও বললাম, “তুমি পাথর ছুঁড়ে মারছ কেন? তোমাকে একটা ঐ রকম পাথর ছুঁড়ে মারব? দেখবে কেমন লাগে?”

আরো অবাক লাগল এবারে তার ব্যবহার দেখে। আমার চেয়ে অন্তত সে বছর দশেকের ছোট। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে, অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে সে আমাদের দিকে তাকাল এবং মুখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের চুপ করতে বলল, তার উত্তরটা শুনে যে কারুর রাগ হবে, “বেশ করেছি, অনেকদিনের ইচ্ছে একটা হিমালয়ান ডাকের বডি আমি প্রিসারভ করব, আপনাদের কি সমস্যা তাতে?”

“তুমি জানো না, বন্য প্রানীদের বিরক্ত করা বা মারাটা বেআইনি!”

“জঙ্গলের আইনটা আপনার চেয়ে আমি একটু ভালো বুঝি! এই যে জলপথ যেটা দিয়ে আপনি যাচ্ছেন এটা নেপালেও পড়ে না, এটা ভারতেও আসে না, এখানে বন্য প্রানী কেন যদি আপনাকেও আমি মেরে দিই কোন আইন আমার কিসসু করতে পারবে না। আমাদের আর না ঘাঁটিয়ে নিজের চরকায় তেল দিন”

আমি প্রথমটায় বাকরুদ্ধ হলেও একেবারে দমে যাইনি, “দেখো, তুমি তো আমার সঙ্গে এসেছো, আর এই বোটটা আমি ভাড়া করেছি, এখানে তুমি তোমার ইচ্ছে মতো কাজ করবে, সেটা চলবে না!”

অতুল আমার দিকে তাকাল, তার চোখের দৃষ্টি কেমন যেন অন্য রকম লাগল, আমার একটু ভয়ও লাগল। সে মুখে কিছু বলেনি, এবারে আওয়াজ এল অন্যদিক থেকে, তাকিয়ে দেখলাম রাহুল, সেও রক্তচক্ষু দেখালো আমাকে, “আমাদের ব্যবসার কাজ এটা, এখানে কোন ফালতু ব্যাগড়া দিলে ক্যামেরা শুদ্ধু আপনাকে এই জঙ্গলে পুঁতে দেব। কেউ জানতে পারবে না! এখানে ছবি তুলতে এসেছেন সেটা তুলুন, তারপর এখান থেকে ফুটুন!” এবারে তেজের দিকে তাকিয়ে এক অশ্রাব্য গালি দিয়ে তাকে বোট চালু করতে বলল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। শ্যামসুন্দরবাবুও ভ্যাবাচ্যাকা থেকে কেমন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। আমার সঙ্গে একবার চোখাচুখি হল, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিস্ময়ে তিনিও হতবাক। হাল্কা বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই ক্যামেরাটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলাম। আবার যন্ত্রের মতো বোট চালু হলো। ওরা দুজনেই কেমন উৎসাহী চোখে জলের দিকে চেয়ে আছে, বুঝতে পারছি অপেক্ষায় আছে কখন আবার গোলাপি হাঁস মাথা তুলবে আর তার মাথায় পাথরের বা অন্য কিছুর আঘাত করা যাবে।

এবারে আমাদের নৌকাটা কেমন যেন দুলে উঠল। আর আঘাতও এলো সহসা, তবে নৌকার তলা থেকে। আমাদের নৌকাটা তলা থেকে একটা প্রচন্ড ধাক্কা খেল। খুব সম্ভব মনে হল আমাদের নৌকাটা কোন পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেল, আর তাতে নৌকাটা গেল উলটে। অন্যদের কথা আমি জানি না। তবে আমি আটকে গেলাম সেই ওলটানো নৌকার তলায়। আমি অবশ্য সাঁতার জানি, ছোটবেলায় শোভাবাজারে গঙ্গায় অনেক সাঁতার কেটেছি। আর কোন ভাবেই আমি ক্যামেরার ব্যাগটা হাতছাড়া করিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক মুহূর্তের জন্য যদিও আমার মাথা কাজ করেনি, তবে তাড়াতাড়ি সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার আর একটা ছোট হ্যান্ডব্যাগও ছিল, সেটার মধ্যে একটা অতিরিক্ত জামা, ফাস্ট এইড এবং অন্য কিছু জরুরী জিনিস থাকে সেটাকে কাছাকাছি পেলাম না। কিন্তু এখন সেটাকে খোঁজার চেষ্টা বৃথা, তাই সেটার মায়া ত্যাগ করে ওলটানো নৌকা থেকে আগে বাইরে এলাম। অকস্মাৎ ধাক্কায় আমার নাকে, মুখে জল ঢুকে গেছিল কিন্তু সেসব ম্যানেজ করে জলের ওপর জলে ভেসে উঠতে আমার তেমন অসুবিধা হয়নি। তেজ আগেই ভেসে উঠেছিল। আমাদের কথা হয়নি, তবে আমরা দুজনেই যে নিরাপদ সেটা একে অপরকে জানিয়ে দিতে পারলাম। কয়েক সেকেন্ড বাদে আমার ডানদিকে জল ঝাপটানোর আওয়াজ শুনলাম, তাকিয়ে দেখি শ্যামসুন্দরবাবু ও উঠে এসেছেন। কিন্তু রাহুল বা অতুল কাউওকে দেখতে পেলাম না। যদিও খানিক আগে ওদের সঙ্গে একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে কিন্তু হাজার হোক আমাদের সহযাত্রী, তার ওপর সাঁতার না জানার জন্য যদি ডুবে যায় সেটা খুব দুর্ভাগ্য হবে। তবে তেজ বলল – “বাবু আপনারা আগে পাড়ে উঠুন, তারপর আমি দেখছি। আর নদীও সে রকম গভীর নয়, একটু স্রোত আছে খালি। ডুবে যাওয়ার চান্স কম”

সেটা অবশ্য তেজ ভুল বলেনি, আগেই সেটা বুঝেছিলাম এখন আরো খেয়াল করলাম, নদী খুব একটা গভীর নয়, বড় জোর আট, নয় ফিট জল, আর জলও সেই রকম অসহ্য ঠাণ্ডা কিছু নয়। সুতরাং জলের দিক থেকে প্রানভয় নেই। তেজের নির্দেশিত পথে আমরা সাঁতরে নদী পাড় হলাম, আমার ব্যাগটা তেজ নিয়ে নিয়েছিল। খালি একটাই চিন্তা, জানিনা আট ফিট জলে স্নান করে আমার ক্যানন ‘এসএলআর’ কেমন ব্যবহার করবেন। ইনসিওরেন্স করানো আছে এই যা রক্ষে! নদীর জল থেকে উঠে আমরা অপেক্ষাকৃত একটা উঁচু জায়গায় এলাম। একটা গাছের ডাল এমন ভাবে বেঁকে উঠেছে তাতে বেশ ভালো বসা যায়, সেটাতে আমি বসলাম আর শ্যামসুন্দরবাবু আমার মুখোমুখি একটা প্রকান্ড মেহগিনী গাছের নিচে, মাটির ওপরেই বসে পড়লেন। পেছনে গহন ঝোপ, তার পেছনে আরো গহন অরণ্য, তাকাতে ভয় হয়। আমাদের বসিয়ে তেজ আবার গেল জলে। ওলটানো নৌকাটাকে সোজা করতে এবং অবশ্যই রাহুল আর অতুলকে খুঁজতে। শ্যামসুন্দরবাবু আর আমি দুজনেরই মাথা থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিজে গেছে, ভাবছি কোথা থেকে শুরু করবো। ঠিক এই সময়ে আমার চোখ গেল নদীর দিকে। এক লহমায় আমার সম্পূর্ণ ভেজা শরীরটা যেন কেঁপে উঠল, একটা অদৃশ্য প্রকান্ড অক্টোপাস যেন আমার পেটের মধ্যে থেকে তৈরি হয়ে আমার পুরো শরীরটা গিলে ফেলল। এই রকম ভয়ঙ্কর দৃশ্য আজ অবধি কখনো আমি দেখিনি।

আমি দুটো মানুষের মাথা দেখতে পাচ্ছি, জলের ওপর ভাসছে আর এটাও বুঝতে পারছি দুটো দেহই প্রানহীন। একটা আমার দিকে পেছন ফিরে যেটা আমি দেখতে পাচ্ছি না, আর একটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে যার চোখের পাতা গুলো খোলা, আমারও তাকে দেখে চিনতে অসুবিধা হয়নি। একটু আগে তার রক্তচক্ষু দেখেছি, অপলক চক্ষে রাহুল তাকিয়ে আছে, মুখে কেমন যেন এক আতঙ্ক লেগে আছে আর ওর মাথাটা নদীর স্রোতের ধাক্কায় থেকে থেকে অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে।

আমার ধাতস্থ হতে বেশ খানিকটা সময় লাগল, শ্যামসুন্দরবাবুও কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। এই অবস্থার মধ্যেও তেজ নদীর মাঝামাঝি পৌঁছে গেল, এবারে সেই কড়া ওডিকলোনের গন্ধটা আবার নাকে এল। আমার আর শ্যামসুন্দরবাবুর চোখাচুখি হল, বুঝলাম উনিও পেয়েছেন। একটা পাহাড়ি পাখি কেমন যেন চেঁচিয়ে উঠল। এ আনন্দে দেওয়া শিস নয়, বরং কেমন ত্রস্ত, আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে ওঠা। এবারে আর একটা শব্দও এল। এই শব্দটা আমি জানি, আগেও শুনেছি এটা বার্কিং ডিয়ারের আওয়াজ। অ্যান্ডারসনের বইয়ে পড়েছি বার্কিং ডিয়ার ডেকে ওঠে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে, সেই পরিস্থিতি আমি কিন্তু এই মুহূর্তে একেবারেই মনে করতে চাই না। শ্যামসুন্দরবাবুর দিকে চোখ পড়ল, তিনিও আওয়াজটা পেয়েছেন। তাঁর মুখ দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি তিনিও একই আশঙ্কা করছেন। আমি দুদিকে তাকালাম, বাঁদিকে একটা গাছ চোখে পড়ল। প্রানভয়ে যদি গাছে উঠতে হয়, কিন্তু তাতে ওঠা অতো সহজ হবে না। নদী থেকে একটা হাল্কা আওয়াজ পেলাম, তাকাতে দেখলাম তেজ। সেও বুঝেছে ব্যাপারটা, হাতের ইশারায় বলে দিল আমরা যেন কোন আওয়াজ না করি, সে ডুব সাঁতারে জলের নিচ দিয়ে পাড়ে আসছে। এবারে আমার বাঁদিক থেকে একটা আওয়াজ এল, কোন কিছুর পায়ে চলার শব্দ। মুখ ঘুরিয়ে দেখতে ভয় লাগল, তবে এটা আমি বুঝতে পারছি আমার থেকে পনের ফিট দূরে ঘন ঝোপের পেছনে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আলো তেমন উজ্জ্বল নয় তবে এটা বেশ বুঝতে পারছি যে জিনিসটা দাঁড়িয়ে আছে তার গায়ের রং কালচে হলুদ আর সেটা চতুষ্পদ। চারপাশ নিস্তব্ধ, আকাশে বাতাসে ওডিকলোনের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, আর সেটা যেন নিঃশব্দে আমাদের গিলে ফেলছে। শ্যামসুন্দরবাবু স্থানুর মতো বসে আছেন, আমার যে অবস্থা কি আমি নিজে জানি না। এবার একটা আওয়াজ হল, মনে হচ্ছে কোন প্রানীর দৌড়ে পালানোর আওয়াজ। হরিন বা শম্বর হবে হয়তো! না তাকালেও এটা বুঝতে পারলাম, ঘন ঝোপটা যেন একটু নড়াচড়া করে উঠল, একটা শব্দও পেলাম, মনে হচ্ছে কেউ হেঁটে চলে গেল। বুঝতে পারছি না, বিপদ কেটে গেল কিনা?

কতক্ষন জানিনা, আমার ঘোর ভাঙ্গল একটা অচেনা গলার আওয়াজে, “ও কিছু করবে না! আর ও চলেও গেছে, আর চিন্তা নেই। তা আপনারা কোথা থেকে? এখানে কি ঘুরতে এসেছেন?” একটু অপরিষ্কার হিন্দী, তার সাথে একটা পাহাড়ি ডায়ালেক্ট জড়িয়ে রয়েছে। তবে কথা ভালো ভাবে বোঝা যায়, মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম একজন স্থানীয় মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এক মুখ না কামানো দাড়ি, পরনে পোশাক খুব সাধারণ। গায়ের একটা জামা, পরনে একটা নীল রঙের কাপড়, লুঙ্গির মতো জড়ানো। আমাদের উত্তর দেবার আগেই তেজের গলা শুনলাম, সেও এতক্ষনে জল পেরিয়ে ডাঙ্গায় উঠে এসেছে।

“হ্যাঁ, আমরা মাঝোলা থেকে আসছি, ফরেস্ট রেসর্ট”

“এদিকে? ফরেস্ট সাফারির সঙ্গে এসেছেন? কিন্তু ওরা তো এদিকে আনে না”

“না, এই বাবুর মহেন্দ্রনগর যাবার আছে, ওদিকে জীপ যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। তাই আমরা নৌকাপথে এদিক দিয়ে এলাম”

বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল সব কিছু মিশে গিয়েছিল, আমি মাঝখানে আটকালাম, “আপনি?”

“আমি এখানেই থাকি, কাছেই আমাদের গ্রাম। আপনারা তো পুরো ভিজে গেছেন, আসুন আমার সঙ্গে, বাড়িতে গিয়ে একটু গা শুকিয়ে নিন” তারপর তেজ কে বললেন, “তোমাদের নৌকা কি ভেঙে গেছে”

তেজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, ব্যাপারটা যা বুঝলাম নিচ থেকে প্রচন্ড ধাক্কায় নৌকার তলায় একটা ফাটল হয়েছে আর যেখান দিয়ে ভালো মতো জল ঢুকছে। কোনমতে সেটাকে ভাসিয়ে রাখার ব্যবস্থা তেজ করেছে কিন্তু সেটাকে মেরামত করা এক্ষুনি সম্ভব নয়। তাছাড়া নৌকা উলটে যাওয়াতে নৌকার ইঞ্জিনে জল ঢুকে গেছে, তাই সেটা এক্ষুনি চালু হবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তাই জলপথে মাঝোলা ফেরা এই মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং এই স্থানীয় মানুষটির সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে হয়তো আর কোন বিকল্প নেই। এটা আমাদের আর একটা ধাক্কা। এবারে শ্যামসুন্দরবাবু বললেন, “তাহলে আমাদের রেসর্টে ফেরার কোন রাস্তাই নেই”

তেজ কিছু বলার আগেই সেই মানুষটি আবার বললেন, “কোন চিন্তা নেই, আমাদের কাছে নৌকা আছে, আমরা পৌঁছে দেব, আপনারা আসুন আগে আমার সাথে”

তারপর নদীর দিকে তাকাতে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা আবার দেখতে হল, এবারে ভাসমান মাথা দুটোর অ্যাঙ্গেল একটু চেঞ্জ হয়ে গেছে। রাহুলের মাথা আমাদের দিকে পেছন ফিরে গেছে আর অতুলের মুখের ৬০% আমরা দেখতে পাচ্ছি। আবার সেই মানুষটির গলা শুনলাম, “ওঁরাও কি আপনাদের সঙ্গে এসেছেন”

সম্মতিসূচক মাথা নাড়তে, তিনি কেমন একটা অদ্ভুত গলা করে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়লেন। মনে হল কাউকে ডাকা হল, আমরা অবাক হয়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছি। মিনিট খানেক বড়জোর মিনিট দেড়েক, তারমধ্যে আরো চারজন মানুষ এসে পড়লেন। নিজের ভাষায় কিছু বললেন ওদের, তারপর আমাদের বললেন, “ওরা বডি দুটো নদী থেকে তুলবে, তারপর বনবিভাগে খবরও ওরা করে দেবে। আপনারা আসুন আমার সাথে,”

আমরা ওনার পিছু নিলাম, তেজকেও নিয়ে এলাম সঙ্গে। আবার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমি বললাম, “আপনি বলছিলেন ও কিছু করবে না, ও চলে গেছে। কার কথা বলছিলেন?”

“সব বলবো, আসুন আমার সাথে। বাড়িতে গিয়ে সব কথা হবে”

==শেষ পর্ব==

জঙ্গলের মধ্যে দুচারটে ছোট বাড়ি, জানি না এটাকে গ্রাম বলা যায় কিনা? বাকীটা জানলাম সুলেমানের মুখে। যে মানুষটি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এলেন তাঁর নাম সুলেমান। ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম, দুধওয়া, পিলভিট আর শুকলাফাটা যদিও তিনটে আলাদা ন্যাশানাল পার্ক, কিন্তু পুরোটা ধরলে এটা একটা মস্ত অভয়ারণ্য। আমরা যে এলাকাটায় রয়েছি সেই গ্রাম মোটামুটি অভয়ারণ্যের কেন্দ্রীয় অবস্থানে আসে। আর আমি যেটা জানতাম সেটা ভুল নয়। হাজার বন্য প্রানী সংরক্ষন আইন পাশ হলেও বেআইনি শিকার, বন্যপ্রানীদের ট্র্যাপ করা বা বনসম্পদ ব্যবসার কাজে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া এই সব এখানে ভালো ভাবেই চলে। পুলিশ, বন বিভাগ সবই জানেন, কিন্তু প্রত্যন্ত প্রান্ত, দুর্গম জঙ্গল, পদে পদে বন্যপ্রানী থেকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আর অপ্রত্যাশিত প্রকৃতির আক্রমন এঁদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত করে রাখে। তাছাড়া এটা বর্ডার এলাকা, তাই স্বাভাবিক ভাবেই আইন থাকলেও তার প্রয়োগ করা বেশ শক্ত হয়ে ওঠে।

বছর খানেক আগের কথা। গ্রামের লোকই দেখতে পায় একজন চোরাশিকারীকে মৃত পড়ে থাকতে। মৃত্যুর ধরনও বেশ অন্য রকম, মাথাটাকে ধর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। শরীরে অন্য কোন আঘাত নেই, মাংসাশী প্রানীরা সাধারনত শরীরের অন্য অংশ থেকে মাংস খাবলে থাকে, এক্ষেত্রে সে সব কিছু নেই। ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় মাস দুয়েক বাদে। ভিকটিম আবার একজন চোরাব্যবসায়ী, যার মৃত্যুসংবাদে বিচলিত হয়ে নাকি কাঠগোদাম থেকে পুলিশ এসেছিল অনুসন্ধান করতে। কিন্তু কিছু পায়নি। আশ্চর্যের কথা, খুব কম হলেও প্রায় শ দুয়েক মানুষ তাঁদের পরিবার সহ এই অভয়ারণ্যে থাকেন। গ্রামের কোন মানুষের ওপর কিন্তু কোন রকম আক্রমন হয়নি। তৃতীয় আক্রমন হয় এক বিদেশীর ওপর, তিনি নাকি পাখি ধরতে আসতেন। গ্রামের কিছু মানুষটাকে চিনতেন, আগেও এসেছেন। এবারে কিন্তু মারা গেলেন। আর প্রতি ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ধরন কিন্তু একেবারে একরকম। গ্রামের মানুষ এবারে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, আর যেটা দেখা যায় সেটা আশ্চর্যের।

এক অদ্ভুত প্রানীর আবির্ভাব হয়েছে এখানে। যে আকারে অনেকটা সিংহীর মতো, বলিষ্ঠ, প্রচন্ড শক্তিশালী আর সবচেয়ে বড় কথা অসম্ভব বুদ্ধিমান, চকিত আর আশ্চর্য ঘ্রানশক্তি। কয়েকটা ব্যাপার আরো বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। যেমন, এরপর গত আট মাসে আরো ছয় জন চোরাশিকারী একই ভাবে মারা যান। কোনক্ষেত্রেই সে কিন্তু কোন ভুল করে অন্য কাউকে আক্রমন করেনি। আবার সে কিন্তু সব সময়ে জঙ্গলে গাছপালার আড়ালে বিচরন করে। গ্রামের মানুষ তাকে অনেকবার দেখেছে, কিন্তু অন্য প্রানীদের মতো নদীর ধারে বসে রোদ পোহানো অথবা শীতের দুপুরে গাছের ছায়ায় ঘুমোনো – কখনো তাকে দেখা যায়নি। সাধারনত বন্য প্রানীদের একটি বাসা থাকে, এর ক্ষেত্রে সেটি কিন্তু নেই। গোটা অভয়ারণ্য সে চষে বেড়ায়। আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার, সে হিংস্র, সন্দেহাতীত ভাবে অত্যন্ত নৃশংস, তার একটা আক্রমনে চোরাশিকারীর ধর আর মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু সে বনের অন্য কোন প্রানীকে আক্রমন করে না।

গ্রামের মানুষ প্রথমটায় সিংহ বলে ভুল করেছিল, কেউ বা ভেবেছিল হিমালয় থেকে কোন ভাবে নেমে আসা কোন বিশেষ প্রজাতির নেকড়ে, কেউ বা ভেবেছিল কোন মিশ্র জিনের তৈরি প্রানী। বনবিভাগের কর্মীরা খবর পেলেও তার দেখা পায়নি। বেশ কয়েকবার তাঁরা প্রয়াস চালিয়েছেন, কিন্তু এর বুদ্ধির কাছে তাঁদের হার মানতে হয়েছে। তাকে ধরা তো দূরের কথা, তাকে দেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু গ্রামের মানুষ জানেন সে আছে, আর সব সময়ে সজাগ, সচল। সুতরাং আমাদের এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়া উচিত নয়, গতকাল শর্মাজী বা আজকে কয়েক ঘন্টা আগে রাহুল এবং অতুলের হত্যাকারী কে? ভুল বললাম, হত্যাকারী নয়, ফরেস্ট আওলেট বা পিঙ্ক হেডেড হাঁসের নিরাপত্তারক্ষী কে? তার এই অনমনীয় দৃঢ়তা, সাহস, শক্তি, বুদ্ধি আর নিরাপত্তা দানের অসীম ক্ষমতার জন্য গ্রামবাসী তার নাম যেটা রেখেছে, সেটা আমার কাছে যথার্থই লাগল, ‘সুলতান’।

সব কিছুর মধ্যে একটা জিনিস ভালো লাগেনি, এটা অবশ্য গ্রামবাসীদের অনুমান। ঠিক নাও হতে পারে, তবে তারা মনে করে সুলতানকে নাকি কেউ বা কারা এই জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে গেছেন। আর সেই থেকে সে এখনো খুঁজছে সেই মানুষটিকে অথবা সেই সব মানুষদের। তার অপরিসীম ঘ্রানশক্তি তাকে জানান দেয় এই এলাকায় নতুন কেউ এলে। আর তাই হোটেলে, রেসর্টে, টুরিস্ট লজে নতুন কেউ এলেই সুলতান পৌঁছে যায় নিঃশব্দে, খোঁজে সেই মানুষটিকে।

***

আজ সকালে পাঁচ মাস বাদে আবার এলাম সেই এলাকায়। মাঝে মাঝেই মনে হয়, সেই বৃষ্টি, ফরেস্ট রেসর্টে আমার আটকে পড়া, জঙ্গলে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, তারপর না জানা কিছু কথা শোনা। কতোটা সত্যি সেদিনও জানতাম না, আজও জানি না। তাই সে ঘটনা আমি কাউকে বলিনি। তবে কয়েকটা জিনিস নিশ্চয়ই বলার আছে। আমার মোবাইলটা জলে পড়ে গেছিল, তাই সব পাখির ডাক যা রেকর্ড করেছিলাম আর ছবি যা তুলেছিলাম তার কোনটাই আমার কাছে আর নেই। সেই মোবাইলটা আমাকে ফেলে দিতে হয়েছিল। কিন্তু যেটা বলার, জলে পড়ে গেলেও আমার বড় ক্যামেরাটা কিন্তু খারাপ হয়নি। দিল্লীতে ক্যাননের সার্ভিস সেন্টারে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তাঁরা সেটাকে সম্পূর্ণ কার্যোপযোগী করে দিয়েছেন। কিন্তু আমার ডিজিট্যাল কার্ডটা জল লেগে খারাপ হয়ে যায়। তাই বিলুপ্তপ্রায় ‘পিঙ্ক হেডেড ডাক’এর যে ছবিগুলো আমি তুলেছিলাম সেই ছবি আর প্রিন্ট করা হয়নি। সত্যি বলতে একদিকে ভালোই হয়েছে। পয়সার লোভে মানুষ যে কি মারাত্মক হয়ে ওঠে সে আমি আগেও দেখেছি। আমার ছবিগুলো বইয়ের পাতায় বা ফিল্মে না ধরা হলে যদি বিলুপ্তপ্রায় প্রানীরা নিরাপদে থাকে, থাকুক না! খালি আমার নিজস্ব মেমারিতে সেগুলো স্থায়ী হয়ে রয়ে গেছে। আর সুলতানকে আমি দেখিনি সুতরাং সে করতে পারে বা পারে না, সে সব বিশ্বাস করার প্রশ্ন আসেনি। খালি ফেরার দিনে শ্যামসুন্দরবাবু পরামর্শ দিয়েছিলেন, আর সেটাকে গ্রহন করতে আমার কোন আপত্তি ছিল না, আমরা অনর্থক সুলতান কে নিয়ে অন্যত্র কোথাও প্রচার করব না। সুলতান যেদিন সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্ক বা আশঙ্কার কারন হবে সেদিন তারাই তাকে খতম করবে। আমরা কেন শুধু শুধু অরন্যের নিয়মকে ঘাঁটাব?

যা হোক যেটা বলার, এবারে এসে দুধওয়া ফরেস্টের মধ্যে একটা রেসর্টে উঠেছি। এবারে একটা দলের সঙ্গে এসেছি, আর এবারের বিষয় ‘প্রজাপতি’। এখন নভেম্বর মাস তাই খুব সুন্দর আবহাওয়া, আর ভালো ছবিও উঠেছে। হোটেলের ম্যানেজার বলছিলেন বছরের শুরুর দিকে বন্যপ্রানী দ্বারা মানুষকে আক্রমনের বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু আপাতত লাস্ট তিন-চার মাস সেই রকম কিছু হয়নি। খালি একটা জিনিস বলার ছিল, রাত দেড়টার সময় ঘুম ভেঙ্গেছিল। আমি কিন্তু সেই কড়া ওডিকলোনের গন্ধটা আবার পেয়েছি। জানি না, সাইকোলজিক্যাল কিনা তবে অন্য কোন ফরেস্টে কিন্তু সেটা পাই না।


কবিগুরুর পদ্যের কয়েক পঙক্তি, ওডিকলোনের গন্ধ, ফরেস্ট আওলেটের ডাক, গোলাপি মাথাওয়ালা হাঁসের সাঁতার কাটার ভঙ্গী ছাড়া বাকিটা পুরোটাই কাল্পনিক। আর হ্যাঁ, পাঠকদের বিশ্বাস করানোর জন্য এই কাহিনী নয়। এই কাহিনী বরং আমার মতো কিছু অপরিণত মনের মানুষের জন্য, কল্পনার জগতে থাকতে থাকতে, যারা বাস্তবকে ভুলে থাকতে চান।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮