• শর্মিষ্ঠা বসু

ওরা উদ্দাম

[১]

ফোন এর পর্দার ওপরে তোজোর স্কুলের নম্বরটা ভেসে উঠতেই চমকে উঠলো তনয়া ! “ মিসেস সান্যাল , ওপাশের কণ্ঠস্বর প্রাণহীন , ঠান্ডা ! আমি হোলি হার্ট স্কুল থেকে বলছি ! প্রিন্সিপাল মিসেস ভিন্সেন্ট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন ! আপনি এখুনি স্কুলে চলে আসুন ! রক্তশূন্য হয়ে গেছে তনয়ার মুখ ! এটা যে কোনো দুঃসংবাদের সংকেত সেটা অনুমান করতে অসুবিধে হচ্ছেনা আর ! স্কুল থেকে তো নালিশ আসছিলো ক্রমাগত ! তোজো ক্লাসের বাচ্চাদের টিফিন খেয়ে নেয় , তোজো ক্লাসে না বসে স্কুলময় দৌড়ে বেড়ায় , তোজো ক্লাসে পড়া পারেনা , তোজো পরীক্ষার খাতায় না লিখে অর্থহীন আঁকিবুঁকি কাটে ক্রমাগত !

কিন্তু এবারের ঘটনা আরো ভয়ঙ্কর কিছু নিশ্চই ! রজতাভ এখন অফিসে , তাই একাই যেতে হবে তাকে !বাড়িতে কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়েছে তনয়া ! রাস্তায় বেরিয়ে ট্যাক্সি ডেকে নিয়েছে একটা ! বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে কপালে ! শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে এখন! একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক পাক খাচ্ছে ! দমবন্ধ হয়ে আসছে যেন !

বিধায়ক অনিমেষ সান্যালের পুত্রবধূ বলে অনেক জায়গায় বাড়তি একটা খাতির পাওয়া যায় ! এতদিনে এতেই বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে তনয়া ! তোজো এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে মিসেস ভিন্সেন্ট নিজের ঘরে তনয়াকে ডেকে নিয়ে গেছেন , কথা বলেছেন , খাতির করেছেন যথেষ্ট ! তবু আজ যে দিনটা অন্যরকম সেটা ঘরে ঢুকেই বুঝতে পারছিলো সে ! বেশ থমথমে একটা পরিবেশ ! “

“মিসেস সান্যাল, আপনাকে একটা দরকারে ডেকে পাঠালাম ! “ নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিলো তনয়া ! “ অনেকদিন ধরেই কমপ্লেইন আসছিলো , আমি খুব একটা আমলদিইনি , আমি আসলে ভেবেছিলাম বাচ্চারা একটু আধটু দুষ্টুমি করেই থাকে ! কিন্তু আজ যেটা হলো সেটা .... তমোঘ্ন ওর ক্লাসের একটি ছেলেকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে !

ফর্চুনেটলি , আমাদের একজন টিচার দেখতে পেয়েছেন নাহলে কি যে হতো “! কাল্পনিক দৃশ্যের কথা ভেবে নিজেই যেন শিউরে উঠলেন মিসেস ভিন্সেন্ট ! তারপরে একটু থেমে বললেন “ মিসেস সান্যাল,আই অ্যাম সরি টু সে , তমোঘ্ন ইস এ স্পেশাল চাইল্ড ! এই স্কুল ওর জন্য নয় ! হি নীডস এ স্কুল ফর স্পেশাল চিলড্রেন ! আমি জানি আপনাদের পরিবারের একটা বিশেষ পরিচিতি আছে সমাজে , তাই আপনাকে আর কষ্ট করতে হবেনা ! ওর ট্রান্সফার সার্টিফিকেট বরং আমি বাড়িতে পাঠিয়ে দেব ! কথা শেষ হলে টেবিলে রাখা জলের গ্লাস থেকে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেলেন মিসেস ভিন্সেন্ট !

চোখের সামনে আঁধার ঘনাচ্ছে তনয়ার ! একটা ভয়ঙ্কর সত্যকে যেন এতদিন চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল , এক ঝটকায় সেই সত্যটা যেন নির্মমভাবে এসে দাঁড়িয়েছে চোখের সামনে ! নির্মম , নিষ্ঠুর ,ভয়ঙ্কর এক সত্য !

বাড়ি ফিরে তোজোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তনয়া ! অন্ধ ক্রোধে , আক্রোশে উন্মাদ এখন ! একটা ঝড়যেন নিমেষে শেষ করে দিয়ে গেছে সবকিছু !“ বল , বল কেন করলি এমন বল? পাগলের মতন মারছে তোজোকে !

চোখ দিয়ে অবিরাম জল গড়াচ্ছে তোজোর !“ আমি কিকরবো , শঙ্খ আমার চোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলো যে ! আমি তো না দেখতে পেয়ে ধাক্কা দিয়েছি আর দেয়ালের ওপরে পড়ে ওর মাথা ফেটে গেছে ! আমি তো মারিনি ! “ ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো তোজো !

মার থামিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইলো তনয়া ! কোনো কিছু বোঝার শক্তি লোপ পেয়েছে এই মুহূর্তে !

একটা সাত বছরের ছেলের স্কুলজীবন শুরু না হতে হতেই শেষ হয়ে গেলো ! বিধায়ক অনিমেষ সান্যালের নাতি, এক্সিকিউটিভ রজতাভ সান্যালের একমাত্র ছেলে এখন স্কুল থেকে বিতাড়িত ! একটু একটু করেনিঃস্ব হচ্ছিলো তনয়া ! কি দ্রুত শুন্য হয়ে গেলো জীবনটা !

কফির কাপটা ঠকাস করে টেবিলএর ওপরে রাখলো রজতাভ ! রাগে গনগন করছে মুখ!!কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললো , “ কথা বলে এলাম । “ মানে ? পাল্টা প্রশ্ন করলো তনয়া ! “ মানে আর কিছু নয় , তোমার ছেলে আর পাঁচটা ছেলের মতন স্বাভাবিক নয় ! আমি ওর কেস হিস্ট্রিটানিয়ে সাইকিয়াট্রিসস্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি ! মনে হয় ইটস এ কেস অফ অ্যটেনশন ডেফিসিট হাইপারএকটিভিটি ডিসর্ডার ! তুমি তোজোকে নিয়ে কাল চলে যাবে ! সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় ডক্টর সামন্তর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ! মুখ নামিয়ে চুপ করে থাকে তনয়া ! বোবা কান্নাটাগিলে ফেলার চেষ্টা করছে প্রাণপন ! ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো রজতাভ !

দৃষ্টিতে একরাশ ঘৃণা , হতাশা ! সবটাই যেন ছুড়ে দিয়ে গেলো তনয়াকে ! ভাবলেশহীন মুখে পাশে রাখা মোবাইলের বোতাম টিপল তনয়া ! ” বাবা , আমি তানি”! মনের পুঞ্জীভূত মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরছে অঝোরধারায় !

বিছানায় শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে তোজো ! তনয়া আর ডাকলো না তোজোকে! তোজো জেগে থাকা মানেই তো অশান্তি ! বাড়িময় দৌড়ে বেড়াবে , গোছানো জিনিসপত্র অগোছালো করবে ,হয়তো বা ভাঙবে কোনোকিছু , বায়না করবে একটানা , বকুনি দিলে তারস্বরে চিৎকার জুড়বে ! আজকাল কেমন সিটিয়ে থাকে তনয়া ! তোজোর মতন ছেলের মা হওয়া যে লজ্জার , অপরাধের সেকথা হাবেভাবে বুঝিয়ে দেয় এ বাড়ির সবাই ! ইঙ্গিতটা দিনে দিনে এতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে সে !

কখনো দরজা বন্ধ করে তোজোকে নিয়ে বসে থাকে নিজের ঘরে ! তোজো দাপিয়ে বেড়ায় ঘরের মধ্যে , বায়না করে বাইরে যাওয়ার জন্য, তবু বেরোতে দেয়না তনয়া ! নিষ্ফল আক্রোশে খেলনা টেনে নেয় তোজো ! ঠুকেঠুকে ভাঙে সেগুলোকে ! স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তনয়া !

মেঘ জমেছে আকাশে ! বাইরে এখন ঝোড়ো হাওয়ার দাপট ! দক্ষিণের জানালাটা বন্ধ করে দিলো তনয়া ! যন্ত্রনায় ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে ভেতরটা ! জল গড়াচ্ছে দুচোখ দিয়ে !

“ইউজলেস , শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টটা মিস্ করে গেলে !” রাগে জ্বলছে রজতাভর দুচোখ ! “ “ “আমি ইচ্ছে করে যাইনি”, খুব ধীরে ধীরে কথা বলে তনয়া ! “ মানে ? ফুঁসে উঠেছে রজতাভ ! “ কাল বাবার কাছে চলে যাচ্ছি হিজলীডাঙ্গায় তোজোকে নিয়ে !”’একটু দম নেয়তনয়া ! কপালে জমে

ওঠা ঘাম মোছে হাত দিয়ে ! আর ভয় করছেনা এখন ! একটা নিয়মভঙ্গের খেলায় মেতে উঠেছে যেন !

“ হিজলীডাঙ্গা , মাই ফুট ,! রুদ্ধ রোষে ফুঁসে উঠেছে রজতাভ ! “ কি আছে হিজলীডাঙ্গায় ? কি শিখবে তোমার ছেলে ওখানে গিয়ে ? ত্যাগ , মহানুভবতা , দেয়ালে জাতির জনকের ছবি লাগানো অফিসে বসে কলম পেশা ? হাহা করে হাসে রজতাভ ! নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে তনয়া ! কান , মাথা ঝাঁঝাঁ করছে এখন ! আজ ডিনার সেরে ফিরেছে রজতাভ ! এসব ডিনার তো ছাইপাঁশগেলার আদর্শ পরিবেশ ! আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি ! আলকোহল এর প্রভাব এখন ঘাঁটি গেড়েছে রজতাভর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে ! বল্গাহীন , লাগামহীন কথার স্রোতে রক্তাক্ত হয়েযাচ্ছে তনয়ার ভেতরটা ! চুপ করে তাকিয়ে থাকে তনয়া ! বিশৃঙ্খল মাতালের প্রলাপ শুনে যায় একভাবে !

রাতের অন্ধকারে দেওয়ালে টাঙানো সমুদ্রের ছবিটা একমনে দেখে তনয়া ! অদ্ভুত শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে পৃথিবী !দুচোখ ভারী হয়ে আসে তার ! বিছানায় মেলে দেয় ক্লান্ত শরীর !

সবুজের ঢেউ খেলানো মাঠ আর কচুরিপানা ভরা পুকুরের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তনয়া ! আজ খুব ভোরে উঠেই তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিয়েছে সবকিছু ! তৈরী হয়ে গেছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ! তারপর ঘুমন্ত তোজোকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ির বাইরে ! গোটা বাড়িতে সবাই ঘুমোচ্ছে তখনও ! ট্রেনে বসে অস্বস্তি হচ্ছিলো ওর ! দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে লোকাল ট্রেনের দমবন্ধ ভিড় বিশ্রী লাগছে ভীষণ !

ট্রেন থেকে নেমে শ্বাস নিলো তনয়া ! ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে এখনো ! তবু কোথাও হালকা বোধ হচ্ছে যেন ! ভয় নেই , আতঙ্ক নেই, অনাবিল মুক্তি !

মৃদুমন্দ গতিতে চলমান রিকশায় বসে থাকে তনয়া ! চোখের সামনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আমবাগান , রথতলা , পদ্মদীঘি ! পুবের আকাশে এখন রঙের ছটা ! ঝকঝকে সুন্দর একটা দিন !

তোজোর আচরণের গ্লানি , তোজোর অসাফল্যের লজ্জা ধীরে ধীরে বোঝা হয়ে উঠছিলো পরিবারের সবার কাছে ! সান্যাল পরিবারের খ্যাতি আর সাফল্যের মাঝে যেন কলংকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো তোজোর আচরণ , অকৃতকার্যতা ! মাঝে মাঝে ঘুমন্ত তোজোর দিকে তাকিয়েথাকতো তনয়া! সত্যি কি তোজো সুস্থ নয়? স্বাভাবিক নয় ? নাহ্ , কোথাও ভুল হচ্ছে যেন !

[২]

হিজলীডাঙ্গায় আসার পরে একমাস কেটে গেলো প্রায় ! এই একমাসে একবার ফোন করেছে রজতাভ ! নেহাতই দায়সারা কথা বলে রেখে দিয়েছে ফোন ! জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছে মেসেজ পাঠিয়ে ! নিছক নিয়মরক্ষা ! চুপ করে বসে ছিল তনয়া ! স্মৃতি ঘাঁটছে একমনে ! কিঅদ্ভুতভাবে বদলে গেলো জীবনটা ! চেনা মুখগুলো দূরে সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে ! অথচ তনয়া ভাবতো রজতাভ ওকে ভালোবাসে ! সত্যি কি ভালোবাসতো রজতাভ? তবে কি সম্পর্কের বুনিয়াদটা এতটাই ঠুনকো নাকি ভীত নড়ে গেছে দূরত্বের কারণে ! অথচ তনয়া চেষ্টা করেছেনিজেকে রজতাভর যোগ্য করে তোলার ! কেউ যাতে আর না বলতে পারে হিজলীডাঙ্গার তনয়া নয় , রজতাভ সান্যালএর স্ত্রী তনয়া সান্যাল !

বদলটা তনয়া চায়নি তবু বদলাতে হয়েছে ! এ বাড়িতে তনয়ার কথাবার্তা , চালচলন নিয়ে যে আলোচনা হতো তা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ঠেকলেও মোটেই তা নয় ! মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে তনয়াকে নিয়ে আলোচনার আড়ালের ইঙ্গিতগুলো সাপের দাঁতের আড়ালে বিষের থলির মতোই বিষাক্ত ! তবু মেনে নিয়েছিল তনয়া ! গড়ে নিয়েছিল নিজেকে ওদের মতো করে ! কর্পোরেট দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়া মানুষটার জগতে ক্লান্ত লাগতো কখনো ! কিন্তু সোনার খাঁচার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপের মধ্যে থাকার একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আছে ! তাই হঠাৎ করে খাঁচা ভাঙার কথাস্বপ্নেও ভাবেনি কখনো ! আজ হঠাৎ ঝড়ে পৃথিবীটা বদলে গেছে এক লহমায় ! হতাশার স্রোতে বিধ্বস্ত লাগছে এখন !

“ তানি, মনোতোষ ঘরে এসে হাত রেখেছেন তনয়ার মাথায় ! চঞ্চল , প্রাণবন্ত মেয়েটাকে আজকাল অচেনা মনে হয়ে বড় ! মায়ায় টলটল করে মনোতোষের মন ! মনোতোষের কাঁধে মাথা রেখেছে তনয়া ! উচ্ছাসহীন, আনন্দহীন , বিষাদমাখা মুখ ! পাশের ঘর থেকে তোজোর পড়ারআওয়াজ ভেসে আসছে এখন ! বাড়ির পাশের ডোবাটায় কতগুলো হাঁস সাঁতার কাটছে ! ঝাপসা হয়ে আসে তনয়ার দৃষ্টি ! বড় মেঘাছন্ন আজ মনের আকাশ !

“ আমি পারবো না , স্কুলে পারতাম না আমি , মিস আমায় কত বকতো , পানিশমেন্ট দিতো ! “ বাড়িময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে তোজো ! মনোতোষ একটা হলুদ কাগজ লাগিয়েছেন দেওয়ালে , সবুজ রং দিয়ে তাতে লেখা “ গুডবাই ফেইলিওর , ওয়েলকাম সাকসেস “! অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে সাত বছরের তোজো ! মানে বোঝার চেষ্টা করে ! বাবার পাশে এসে দাঁড়ায় তনয়া , কি শান্ত , সৌম্য ,সমাহিত এক মানুষ ! ক্ষণপূর্বের বিষন্নতা উধাও হয়ে যায় এক নিমেষে! বিষাদমোড়া অন্ধকার পৃথিবীতে এক মুহূর্তে যেন হাজার তারার আলো জ্বলে উঠেছে এখন !

“ভুল করতেই হয় , ভুল না করলে ঠিক করার মজাটাই নেই যে ! ভুলে ভরা অঙ্ক খাতাটা টেনে নিলেন মনোতোষ ! তারপর খাতার ওপরে বড় বড় অক্ষরে লিখলেন “ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ক ! “ ঘষে ঘষে ভুল অঙ্ক মুছতে যাচ্ছিলো তোজো ! খাতা টেনে নিলেন মনোতোষ তারপর বললেন “ মুছবে না দাভাই , ভুল মুছলে মন থেকেই মুছে যাবে সব ! আমরা বরং নতুন করে অঙ্কগুলো করি !

এই তিনমাসে অনেককিছু শিখে গেছে তোজো ! পিঁপড়ের ডিম আর সরষের খোল দিয়ে কিকরে মাছের চারা বানাতে হয় তোজো জানে , কাচের গুঁড়ো আর আঠা মেশানো মসলায় ঘুড়িতে মাঞ্জা দিতেও শিখে গেছে সে ! অযত্নে ফুটে থাকা বহু ফুলপাতার নাম মুখস্হ তার ! তোজোএখন ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙ হওয়ার গল্প জানে, শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার প্রক্রিয়াও তার অজানা নয় ! তোজো এখন ছবি আঁকে আপনমনে , বই পডে মন দিয়ে ! ওর অনাগ্রহী চোখে এখন আগ্রহের দৃষ্টি! নিরুৎসাহ বদলে গেছে অদম্য কৌতূহলে ! অলসতার জায়গা নিয়েছে উদ্দীপনা !

ভোরের জমে থাকা কুয়াশা মেখে বাইরের বাগানে দাঁড়িয়ে আছে তনয়া ! মনের মধ্যে শুধু অতীতের আসা যাওয়া ! কি অদ্ভুতভাবে রজতাভর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলো ওর ! মাতৃহীনা একমাত্র কন্যার বিয়ের জন্য উঠেপডে লেগেছিলেন মনোতোষ ! গ্রাজুয়েশনের পরে তাই বিয়েটা হয়েই গেলো, যেমন করে হয় আর কি ! অথচ কোথাও মেলেনা দুটো পরিবারের ! প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিল তনয়া , কাছে টানতে চেয়েছিলো সবাইকে কিন্তু এবাড়ির সবাই কেমন যেন নিজস্ব বৃত্তে সন্তুষ্ট , একটা অধরা বলয়ের মধ্যে আটকে রয়েছে সবাই ! কেমন করে যেন ওরা বুঝিয়ে দিতো যে তনয়া বহিরাগত ! হাবেভাবে তাচ্ছিল্য থাকতো , অবজ্ঞা থাকতো ! এমনকি মনোতোষ নিজেও কেমন কুন্ঠিত হয়ে থাকতেন এদের বাড়িতে এসে ! এরা ভাবখানা এমন , করত , মেয়েকে দেখতে এসেছো দেখা করো , কথা বলো , চা মিষ্টি খাও , চলে যাও ! এর থেকে বেশি ভদ্রতা বা সৌজন্যের আশা রেখোনা ! একটা ক্লাস ডিফারেন্স আছে, অনেক চেষ্টা করলেও সেটা অতিক্রম করা যায়না !

অথচ তনয়া অসুখী একথা বলতে পারবেনা কখনো ! রজতাভ কিছুটা আত্মসুখপরায়ণ , কিছুটা আত্মসুখকেন্দ্রিক কিন্তু বিবেচনাহীন একথা বলা যায়না ! তাই সত্যি হয়তো সুখে ডুবে ছিল তনয়া ! বিলাস বৈভবের সুখে ! মনোতোষও খুশি ছিলেন তাই ! মেয়ে সুখে আছে এর থেকেআনন্দের কথা আর কি হতে পারে !

ঘুম থেকে উঠে পড়েছে তোজো ! ঘরের থেকে ভেসে আসছে ওর গলার আওয়াজ ! ঘুমের জড়তা মাখা পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো তনয়া ! মনে এখন বৃষ্টির মুষলধারা !

[৩]

লং ড্রাইভে যাওয়ার অভ্যেসটা রজতাভর অনেকদিনের !তবু কোথাও একটা উত্তেজনার চোরাস্রোত টের পাচ্ছিলো আজকে ! ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই বেরিয়ে পড়েছে আজ, পৌঁছে গেছে হিজলীডাঙ্গার কাছাকাছি ! এখন অনেক রঙের খেলা চলছে আকাশ জুড়ে ! ঝলমল করছে সূর্য !

হঠাৎ কেন যে আজ হিজলীডাঙ্গায় চলে এলো রজতাভ নিজেই জানেনা ! এই তিনটে মাস যেন একটা অনাবশ্যক অস্তিত্ব বয়ে বেড়াচ্ছিল সে ! সব সাফল্য আর খ্যাতির মাঝে এই বর্ণহীন অধ্যায় কাঁটার মতন বিঁধছিলো তাকে ! ভুলবোঝাবুঝির জেরে তনয়ার সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরী হয়েছিল ঠিকই কিন্তু মন থেকে তো মুছে যায়নি কিছুই ! কত নির্ঘুম রাত্রিতে নাড়াচাড়া করেছে ফেলে আসা দিনগুলো , রোমন্থন করেছে মধুর অতীত !

ঘড়ির মোড় ছাড়িয়ে গলির দিকে গাড়িটা ঘুরিয়ে নিলো রজতাভ ! বিয়ের পরে একবারই এসেছিলো এখানে ! একরাত থেকে নিয়মরক্ষা করে গেছে ! এরাও আর জোর করেননি কখনো জামাইয়ের অসুবিধের কথা ভেবে ! হলুদ রঙের একতলা বাড়িটার সামনে গাড়ি দাঁড় করালো রজতাভ ! গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকিয়ে দেখলো কিছুক্ষন তারপরে এগিয়ে গেলো !

“ বাবা “, বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে তোজো, নিষ্পাপ , সরল , সুন্দর মুখ ! কি মধুর একটা অনুভূতি ! শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায়না ! মনখারাপের পোকাটা নিমেষে উধাও এখন !

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তনয়া ! কি অদ্ভুত ভালোবাসায় আবার জারিত হচ্ছে মন ! কি ভীষণ ইচ্ছে করছে মানুষটাকে আবার আঁকড়ে ধরতে !

“ ভেতরে এস”, এগিয়ে গেছেন মনোতোষ ! কিঞ্চিৎ সম্ভ্রম ফুটে উঠেছে তার অভিব্যক্তিতে ! ঘরে ঢুকে মনোতোষকে প্রণাম করলো রজতাভ, মুখে প্রশান্তির হাসি !

চামচ দিয়ে কেটে একটুকরো রসগোল্লা মুখে দিলো রজতাভ ! এদিকের মিষ্টি বেশ ভালো , কলকাতার থেকে আলাদা !হিজলীডাঙ্গা থেকে ফেরার সময় অনেকবার মিষ্টি নিয়ে গেছে তনয়া , অনুরোধ করেছে খাওয়ার জন্য ! তবু ছুঁয়ে দেখেনি সে ! একটা অবজ্ঞা তো ছিলই ওদের রুচিবোধ , চালচলন নিয়ে !

চরম ঔদ্ধত্যও ছিল ব্যবহারে ! নীরব উপেক্ষার মধ্যে দিয়ে শ্রেণীগত ফারাকটা বুঝিয়ে দিতো ! ধনী আর মধ্যবিত্তের বন্ধুত্বটা যে কেবলমাত্র বাইরের প্রলেপ সেটাই ইঙ্গিত করতো বারবার ! আজ হঠাৎ এই বিশ্বাসের জগৎটাকে ঠুনকো মনে হচ্ছে যেন ! বড়ক্ষুদ্র লাগছে নিজেকে ! তোজোর দিকে চোখ ফেরায় রজতাভ।

একমনে ছবি আঁকছে তোজো ! সাদা খাতায় পেন্সিলের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা গ্রামের ছবিতে রং ভরছে আপনমনে ! রঙের ছোঁয়ায় সবুজ হচ্ছে গাছ , লাল সূর্য ঝলমল করছে আকাশে ! স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে রজতাভ ! কতবদলে গেছে তোজো ! এই তিনমাসে !

টেবিল এর ওপরে পড়ে থাকা ছবি আঁকার খাতাটা টেনে নেয় রজতাভ ! মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখে পেন্সিলের আঁচড়ে ফুটে ওঠা ঘর, বাড়ি, নৌকার সারি ! নিশ্চুপ ভাবনার গভীরে ডুব দিয়েছে এখন ! কোথায় ভুল ছিল সে ? তোজোকে ভালো করার কোনো ত্রুটি রাখেনি কোথাও ! তবু সাঁতারেরক্লাসে , ক্রিকেট কোচিঙে , ছবি আঁকার ক্লাসে , স্কুলে কোথাও মন দেয়নি তোজো ! একমুহূর্তের জন্য নয় ! আজ যেন কোনো এক অমৃত ওর সুপ্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলেছে ! পাশে বসে একমনে অঙ্ক কষছে তোজো ! কর গুনে সংখ্যা বসাচ্ছে একের পর এক ! সন্ধ্যা নেমেছে ! ঠান্ডা বাতাসের ঝাপ্টা লাগছে নাকেমুখে ! বাইরের আলো আঁধারি , আর নৈঃশব্দে আরাম লাগছে ভীষণ ! মনের ভেতরেও ঝড়ের তাণ্ডবটা অনেক স্তিমিত !

“ফ্লোরেন্সের রাস্তায় হাঁটছিলেন মাইকেল এঞ্জেলো ! রাস্তার পাশে অযত্নে পড়ে থাকা পাথরগুলো দেখে মনে হলো কি অপূর্ব মূর্তি সৃষ্টি করা সম্ভব এই পাথরের থেকে ! “ গলার আওয়াজ শুনে চমকে তাকালো রজতাভ , মনোতোষ এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে ! চায়ের কাপে চুমুক দিলেন মনোতোষ তারপর বললেন প্রতিটা পাথরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির বীজ আর সব শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনন্ত সম্ভাবনা ! আমি আমার দাভাই এর মধ্যে একটা সম্ভাবনা দেখেছিলাম শুধু ! আই রিফিউসড টু ভিউ হিম অ্যাজ আনটিচেবল্”!

রজতাভ তাকায় মনোতোষের দিকে ! এতো বছরে সত্যি মানুষটাকে চিনতে পারেনি সে ! আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয় মন ! সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে নিয়ে অশ্রদ্ধার অন্ত ছিলনা তার অথচ সেই মানুষটাই এমন করে বদলে দিলো তোজোকে ! কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে যায় ওর ! মনোতোষ এসে হাত রাখেন ওর মাথায় তারপর বলেন , “ গাছ বড় হতে গেলে শুধু সার দিলে হয়না ! রোদ লাগে , আলো লাগে, হাওয়া লাগে , জল লাগে ।আমি কিছুই করিনি ,দাভাই এর ভেতরে দুমড়ে যাওয়া বিশ্বাস আর ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে তুলেছি শুধু !

রাতের অন্ধকারে রজতাভর বুকে মাথা রেখেছে তনয়া ! বহুদিনের পুঞ্জীভূত কান্না এখন বেরিয়ে আসছে ঝর্ণা হয়ে ! যন্ত্রনা , গ্লানি , উপেক্ষা ধুয়ে যাচ্ছে চোখের জলে ! তনয়ার পিঠ ভাসানো চুলে হাত বোলায় রজতাভ ! কালো ঘন অন্ধকারে দুরন্ত হতে চায় ইচ্ছেগুলো ! বাইরে ঝিঁঝিঁপোকারা ডেকে যায় অবিরাম ! আকাশের একটুকরো চাঁদ আর কালো ঘন অন্ধকার সব এক হয়ে গেলো এখন ! বিছানার একপাশে শুয়ে আছে তোজো , তলিয়ে গেছে আরামের ঘুমে !

ঝকঝকে সুন্দর একটা সকালে হাত ধরে হাঁটছে ওরা তিনজন ! তনয়া , রজতাভ আর তোজো ! অনেকদিন পরে রোদ্দুর মাখছে একসাথে ! ওদের চোখে এখন ঘরে ফেরার আনন্দ ! সংকট আসবে , বিপর্যয় আসবে তবু থামবেনা কেউ ! সংকটের মধ্যেই একটা রূপকথার খোঁজ পেয়েছে ওরা ! অন্তহীন বিষাদের মধ্যে থেকে খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ! অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা !এভাবেই পথ চলতে চলতে বড় হবে তোজো ! তৈরী করবে নিজস্ব একটা পথ ! জিতে যাবে জীবনের খেলায় ! শুধু সময়ের অপেক্ষা !

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮