• প্রদোষ সেন

আধিভৌতিক




ভূত আছে কিনা এই নিয়ে অনেক বিতর্ক শুনেছি। ইদানীংকালে এই ধরণের আলোচনা অনেক কম হলেও আমাদের শৈশবে এমনকি কলেজ লাইফেও অনেককে বলতে শুনেছি তাদের ভূত দেখার বা ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা। আর একদল, যেমন ছিলাম আমরা, বলতাম এসব মনের ভুল। আসলে ভূত বলে কিছু হয় না। তারপর কর্মজীবনে এসে কাজের চাপে এইসব আলোচনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। ভূত আছে কি নেই তা নিয়ে আর কোন মাথাব্যথা আমার নেই।

এইভাবেই চলছিল। আর তখনই ঘটল এই ঘটনা।

............

তখন কলেজ থেকে পাশ করে দিল্লীতে চাকরি করি। মাইনে মোটামুটি ভাল। বিয়ে-থা করিনি। আমার ছিল নতুন জায়গা বেড়ানোর শখ। আর ছবি তোলার। তাই দিন দুয়েকের ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়তাম। করবেট, ল্যান্সডাউন, ভানগড়, কৌশানি এইরকম আরও অনেক জায়গা গেছি। অফিসে আরও কয়েকজন ছিলেন যাদের আমার মত না হলেও বেড়াতে যাওয়ার শখ ছিল। তাদের কাউকে না কাউকে প্রতিবারই পেয়ে যেতাম। কিন্তু আমি ছিলাম কমন ফ্যাক্টর।

যে বারের কথা বলছি সেটা ছিল দেওয়ালির ছুটি। সব মিলিয়ে ৪ দিনের ছুটি আমার। ভাবলাম একটু দূরে কোথাও যাওয়া যেতে পারে। তার জন্য অন্তত একজন সঙ্গী দরকার। আমার এক বাঙালি সহকর্মী ছিল। আমাদেরই কলেজ থেকে পাশ করা। একবছরের সিনিয়র। নির্ভীক। প্রথমদিন পরিচয়ের পর “নির্ভীক-দা” বলাতে আমাকে বলল “ওই সব দাদা আর এখানে বলতে হবেনা। এখানে সবাই প্রথম নাম ধরে বলে।“ বললাম “ঠিক আছে আমিও তাই চেষ্টা করব।“ কিন্তু চার বছরের অভ্যাস একদিনে পরিবর্তন করা যায় না। সে যাই হোক, নির্ভীকদা রাজি হল আমার সঙ্গে যেতে।

গন্তব্য ঠিক হল গঙ্গোত্রী আর যমুনোত্রী। প্রথমে যাবো যমুনোত্রী, যেটা অপেক্ষাকৃত দুর্গম রাস্তা। তারপর গঙ্গোত্রী। মন্দির দেখার থেকেও দুর্গম পাহাড়ি জায়গায় যাওয়ার যে একটা আলাদা উত্তেজনা আছে, সেটার থেকেই আমরা রাজি হলাম। আর দেওয়ালির পরেই বন্ধ হয়ে যায় দুই মন্দির। তার সঙ্গে একটু ঠাণ্ডার ভাব পড়তে শুরু করে এই সময়। ভিড় অনেক কমে আসে। সব মিলিয়ে মনে হল আমাদের পরিকল্পনা বেশ ভালই হয়েছে।

ঠিক করলাম দিল্লী থেকে গাড়িতে চলে যাব হরিদ্বার। ওখানে কোন হোটেলে রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালে একটা গাড়ি নিয়ে সোজা যমুনোত্রী। তাতে একটু তাড়াতাড়ি পৌছনো যাবে। তো পরিকল্পনা মত কাজ। পরদিন গেলাম GMVN-র অফিসে হোটেল বুকিং-র জন্য। GMVN-র পুরো নাম হল গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগম। পাঠকরা হয়ত অনেকেই জানেন যে ওই সব অঞ্চলে GMVN-র হোটেলের সংখ্যা বেশী আর তুলনামুলকভাবে হোটেলগুলি খারাপ নয়।

অফিসে যার সঙ্গে আমি কথা বললাম বেশ ভাল কথাবার্তা। যেটা সরকারী অফিসে প্রায়ই দেখা যায়না। নাম অবিনাশ শর্মা। দুএকটা কথার পর আমাকে বললেন “যমুনোত্রী যাওয়ার পথে বেশীর ভাগ টুরিস্ট বারকোটে থাকে। ওখানে ভিড়-ও বেশি। তো আপনারা তো দুজন বন্ধু যাচ্ছেন। আপনারা একটা ডিফারেন্ট জায়গা ট্রাই করে দেখুন না।“ “আপনি সাজেস্ট করুন। আমার অত আইডিয়া নেই।“ বললাম। “দেখুন জানকীছেটি বলে একটা ছোট গাঁও আছে, ওখানে থেকে যান। আমাদের একটা লজ-ও রয়েছে, বুক করে দিছি।“ আমি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছু বলার আগেই, মি শর্মা আবার বললেন “এটা আমাদের নতুন লজ। পুরোনোটা লাস্ট ইয়ারের ফ্লাড – এ খুব বাজে ভাবে ভেঙে গিয়েছিল। নতুনটা জাস্ট দুমাস হল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। থেকে দেখুন কেমন লাগে। ওখানে থাকার একটা সুবিধে হল কি ওটা মন্দির থেকে অনেক কাছে। সকালে তাড়াতাড়ি মন্দিরে যেতে পারবেন।“

মন্দির দেখার বিশেষ আগ্রহ আমার নেই। যাচ্ছি যখন তখন অবশ্যই দেখব। আপাতত মি শর্মার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। গঙ্গোত্রীর হোটেল বুক হল উত্তরকাশীতে। এটার মধ্যে অবশ্য নতুনত্ব কিছু নেই, বেশীরভাগ তাই করে থাকেন।

……………

কাল রাতে এসে পৌঁছেছি হরিদ্বার। এই নিয়ে চার বার এলাম। প্রথম যখন আসি স্কুলে পড়তাম। হরিদ্বার জায়গাটার একটা মাহাত্ম্য আছে। যে কারণে বোধহয় এতবার আসলেও আবার আসতে ভাল লাগে। এইসব কথাই হচ্ছিল নির্ভীকদার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে।

বেড়াতে এসে তাড়াহুড়ো আমার ভাল লাগেনা। নির্ভীকদা আবার উলটো, সব সময় টাইম মেনে চলতে চায়। “চল প্রবাহ, এবার বেরনো যাক।“ বলতে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। হরিদ্বার থেকে হৃষীকেশ হয়ে মুসৌরির কেম্পটি ফলস-র রাস্তা ধরব।

ড্রাইভারটিও বেশ ভাল। মাঝবয়সী। নাম সতিন্দার। উত্তরাখন্দের-ই বাসিন্দা আর দশ বছরের ওপর এই অঞ্চলে গাড়ি চালাচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট নখদর্পণে। আগেই বলেছি এই সময়টা এখানে ভিড় একটু কম থাকে। তাই রাস্তায় ট্রাফিক খুব বেশী নয়। আমাদের গাড়ি বেশ তড়তড় করে এগিয়ে চলেছে। এইভাবে চললে বিকেলের আলো থাকতেই হোটেলে পৌঁছে যাব। সতিন্দার অন্তত তাই বলল। কিন্তু এই সব পাহাড়ি জায়গায় আগে থেকে সবকিছু বলা যে মুশকিল বুঝলাম একটু পরেই।

তখন দুপুর। একটু পরে বারকোট পৌঁছব। মনে পড়ল GMVN অফিসে মি শর্মা বারকোট-র ব্যাপারে বলেছিলেন। এই অঞ্চলের এটাই বড় জায়গা। কিছু হোটেলও আছে। ভাবলাম ওখানে দাঁড়িয়ে একটু খাওয়া-দাওয়া করা যাবে। ড্রাইভারকে বলতে সেও রাজি। হঠাৎ শুরু হল বৃষ্টি। প্রথমে গুঁড়ি গুঁড়ি। তাই আমরা সেরকম আমল দিইনি।

সতিন্দারও বলল “এটা অসময়ের বৃষ্টি, এখুনি থেমে যাবে।“ আমরাও জানি এটা অসময়ের বৃষ্টি। এটা বৃষ্টির মরশুম নয়। কিন্তু বৃষ্টি আর থামেনা। বারকোট-র হোটেলে লাঞ্চ করতে আধঘণ্টার একটু বেশি সময় লেগে গেল। তখন বৃষ্টি থামা তো দূরের কথা, বেগ একটু বেড়েছে। আর তার সঙ্গে বাড়ছে ঠাণ্ডাটাও। বেশ শীত শীত একটা ভাব। ব্যাগ-প্যাক থেকে জ্যাকেট বের করে গাড়িতে উঠলাম। সতিন্দারের মুখে দেখলাম একটু চিন্তার ছাপ। সকালের সেই হাসি-খুশি ভাবটা আর নেই। বলল “আজ রাতটা এখানে থাকলে হত না?” একটু আশ্চর্যই হলাম। এই রকম বলছে কেন? জিগ্যেস করতে বলল “এরপর রাস্তা খারাপ। ধস নামার চান্স থাকে। গাড়ি রাস্তায় আটকে গেলে খুব প্রবলেম।“ নির্ভীকদা বলল “কিন্তু এখানে আমাদের কোন হোটেল বুকিং নেই। বুকিং তো জানকীছেত্তি-টে।“ সতিন্দার “ঠিক আছে চলুন” বলে আস্তে আস্তে গাড়ির স্পীড বাড়াল।

কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম সতিন্দারের কথার মর্মটা। গাড়ি যত এগোচ্ছে, দেখলাম রাস্তা খারাপ তো দূরের কথা, রাস্তা বলে কোন বস্তু নেই। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওপরে শুধু নুড়ি আর পাথর। বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে বাইরে আবছা যেটুকু দেখা যায়, তাতে কোন জনপ্রাণী চোখে পড়ল না। বাড়িঘর-ও প্রায় নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে একটা বা দুটো গাড়ি দেখতে পাচ্ছি। যাচ্ছে বারকতের দিকে। আর চারদিকে বিস্তীর্ণ পাহাড়। এইরকম দুর্গম জায়গায় আমি এর আগে কোনদিন এসেছি বলে মনে পড়ল না। তার সঙ্গে এই বৃষ্টি আর দিনের আলো নিভে আসছে। সব মিলিয়ে যেন একটা কিসের অশনি সংকেত। নির্ভীকদার গলা শুনলাম “এবার বুঝতে পারছি কেন ও বলছিল। গাড়ি এখানে ফেঁসে গেলে...” আমাদের ড্রাইভার অল্প হলেও বাংলা বোঝে। বলল “গাড়ি ফাঁসবে না স্যার। রাস্তা বন্ধ না হলেই হল।“ ওর কথায় মনে একটু সাহস পেলাম। স্পীডমিটারের কাঁটা চল্লিশ ছাড়ায়নি বারকোট ছাড়ার পর। এইরকম করে প্রায় দুঘণ্টা আসার পর দেখলাম রাস্তার ধারে একটা বোর্ড লাগানো যাতে লেখা রয়েছে আর একটু গেলেই GMVN হোটেল। লেখাটা সতিন্দার-ও দেখেছে। বলল “এটা হনুমানচ্ছতি। আপনাদের হোটেল আরও আগে।“ “আর কতক্ষণ লাগবে ওখানে পৌঁছতে?” জিগ্যেস করলাম। “আধঘণ্টা মত।“ রাস্তার ধারে হোটেলটা চোখে পড়ল। একটু উঁচু জায়গায় একটা বেশ বড় টিলার ওপর। হোটেলটার একটা বোর্ড ঝুলছে। চারপাশে কয়েকটা বাড়ি আর দুএকটা দোকান রয়েছে মনে হল। সবই বন্ধ। আর টিমটিম করে কয়েকটা আলো জ্বলছে। কোন লোকজন চোখে পড়ল না। বুঝতে বাকি রইল না আমাদের হোটেলও এইরকম-ই কিছু হবে।

………

আরও আধঘণ্টার রাস্তা এসে গেছি। চারদিক প্রায় অন্ধকার। বৃষ্টিটা এর মধ্যে খানিকটা ধরেছে। ঝিরঝির করে পড়ছে। “ওই আপনাদের হোটেল। দেখুন লাইট দেখা যাচ্ছে।“ আমাদের ড্রাইভার বলল। কথাটা শুনে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তাকালাম বাইরের দিকে। বাঁদিকে খানিক দূরে কয়েকটা আলো দেখা যাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি আর গাড়ির জানলার কাঁচে জল থাকায় আলোগুলো বেশ আবছা। কিন্তু একটা ছোট লোকালয় আছে সেটা বোঝা যায়। ঘড়িতে সময় দেখলাম। সাড়ে পাঁচটা বেজে ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে ছটার দিকে এগোচ্ছে। মিনিট খানেকের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে গাড়ি থামাল সতিন্দার। “আপনারা ওয়েট করুন। আমি গিয়ে কাউকে ডেকে আনছি।“ আমরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে ও নেমে গেল। গাড়ির ক্যারিয়র থেকে একটা ছাতা নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের জিগ্যেস করল “নতুন ব্লক তো?” বললাম “হ্যাঁ।“ এখানেও দেখলাম হোটেলটা একটু উঁচু জায়গায়। সিঁড়ি রয়েছে। সতিন্দারকে দেখলাম সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে।

হোটেলের চারপাশে কয়েকটা বাড়ি আর দুএকটা দোকান। সবই বন্ধ মনে হল। পাহাড়ি জায়গা। তার ওপর বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা। দোকানপাট খুলে রেখে করবেই বা কি? GMVN যে এখানে হোটেল খুলে রেখেছে, এই যথেষ্ট। এই সব আলোচনা করতে করতে খেয়াল নেই যে কয়েক মিনিট কেটে গেছে। হুঁশ কাটল ঠক ঠক আওয়াজে। গাড়ির কাঁচে দেখলাম একজন আওয়াজ করছে। আমাদের কিছু বলতে চাইছে। কাঁচটা একটু নামিয়ে জিগ্যেস করলাম “কি দরকার?” একজন মাঝারি উচ্চতার লোক। আমাদের গাড়ি থেকে নেমে সঙ্গে আস্তে বলল। বললাম “আমাদের এই হোটেলে বুকিং আছে।“ ও আশ্বস্ত করল যে ও সেই জন্যই এসেছে। আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। সুতরাং গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। দুজনেই।

বেশ জাঁকিয়ে ঠাণ্ডাটা পড়েছে। লোকটির পোশাক দেখে সেটা গাড়িতে বসেই বুঝেছিলাম। নামার পর সেটা অনুভব করতে পারলাম। তার সঙ্গে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড়ি জায়গার হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা কাকে বলে সেটা বেশ বুঝতে পারছি। লোকটি দেখলাম বুদ্ধি করে দুটো ছাতা নিয়ে এসেছে। আমাদের ছাতাগুলো দিয়ে ও জিনিসগুলো চাইল। আমাদের দুজনেরই শুধু ব্যাগপ্যাক। মাঝারি সাইজের। পিঠে নিয়ে নিলাম। বললাম “চল।“ তখন দিনের আলো নিভে এসেছে। একটা টর্চ হলে ভাল হয়। নাহলে নুড়ি পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে যেতে হবে। নির্ভীকদাকে বললাম। ভাবলাম নিজের মোবাইলটা বের করি। তখনই দেখি লোকটা একটা টর্চ বের করে জ্বালাল। আর অতটা অসুবিধে নেই। যদিও খাড়া রাস্তা। আর পাথরে ভর্তি।

পিঠে ব্যাগ নিয়ে এই রাস্তায় ওঠা বেশ কষ্টকর। নির্ভীকদা আমাকে বলেই ফেলল “এবার বুঝতে পারছি দিল্লি অফিসে এই লজটা কেন তোকে সাজেস্ট করেছিলো। ফ্যামিলি নিয়ে কেউ এখানে থাকবে না।“ যাইহোক মিনিট খানেক পরেই আমরা ওপরে ওঠার সিঁড়ি পেয়ে গেলাম। এইটা দিয়েই সতিনদারকে ওপরে উঠে যেতে দেখেছি।

সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাঁদিকে একটা সমতল জায়গায় এসে পৌঁছলাম। অন্ধকারে কিছু সেইরকম বোঝা যায়না। টর্চের আলোয় যেটুকু দেখতে পাচ্ছি। আর একটু এগিয়ে একটা দরজা। মনে হল লজেরই প্রবেশ পথ। লোকটা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। পিছনে আমরাও। একটা অল্প ওয়াটের আলো জ্বলছে। ঘরটা মনে হল হোটেলের ডাইনিং রুম। ছোটো কিন্তু মোটামুটি সাজানো। চারটে টেবিল আর খান দশেক চেয়ার পাতা। এত ছোটো হোটেলে এই যা আছে যথেষ্ট। একটু আশ্বস্ত বোধ করলাম।

লোকটি আমাদের বসতে বলল। তারপর একটা টেবিলের ওপর পরে থাকা একটা মেনুকার্ড নিয়ে আমাদের দিল। আমি আর নির্ভীকদা একবার পরস্পরের দিকে তাকালাম। আগে হোটেলে চেক-ইন করে তারপর খাওয়ার পাট। “হোটেলের রিসেপশন-টা কোথায়? আমাদের সেখানে আগে নিয়ে চলো।“ একথা বলতে লোকটা আমাদের হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল।

মিনিট তিন-চার কেটে গেছে। দুজনে চুপচাপ বসে আছি। ততক্ষণে আমার একটু অস্বস্তিও বোধ হচ্ছে। এটাই ঠিক জায়গা কিনা। নির্ভীকদারও মনে হয় তাই। আমাকে জিগ্যেস করল “আচ্ছা আমাদের ড্রাইভার কোথায় গেল? ওকে তো এখানে দেখছি না?” “আমিও তাই ভাবছি। একবার বাইরে বেরিয়ে দেখব?” “এক মিনিট”। নির্ভীকদা দেখলাম নিজের মোবাইল বের করেছে ওকে যদি ফোনে পাওয়া যায়। তারপর নিজেই বলল “না এখানে সিগন্যাল নেই।“ “ওই লোকটাকেও জিগ্যেস করা যায়।“ বললাম। “লোকটা কি বোবা? এতক্ষণ কিন্তু একটাও কথা বলেনি।“ নির্ভীকদার সন্দেহটা অমূলক নয়। আমরা ওকে শুধু ইশারাতেই উত্তর দিতে দেখেছি। যাহোক ফিরলে ওকে একবার জিগ্যেস করব।

হঠাৎ খেয়াল পড়ল কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে পিছন থেকে। ঘুরে দেখি, জানলার একটা কাঁচ খানিকটা ভাঙা। সেটার ওপর একটা কাগজের বোর্ড তাপ্পি মারা ছিল, যেটা খুলে মাটিতে পরে গেছে। সন্দেহটা আরও গাড় হল। দিল্লীর অফিসে আমাকে বলেছিল যে আমাদের বুকিংটা নতুন ব্লকে দিচ্ছে। নতুন ব্লকের এই অবস্থা? কথাটা বলে ফেললাম নির্ভীকদাকে। “তাই তো ঠিক বুঝতে পারছি না। একবার বাইরে বেরিয়ে দেখি চল।“ ভাঙ্গা জানলার দিকে দেখিয়ে বললাম “বাইরে তো পুরো অন্ধকার, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।“ তাও বেরিয়ে দেখা ভাল, এভাবে বসে থাকার কোন মানে নেই। বেরতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। টান দিলেও খোলে না। দুজনেই চেষ্টা করলাম। প্রথমে আস্তে, তারপর জোরে। কিন্তু কোন লাভ হলনা। এখন উপায়? দরজাটা ওপর খুব জোরে কয়েকবার লাথি মারলাম, যদি তার আওয়াজ বাইরে থেকে কেউ শুনতে পায়। নির্ভীকদা এমনিতে খুব শান্ত স্বভাবের। বিচলিত হতে খুব একটা দেখিনি। এখন দেখলাম ও একটু হলেও উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। যদিও গলার স্বরে সেরকম কিছু ছাপ পড়েনি। আমাকে বলল “দ্যাখতো কোন জানলা আছে কিনা।“ বললাম “একটা তো এখানেই রয়েছে, যেটায় কাঁচটা ভাঙ্গা।“ “ভিতরে গিয়ে দেখব? আর কোন জানলা আছে কিনা…” কথাটা বলতে বলতে একবার ভাঙ্গা জানলাটার কাছে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল-টা বের করে দেখলাম। সিগন্যাল আসছে কিনা। একটু সিগন্যাল আছে। খুব দুর্বল, কিন্তু আছে। সতিন্দারকে ফোন করলাম। ফোন লাগলো। “হাঁ জী, আপনারা কোথায়?” ওর গলা শুনতে পেলাম। কিন্তু আমার গলা ও শুনতে পাচ্ছেনা। বারকয়েক ‘হ্যালো’ ‘হ্যালো’ করে লাইন কেটে দিলাম। “ঠিক আছে, ছেড়ে দে। সিগন্যাল পেলে ও ঠিক ফোন করবে। “কয়েক সেকেন্ড থেমে নির্ভীকদা বলল “বাইরে কিছু বোঝা যাচ্ছে?” “না প্রায় কিছুই না। তবে মনে হচ্ছে এটা পিছনদিক, হোটেলটা সামনের দিকে হবে।“ “কীভাবে বুঝলি?” “আমরা যখন এসে পৌঁছালাম কিছু আলো দেখা যাচ্ছিল। এখান থেকে তো কোন আলো দেখা যাচ্ছেনা। তবে – “ “তবে কি?” “মনে হল একটা পাহাড়ি নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।“ আমি পাহাড়ি জায়গায় অনেক ঘুরেছি। এইরকম নির্জন, নিঃশব্দ পরিবেশে পাহাড়ি নদীর বয়ে যাওয়ার এই শব্দ আমার খুব পরিচিত। নির্ভীকদা আমার পাশে এসে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখে বলল, “দেখি অন্যদিকে কোন জানলা আছে কিনা।“ ডাইনিং রুম থেকে পিছনদিকে যেতে দেখলাম একটা প্যাসেজ। একটু এগোতেই গাড় অন্ধকার। মোবাইলের আলোটা জ্বালালাম। দুজনেই। আলো যে যথেষ্ট তা নয়। কিন্তু যেটুকু দেখতে পারছি মনে হল একটা সমতল জায়গা মত। এখানে নদীর জলের আওয়াজটা আরও বেড়েছে। মনে হল খুব কাছেই। আর একটু এগোতে মনে হল এর পরে আর এগোনোর জায়গা নেই। একটা বাড়ীর ভগ্নাবশেষ মত মনে হল। আমরা পরস্পরের দিকে দেখলাম। বুঝতে আর বাকি নেই যে ভুল জায়গায় আমরা এসেছি। এখন কি করে এখান থেকে বেরনো যায়। নির্ভীকদাই প্রথম কথা বলল “চল আমরা ওই ঘরেই ফিরে যাই। এদিক দিয়ে কোথাও তো যাওয়ার রাস্তা নেই।“ সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মোবাইলের চার্জও কমে এসেছে। ফিরে এলাম ওই ঘরটায়। বসে ভাবছি কি করা যায়। হঠাৎ দেখি দরজা খোলার শব্দ।

সশব্দে খুলে গেল দরজাটা। সঙ্গে একরাশ দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া। চমকে তাকিয়ে দেখি ওই লোকটা দাঁড়িয়ে। হাতে দুটো চায়ের গ্লাস। আমার মেজাজ গরম হয়ে গেছে ওকে দেখে। কোন আক্কেল নেই। আমাদের এখানে বসিয়ে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে গেছে। সেটা ওকে জিগ্যেস করলাম বেশ রাগের মাথায়।

ও এবারও মুখে কোন উত্তর দিল না। শুধু ইশারায় বোঝাল আমাদের জন্য চা আনতে গিয়েছিল। ততক্ষণে আমাদের সন্দেহ আর ভয় দুটোই বেশ দানা বেধেছে। আর অপেক্ষা না করে, দরজা দিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরলাম। মনে হল যেন, ওর সঙ্গে একটু ধাক্কা লাগল আর একটা গ্লাস মাটিতে পরে গেল। কিন্তু আর ওইসব দেখার সময় নেই। পিঠে ব্যাগ-প্যাক। তার ওপর চারদিক অন্ধকার। দৌড়তে গিয়ে নির্ভীকদা একবার হোঁচট খেল। মাটিতে পড়ল। উঠে পড়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে আবার এগোলাম।

আর কয়েক পা এগিয়ে দেখি, দুটো টর্চের আলো। আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে মনে হল। এরা আবার কারা? আমরা হাঁটার গতি কমালাম। প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছি। আলোটা আরও এগিয়ে আসতে গলা শুনতে পেলাম। পরিচিত স্বর। সতিন্দারের। বলল “আমি সতিন্দার। আপনারা কোথায় চলে গিয়েছিলেন?” ওর সঙ্গে আর একজন লোক রয়েছে। বলল সে এই হোটেলের একজন কর্মচারী। মুখ দেখে মনে হল তারও একই প্রশ্ন। সতিন্দার আবার বলল “আমরা তো অনেকক্ষণ ধরে আপনাদের খুঁজছি।“ বললাম “কিছু একটা ভুল হয়েছিল। চল হোটেলে গিয়ে বলছি।“ হোটেলের নতুন ব্লকটা, যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, দেখলাম আরও কয়েকটা সিঁড়ি ওপরে উঠে। মোটামুটি ভালই। এইরকম জায়গায় এই যথেষ্ট। তাছাড়া দেখে মনে হল নতুন তৈরি করা হয়েছে।

………

প্রায় মিনিট কুড়ি পরে এই নতুন ব্লকের ডাইনিং রুমে বসে আমরা বলছিলাম নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা।

হোটেলে সেদিন আমরা দুজনই গেস্ট। ফলে সেইরকম কোন ব্যস্ততা নেই। হোটেলের দুজন কর্মচারী আর আমাদের ড্রাইভার সতিন্দার রয়েছে।

আমাদের কথা শোনার পর, দুজন কর্মচারীকে দেখলাম বেশ চুপ হয়ে যেতে। প্রথমে কারণটা বুঝতে পারিনি। তারপর অনেক অনুরোধ করতে ওরা মুখ খুলল।

গত বছর জুলাই-র প্রথম দিকে এখানে মেঘ-ভাঙ্গা বৃষ্টি হয়। ইংরেজিতে যাকে বলে cloud-burst. যার জন্য অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তো হয়ই আর তার সঙ্গে বহু লোকের প্রাণহানিও হয়েছিল। সেই সময় একটা পাহাড়ি নদী, যেটা এই হোটেলের পাশ দিয়ে বইছে, সেটা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তখন হোটেলটা ছিল খানিকটা নিচে, যেখানে আমরা ভুলবশত গিয়েছিলাম। আর নদীটাও ছিল হোটেলের অনেক কাছে। যেটা আমাদেরও মনে হচ্ছিল। একদিন হঠাৎ জল খুব বেড়ে যায় নদীতে। আর দুধার ভেসে যায় ওই জলে। এমন প্রবল ছিল ওই জলের বেগ, হোটেলের একটা অংশ ভেঙে চলে যায় নদীতে। ভাগ্যবশত হোটেলে তখন কোন টুরিস্ট ছিল না। কিন্তু হোটেলের একমাত্র স্টাফ, যে সেদিন রাতে ওখানে ছিল, তাকে আর পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিক ভাবেই সকলের ধারনা সে মারা যায়।

আমরা আর কোন কথা বলতে পারলাম না। তাহলে কি তার সঙ্গেই আজ আমাদের দেখা হয়েছিল?

আমি আর নির্ভীকদা পরস্পরের দিকে দেখলাম। এর উত্তর আমাদের কাছে নেই। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। নীরবতা ভাঙলাম আমি। হোটেলের লোক দুটিকে জিগ্যেস করলাম “এইরকম ঘটনা আগে কারুর কাছে শুনেছ?” “হ্যাঁ শুনেছি। তবে ঠিক আপনাদের মত নয়। তারা সন্ধেবেলা একটু বাইরে বেরিয়েছিল। তখন ওর সঙ্গে দেখা হয়।“






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮