• অমৃতা চক্রবর্তী

অনুজা

অনুজা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, বাপরে! ৫.১৫ হতে চলেছে? তাড়াতাড়ি করে বাচ্চাদের ড্রয়িং গুলো শেষ করতে লাগলো। বেবো কে ডাকতে হবে। সে পাশের বাড়ি খেলতে গেছে।বেবোর ৬ টা থেকে সুইমিং ক্লাস থাকে। মেয়েটা এই গরমের ছুটিতেই যা একটু প্রাণ ভরে খেলতে পারে। কয়েকদিন পর থেকে তো স্কুল খুলে গেলে আর দম নিতে পারবে না।


অনুজা একটা বড় ড্রয়িং ইন্সটিটিউট থেকে অনেকগুলো ড্রয়িং এর কোর্স করেছে, এছাড়াও ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছে। গরমের ছুটিতে বাচ্চাদের জন্য ড্রয়িং ওয়ার্কশপ নেয়। এছাড়া সারাবছর টিউশন ক্লাস তো থাকেই।


অনুজার ছোটবেলা থেকে সুইমিং শেখার খুব ইচ্ছা। কিন্তু ওদের সোদপুরে সুইমিং শেখার মত কোন পুল ছিল না। একটা পুকুরে কিছুদিন সাঁতার শেখার চেষ্টা করেছিল। ৩ দিন একটু শিখে ৪ দিনের দিন ডুবে যাচ্ছিল। তাই সেই ভয়েতে আর শেখাই হয় নি শেষ শেষ অবধি। অনুজা নিজে যা পারেনি, বেবো কে দিয়ে সেই শখ পূরণ করছে।


বেবোর জন্মের আগে একটা স্কুলে অনুজা চাকরি করত, কিন্তু মেয়ে হওয়ার পর মেয়েকে দেখাশুনা করার জন্য অনুজা ঘরে বসেই নিজের শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যেটা সবথেকে অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াল, সেটা অনুজার ওজন। অনুজা সারাদিন কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলেও ওর সব কাজ ই ছিল ঘরে থেকে। নিজের জন্য সময় বার করতে না পারার ফলে ৫ ফুট উচ্চতার ৪৫ কেজি ওজনের অনুজা আজ ৭৫ কেজি তে পরিণত হয়েছে। এই নিয়ে শুভ, অনুজার স্বামী অনেকবারই জিমে ভর্তি হওয়ার কথা বলেছে ,অনুজাই সময় বার করতে পারেনি। তার ওপর অনুজা আবার ফুডি। পিজ্জা, মিষ্টি,চকলেট- এগুলো তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার।এসব পুরনো কথা চিন্তা না করে বেবো কে নিয়ে সে বেরোল সুইমিং পুলের উদ্দেশ্যে।


আজ পুলে খুব বেশি ভিড় ছিলনা। আজ একটু বৃষ্টি হয়ে ঠাণ্ডা হয়েছে তাই বোধ হয়। অনুজা বাকি মায়েদের মতই সুইমিং না জানা সত্ত্বেও ডাঙ্গা থেকেই বেবোকে সাঁতারের ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছিল,পুলের চারপাশটায় ঘুরে ঘুরে।তার ফলে ঘটল এক সাংঘাতিক ঘটনা।পুলের ধার দিয়ে যাওয়ার সময় পা পিছলে অনুজা পড়বি তো পড়, সোজা পুলে।৭৫ কেজি ওজনের অনুজা যখন জলে পড়ল, তখন পরিস্থিতি টা এমন দাঁড়াল, যে একটা ছোটখাটো বাচ্চা হাতিকে জলে ফেললে যা হয়, ফোয়ারার মত জল উপচে পড়ল।আশেপাশের বাচ্চারা ভয় পেয়ে গেল। বেবো দারুণ লজ্জা পেয়ে গেল। সবথেকে বড় অসুবিধা হল অনুজার। সে সাঁতার জানতোনা,ভয়ে হাবুডুবু খেতে লাগলো আর চিৎকার করতে লাগলো।


ওখানকার যে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ট্রেনার ছিল, তিনি অবশেষে অনুজা কে উদ্ধার করতে এলেন। ৭৫ কেজির অনুজা কে উদ্ধার করা কি আর সোজা কথা? শেষে দুজন ট্রেনারের সমবেত চেষ্টায় সে পুলের বাইরে এলো। সেকি লজ্জা,সবাই তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে,আর নিজের তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। কোনোরকমে অনুজা বেবো কে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলো। রাত্রে শুভ বাড়িতে এলে ১০ বছরের মেয়ে যখন সব শোনাল তখন শুভ হেসেই কুটিপাটি।


দুদিন ধরে অনুজা পুলেও যায়না,লজ্জার চোটে। কিন্তু কাঁহাতক আর ঘরে বসে থাকা যায়?৩ দিনের দিন অবশেষে সে মেয়ের হাত ধরে পুলে পৌছালো। ভারী অস্বস্তি হচ্ছিল। দু- একজন আড়চোখে তাকিয়ে হাসছিল।কিন্তু এটা পুনে শহর,এখানে কেউ কাউকে নিয়ে অত চিন্তা করে না। বেবো পুলে নামলে আজ আর অনুজা সামনে না যেয়ে দূরের একটা চেয়ারে বসলো।


জীবনে এত অপমানিত অনুজা কখনো হয়নি।বাইরের লোক,ঘরের লোক আজ সবাই হাসছে।তার কি দোষ? হ্যাঁ, সে একটু বেশি মোটা। কিন্তু সেও তো একদিন ছিপছিপে সুন্দরী ছিল!

আজ অনুজা হঠাৎ একটা নতুন জিনিষ খেয়াল করল। একটি বিবাহিত মোটাসোটা মারাঠি মেয়ে,তার মায়ের সাথে এসেছে সাঁতার শিখতে। অনুজা লক্ষ্য করল, ট্রেনার তাকে সুন্দর করে শেখাচ্ছে। মেয়েটিকে দেখে অনুজার মনে হল, মেয়েটি হয়ত অনুজার মত অত মোটা নয়। কিন্তু সে যদি পারে,তবে অনুজা কেন নয়?


যেই ভাবা সেই কাজ।বেবো সাঁতার কাটছিল। আর পাশেই অফিসে গিয়ে অনুজা এডমিশন নিলো। তারপরের দিন গেল সাঁতারের ড্রেস কিনতে। শুভ সেদিনের ফ্লাইটেই সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল অফিসের কাজে, ৩ সপ্তাহের জন্য, তাকে আর অনুজা কিছু জানাল না।

অনুজার প্রশিক্ষণ শুরু হল সাঁতারের। প্রথমে তো অনুজার ওজনের সাথে ট্রেনাররাই তাল সামলাতে পারছিল না।দুজনে দুপাশ থেকে ধরছিল, আর বেবো ও সাথে ছিল।


যা হোক, ৩ সপ্তাহের মধ্যে সাঁতার শিখে ছোটোখাটো বাচ্চা হাতি অনুজা ৭৫ কেজি থেকে ৭০ কেজিতে পরিণত হয়েছে। বেবো মায়ের নতুন রূপ দেখে খুব খুশি । আর শুভ এই সারপ্রাইজ দেখে জীবনে প্রথমবার এত খুশি হয়েছে। আর যেটা হয়েছে জীবনে চলার পথে অনুজার আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গেছে।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮