• সম্পাদনায় দীপাঞ্জন

শিরোনাম


শিরোনাম বিভাগটি নীড়বাসনার আর একটি পরীক্ষা মূলক প্রয়াস । অণু-গল্প যা একান্তই মৌলিক কিন্তু নামটা চেনা কোন বিখ্যাত উপন্যাসের অথবা গল্পের অথবা সিনেমার । চেনা নাম অচেনা কাহিনীর এই বিভাগটির সম্পাদনা করেছেন দীপাঞ্জন মাইতি।

শিরোনাম-'বিষ বৃক্ষ ' (বঙ্কিম চন্দ্র) - বর্ণালী মুখোপাধ্যায়।

কিছুতেই গাছটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না বাদল। স্টেশনের কাছাকাছি এই পাড়াতে সে ভাড়া এসেছে গত মাসে। অকৃতদার। রেলের চাকরিতে নবাগত। কোয়ার্টার পেতে একটু দেরি, ততোদিন এই একঘরেই দিব্য। কিন্তু ঐ গাছ!সে কাজ থেকে ফিরে ঘরের জানলা খুলে দিলেই গাছ নিঃশব্দে হাসে। ডাকে। একটা আলো অযাচিতের মতো গাছের মগডালে আটকে থাকে। কারা ফিসফিসোয়। একদিন খুব পানসে জ্যোৎস্না। মোটা গুঁড়িটায় অলৌকিক সফেন রঙ। জোনাকিরা স্থির ও নিষ্প্রাণ । । সে ডাক এলো-আয়। সময় হয়েছে। দড়ি আগেই বাদল জুটিয়েছিল। আহ। কি এক মোহের ডাক।

কলোনির বুড়ো শ্যামলাল গুণে গেঁথে বলল-এ ছোকরা কে নিয়ে সাতজন। পুলিশ লাশটাকে প্লাস্টিকে বাঁধছিল।



শিরোনাম-'বিষ বৃক্ষ' (বঙ্কিম চন্দ্র) - দীপাঞ্জন মাইতি

মাঝেমাঝে পৃথ্বিশ বুঝতে পারে না সে আলোর দিকে ছুটছে না অন্ধকার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গত দু-তিন দিন যাবৎ কারো মানসিক সমস্যার কথা কানে আসে নি। কোনো পেশেন্ট নেই, চেনা পরিজন নেই, কারো সমস্যা নেই সমাধানের প্রয়োজন নেই... তবে কি তারও প্রয়োজন ফুরালো! এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছিল পৃথ্বিশকে। ঠিক সময় পরিতোষ এক ঝাঁক সমস্যা নিয়ে হাজির না হলে কি যে হত.... গত চার বছর ধরে সপ্তাহে অন্তত একবার এমন বাড়াবাড়ি হয় পৃথ্বিশের। আবার নিজে নিজে ঠিক হয়ে যায়। কে বলবে এই মানসিক চিকিৎসার হাসপাতাল তারই গড়া!



শিরোনাম-'কড়ি দিয়ে কিনলাম' (বিমল মিত্র) - অরুণাভ দত্ত

লোকেশ এর অফিস এ তখন খুব চাপ ...শনি রবিবার অফিস ক্যান্টিন বন্ধ তাই কাছেই এক ঝুপড়ি তে লাঞ্চ করতে এসেছিলো.....রাজারহাট তখন এতো জমজমাট হয় নি..বেশ দূরে দূরে নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট ..আর সংলগ্ন কিছু চা আর ভাত তরকারি র দোকান ...খুবই হত দরিদ্র আয়োজন.. দিন মজুর দের জন্য ..একটায় ঢুকে সবজি ভাত অর্ডার করতেই চোখ গেলো উঠোনে গাছের ছায়ায় বসে থাকা মালিক পত্নী আর তার কোলের শিশু টি র দিকে - দুজনেই হাড় জির জিরে ..বাচ্চাটা কে দুধ খাওয়াচ্ছে বোধহয় ..না চাইতেও কালো সুডোল চাঁদ উঁকি দিয়ে গেলো বুঝি এই তপ্ত দুপুরে..আর দুচোখ এর বিদ্যুৎ চাহনি ..বিল মেটানোর সময় ততোধিক জীর্ণ চেহারার মালিক সবজি ভাত এর ন্যায্য দাম তিরিশ টাকা চাইলে উঠোন থেকে উত্তর এলো ...ওনাকে চল্লিশ ট্যাহা দিতে বোলো..এক্সট্রা ভাত এর দাম ..দোকানদার এর বোকা হাসি এ রসিকতার মানে বোঝার আগেই লোকেশ পঞ্চাশ টাকার নোট টা ধরিয়ে ' রেখে দিন দাদা ..কাল আবার আসতে পারি ' বলে বেরিয়ে এলো..তার মুখে তৃপ্তি না দুঃখ সেটা ঝলসে যাওয়া রোদ এ বোঝা যাচ্ছিলো না..



শিরোনাম-'গল্প হলেও সত্যি' (তপন সিনহা) - রূপম গুহ খাসনবিশ

ঘটনাটা ২০০০ সালের, স্থান দূর্গাপুর ! রাত তখন ১১ টা হবে ! বিপ্লবের দেরী হয়ে গেছিলো বিধান নগরে একটা কাজ সারতে ! বাড়ী ইস্পাত নগরীর এ জোন ! বাইক নিয়ে বাড়ী ফিরছিল ! দূর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজ পেরিয়ে তখন ভগৎ সিং মোড়ের দিকে এগোচ্ছে বিপ্লব ! চারিদিক শুনশান ! হঠাৎই দেখতে পায় বছর কুড়ির একটি মেয়ে রাস্তার প্রায় মাঝে এসে দাঁড়াতে বলছে ! ব্রেক টেপে সে !

"বান্ধবীর বাড়ীতে নেমন্তন্ন ছিল, এখন বাড়ী ফেরার কিছু পাচ্ছি না ! আমার বাড়ী বি জোনের 'আমরা কজন' ক্লাবের পাসে ! একটু বাড়ী ছেড়ে দেবেন ?"

১২ নম্বর স্ট্রিট এর মুখেই বাইক থামাতে বলল ! নেমে হেঁটে গেলো দু তিনটে বাড়ী পেরিয়ে ! গেট অবধি বিপ্লব দেখতে পেলো মেয়েটিকে ! হঠাৎ যেন মিলিয়ে গেলো ! এতদূর পৌঁছে দিয়েছে ! বাড়ি পৌঁছনোর শেষ খবরটা নিয়ে যেতে মন টানল !

দরজায় কড়া নাড়ল বিপ্লব ! বছর ষাটেকের এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দাঁড়ালেন ! "উনি ঘরে পৌঁছেছেন তো ?" ভদ্রলোক কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় ঘরের ভেতর আসতে বললেন ! ছোট ঘর ! ঘরে একপাশে একটা পুরানো সোফা কাম বেড আর প্রায় বাকি ঘরটা দখল করে একটা সিঙ্গেল খাট ! তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েক দিনের খবরের কাগজ আর কিছু বই ! এক গ্লাস জল হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ভদ্রলোক ! "জলটা খেয়ে নাও বাবা আর তোমার বাড়ীর নম্বরটা দাও !" কেন ? চমকে ওঠে বিপ্লব ! "না না এমনিই" উত্তর দিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যান ! ফিরে আসেন একটা বাঁধানো ফটো নিয়ে ! "একেই আজ বাড়ী পৌঁছে দিয়েছ তো ? এর আগেও বেশ কয়েকজন ওকে বাড়ী দিয়ে গেছে ! ও মাঝে মাঝেই বাড়ী ফেরে, কিন্তু আমি দেখতে পাইনা ওকে !" চোখের জল মুছে .... "আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এক বন্ধুর বাড়ী গেছিলো, ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্ট !"

জ্ঞান হারায় বিপ্লব !

শিরোনাম-‘দত্তা। ’ (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) বর্ণালী মুখোপাধ্যায়

মা বলল-অফিস থেকে ছ্যাঁচাপোড়া হয়ে ফিরলি। কাপড়টা বদলে নিস। মুখটা ধুয়ে একটু পাউডার টাউডার। মলির শ্বাসবায়ুটি দীর্ঘশ্বাস। আজ বুধবারের সন্ধেবেলা। আজ শ্রীমন্ত বসু ঢুঁ মারবে। মা কদিন ঘ্যানঘ্যান করছিল এবারের চিটফাণ্ডের টাকা জমা হয় নি বলে। সিলিং এর ড্যাম্পটা অবিকল শ্রীমন্তের ঝোলা চোয়াল । মা আজ শান্ত হবে। সে পিঠ খোলা কুর্তাটা গলিয়ে আয়নায়। লিপস্টিক ঘষছে ঠোঁটে। অতুল বলেছিল তোকে ইলোপ করবো একদিন ঠিক। মলি শোনে বিকট শব্দে বেল বাজলো।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮