• শুভাশিস ভট্টাচার্য

নামদেও ধাসাল- দলিত মুক্তি সংগ্রামের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর


“অতটা নিষ্কলঙ্ক সাজা উচিত নয় মানুষের

বয়ে চলা উচিত কিছু পাপ

রেখে দেয়া উচিত দু একটা দাগ জামায়” - ( জামা বিষয়ে অনুমান : নামদেও ধাসাল)


মহারাষ্ট্রকে বলা হয় দলিত সাহিত্যের আঁতুড়ঘর । বিশ শতকের মাঝামাঝি, সমাজে ‘অস্পৃশ্য’ বলে চিহ্নিত একদল মারাঠি লেখক তাদের অস্পৃশ্যতার অভিশাপে অভিশপ্ত জীবনের যন্ত্রণা থেকে, জন্ম দিলেন ভারতীয় দলিত সাহিত্যের। বাবা সাহেব আম্বেদকরের নেতৃত্বে অচ্ছুতদের সমানাধিকারের লড়াই শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। সময়ের সাথে, এই আন্দোলন না না রূপ নেয়। সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই থেকে শুরু করে ১৯৫৬ সালে হিন্দু জাতিভেদ প্রথা থেকে মুক্তির জন্য গণহারে বৌদ্ধ ধর্ম নেওয়া, দলিত সাহিত্যের জন্ম এসবই ছিল এই বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ।


মারাঠি দলিত সাহিত্য যাঁদের অবদানে বিশেষ সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কবি নিঃসন্দেহে নামদেও ধাসাল। সত্তর দশকের শুরুর দিকে, নামদেও ধাসালের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে সমাজের প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অনাহার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের নগ্ন বাস্তব, মারাঠি সাহিত্যের ঘুমের ঘোর কাটিয়ে, প্রকাশ্যে আনে আমাদের আত্মায় লেগে থাকা মানুষের দাসত্বের পাপের দাগ |


নামদেও ধাসালের জন্ম ১৯৪৯ সালে পুনের কাছে এক গ্রামে, মাহার সম্প্রদায়ে | মাহার সম্প্রদায় অস্পৃশ্যতার অভিশাপে অভিশপ্ত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার । গ্রামের হিন্দু সমাজের বর্ণবৈষম্য তথা অস্পৃশ্যতার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতায় শুরু হয় তাঁর জীবন । গ্রামের সীমানার বাইরে, অন্যান্য অচ্ছুত সম্প্রদায়ের সাথে, ভয়ানক দারিদ্রের মধ্যে, বেঁচে থাকার চেষ্টা ব্যর্থ হলে, তাঁর বাবা, পরিবারের সাথে চলে আসেন মুম্বাইয়ের ধোরচালের বস্তিতে, এক মুসলিম কসাই এর সহকারী হিসেবে কাজ করতে | দৈনিক মজুরি ও গরুর মাংসের বাতিল অংশে শুরু হয় মুম্বাইয়ের জীবন | নামদেওর বয়স তখন ছয় অথবা সাত |


নামদেও ধাসালের কাব্যিক চেতনার জন্ম মুম্বাইয়ের পেটের ভিতর, ধোরচাল এবং তার সংলগ্ন বেশ্যা-পাড়া গোলপিঠার আঁচলের তলায়, তার মল, মূত্র কাদাজলে | ওই নামেই তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন ‘গোলপিঠা’, প্রচলিত বুর্জোয়া সাহিত্যের তথাকথিত শ্লীলতার মুখোশ খুলে, দাঁড় করিয়ে দেয় আয়নার সামনে, নগ্ন, পর্দার আড়াল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে “ভাষার লজ্জা-স্থানে যৌনরোগের ক্ষত” | তাঁর কবিতার অনুপ্রেরণা বর্ণবৈষম্যের শিকার দলিত মানুষ | ধোরচালের বস্তির হিন্দু, মুসলিম, দলিত নির্বিশেষে সবার দুঃসহ জীবন | এই নিপীড়িত জীবন-ই চুইয়ে পড়ে তাঁর কবিতায় |


গোলপিঠা প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে | গোলপিঠার জন্য ১৯৭৪ সালে তিনি নেহেরু পুরস্কার পান |

তাঁর অন্যান্য প্রশংসিত কাব্য সমগ্র ‘গান্ডু বাগিচা’, ‘তুহি ইয়ত্তা কাঞ্চি’, ‘খেল’ , ‘য়া সত্তেত জীভ রামাত নাহি’, ‘মি মারলে সুর্যচ্যা রথাচে সাত ঘোড়ে’ | তিনি ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০০৪ সালে সাহিত্য একাডেমী লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারে ভূষিত হন |





নামদেও ধাসালের কবিতা দলিত স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র, এর বিপ্লবী মন বুঝতে হলে বুঝতে হবে ওই মানুষ গুলোকে, যে মানুষ গুলো ভারতীয় সমাজের শতাব্দীর নিপীড়ন সহ্য করে অকল্পনীয় ভাবে বেঁচে থাকে খিদের অন্ধকার রাজ্যে, যেখানে খিদের তীব্রতায় পেটের নাড়ি ভুঁড়ি শুকিয়ে যায়, যেখানে পুষ্টির ধারণা পুষ্টির মতই অনুপস্থিত | জীবন যেখানে সর্বদা আধিপত্য-বাদী সমাজের দাসত্ব মেনে নিয়ে পশুদের মতো বেঁচে থাকা | এই অর্থনৈতিক ও মানসিক জাহান্নামে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এই কথা গুলো শুধুই ফাঁকা শব্দ | মেথর, ঝাড়ুদার, ধাঙড়, মুচি, ডোম এবং অন্যান্য দলিতের জীবন, নামদেও ধাসালের তীব্র বিদ্রূপে “শিকলে বাঁধা কুকুরের মতো” যে -


“সময়ে সময়ে আর্তনাদ ও চিৎকার করে

যেটা তার সাংবিধানিক অধিকার”


তারপর -


“কোন এক বিদ্রোহী মুহূর্তে

অসহনীয় হয়ে ওঠে সবকিছু

শিকলে টান মেরে ভাঙ্গার চেষ্টা করে সে,

তখন তাকে গুলি করা হয়”


‘হিংসার গাছ’ কবিতায় প্রতিফলিত হয় বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বিষয়ে তাঁর পরিণত উপলব্ধি | এখানে শাসক, রাজনীতিবিদ, পুঁজিবাদী, আমলা ও সামন্তবাদী প্রভুদের তত্ত্বাবধানে তুলসী গাছের মতো সযত্নে লালিত হয় “হিংসার গাছ” - "মানুষের রক্তে” | অবশেষে হিংসার গাছের শিকড়ের সন্ধান পান নামদেও –


“অবশেষে তারা খুঁজে পায় সেই গাছের শিকড়

জমিদারের হাবেলিতে, রঙিন মহফিলে,

অবশেষে তারা খুঁজে পায় সেই গাছের শিকড়

পুঁজিবাদীর পুঁজির বাক্সে,

অবশেষে তারা খুঁজে পায় সেই গাছের শিকড়

সম্রাটের সিংহাসনের নীচে”


‘সনাতন দয়া’ কবিতায় তাঁর অভিযোগ সামন্তবাদী সমাজ বন্দী করে রেখেছে সভ্যতার সমস্ত আলো তাদের সিন্দুকে | এক পদদলিত জীবন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে দলিতের উপর সেখানে ফুটপাথেও জায়গা হয় না তার | খুদকুঁড়োও জোটে না পোড়া পেটের জ্বালা মেটাতে | “ওরা এত অসহায় করেছে আমদের ; যে মানুষ হতে ঘেন্না হয়”


তাঁর কবিতায় ভিড় করে আসে বেশ্যা, বেশ্যার দালাল, যৌন রোগ, মাতাল, সুদখোর, গ্যাংস্টার, মুজরা নর্তকী, দুর্নীতি-গ্রস্ত পুলিস, উপচে-পড়া নর্দমা, খিদের চিৎকার, মৃত্যুর হতাশা | এখানে -


“মেয়েরা শুধুই রং মাখা বেশ্যা

আর পুরুষ শুধুই মেয়েদের দালাল”


এখানে মেয়ে আর পুরুষের সম্পর্ক অনেকটা –


“কয়েকটা বেশ্যা,

কয়েকটা দালাল,

কয়েকটা দাঁতন-কাঠি,

ব্যবহারের পরে ছুড়ে ফেলে

নদীর পবিত্র জলে কুলকুচো”


এখানে -


“শতাব্দীর যৌন ক্ষত গায়ে

শুয়ে থাকে নিশাচর শজারু,

তোমাকে ছিন্ন ভিন্ন করে

কাঁটার তীক্ষ্ণ আঘাতে |

নাগরের অভিসারে সেজে ওঠে রাত,

জমে থাকা জখমে – ফুটে ওঠা ফুল |”



এখানে জীবন যেন নরক –


“এই নরক

এই ঘূর্ণাবর্ত

এই নোংরা যন্ত্রণা

এই ঘুঙ্গুর-পায়ের ক্রন্দন”


তাঁর কবিতায় পুরুষ শোষণের যৌন ক্রীতদাসী তাঁর মা যেন “কৃমি উৎপাদনের যন্ত্র” | হাজার হাজার বছরের অন্যায় অত্যাচার মেনে “বেঁচে থাকো কত অনায়াসে” | “বেঁচে থাকো কত অনায়াসে” – আপাত দৃষ্টিতে সরল অথচ প্রকৃত বিচারে জটিল একটি প্রস্তাব | এতে প্রছন্ন আছে জমে থাকা রাগ ও হতাশা – শুধুমাত্র মায়ের নীরবতার বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র দলিত সমাজের নীরবতার বিরুদ্ধে | তীব্র বিদ্রূপে বলতে চায় একজন দলিত নারীর অনায়াসে বেঁচে থাকার প্রস্তাব কতটা অবাস্তব |


মুখ বুজে মেনে নিতে নারাজ নামদেওর প্রশ্ন, তিক্ততার সাথে –


“কেন কেটে দিলেনা আমার গলা

তোমার নখের তীব্রতায়

যেদিন কেটেছিলে আমার নাড়ি”


নামদেও আশাবাদী কবি | ‘মানুষ’ কবিতায় নামদেও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা, সভ্যতার সব চিহ্ন, সব ঠাকুর দেবতা, সব ধর্মগ্রন্থ, সব মানুষকে, এমনকি নিজেকেও ধ্বংস করে তারপর এক শ্রেণীবিহীন নূতন সমাজের স্বপ্ন দেখেন | যেখানে -


“সবশেষে থাকবে শুধু মানুষ

গোলাম নয়, লুটেরা নয়,

সাদা অথবা কালো নয়,

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শূদ্র নয়,

রাজনৈতিক কোন দল নয়,

সম্পত্তির অধিকার নয়,

শুধু আকাশকে প্রপিতামহ

আর মাটিকে প্রপিতামহী মেনে

পারস্পরিক প্রেমের তাপে

নিজেদের সেঁকে নেওয়া"


নামদেও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, রেখে গেছেন তার কবিতার আয়না, যেখানে মানুষের দাসত্বের ইতিহাসে, আমরা বয়ে চলি আমাদের জন্ম- জন্মান্তরের পাপের দাগ অনন্তকাল ধরে


‘জামা বিষয়ে অনুমান’ (`গান্ডু বাগিচা’ : ১৯৮৬ )


পেরিয়ে যাই যন্ত্রণাময় অনন্ত রতি কাল

ছুঁড়ে ফেলি পরম্পরার প্রচলিত জঞ্জাল

ইভের লিঙ্গ পরিবর্তন করি

গর্ভবতী করি আদমকে |

অনুমানে পেরিয়ে যাই

জান্তব আশঙ্কা,

নরকের কাদাজল |

মানুষের দাসত্বের ইতিহাসে

দালালি করে চাঁদ,

জাবর কাটে

যৌন আবেগের ষাঁড়

অশরীরী খড়ের গাদায় |

একটা ডুবন্ত জাহাজে ভেসে

বদলে যাই বন্য মানুষে,

ভয় পাই আলো,

পুড়িয়ে দেয় জিভ

একটি সাধারণ লবঙ্গ-ও |

এইভাবেই স্বাধীনতা শাস্তি দেয় মানুষকে

অতটা নিষ্কলঙ্ক সাজা উচিত নয় মানুষের

বয়ে চলা উচিত কিছু পাপ

রেখে দেয়া উচিত দু একটা দাগ জামায় |




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮