• সম্পাদনায় অরুণাভ

বৈশাখী জোড় কবিতা - রাধা



বৈশাখী জোড় কবিতা - রাধা - বর্ণালী ,শুভাশিস,রূপম,দীনেশ,দীপাঞ্জন,সুপ্রিয়া,অরুণাভ


মুখবন্ধ সম্পাদকের চাপা শাসানি আর সস্নেহ প্রশ্রয় পেয়ে শেষমেশ একটা জোড় কবিতা সঙ্কলনও লিখে ফেলা গেল।ব্যাপারটা আপাত সহজ – কিছু বন্ধুবান্ধব নীড়বাসনার মুঠোফোন রোজনামচাতে (মানে 'নীড়বাসনা সাহিত্যযাপন' হোয়াটস্যাপ গ্রুপে) খেয়ালে বেখেয়ালে কবিতার আবীর ছড়িয়ে থাকে – সেগুলো জড়ো করে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা।এই খামখেয়ালি,তাৎক্ষণিক অণুকবিতাগুলি নিয়ে অনেক আলোচনা,বাদানুবাদ এমনকি মান অভিমান পর্যন্ত হয়েছে।মালা গাঁথতে গিয়ে দেখা গেল খুব সহজ নয় – আঙ্গিক,ছন্দ,ভাবনা সূত্র এসব সুসংহত করে কবিতার শরীর বানানো বেশ সময় আর শ্রম সাপেক্ষ।তার উপর কিছু অত্যন্ত ভাল লেখা সামগ্রিক মেজাজের সাথে না মেলায় বাদ দেওয়াও প্রয়োজন।নিজের দক্ষতার দৈন্যের কথা আর নাই বা বললাম।তবু,মূলত বাকিদের সময়ের অভাবে, আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী কবি বন্ধুদের কিছু কবিতা নিয়ে এবারের সঙ্কলন – বিষয় রাধা। জোড় কবিতার সামাজিকতা বজায় রাখতে আলাদা করে বিভিন্ন চরণের লেখক-লেখিকাদের নাম দিলাম না – উৎসুক পাঠক পাঠিকাদের সেটা আলাদা করে জানিয়ে দেওয়া যাবে।ত্রুটি বিচ্যুতি মার্জনীয়।

- অরুনাভ দত্ত

রাধা -১ (পূর্বরাগ এবং...)

যদি বলো দীঘির মতো শান্ত হতে পারি থির বিজুরি একটি রেখা নীলাম্বরী শাড়ি। তোমার জন্য গহন আমার সপ্ত কহন। ভালোবাসার সপ্তপদে অগম্য পথ পাড়ি ।


নীড়ের মাঝে নীড় বেধে গো বৈঠা ধরে বাঁচতে পারি মন যমুনায় বান এলো গো বনমালী কি দিচ্ছে পাড়ি ?


কেন এমন অস্তরাগে পানসি ভাসাও দিগ উজানে কান্না জমা রাগ বেহাগে আঁধার উধাও সাঁঝ বিহানে


সাঁঝ সকালের প্রান্তে দেখি ফেরার পথটি তেমনি আঁকা তুফান রাতের ভ্রমের ভ্রমণ ভুলে রে মন, সেদিকে তাকা


নৌকোডুবির গল্প কেবল মাঝির কাছে থাক, নীল খামেতে রোজ আসে রোজ অচিনপুরের ডাক, আমি আকাশ বলে চিনি তুমি নদী ডাকো যারে, মন বেবাগী বেঘর হবে এমন কথাই ঠিক, কৃষ্ণসায়র মেঘের বুকে বনমালীর দিক.. দেখতে পাবে.. দেখতে পাবে.. রাধা হলে প্রেমে দেখতে পাবে।


যেদিকে তোমার মন ফকিরা মন ছেড়ে আজ বেঘর হল ভুললো উড়ান সব পাখিরা কৃষ্ণা সায়রে তৃষ্ণা ফুরালো


এক মাঝিতেই কেল্লাফতে মনকাজলে পা দোলা তুই বনমালী তোর রাধা হতে মগডালে আয় একসাথে সই।


চেয়ে দেখি ঈশান কোণে মেঘের পালক তুলির টানা, ডুবছে তবু আধো আলোয় বুকের মাঝে নৌকো খানা !


বাতাস ছাড়া বাঁচতে পারি দহন দিনেও অতল সুখ সর্বস্বান্ত সে সব ক্ষণেও তাকেই খুঁজি, হে উন্মুখ ! মনে মনে তোমার বুকে এলিয়ে গিয়েও বাঁচতে পারি, তোমার মনে এলিয়ে মন সুখ সাগরও দেবো ছাড়ি ! আসতে হলে আমার মনে, সাত সাগর দাও গো পাড়ি, নীড়ের মাঝে নীড় বেঁধে গো বৈঠা ধড়ে বাঁচতে পারি !


কে যেন সব এলোমেলো করবে বলে সকালটাকে পার করে দেয় ঠিক বিকেলে তবুও তো এই বুকের মধ্যে নৌকো ডোবে অন্ধকারকে আয়না ভেবে ভাঙবো কবে?


পথ গিয়েছে ঠমক ঠামক আর কি রাই উড়তে পারি? তোমার তরে চরকিনাচন ব্যাধের কাছে হারতে পারি।


বদলে ফেলা বুকের বোতাম আকাশ বাতাস জানলা কপাট ঢেউ জমেছে জাহাজ কোথায়? মিথ্যে পাঁজর তোর রাজপাট।


কষ্ট তোর কথায় ভুলে পথ হারালাম গহন কুলে বুক পকেটে শুকনো বালি চিঠির ভাঁজে জমাস খালি তোকে ভোলার অলীক হাসি কষ্ট, তোকে ভালোবাসি।


মিথ্যে পাঁজর এ রাজপথে খুঁজছে হাত তোমার হাতে মিথ্যে বিবেক বেবাক ভুলে সাতনরী হার ফেলল খুলে


নৌকোডুবির গল্প খানি আমিই নিলাম বুকে, আমার রাধা থাকুক নাহয় অচিনপুরেই সুখে ! তোমার আকাশ, তোমার নদী হোক না তোমার মতো, বেবাগী মনে প্রেম সাগরে আরও বাড়াও ক্ষত !


ভুললি কেন মনমানসী ? ভুললি ঠোঁটের সকল হাসি ? তুই হারালি গহন কুলে, আমি যে তোর ঘন চুলে ! পকেটে নয় চোখের তারায়, বালি নয়, মন হারায়, চিঠির ভাঁজেও মনই থাকে, ভালবাসা ঠোঁটের ফাঁকে ! শুনে তোর হৃদয় বাঁশি, আমিও তোকে ভালোবাসি !


ভালোবাসি ভালোবাসি বলেই শুধু মনকে ভুলাই ভালোবাসার সঠিক মানে আজও মন খুঁজে বেড়ায় তুমি আছো আমিও আছি একে অপরের কাছের হয়ে তবু মাঝে এত ফারাক সব অনুভূতি হারায় সাগর পাড়ে... ভালোবাসা কি অতই সোজা মনকে এবার প্রশ্ন করো জবাব দেবে তোমার হৃদয় বৈঠা যদি নিজেই ধরো


মনকে ভুলিয়ে লাভ কি বলো ? মনের সাথে লড়তে হবে .. ভালোবাসার সঠিক মানে বুঝবে তুমি আবার কবে ? খুঁজুক মন শুধুই আমায়, তুমি আছো আমিও আছি, আমার কাছে হয়তো দূরে, তোমার কাছে কাছাকাছি ! হোকনা ফারাক মন যমুনায়, অনুভূতি হারিয়ে যাক, সাগর পাড়ে... আকাশ বুকে শুনতে থাকো প্রেমের ডাক ! মনকে তুমিই প্রশ্ন করো, ভালোবাসার আঁচল পেতে, আমার কি আর সময় আছে ? তোমার কাছে ছুটে যেতে !


গভীর থেকে অতল গভীর মনের মাঝে অচেনা তরী


চুল ভেজে রে দৃষ্টিতে, শরীর ভেজে বৃষ্টিতে, মন পাতলে রাধার কোলে আকাশ দোলে সৃষ্টিতে !


রাধা -২ (লজ্জা,যন্ত্রণা)


দেবদারু পাতার জঙ্গলে মন খারাপের রসদ খুঁজি রোজ .. সঙ্গে থাকে আমার ছায়া আর চোখের কোনায় ছাই হয়ে থাকা কয়েক ঝুড়ি স্মৃতি ! পড়ন্ত বিকেলে, ডুবন্ত সূর্যের সামনে অতীতের পাপ ধুই, সময়ের মূল্যে ! মন খারাপ করা মনটাকে লুকাই কুয়াশার অন্তরালে ! সাথের ছায়াটা বিরক্ত করে, সন্ধ্যা নামে, আরও আকার বাড়ায়, শেষে পালিয়ে যায় অন্ধকারে! আমিই তখন ছায়া হই, মন খারাপের রসদ পাই অবশেষে !


তোমার ডালপালা ছেঁটে দিলে তুমি আমার মতো দেখতে হয়ে যাও। তোমার নিখুঁত পাতাগুলি তখন আলমারিতে সাজানো থাক বাঁধা শাড়িগুলি ঠিক! তারপর বিকেলের ঢালে সুমন্দ বাতাস এলে অল্প আন্দোলিত হয় সংহত দেহ পল্লব। পৃথিবীর প্রতিটি সুখের সময়কে নাড়াচাড়া করো আলস্যে, যেহেতু প্রতিটি বিষাদ ধুলোময় অলীক ,পিছলে যায় মসৃণ পাতাদের বুকে। কোন ফুল নেই । অগোছালো দোয়েলের ঘরকন্না নেই আর। বিকেলের উঠোনে তুমি ও আমি চুপ করে বসে থাকি। অদূর অরণ্যে তীব্র ঝড় ওঠে।


খণ্ড খণ্ড আকাশে এক অখণ্ড মেঘ নোনতা জিব দিয়ে চেখে দেখি সেও লক্ষ জলের বিন্দু ; একবুক ঘ্রাণ টেনে বুঝি, মেঘলা সকালও কেন যন্ত্রণায় ঠিকানা খোঁজে বেশ্যাপাড়ার ! শুধু সকাল কেন ? রাতের গহ্বরেও নিজেকে হারায় অমীমাংসিত রাতের অন্ধকারে, সেখান বুঁদ বুঁদ-শরীরে ধর্ষণ বলে ধূসর শব্দটাই নেই ! আসলে জলের শরীরে কোন দাগই লাগেনা ! সেখানে সব অঙ্গই বিকলাঙ্গ !


সরল গাণিতিক নিয়মে দারিদ্রসীমা ছাড়িয়ে রেশনের চাল চলে যায় মোটা মুনাফায় বুলেটে চড়ে বিকাশ আসে পুঁজির বাক্সে অন্য সকলের জন্য অন্ন নয় বিষ বয়ে আনে বিষণ্ণ বিকেল হাঁড়িতে ফুটন্ত সরল গাণিতিক নিয়মে সমাজের সমস্ত সম অস্ত গেলে আমাদের মা বোন এক করে একশো আট পরমান্ন রান্না হয়।


নিয়ন আলোর লাল ওপারে রাধার চোখ ভেজা জ্যোৎস্না নাকি আশাপূর্ণা হাসি, কৈকেয়ী র হাত লিঙ্গ ছুঁয়ে দিলে বেইমান কৃষ্ণের দল মজা লুটে যায় বেইমান কৃষ্ণের দল শরীর ছিঁড়ে খায় স্বার্থপর নপুংসক ! প্রয়োজনে বেসাতি প্রেম আর অনেক রাধার চোখ এর জল


লাল আলোর নিয়ন বাঁধা ছিঁড়ছে রাধা কৃষ্ণবর্ণ প্রেম জমছে কনডমের প্যাকেটে রাত খরচের জমাটি হিসেব শেষে পড়ে থাকে গোলাপি বাৎস্যায়ন।


রাধা – ৩ (ব্রিজের উপর মেয়েটিকে)


নামভূমিকায় অন্ধকানাই। ইমন রাগে বিসমিল্লা ই। তেমন দিনে বৃষ্টিজলে, ধোঁয়ার রঙ রাত কাজলে, আম্রপালির লাজের বালাই? তবু ও কাঁদায় বিসমিল্লাই! ব্রিজের উপর একক নিলাজ বর্ষা ভেজায় রাত্রির সাজ। অনন্তে আজ তীব্র সানাই মেয়েটিকে ছোঁয় বিসমিল্লা ই।


ঠোঁট ভিজে যায় লিপস্টিকে ভালো খারাপ ধানাই পানাই, বুকের কাপড় লাজুক চোখে টাকা ওড়ায় রাম বা কানাই ! চেতলা ব্রিজে লাস্যের মাপ- মাপে কোন সে পাগল সানাই ? শরীর চেখে ভৈরবী গায় তোমার আমার বিসমিল্লাই ? ব্রিজের উপর আঁচল ফেলে বর্ষা ভেজায় রুকমিনি বাই, বাঁধন বাঁধার বাজায় সানাই তোমার আমার বিসমিল্লা ই ?


মনটা এখন ঝড়ো হওয়ায় কল্পনা ছোঁয় আকাশ জুড়ে, ইচ্ছেমাঠে ইচ্ছে কুড়াই দারুণ,প্রখর,রৌদ্রে পুড়ে ! ভোরের বেলায় রাতের স্মৃতির চাটাই পাতি উঠোন কোণে, স্বপ্নগুলো বাছতে বসি আপন মনে ! বারান্দাতে বিছিয়ে থাকে হলদে রোদের কণার সারি, বুকে মেখে রোদের কণা, বাতাস ছাড়াও বাঁচতে পারি !!




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮