• পার্থ সেন

বড়গল্প - নন্দনকানন





পূর্ব কথা -




এ অনেক দিন আগের কথা। দুটি যুবকের কাহিনী। তাঁদের একজন ব্রিটিশ, নাম টমাস ওয়ালকট, আর অন্যজন বাঙালী, নাম মৃগাঙ্কশেখর রায়চৌধুরী। কিন্তু সে গল্প বলতে গেলে আর একজন অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসে পড়েন। তিনি রাগে, বিদ্রোহে, অভিমানে ক্ষতবিক্ষত একটি মানুষ। তিনি ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আর ভগবতী দেবীর প্রথম পুত্র। পরাধীন ভারতে, সাহেবের অনুরূপ অভদ্রতার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের সমস্ত প্রচলিত মত ও প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বিধবাদের আবার বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি মেয়েদের সম্মান, শ্রদ্ধা দেখানোর কথা বলেছেন। অত বড় পন্ডিত হয়েও তিনি সন্ধ্যা আহ্নিক করেন না। সকল ধর্ম প্রভাব ছেড়ে তিনি ‘বর্ণপরিচয়’ লিখে নীতি কথা শেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি ইংরাজ সরকারের সঙ্গে লড়াই করে রবিবারে ছুটি চালু করেছেন। শোনা যায়, ইংরাজ সরকার ও নাকি তাঁকে যমের মতো ভয় করে। কিন্তু সেই ১৮৭০ এর পর থেকে তাঁর জীবনে পর পর অনেক গুলো ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল, সেগুলোর বেশীর ভাগই আনন্দের বা সুখের নয়। নিকট বন্ধুর মৃত্যু, নিকট বন্ধুবিচ্ছেদ, নিকট আত্মীয়বিচ্ছেদ, প্রিয় কন্যার বৈধব্য, শিক্ষিত সমাজের প্রতারনা, অর্থাভাব আর সবার ওপরে বাবা মার সঙ্গে গভীর মতান্তর। প্রতি মুহূর্তে তাঁকে বিদ্ধ করছেন তৎকালীন সমাজ, ইংরাজ সরকার, শাসকদের দল, জমিদার শ্রেনীর বাবু সম্প্রদায়, এমনকি যার ডাকে সাড়া দিয়ে দামোদর সাঁতরে পাড় হবার সেই অমর কথা ইতিহাসে রচনা করেছিলেন সেই জননী।


এদিকে সমাজের সঙ্গে আর লড়তে পারছিলেন না, নিকট মহলে বলেছেন “আমাদের দেশের লোক এত অসাড় ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না” একটু শান্তির জন্য চলে এলেন জামতাড়া ও মধুপুরের মাঝে ছোট্ট স্টেশন কর্মাটাড়ে, সেখানে মূলত সাঁওতালদের বাস। ঘরে বাইরে লড়তে লড়তে চেহারা ভেঙে যাচ্ছিল তাঁর। কিন্তু তার জন্য কলম বা কাজ কোনটাই কিন্তু থেমে থাকেনি।


বর্ণপরিচয়ের পরিমার্জিত সংস্করন লেখা হয়ে গেছে, ঠিক এরকম সময়ের কথা। এই ওয়ালকট আর মৃগাঙ্ক ছিলেন কলেজের ছাত্র, খুব বন্ধু। ১৮৭০ এর আশে পাশে বাঙালী ‘বাবু-কালচার’ যখন আস্তে আস্তে সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে, এঁরা দুজনেরও তাতে পূর্ণগ্রহন হয়ে যায়। পড়াশোনায় আগ্রহ কমতে শুরু করে এবং জীবনের অন্যান্য স্বাদ, আহ্লাদে এঁরা আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এবারে আসে এক মোক্ষম আঘাত, মধ্য কলকাতার কোন বনেদী বাড়িতে চুরির দায়ে ধরা পড়েন মৃগাঙ্ক। শ্বেতাঙ্গ হওয়ার সুবাদে ওয়ালকট কোনমতে বেঁচে যান। কিন্তু মৃগাঙ্কের জীবনে চরম দুর্যোগ নেমে আসে। বাবা তাঁকে ত্যাজ্য পুত্র ঘোষণা করেন, বাড়ির বাকীরা সকলে তাঁর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন, পুলিশের হাজতে আঠারো-উনিশ বছরের রঙিন জীবন এক মাসের মধ্যে ‘সাদা–কালো’ হয়ে যায়।


কিন্তু মৃগাঙ্ককে ভগবান আর একবার চান্স দিলেন। নিজের দায়িত্বে তাঁর জামানতের ব্যবস্থা করেন সেই মহানুভব করুনার সাগর। মৃগাঙ্কের পড়াশোনা আর একবার নতুন করে শুরু হয়। তবে কলকাতা থেকে বহুদূরে, কর্মাটাড়ে। সুশিক্ষায় মৃগাঙ্কের চিন্তা, শিক্ষা, মননের উন্নয়ন হয় আর তাতে ওয়ালকটও শুদ্ধ হলেন। কলকাতা ছাড়লেও ওয়ালকট ও মৃগাঙ্কের যোগাযোগ কিন্তু অটুট ছিল। বছর পাঁচ ছ্য় এই ভাবে চলল। বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষা শিখে ইতিমধ্যে মৃগাঙ্ক তখন সাহিত্যে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। কর্মাটাড় ছেড়ে কলকাতায় বসবাস শুরু করেছেন। আর ওয়ালকট ভারতের আইনী ব্যবস্থায় চাকরী করছেন। পাকাপাকি ভাবে চন্দননগরে বসবাস শুরু করেছেন। ওয়ালকট স্থির করলেন বিবাহ করবেন, যাকে করবেন তিনি একজন ষোল বছরের বিধবা বাঙালী রমণী। আর্মহাস্ট স্ট্রীটের বনেদী বাঙালী ঘরের মেয়ে, এগারো বছর বয়সে প্রথম বিবাহ, তারপর গত দুই বছর ধরে বিধবা। বিদ্যাসাগরের ভাবাদর্শে দীক্ষিত ওয়ালকট ও মৃগাঙ্ক দুজনেই। সুতরাং এতে আশ্চর্যের কিছু ছিল না।


বিবাহ সম্পন্ন হলো। বিদ্যাসাগর মশাই নিজে দাঁড়িয়ে সে বিবাহ দিলেন, নববধূ এবং ওয়ালকট চন্দননগরে ফিরে গেলেন। কিন্তু ওয়ালকটের সংসার করা হলো না। বিবাহের বারো দিন বাদে সমাজের গোঁড়াপন্থী কিছু মানুষের চক্রান্তে ওয়ালকটের নববধূ মারা গেলেন। পুলিশের রিপোর্টে বলা হল আত্মহত্যা, দুঃখে, শোকে ওয়ালকট মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। মাস তিনেক বাদে অসুস্থ ওয়ালকট চিরদিনের জন্য ভারতকে বিদায় জানিয়ে নিজের দেশে ফিরে গেলেন।


আর একটা কথা, ওয়ালকটের দেশ ছাড়ার পনের দিনের মধ্যে চন্দননগরে তিন উচ্চবর্গীয় হিন্দু একই ভাবে পর পর মারা গেলেন। প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁদের গলা টিপে হত্যা করা হয়, তারপর সিলিঙ্গে দেহটাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় যাতে মনে হয় এ খুন নয়, আত্মহত্যা। আরো আশ্চর্যের কথা, যে লোকে বলে এঁরা তিনজনেই নাকি চক্রান্ত করে ওয়ালকটের নববধুকে গলা টিপে হত্যা করেছিলেন আর সেই কেস সাজানো হয়েছিল আত্মহত্যা বলে। কিছুদিন পুলিশি তদন্ত চলে। ওয়ালকটের বন্ধু হিসেবে সন্দেহের তীর প্রথমে আসে মৃগাঙ্কশেখরের ওপর। কিন্তু তাঁর কথা আর জানা যায় না। কলকাতার পাট চুকিয়ে কেমন করে যেন জনসমুদ্রে হারিয়ে যান মৃগাঙ্কশেখর।




[১]


অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই দেখলাম, কুরিয়ার কোম্পানি দরজার ফাঁক দিয়ে ফেলে দিয়ে গেছে। প্রথমটায় দেখে খামে ভরা এক বিজ্ঞাপনের ক্যাম্পেন লেগেছিল। কিন্তু হাতে লেখা আমার নাম দেখেই বুঝতে পারি এই চিঠি কারুর পাঠানো। খুলে দেখি আমার ছোটদাদুর লেখা, গত পরশু জেনেছি যে আগের সপ্তাহে তিনি মারা গেছেন। সুতরাং এই চিঠি হয়তো তাঁর মারা যাওয়ার ঠিক আগেই লেখা।


২৪শে জুলাই, সপ্তগ্রাম, মুর্শিদাবাদ

স্নেহের পাপাই,

আশাকরি তোমাদের সব খবর ভালো। তোমাকে ফোনে ধরার বার কয়েক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পেলাম না। তাই ভাবলাম একটা চিঠি লেখা যাক! জানি তোমরা সবাই ব্যস্ত, কাজের আর সময়ের পেছনে লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মতো দৌড়চ্ছ। তাও যদি পারো তো একবার এই সপ্তগ্রামে ঘুরে যেও, অনেকদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ নেই, দেখা হলে ভালো লাগবে। জানি না আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে কিনা!

সত্যি বলতে তোমার দুই মামা ছাড়া নৃসিংহ নারায়নের বংশের বাকী উত্তরাধিকারদের চিনলেও কারুর সাথেই আমার আর কোন যোগাযোগ নেই। পৈতৃক ভিটে ছেড়ে যাবো না বলে এই সপ্তগ্রামের পোড়ো বাড়িকে এখনো আমি আঁকড়ে পড়ে আছি। কিন্তু সম্পত্তির কোন উইল বা দলিল কিছুই নেই। তাই এই সম্পত্তি কোনদিন বিক্রি হবে কিনা সেও আমি জানি না। তাছাড়া বাকিদের পরামর্শ না নিয়ে সে সব করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বয়সের ভারে আজ আর সেই শক্তি নেই। তাই এই দুশো বছরের পুরোনো বাড়িটা যখন আস্তে আস্তে ভেঙে মাটিতে মিশে যেতে দেখছি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। অর্থনৈতিক বা শারীরিক সামর্থ্য দুটোর ই খুব অভাব। তোমার মামাদের সঙ্গেও আমি এই নিয়ে কথা বলেছি, তাঁদের ও সামর্থ্য বেশী নয়। আর বাকীদের কথা না বলাই ভালো। সুতরাং সেই সব নিয়ে আর বেশী ভাবতে চাইনা।

কিন্তু ছোট থেকে তোমাকে আমি দেখেছি এবং তোমার অনুসন্ধিৎসা আমার ভালো লাগতো। তাছাড়া সম্পর্কে তুমি আমার দৌহিত্র, তোমার মা ছিল আমার খুব পছন্দের ভাইঝি, তাই তোমার চেয়ে কোন যোগ্য ব্যক্তি এই মুহূর্তে আমার মনে এলো না। তুমি খবরের কাগজে চাকরী করো, পড়াশোনা ভালোবাসো, আমি নিশ্চিত তুমি এই জিনিসের তাৎপর্য বুঝবে।

আমাদের ভেতর বাড়ির দোতলার যে ঘরে বসে আমি পড়াশোনা করি সেই ঘরে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটা হাতে আঁকা ছবি আছে। আমি নিশ্চিত ছেলেবেলায় সে ছবি তুমি দেখেছো। হয়তো তার কথা তোমার মনেও আছে। দিল্লীতে থাকাকালীন সেই ছবি আমি এঁকেছিলাম, অয়েল পেইন্টিং। প্রথম আঁকতে শিখে সেই মানুষটার ছবি এঁকেছিলাম যিনি আজও প্রতিদিন আমাকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে আসছেন। আমার অবর্তমানে এই বাড়ি হয়তো একদিন মাটিতে মিশে যাবে, কিন্তু সেই ছবিটার কোন অমর্যাদা হোক সেটা আমি চাই না। তাই সেই ছবিটা তোমার কাছে রেখো। বাড়িতে ধনসম্পদ কিছুই নেই, আছে বলতে কিছু বই, যদি পারো কিছু নিয়ে যেও। দুষ্প্রাপ্য অনেক বইও আছে, এখন তার বেশীর ভাগই এখন আর বাজারে পাবেনা, পারলে সেসব নিয়ে যেও। আর একটা জিনিসই চাইবো তোমার কাছে, যদি পারো দেশের জন্য কিছু কোরো। মনে রেখো কবিগুরুর সেই বাণী, “যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে/ পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে টানিছে পশ্চাতে”।

ভালো থেকো, আনন্দে থেকো, সুস্থ থেকো। কবে আসছো জানিও, কটা দিন এখানে কাটিয়ে যেও। যদি দেখা না হয়, তাহলে একটাই প্রার্থনা করব, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।


ছোট দাদু, সোমেশ্বর রায়চৌধুরী



সোমেশ্বর রায়চৌধুরী আমার মায়ের ছোটকাকা। মামারবাড়ির সবার সঙ্গেই আমি বরাবরই ছিলাম খুব ক্লোস। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের লম্বা ছুটি পড়লেই মায়ের সঙ্গে আমরা দুই ভাই রওনা দিতাম মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে। যদিও সপ্তগ্রাম মুর্শিদাবাদে আসে, আমরা কিন্তু রামপুরহাট হয়ে আসতাম। ট্রেন থেকে নেমে মিনিট পঁয়তাল্লিশ বাস করতে হত। যদিও ব্যাপার গুলো অত বুঝতাম না তবে এটা জানতাম আমার মামার বাড়ির দিকে নাকি এককালে বিরাট জমিদারী ছিল। জায়গাটাও ছিল বিশাল, ভগ্নাবশেষ হলেও বাইরের দালানটা দেখে বেশ বোঝা যেও এখানে আগে পুজোপার্বণ হতো। ভগ্নাবশেষ বলে আমাদের অবশ্য সেসব জায়গায় যাওয়া বারন ছিল, যদি সাপ খোপ বেড়িয়ে পড়ে! বাড়ি বলতে আমরা বুঝতাম ভেতর বাড়ি, সেটার অবস্থা অবশ্য খুব খারাপ ছিল না। আমার দাদামশাই এবং ওঁর ভায়েরা ভেতর বাড়িটিকে নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষন করতেন। তবে বছরের বেশী সময়টা বাড়ি বন্ধ থাকতো। দাদামশাই মুর্শিদাবাদে কোন স্কুলে পড়াতেন আর আমার মামারা সিউড়ী, বহরমপুরে চাকরী করতেন। তবে হ্যাঁ, ছুটিছাটায় ফ্যামিলি রিইউনিয়নে আমরা সবাই হাজির হতাম সেই সপ্তগ্রামে।


আর একটা জিনিস বলে রাখা দরকার, যদিও ইতিহাসের পাতায় আমার মামারবাড়ির উল্লেখ সেরকম কিছু দেখিনি তবে মুর্শিদাবাদের সম্ভ্রান্ত এবং প্রভাবশালী পরিবার হিসাবে এককালে আমার মামারবাড়ির কিন্তু বেশ নাম ছিল। নৃসিংহ নারায়ন রায়চৌধুরী ছিলেন পলাশীর যুদ্ধের সমসাময়িক, সিরাজের বন্ধুস্থানীয়। এও শোনা যায় ১৭৫৭ তেইশে জুনের সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় ক্লাইভের কাছে হেরে গিয়ে সিরাজ যখন ক্যাম্প ছেড়ে দিলেন তখন দশ বারো জনের খুব কাছের বন্ধুস্থানীয় পরামর্শদাতাদের সঙ্গে সিরাজ সেই রাতে একটা মিটিং করেছিলেন। নৃসিংহ নারায়নও নাকি সেই মিটিংএ ছিলেন এবং পলায়নরত সিরাজকে বেশ কিছু অর্থ সাহায্য ও করেছিলেন। শোনা কথা জানি না সত্যি কিনা, মীরজাফর নাকি জানতে পেরেছিলেন এবং কোম্পানী রাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দোষে নৃসিংহ নারায়নকেও দায়ী করেছিলেন। মীরজাফরের রোষ থেকে বাঁচতে নৃসিংহ নারায়ন সপ্তগ্রাম থেকে পালিয়ে উত্তর বিহারে চলে যান। সেখানে বছর চারেক থাকার পর যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল, তখন আবার ফিরে আসেন। তবে হ্যাঁ, পুরোটা কিন্তু শোনা কথা।


যা হোক ছোটদাদুর কথায় আসি, উনি দিল্লীতে থাকতেন, মিউজিয়ামে চাকরী করতেন। ছোটদাদুকে অবশ্য আমরা কোন ফ্যামিলি অনুষ্ঠানে মিস করতাম না। ঠিক ছুটি নিয়ে চলে আসতেন। আর আমরা পাহাড়ের মানে প্রধানত হিমালয়ের গল্প শুনতাম। একা মানুষ ছিলেন, বিয়ে থাওয়া করেন নি, আর ঘুরতে যাওয়া ছিল তাঁর কাছে অবসর এবং প্রধান আকর্ষণ। কখনো ভূতের গল্প, কখনো বা বাঘের গল্প, কখনো ডাকাতের গল্প শোনাতেন। আর একটা স্পেশালিটি ছিল ওনার, ভূতের গল্প কখনো ইলেকট্রিকের আলোয় বলতেন না। ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন বা হ্যাজাকের আলোয় গল্প শোনাতেন। আমরা হাঁ হয়ে গোগ্রাসে সেই সব গল্প গিলতাম। আর তারপর অন্ধকারে একা একা অন্য ঘরে যেতাম না। আর হ্যাঁ, যখনই আসতেন প্রতিবারেই আমাদের জন্য অনেক গিফট নিয়ে আসতেন। তারপর বড় হয়ে যখন পড়াশোনার চাপ বাড়ল আস্তে আস্তে সপ্তগ্রাম যাওয়াটা কমে গেল, বন্ধই হয়ে গেল বলা যায়। দাদাও পড়তে বাইরে চলে গেল, তারপর আমারও আর যাওয়া হয়নি। মামারা আস্তে আস্তে সেই সপ্তগ্রাম ছেড়ে বড় শহরে বসবাস আরম্ভ করলেন। সেই ১৯৯৪ সালে শেষ গেছি সেখানে। অবশ্য এটা জানতাম ছোটদাদু দিল্লীর সব পাট চুকিয়ে সপ্তগ্রামের পৈতৃক বাড়িতে আবার স্থায়ী বসবাস শুরু করেছেন। মহাদেবদা মামার বাড়ির পুরোনো লোক, আমরা ছোটবেলা দেখে দেখেছি। পুরোনো বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন, তিনিও ছোটদাদুর সঙ্গে সেই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। সেই রকমই জানতাম। তবে যাওয়া আর হয়নি।


ছোটদাদুর মৃত্যু সংবাদ আমি ছোটমামার কাছে পরশুই শুনেছি, কিন্তু সপ্তগ্রাম গিয়ে তাঁর শ্রাদ্ধ শান্তিতে অংশ গ্রহন করার ইচ্ছে আমার খুব একটা ছিল না। কিন্তু এতোদিন বাদে ছোটদাদুর হাতে লেখা চিঠি পেয়ে আমাকে ডিসিশনটা পাল্টাতে হল। আসলে এতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে ঐ বাড়িটার সাথে, আর সেই মানুষটার সাথে! সত্যি বলতে যিনি চলে গেলেন তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো ছাড়া মামারবাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ আমার আরো বেশী করে পেয়ে বসেছিল ছোটদাদুর বই গুলোর লোভে। ছোটবেলা থেকেই মামারবাড়ি তে অনেক বই দেখেছি, আর আমার দিদিমা, দাদামশাইেরও বইয়ের খুব শখ ছিল। আমার মামারবাড়িতে এক প্রকান্ড দেওয়াল জোড়া বইয়ের আলমারি ছিল, ঠিক লাইব্রেরীতে যেমন থাকে। আমার দাদামশাইয়ের বাবা নাকি সেটা বানিয়েছিলেন। বেশ মনে আছে একটা ছোট সিঁড়িও ছিল, সেটা ছাড়া ওপরের তাক থেকে বই নামানো যেতনা। প্রসঙ্গত বলি, লুকিয়ে লুকিয়ে দেবদাস, চরিত্রহীন, গৃহদাহ এইসব মামারবাড়িতেই প্রথম পড়েছিলাম। তাই মামারবাড়ি যাবার সুযোগটা যখন এসে পড়ল আমার সেই মানুষটার কথা আবার মনে পড়ে গেল। সে কিন্তু আমার চেয়ে অনেক উচ্চদরের পাঠক এবং বইয়ের যথার্থ প্রেমী – আমার বন্ধু প্রফেসর ডঃ সব্যসাচী দাশগুপ্ত।


আমার আগে লেখা কিছু আবর্জনায় আমি প্রফেসরের কথা লিখেছি। যা হোক, এক কথায় খুব উঁচু দরের স্কলার, দীর্ঘদিন আমেরিকায় ছিল, সেখানে দুদফায় রিসার্চ শেষ করে এখন কলকাতায় একটি কলেজে পড়ায়। বিজ্ঞানের ছাত্র, ডিসক্রিট ম্যাথেমেটিক্স তার গবেষণার বিষয় ছিল, কিন্তু ইতিহাস এবং সাহিত্যের অসম্ভব ভক্ত এবং অনেক বিষয়েই তার অগাধ পান্ডিত্য। আমরা একসাথে কলেজে পড়েছি, ও আমার চেয়ে এক বছরের সিনিয়র ছিল। কিন্তু আমার মতো এক বুদ্ধিহীন মানুষের সঙ্গে এই রকম এক তুখোড় মানুষের কি করে এত গভীর বন্ধুত্ব হল সে নয় পরে কখনো বলা যাবে। তবে যেটা বলার সেটা হলো, মামারবাড়িতে পুরোনো বইয়ের আখড়ায় কাজের বই খুঁজতে হলে যে কোন সময়ে আমার প্রফেসরের কথাই প্রথমে মনে আসত। প্রসঙ্গত বলে রাখি, অপরাধবিজ্ঞান নিয়েও প্রফেসরের বিস্তর পড়াশোনা, জিজ্ঞাসা করলে বলে, ছেলেবেলায় তার নাকি কোন এক সময়ে ব্যোমকেশের মতো ‘সত্যান্বেষী’ বা ফেলুদার মতো ‘প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর’ হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। জানিনা সেটা অত্যাধিক শরদিন্দু বা সত্যজিৎ রায়ের পড়ার জন্য কিনা, তবে এটা ঠিক রহস্যের গন্ধ তাকে সবসময়েই উত্তেজিত করে তোলে।


যা হোক এই চুয়াল্লিশ বছরের প্রফেসর ডঃ সব্যসাচী দাশগুপ্তের সাথে আমি শনিবার রওনা হলাম আমার মামারবাড়ি, সপ্তগ্রামে। উদ্দেশ্য ছোটদাদুর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা। এবারে অবশ্য ছোটবেলার মতো ট্রেনে যাইনি। প্রফেসরের নতুন হন্ডা ‘ডাবলিউ-আর-ভি’ তে আমরা বেরোলাম। ছঘন্টার রাস্তা, আমরা সকাল পাঁচটায় বেরোলাম। বারোটার মধ্যে পৌছনোর কথা। আমি ছোটমামার সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলাম, একরাত আমরা ওখানে থাকবো। আসলে একদিনের মধ্যে ফেরাটা খুবই পরিশ্রম সাপেক্ষ, তার ওপর যে গাড়ী চালাচ্ছে তার কাছে সেটা একটা চরম শাস্তি। তাই একদিন থাকা, তার পরদিন সকালে আমরা বেরিয়ে আসব। সোমবার থেকে আবার অফিস। সুতরাং ঠিক সময়ে ফিরতে হবে। প্রফেসরের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ আমার ইদানীং একটু কমে গেছে, তাই দেখা হলে কথা ফুরোতে চায়না। ঐ গাড়ি চালাচ্ছিল আর তার মধ্যে অনেক কথা হচ্ছিল, নানান বিষয়ে, সাহিত্য, গান, খেলা। আর প্রফেসরও জ্ঞানের ভান্ডার, যে কোন টপিকের ওপর তার সাথে আলোচনা করা যায়। আমার ছোটদাদুর কথা বলছিলাম, প্রফেসর কোন প্রশ্ন করেনি। তবে সব শুনে নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একটা কমেন্ট করল, “অদ্ভুত কি লাগছে জানো? চিঠিটা পড়ে মনে হচ্ছে বিদ্যাসাগর মশাইএর একটা ছবি দেওয়ার জন্য তোমার দাদু তোমাকে একটা হাতে লেখা চিঠি পাঠালেন! সেটা কি সেই মহাপুরুষটির ওপর শ্রদ্ধায় নাকি নিজের সৃষ্টির ওপর ভালোবাসায়? নাকি অন্য কারনে?”

“অন্য কারন? অন্য কিছু কারন থাকতে পারে কি?”


আমার কথার উত্তর না দিয়ে সে আমাকে আর একটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, তোমার দাদুর কত বয়স হয়েছিল?”

“উননব্বই”

“তুমি বললে রিটায়ার করে তিনি দিল্লীর সব পাট চুকিয়ে সপ্তগ্রামের পৈতৃক বাড়িতে চলে আসেন। তাহলে আজ প্রায় বছর কুড়ি-পঁচিশ ধরে তিনি ঐ বাড়িতে নিয়মিত ভাবে বাস করছেন। তোমার নিজের কথায় ১৯৯৪ এর পরে তুমি আর সে বাড়িতে যাও নি। তাহলে এতদিন বাদে হঠাৎ করে এই ছবি তোমাকে দেওয়ার কথা ওনার মাথায় এলো কেন? তাও আবার মৃত্যুর দুই বা তিনদিন আগে? উনি কি বুঝতে পারছিলেন যে উনি মারা যাচ্ছেন?”

বাধ্য হয়েই জিজ্ঞাসা করতে হল, “একটা চিঠি পড়ে শুধু শুধু এতো অনুমান কেন করছো?”

“অনুমান নয়, কয়েকটা খটকা! আরো একটা কথা, পুরো চিঠির মধ্যে কবিগুরুর ‘দুর্ভাগা দেশ’ এর লাইন দুটো কেমন যেন ফিট করছে না”

“মানে?”

“তোমাকে দেশের জন্য উনি কিছু করতে বলছেন, তা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে’ কথাটা বললেন কেন? কবিগুরুর অন্যান্য অনেক অনুপ্রেরণামূলক এবং দেশাত্মবোধক উদ্ধৃতি আছে। সেগুলো লিখতে পারতেন, কিন্তু”

আমি ওর কথা শেষ হতে না দিয়েই বললাম, “তুমি কি এসবের মধ্যেও রহস্যের গন্ধ পাচ্ছো?”

উত্তরে সে তেমন কিছু বলেনি, খালি একটা কথা বলল, “চলো না, গিয়ে দেখা যাক! ”


যাহোক বর্ধমানে একটু জ্যাম পেয়েছিলাম, তাছাড়া রাস্তা মোটামুটি খালিই ছিল। আমরা সপ্তগ্রাম পৌঁছলাম তখন বারোটা দশ, মাঝখানে একটা জলখাবারের ব্রেক। আগস্টের মাঝামাঝি বেশ গরম, অবশ্য সপ্তগ্রাম তুলনামূলক ভাবে একটু ভালো। গাছপালা এখনো কিছু আছে তাই কড়া রোদ হলেও গাছের ছায়া বেশ স্বস্তি দিচ্ছিল। প্রায় পঁচিশ বছর বাদে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি নিয়ে ঘেরা জায়গায় এসে আমার মনের সব জানলা খুলে গেছিল। অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ছিল, যা হোক সেসব বলে সময় নষ্ট করবো না। মামাদের সাথে দেখা হল, প্রফেসরের সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিলাম। প্রফেসরের বইয়ের ওপর ইন্টারেস্ট শুনে তো ছোটমামা বলে ফেললেন “ভালো হয়েছে তুমি এসেছো, যতটা পারো তুমি নিয়ে যাও, এই বাড়ি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকবে, আর আমাদের সেরকম বইয়ে তেমন ইন্টারেস্ট নেই। সব বই নষ্ট হয়ে যাবে। আমিও দাদার সঙ্গে কথা বলছিলাম, কাছাকাছি কোন লাইব্রেরীতে যদি এই সব বই দিয়ে দেওয়া যায়”


এই প্রস্তাবটা যে প্রফেসরের ভালো লাগবে সেটা আমি জানতাম “হ্যাঁ, সেটা খুব ভালো হবে। পড়তে ইচ্ছে না হলে বাড়িতে বই জমা না করে লাইব্রেরীতে দিয়ে দেওয়া ঢের ভালো। সেখানে পড়ার কিছু মানুষ তো থাকেন! বইয়ের অনাদর হয়না”


যা হোক, ছোটদাদুর কাজ শেষ হল তখন প্রায় বিকেল সাড়ে তিনটে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি প্রফেসরকে পুরো জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখালাম, সামনের বাড়ির যে ভগ্নাবশেষ ছোটবেলায় দেখেছি সেটা মোটামুটি একই আছে, আর বেশী খারাপ কিছু হয়নি। বরং ভেতর বাড়িটার পেছন দিকটায় একটু এক্সটেনশন হয়েছে, সেখানে দুটো নতুন ঘর হয়েছে, আর বাকি বাড়িটা মোটামুটি একই আছে। দোতলায় ছোটদাদুর ঘর, সেখানে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবিটাও চোখে পড়ল। আর তার পাশের ঘরটাতে বইয়ের সেই দেওয়াল জোড়া আলমারী। যার সঙ্গে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দেখলাম তার পাশে আর একটা বেশ বড়সড় বইয়ের আলমারি বানানো হয়েছে, বুঝলাম এটা নতুন বানানো, হয়তো ছোটদাদুর রিসেন্ট কালেকশন। প্রফেসর মুখে কিছু বলেনি, কোন বইয়েও হাত দেয়নি, খালি আলমারির বিভিন্ন অংশে তাকিয়ে দেখছিল, আমিও কিছু বলিনি। ঘরের কোনে একটা সিঁড়ি রাখা, সেটাকে দেখে অবশ্য এক-দু বছরের পুরোনো বলেই মনে হয়। নীচের তলা থেকে আমার নামে ডাক পড়তে আমাকে চলে আসতে হল, প্রফেসর হাত নেড়ে আমাকে আশ্বস্ত করল, “তুমি যাও, এতদিন বাদে মামারবাড়িতে এলে, যাও ওঁদের সঙ্গে গল্প করো। আমার জন্য ভেবো না, এত ভালো একটা কালেকশন! আমার কিছু চাই না, খালি পারলে একটু চা পাঠাতে বলো”।


আত্মীয়স্বজনের সকলের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে সেই ঘরে ফেরত আসতে আমার প্রায় ঘন্টা দেড়েক লেগে গেল। জানতাম প্রফেসর বইয়ের সমুদ্রে ডুবে যাবে। ফিরে দেখলাম ঠিক তাই, মহাদেবদা ও এসে পড়েছে, আর প্রায় শ দুয়েকের ওপর বই সে দেওয়াল আলমারি থেকে নামিয়েছে, উলটে পালটে দেখছে। এবারে আমার হলো সমস্যা, যাই জিগ্যেস করি কোন উত্তর পাইনা, সে চুপ করেই থাকে, ভাবখানা এমন “তোমার বাজে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আমার এখন সময় নেই”। মিনিট পনের আমি বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্য্যায়ের একখানা বই নিয়ে উলটে পালটে দেখছি এমন সময় প্রফেসরের গলা শুনলাম, “একটা ছোট গড়বড় লাগছে!”

“কি ব্যাপারে?”

“তার আগে চলো, বুদ্ধিতে একটু ধোঁয়া দিতে হবে”


আমরা ছাতে গেলাম, যদিও আমাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে তবু মামারবাড়িতে আমার বয়োজ্যেষ্ঠ কয়েকজন আছেন। এই সন্ধ্যের মুখে তাঁদের কারুর ছাতে আসার সম্ভাবনা কম, সুতরাং সিগারেট খাওয়ার জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কিছু হতে পারে না।

“কিসের গড়বড়?”

“আলমারি থেকে বই নামানো, তোলা, ঝাড়পোঁছ সব কাজ তোমাদের মহাদেবদা করতেন। তোমার দাদু নিজে করতে পারতেন না। এবং মহাদেবদা এই ব্যাপারে খুব দক্ষ ছিলেন, বইয়ের ব্যাপারেও অগাধ জ্ঞান।“

“তাতে গড়বড় টা কি হলো?”

“ডানদিকের সপ্তম তাকে, শরৎ রচনাবলীর বারোটা খন্ড রাখা আছে, কিন্তু নবম এবং দশম খন্ডটা উল্টো করে ঢোকানো। বাকি বইগুলোকে রাখার মধ্যে কিন্তু কোন গন্ডগোল নেই। এদিকে তোমার মহাদেবদা বলছেন, রিসেন্টলী শরৎ রচনাবলী কিন্তু বার হয়নি। মানে তোমার ছোটকাকা তাঁকে সে বই বার করতে বলেননি। তাহলে নবম এবং দশম খন্ডের বইদুটোকে উল্টো করে ঢোকাল কে? এদিকে সপ্তম তাক মাটি থেকে অনেকটা ওপরে। সিঁড়ি ছাড়া সেখানে পৌঁছনো সম্ভব নয়, সুতরাং তোমার দাদুর নিশ্চয়ই এটা করেননি। তাহলে কি অন্য কেউ? বাড়িতে কিছু খুঁজতে এসেছিল?”

আমি চুপ করেই রইলাম, প্রফেসর একমনে সিগারেট টানছে, আমি জানি ওর কথা এখনো শেষ হয়নি, মিনিট খানেক বাদে সে আবার বলল, “আরো একটা গন্ডগোল আছে! আজ থেকে পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগে একটা ছবি আঁকা হয়, সেই পেন্টিং বাঁধানো হয়। ফ্রেম দেখে বোঝা যায় সেই ছবি বাঁধানো হয়েছে আজ থেকে পঞ্চাশ বা তার বেশী বছর আগে। কিন্তু তার পেছনে একটা নতুন কাগজের একটা কভার লাগানো হল কেন?”

“এটা কোথায় দেখলে?”

“বিদ্যাসাগর মশাইয়ের যে ছবি তোমাকে দেওয়ার কথা লেখা হয়েছে, তার ছবির পেছনটা দেখো, একেবারে নতুন ব্রাউন পেপার লাগানো হয়েছে, খুব বেশী হলে মাস খানেক আগে”

“সে হয়তো ছবিটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, সেই কারনে”

“হতেই পারে। ছবিটা যদি খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আসে, তাহলে সেই কাজ কোন ছবি বাঁধাইয়ের দোকান থেকে করানো উচিত ছিল। রাস্তায় আসার পথে একটা ছবি বাঁধাইয়ের দোকানও দেখলাম। সুতরাং সে ব্যবস্থা এখানে আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ক্ষেত্রে যেটা করা হয়েছে সেটা কিন্তু কোন প্রফেশনালের কাজ নয়, এমনকি ছবির পেছনের পেপার প্যাকিংটাও ভালো করে করা হয়নি। আর আমার অনুমান যদি ভুল না হয় এই কাজ খুব সম্ভব তোমার দাদুর নিজের হাতে করা। এখন প্রশ্ন হল এটা করা হলো কেন? আবার এই ছবিটাই তোমাকে দেওয়ার জন্য উনি তোমাকে চিঠি পাঠালেন। চিঠি পাঠানোর পেছনে কি অন্য কোন কারন ছিল?”


আমার কেমন যেন বিশ্বাস হল না, “তুমি এবারে একটু জোর করেই রহস্য খুঁজছ নাকি?”

“একেবারেই নয়, এগুলো শুধু খটকা! আরো একটা খটকা আছে। আপাতত এটাই শেষ তথ্য, তোমার দাদু সাধারনত রাত সাড়ে আটটা থেকে নটার মধ্যে ডিনার করতেন। তারপর খাওয়া হয়ে গেলে মহাদেবদা সাড়ে নটা নাগাদ এসে প্লেট নিয়ে চলে যেতেন। দাদু যেদিন মারা যান, অন্য দিনের মতো সেদিন রাতেও মহাদেবদা খাবার দিয়ে রাত সাড়ে আটটায় নীচে চলে যান। এবারে সাড়ে নটায় ঘরে এসে দেখেন, দাদু নিজের ঘরে সোফায় বসে এলিয়ে পড়েছেন। তার মানে সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে ওনার স্ট্রোক হয়ে গেছে। খাবারের থালা সোফার সামনের টেবিলের ওপর যেমন রাখা ছিল তেমনই রাখা আছে। শুধু জলের গ্লাসটা খাটের পাশে ছোট টেবিলে রাখা আর সেটা খালি, মানে তার জলটা খাওয়া হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হল যে মানুষটা সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন, ডিনারের প্লেটটা ছুঁলেন না পর্যন্ত, তিনি জলটা খেলেন কখন? আর যদি খাবেনই না, গ্লাসটা খাটের পাশে ছোট টেবিলে রাখবেন কেন? সোফার সামনের টেবিলে রাখা উচিত ছিল! আর মহাদেবদার কাছে শুনলাম, উলটো পাল্টা জায়গায় থালা, বাটি, গ্লাস বা চায়ের কাপ রাখার লোকও উনি ছিলেন না। তাহলে এই গন্ডগোলটা হল কেন?”

“তোমার কি মনে হচ্ছে সব কিছু দেখে?”

“বুঝতে পারছি না, তবে গোলমাল যে একটা আছে, সেটা ডেফিনিট! সেটা অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে, তবে” প্রফেসর চুপ করে গেল, আমাকে হাত দেখিয়ে থামতে বলল। তারপর হাতের সিগারেটটা আড়াল করে এগিয়ে গেল ছাদের দরজার দিকে, যেখান দিয়ে সিঁড়ি নেমে যাচ্ছে বাড়ির মধ্যে। আমি ও পিছু পিছু এগোলাম, যা ভেবেছিলাম তাই, এক ভদ্রলোক সিঁড়িতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝলাম, তাঁর উপস্থিতিটা প্রফেসর আগেই বুঝতে পেরেছিল। “কিছু বলবেন” পেছনে থাকলেও আমিই প্রশ্নটা করলাম। ভদ্রলোককে আগে দেখেছি কি না মনে পড়ল না, তবে কাজের বাড়ি এখানে সব নিমন্ত্রিতদের মুখ মনে রাখা অসম্ভব। “আপনি কি তথাগত গুপ্ত?”

“কি ব্যাপার?”

“আসলে আপনারা সিগারেট খাচ্ছিলেন তাই ডিসটার্ব করিনি, যাহোক, শশাঙ্কবাবু আপনার মামা হন তো, আপনাকে ডাকছেন নীচে”

“ঠিক আছে আপনি চলুন, আমি আসছি” সিগারেট শেষ করে নীচে নামতেই হল, প্রফেসরের ইঙ্গিতে আমাকে বলল “তুমি নীচে যাও আমি বইয়ের ঘরে আছি”।



[২]


রাতে ডিনারটা বড্ড বেশী হয়ে গেল। যা হয়, এতোদিন বাদে মামারবাড়ি এসেছি তারপর কাজের বাড়ি। নিরামিষ খাবার, কিন্তু খাবারের ছড়াছড়ি। ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা, ছোলার ডাল, সাদা লুচি, বেগুনি, হলুদ মিষ্টি পোলাও, চাটনী, নানান রকমের মিষ্টি। সেই লর্ডস চমচমও ছিল, কত খুঁজেছি কলকাতায় কোথাও পাইনি, সেও ছিল। আর ছোটদাদুর বরাবরই একটা রাজকীয় কায়দা ছিল, সুতরাং তাঁকে সম্মান দেখাতে মামারা এইটুকু করবে সেটা আশাই করা যায়। প্রফেসর অবশ্য পরিমিতি ব্যাপারটা কখনো ভোলে না, সবই খেল তবে কোনটাই মাত্রাতিরিক্ত নয়। দোতলায় ছোটদাদুর ঘরের পাশে আমাদের শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল। এই ঘরটা আমি দেখিনি, শুনলাম পরে হয়েছে। এটা সাধারনত খালিই থাকতো, কেউ এলে তাঁর থাকার জন্য খোলা হত। যাহোক আগেই বলেছি এমনিতে খাওয়াটা বেশী হয়েছিল, আর পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে আরো খানিকটা দেরী হল, শুতে শুতে প্রায় পৌনে বারোটা হল।


বেশ ভালোই ঘুমোচ্ছিলাম, কেমন যেন আচমকা ধাক্কা লাগল আমার পিঠে, বেশ বেশ কয়েক বার। তন্দ্রাটা কাটতে বুঝলাম প্রফেসর আমাকে ডাকছে, ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসেছি, দেখি ঘরের আলো জ্বলছে দরজা খোলা, প্রফেসর দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে এল। হাতে বাঁধা ঘড়ির দিকে চোখ গেল, দেখলাম একটা সাতচল্লিশ, “কি ব্যাপার? শরীর খারাপ?”

প্রফেসর আমার কথার উত্তর না দিয়ে ঘরের দরজা দিয়ে আবার বেরিয়ে গেল, মিনিট খানেক বাদে ফেরত এল, তারপর যেটা বলল সেটার জন্য আমি একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না। “চোর এসেছিল”

“সেকি? কোথায়”

“খুব সম্ভব, তোমার দাদুর বইয়ের ঘরে, তবে মনে হচ্ছে কিছু হাতাতে পারেনি”

“বইয়ের ঘরে? সেখানে তো হাজার খানেক বই, সেখান থেকে কি চুরি করবে?”

“নিশ্চয়ই কিছু আছে চুরি করার মতো, তাই তো এসেছিল” কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর সে আবার বলল, “ঘরটায় তালাও লাগানো নেই, একেবারে অবারিত দ্বার!”

“তুমি কি করে বুঝলে?”

“আওয়াজ পেলাম, তারপর তাদের পালাতেও দেখলাম, একজন নয়, দুজনে এসেছিল, হাতে একটা টর্চ ছিল”

“তাহলে কি কিছু লুকোনো আছে সেই ঘরে?”

“লুকোনো কি না জানিনা, তবে কিছু আছে। তা নাহলে চোর আসে কেন? আর এরা কিন্তু আজকে প্রথম আসেনি, আমার মনে হয় এরা গত চার পাঁচ দিন ধরেই আসছে”

“আচ্ছা ব্যাপারটা এই রকম নয়তো, হয়তো কেউ এসে বই চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে”

“মহাদেবদার স্মরন শক্তির ওপর যদি ভরসা রাখা যায় তাহলে কোন বই কিন্তু এখনো চুরি যায়নি। আর তার চেয়েও বড় কথা, যতটা দেখলাম লাইব্রেরীটা কিন্তু মূলত গল্পের বইয়ের। সেখান থেকে রাত দুপুরে এসে চুরি করার কোন সেন্স হয়না। গল্পের বই তোমার মামারা চাইলেই তো দিয়ে দেবেন! এতো রিস্ক নিয়ে চুরি করার কোন দরকার আছে?”

“তাহলে কি ওরা কিছু খুঁজছে?”

“নিঃসন্দেহে! আর যেটা খুঁজছে সেটা কিন্তু এখনো পায়নি। নাহলে রোজ এভাবে আসতো না! এখন কথা হল তারা কি খুঁজছে?”

“তুমি বাইরে গিয়ে কি করছিলে?”


প্রফেসর একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে বলল “আমার সঙ্গে একটা তালা ছিল সেটা তোমার দাদুর লাইব্রেরীর দরজায় লাগিয়ে এলাম”। একটা সুদীর্ঘ টান দিয়ে সে আবার বলল, “তোমার মামাদের বোলো, যতদিন না এই সব বই অন্য কোথাও পাঠানো হয় ততদিন এই ঘরটায় একটা তালা লাগিয়ে রাখতে”।

প্রফেসরের আগের কথাগুলো আমার মনে পড়ে গেল, “তাহলে কি তুমি বলছ ছোটদাদু কিছু আঁচ করেছিলেন তাই আমাকে চিঠি লিখেছিলেন!”

প্রফেসর কিছু বলল না, সিলিঙ্গের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, আমি মুখ থেকে আপনা আপনি কথা এল, “তাহলে কি পুরোনো কোন দুষ্প্রাপ্য বই বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট, এখানে রাখা আছে? আর দাদু চেয়েছিলেন যাতে সেটার অনাদর না হয়”

প্রফেসর হাল্কা মাথা নাড়ল, যেটার অর্থ ‘হ্যাঁ’ আবার ‘না’ ও হতে পারে, যদিও মুখে বলল “তাহলে সেটার কথাই চিঠিতে লিখলেন না কেন? আর দুষ্প্রাপ্য বই যদি থেকেই থাকে তোমার দাদুর ক্যারেক্টার যা বুঝলাম তিনি নিজেই সেটার একটা ব্যবস্থা করে যেতেন। সেটার জন্য তোমাকে একটা চিঠি লিখে হাতে আঁকা একটা বিদ্যাসাগর মশাইয়ের ছবি নিয়ে যেতে বলতেন না!”


আমি শুয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, সে আবার বলল, “আরো একটা জিনিস আছে জানো! যে ভদ্রলোক আমাদের দোতলার ছাদ থেকে ডাকতে এসেছিলেন তাঁকে কিন্তু সন্ধ্যেবেলা বা রাতে আর দেখতে পেলাম না! তুমিও তাঁকে চিনতে না! তিনি কে? কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন? নাহলে” এই কথাটা একেবারে আমার মনে ধরেনি, প্রফেসর কে শেষ করতে না দিয়েই বললাম, “কি বলছো? নিমন্ত্রিতদের মধ্যে অবাঞ্ছিত লোক রয়েছেন আর সেটা দেখার কেউ নেই বলছো? এটা হতে পারেকি?”

“তোমার বড়মামার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তোমার ছোটমামা কিন্তু তাঁর চুয়াল্লিশ বছরের ভাগ্নে লুকিয়ে লুকিয়ে ছাতে গিয়ে সিগারেট খাচ্ছে কিনা সেটা পরীক্ষা করতে কাউকে পাঠান নি! এবারে মনে করো সেই ভদ্রলোক কি বলেছিলেন? শশাঙ্কবাবু আপনাকে ডাকছেন নীচে! তাইতো? শশাঙ্কবাবু হচ্ছেন তোমার ছোটমামা! তিনি কিন্তু কাউকে পাঠাননি! তাহলে?”

“তুমি আগে বলোনি তো ব্যাপার টা?”

“আসলে তুমি ডিনারে লুচি আর পোলাও নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলে তাই আর ঘাঁটাইনি!”

“তার মানে বাইরের লোক বাড়িতে ঘুরছে আর মামারা সেটা বুঝতে পারছে না!”

“আমি তা বলিনি! হয়তো সেই ভদ্রলোক নিমন্ত্রিতদের মধ্যেই কেউ ছিলেন! কিন্তু আমার কি মনে হয় জানো!” কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর প্রফেসর আবার বলল, “তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন! আর সেটা যখন আমরা বুঝতে পারলাম তখন তিনি বললেন আমাকে শশাঙ্কবাবু পাঠিয়েছেন! কিন্তু প্রশ্ন হলো ভদ্রলোক আড়ি পেতে কি শুনতে চাইছিলেন? ঠিক আছে ছাড়ো, তুমি এখন শুয়ে পড়, কাল তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। কাল সকালে না হয় ভাবা যাবে”

“আর তুমি?”

“হ্যাঁ, আমি ও শোব, সিগারেটটা শেষ করে”


আমার ঘুমোতে সময় লাগেনি! পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখীর ডাকে। বেশ মনে আছে তিরিশ, পঁয়ত্রিশ বছর আগে যখন মামারবাড়ি নিয়মিত আসতাম সকালে আলো ফোটার সময় দিকে এই পুব দিকের দোতলার চাতালটা ভরে যেত নানান পাখিতে। এখন দেখলাম খুব একটা পরিবর্তন হয়নি! পাখীর সংখ্যা কমেছে তবে এখনো যা আছে অনেক। যা হোক, যা ভেবেছিলাম তাই। প্রফেসর কিন্তু তার বিছানায় নেই, সে বেরিয়ে পড়েছে। সকালে এক কাপ চা খুব প্রয়োজন, নীচে যেতেই আমার ছোটমামার সঙ্গে দেখা হল। বুঝলাম প্রফেসরের সঙ্গে ছোটমামার কথা হয়েছে, প্রফেসরের পরামর্শ মতো ছোটমামাও ঠিক করেছে, লাইব্রেরী আপাতত তালাবন্ধ থাকবে! বড়মামার হার্টে একটা সমস্যা আছে, তাই এক্ষুনি তাঁকে কিছু জানানো হবে না। যদিও ছোটমামার দৃঢ় বিশ্বাস “আমার মনে হয়না, ছোটকাকার লাইব্রেরীতে কোন ধন দৌলত আছে। পুরোনো বই কিছু আছে, সেসব পড়ার লোক কোথায় এখন?”

“আচ্ছা কোন পুরোনো পুঁথি বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট যদি থেকে থাকে? হয়তো এখনকার দিনে সেটার ভ্যালু অনেক”

“আচ্ছা তোর কি মনে হয়? সে সব যদি থাকতোই ছোটকাকা কি সেগুলো কি এখানে বাড়িতে যক্ষের ধন করে রাখতো? নিজে মিউজিয়ামে চাকরী করতো! সেগুলো এতদিনে সব মিউজিয়ামে চলে যেত। তাই না?” অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ধরনের জিনিসকে যে ‘জাতীয় সম্পত্তি’ বলা হয়, সেই কথাটা ছোটদাদুর কাছেই প্রথম শুনেছিলাম। তাই সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে!

“তাহলে রাতে চোর এলো কেন?”

“সেটাই তো বুঝতে পারছি না! চুরি করার মতো আছে কি? কিন্তু তোর বন্ধু তো বলল, সে নিজের চোখে দেখেছে! আসলে পশ্চিমের দেয়ালটা পড়ে যেতে ছাত টপকে বাড়িতে ঢোকাটা সহজ হয়ে গেছে! আমার কি ভয় লাগছে জানিস?”

“কি?”

“কাজের বাড়ি তো! কিছু পয়সা কড়ি হাতানোর জন্য হয়তো এসেছিল!”


ছোটমামাকে কিছু বললাম না। প্রফেসরের অনুমান চোর এসেছিল লাইব্রেরীতে কিছুর সন্ধানে। আর আমি জানি, প্রফেসর এতোটা ভুল করবে না! প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে আরো মিনিট পনের কথা হল, জানলাম মামারা তিনচার দিন বাদে সবাই নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যাবেন। মহাদেবদার কাছে আপাতত বাড়ির চাবি থাকবে। বাড়িতে জিনিস পত্র, আসবাব আপাতত যেমন আছে তেমনই থাকবে। ছোটমামা আজ বা কাল রামপুরহাটে লাইব্রেরীতে যাবেন, বই গুলোর ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করতে চান। এছাড়া বাকি সম্পত্তি কি হবে কেউ জানে না!


কাজের বাড়িতে কাজ শেষ হয়ে গেলে কেমন ভাঙ্গা হাট হয়ে যায়, তবে ছোট ছোট কাজ অনেক থেকে যায়। আর বড়মামা অসুস্থ হয়ে পড়ার পড় পুরো দায়িত্ব এখন ছোটমামার। ছোটমামা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, আমি দু কাপ চা শেষ করে ফেললাম। ভাবছি দোতলায় এসে সিগারেট ধরাবো, এই সময়ে দেখলাম প্রফেসর বাড়িতে ঢুকল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার মুখেই আমার সঙ্গে দেখা, আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, “অনেক কথা আছে, তবে এখন নয়। বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে, নয়তো বেরোতে দেরী হয়ে যাবে। আমি চানটা সেরে ফেলি, দশ মিনিট! তুমি তাড়াতাড়ি করো, জলখাবারের ঝামেলাতে যেও না। আমরা রাস্তায় খেয়ে নেব। আটটার মধ্যে বেরোতে হবে” বলে সে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।


মামারবাড়ি এলাকা ছাড়িয়ে সপ্তগ্রাম সদর রাস্তা ধরার পর প্রফেসর প্রথম মুখ খুলল, “মাস খানেক আগে সম্ভবত জুলাই মাসের শুরুর দিকে অথবা জুনের শেষের দিকে মুম্বাই থেকে দুই জন এসেছিলেন এই সপ্তগ্রামে, তোমার দাদুর সঙ্গে দেখা করতে। সেই দুজনের মধ্যে একজন খুব সম্ভবত বিদেশী। দুর্ভাগ্যচক্রে মহাদেবদা সেদিন অসুস্থ ছিলেন তাই দাদুকে দেখা শোনা করার দায়িত্বে ছিল মহাদেবদার ভাইপো দিলীপ। দিলীপ তোমার মামার বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে একটি ষ্টেশনারী কাম মুদির দোকান চালায়। সকালে সব খাবার দাবারের ব্যবস্থা করে সে দোকানে চলে আসে। তারপর দোকানের কাজ সামলে দিলীপ যখন মামার বাড়িতে পৌছয় তখন সেই দুই ভদ্রলোক এসে পড়েছেন। আরো ঘন্টা খানেক ওনারা ছিলেন, লাইব্রেরীতে বসে আলোচনা হচ্ছিল, অনেক বই নামানো হয়েছিল। অবশ্য দিলীপ তার কিছুই বলতে পারল না, সে কিছুই বোঝেনি। আর তাছাড়া, বেশীর ভাগ কথাবার্তা নাকি ইংরাজীতে হচ্ছিল”


একটানা বেশ খানিকক্ষন কথা বলে প্রফেসর একটা ছোট বিরতি নিল, আমি সেই ফাঁকে জানতে চাইলাম, “তা সেই দুজনের নাম ঠিকানা কিছু জানতে পেরেছ নাকি?”

“এখনো পর্যন্ত না। তবে তোমার ছোটমামার অনুমতি না নিয়ে দুটো জিনিস আমি কিন্তু তোমার মামারবাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি, ইনফ্যাক্ট তোমাকেও জানাইনি। একটা তোমার দাদুর ডাইরি যেটা সম্ভবত ১৯৯৫ সাল থেকে নানা তথ্য নোট করার জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল, আর একটা হাতে লেখা একটা ক্যাটালগ, যেটাতে লাইব্রেরীর সব বইয়ের নাম লেখা আছে। দুটোই আমি তোমাকে ফেরত দিয়ে দেব। আমাকে দুটো দিন সময় দিও। তা সেই ডাইরি টা এখনো পড়া হয়নি, জানিনা পড়লে হয়তো সেই দুই ব্যক্তির নাম জানাও যেতে পারে।”

“আর কিছু জানতে পারলে?”

“আরো চারটে জিনিস। এক, তোমার দাদু যেদিন মারা গেলেন তার আগের দিন রতিকান্ত সোম নামে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে খবর পাঠিয়েছিলেন। মহাদেবদা ওনাকে খবর দিয়ে আসেন, কিন্তু দুদিন পর সকালে রতিকান্ত যখন আসেন দাদু তখন মারা গেছেন। প্রশ্ন হল, কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন? দ্বিতীয়, তোমার দাদুর অভ্যাস ছিল রোজ সকালে এবং বিকেলে রেডিওতে গান শোনা। ২৭শে জুলাই যেদিন রাতে উনি মারা গেলেন সেদিনের দুদিন আগে থেকে আর কিন্তু রেডিও চলেনি! কেন? দাদু কি মানসিক ভাবে ডিস্টার্ব ছিলেন? মহাদেবদা সেভাবে কিছু বলতে পারলেন না! অবশ্য মহাদেবদার বয়স আশির ওপর, চোখে ছানি পড়েছে, তাই তাঁর চোখে নাই পড়তে পারে! তিন, দাদু যে রাতে মারা যান সেদিন কিন্তু কে একজন দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। মহাদেবদার চোখে পড়েনি আর কানেও ভালো শুনতে পাননা, তবে মামার বাড়ির ঠিক পেছনে এক বাড়ির একতলার ঘরে প্রাইভেট টিউশানি করেন রমেন সরকার, স্থানীয় স্কুলের টিচার। তিনি কিন্তু দেখেছেন সেই রাতে স্কুটার করে দুজনকে আসতে। অন্ধকার হয়ে গেছিল, তিনি চিনতে পারেননি, কিন্তু কথা হলো কে এলো অত রাতে? আর চার, যেটা সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট, তোমার দাদুর মোবাইল ফোনের কল হিস্ট্রিতে কিন্তু কোন ইনফরমেশন নেই! কখনো কারুর ফোন আসেনি বা উনি কখনো কাউকে ফোন করেননি সেটা তো সম্ভব নয়! তাহলে উননব্বই বছরের এক বৃদ্ধের পক্ষে নিজের ফোনে কল রেকর্ড ডিলিট করাটা কি, তোমার কাছে খুব যুক্তিপূর্ণ মনে হয়?”


আমি মোটামুটি ‘থ’ মেরে আছি, এই এক ঘন্টার মধ্যে এত কিছু সে জেনে ফেলল কি করে? পুরো ব্যাপারটা বোঝার পর একটা কথাই মুখে এল, “তাহলে দাদুর মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক নয় বলছ?”

“হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু সেটা ঠিক! কিন্তু একজন উননব্বই বছরের মানুষকে একটু বেশী ভয় দেখালেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। সেটা কে কি পুরোপুরি স্বাভাবিক মৃত্যু বলা যায়?”

“কি বলছ?”

“না আমি বলছি না এটাই হয়েছে। কিন্তু আমার অনুমান এই রকম কিছু একটা হয়েছিল”

“কিন্তু কে বা কারা ভয় দেখালো? সেই স্কুটারে চেপে আসা দুইজন?”

“হতে পারে, তবে সেটা এখনো অজানা! তবে সবচেয়ে বড় রহস্য কি জানো, ভয় দেখালোই বা কেন? ওরা কি দাদুর কাছে কিছু চাইতে এসেছিল? সেটা পেলো না বলে ভয় দেখালো? কিন্তু বাড়িতে কাল চোর এসেছিল! তাহলে যে জিনিসের খোঁজ চলছে সেটা নিশ্চয়ই এখনো পাওয়া যায়নি”

“আচ্ছা ছোটদাদুর মোবাইল ফোনের কোম্পানিতে জিগ্যেস করলেও তো সব কল হিস্ট্রি জানা যাবে!”

আমার প্রশ্নের উত্তরে সে মাথা নেড়ে সায় দিল, তারপর সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে সে বলল, “শোন সামনে একটা ধাবা আসছে, আমরা এখন জলখাবারের ব্রেক নেব না! আর একটু বাদে নেব”

এ আবার কি কথা? সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, খিদেটা বেশ চাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রফেসর এই রকম না খাইয়ে রাখতে চাইছে কেন? কয়েক সেকেন্ড বাদে সে নিজেই কারনটা বলল, “লাস্ট তের মিনিট ধরে একটা সবুজ ওয়াগনার কিন্তু আমাদের ফলো করছে, জানা দরকার ওদের উদ্দেশ্যটা কি?”

এবারে আরো অবাক হতে হল, “কিন্তু ফলো করছে বুঝলে কি করে? দুটো গাড়ি এক ডাইরেকশনে যেতে পারে না!”

“পুরো গ্রামের রাস্তা আমাদের পেছনে পেছনে এসেছে, এখন হাইওয়েতেও পেছনে আছে। আমি আর একটু সিওর হয়ে নিতে চাই”


[৩]


মাঝের দুটো দিন খুব ব্যস্ততায় কাটল। অফিসের কাজে আমাকে দুদিনের জন্য পুরুলিয়া যেতে হল। ছোট দাদু, সোমেশ্বর রায়চৌধুরী, সপ্তগ্রাম, বইয়ের ঘরে চুরির চেষ্টা তারপর প্রফেসরের নানান অনুমানের কথা এই দুটো দিন ভুলেই গেছিলাম। সবকিছু আবার মনে পড়ে গেল বুধবার সন্ধ্যেবেলা, পুরুলিয়া থেকে কলকাতা আসার পথে। আমরা খবরের কাগজের অফিস থেকে গাড়ী নিয়ে গেছিলাম। ফেরার পথে রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে আমাদের একটা ছোট বিরতি চলছিল আর তখনই প্রফেসরের ফোন এল। আর যেটা শুনলাম সেটার জন্য আমি একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না। কেউ বা কারা প্রফেসরের উত্তর কলকাতায় সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে দরজা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত দরজা ভাঙ্গা যায়নি। পাশের বাড়িতে কেউ বা কারা আওয়াজ পেয়েছিলেন, তাতে তাঁরা চিৎকার চেঁচামেচি করে ওঠায় চোর পালায়। কিন্তু কথা হলো, প্রফেসরের বাড়িতে এমন কোন বহুমূল্য বস্তু নেই যার জন্য বাড়িতে চোর আসতে পারে। হ্যাঁ অগুনতি বই আছে, তবে বই চুরি করার জন্য চোর ডাকাত কোন বাড়িতে আসে না এটা বোধহয় বাচ্ছা ছেলেরাও জানে। তাহলে এলো কেন? প্রফেসর আমাকে আগেই জানিয়েছিল সে দুটো জিনিস আমার মামারবাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে, ১৯৯৫ সাল থেকে দাদুর হাতে লেখা একটা ডাইরি, আর একটা লাইব্রেরীর সব বইয়ের নাম লেখা একটা ক্যাটালগ। চোর কি জানতে পেরেছিল আমরা সেখান থেকে কিছু নিয়ে এসেছি আর সেটাকে হাতাতে এসেছিল সেই সপ্তগ্রাম থেকে সুকিয়া স্ট্রীটে? কি এমন জিনিস যেটা পাবার জন্য এতো আগ্রহ?


অফিসের গাড়ী ছেড়ে দিলাম, পার্ক স্ট্রীট থেকে মেট্রোতে চেপে গিরীশ পার্ক তারপর বাসে চেপে একেবারে প্রফেসরের বাড়িতে। বলে রাখা দরকার সেই ছোটদাদুর হাতে আঁকা বিদ্যাসাগরের সেই ছবি আমাকে নিয়ে আসতে বলেছিলেন সেই ছবিটাও প্রফেসর আমার কাছ থেকে রবিবার বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে গিয়েছিল। প্রফেসরের বাড়ি পৌঁছতে প্রায় সাতটা হয়ে গেল। দরজা অবশ্য ভাঙ্গে নি, তবে যা অবস্থা তাতে মেরামত একটা দরকার, নাহলে কিছু দিন বাদে নিরাপত্তার একটা প্রশ্ন আসতে পারে। প্রফেসর পাড়ার মিস্ত্রীর সাথে কথা বলেছে, তারা দলবল নিয়ে কালকে আসবে এবং সারিয়ে দিয়ে যাবে। দুচারটে এদিক ওদিক কথার পর সে দ্রুত প্রসঙ্গে এল, “অবশ্য দরজা ভাঙলেও কিছু হতো না। ডাইরি, ক্যাটালগ, ছবি কোনটাই পেতো না!”

“তার মানে?”

“সেদিনের সবুজ ওয়াগন-আর কিন্তু একদম কলকাতা অবধি এসে দেখে গেছে আমাদের বাড়ি। তারপর আর রিস্ক নিইনি। একা বাড়িতে থাকি, কি দরকার রিস্ক নিয়ে?”

“কোথায় রেখেছিলে জিনিসগুলো?”

“আমার এক ছাত্রের বাড়িতে রাখতে দিয়েছিলাম, আমার মনে হয়েছিল এই রকম একটা কিছু হতে পারে”

“আচ্ছা ব্যাপার কি বলো তো? ওরা জানলো কি করে আমরা এই তিনটে জিনিস নিয়ে এসেছি”

“জানার তো দরকার নেই। যেই মাত্র ওদের রাত্রিবেলা বিনা বাধায় লাইব্রেরী ঢোকাটা যখন বন্ধ হয়ে গেল তখনই ওরা বুঝেছে, আর যাই হোক তুমি তাদের বন্ধু নও। আর এটা তারা অনুমান করেছে তুমি কিছু সেখান থেকে কিছু নিয়ে এসেছ!”

“কিন্তু কি এমন জিনিস সেটা? যার জন্য চোর আমাদের পিছু পিছু সেই সপ্তগ্রাম থেকে কলকাতা ধাওয়া করল? সেকি লাইব্রেরীতে লুকোনো আছে?”

“লুকোনো কিছু আছে নিঃসন্দেহে! তবে লাইব্রেরীতে হয়তো নয়! খুব ভুল না হলে আমার মনে হয়, সেখানে কোন একটা কিছুর হদিশ রাখা আছে, মানে কোন হয়তো একটা সূত্র অথবা কোন ক্লু”

আমি কথা শেষ করতে দিলাম না, “মানে কোন গুপ্তধন? আবার সেই ট্রেজার হান্ট?”

“গুপ্তধন হতে পারে! আবার সোনাদানা নাও হতে পারে! অন্য কিছুও হতে পারে, যার ঐতিহাসিক মূল্য হয়তো আজকের দিনে অনেক!”

“তুমি ছোটদাদুর ডাইরী তে কিছু পেলে?”

“বলছি, তার আগে তুমি একটা জিনিস আমাকে বলো। তোমার মামার বাড়ির দিকে মৃগাঙ্কশেখর বলে কারুর নাম শুনেছ? যিনি খুব সম্ভব ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরী করতেন”

সত্যি বলতে নাম মনে পড়েনি, তবে এই তথ্যটা কেমন যেন পুরোনো স্মৃতি ছুঁয়ে গেল। ছোটবেলায় মার কাছে শুনেছিলাম ওঁদের কোন পূর্বপুরুষ, খুব সম্ভব আগের শতাব্দীতে, যিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলেন, তারপর জীবনের বেশ অনেকদিন ইউরোপে ছিলেন। তারপর নানা জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সেনা বাহিনীতে নাম লেখান। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নাইজেরিয়ার সঙ্গে ব্রিটিশদের যে যুদ্ধ হয় তাতেও নাকি তিনি অংশগ্রহন করেছিলেন।


আমার কথা শুনে প্রফেসর সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়ল, তারপর বলল, “এটা ছাড়াও আরো কিছু তথ্য পেলাম। মৃগাঙ্ক শেখর রায়চৌধুরী ইউরোপে থাকাকালীন কোন ফরাসী মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন এবং নাইজেরিয়াতে যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছিলেন। তবে ওনার বডি পাওয়া যায়নি। সৈনিক দলের ক্যাপ্টেন ওনার মৃত্যুর পর, ওনার স্ত্রীকে ওনার হাতে লেখা একটা ডাইরি পাঠিয়েছিলেন। সেই ডাইরি নানা হাত ঘুরে এসে পৌঁছয় মুম্বাইতে এক ভদ্রলোকের কাছে, যিনি বর্তমানে আরকিওলজিক্যাল বিভাগে কাজ করেন নাম ডাঃ সাগর হান্ডে। তা এই ডাঃ হান্ডে গত মাসে তোমার দাদুর কাছে আসেন, আর সঙ্গে ছিলেন আর এক ভদ্রলোক। নাম ডাভিড কাহেজ, শুনে মনে হয় ফরাসী তবে তিনি বেলজিয়ামে থাকেন, মৃগাঙ্কশেখরের স্ত্রীর বংশধর। তো এঁরা সেই ডাইরি নিয়ে তোমার দাদুর কাছে আসেন, কি আলোচনা হয় সে বিষয়ে দাদু কিছু লিখে যাননি। তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন সেখানে। মৃগাঙ্কশেখর নাকি পুরো ডাইরিটা লিখেছিলেন এক অন্য পদ্ধতিতে, ব্যবহার করেছিলেন ট্রান্সপজিশন সাইফার”

“ট্রান্সপজিশন সাইফার?”

প্রফেসর একটা সিগারেট ধরালো, তারপর তাতে একটা সুদীর্ঘ টান দিয়ে শুরু করল, “তুমি ক্রিপ্টোগ্রাফির কথা নিশ্চয়ই জানো! ক্রিপ্টোগ্রাফি হল জরুরি তথ্য গোপন রাখার পদ্ধতি। আর ট্রান্সপজিশন সাইফার হল সেই ক্রিপ্টোগ্রাফির একটা টেকনিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পদ্ধতি খুব পপুলার হয়, তবে তার অনেক আগে থেকেই নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই পদ্ধতিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো হতো! পদ্ধতিটা খুব সিম্পল, কিন্তু নিয়ম জানা না থাকলে তোমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় সেখানে কি লেখা আছে”

“কি রকম?”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে সে আবার বলল, “আমরা যখন কোন কিছু পড়ি আমরা বইয়ের পাতায় এক একটা লাইন ধরে বামদিক থেকে ডানদিকে চোখ বোলাই। কিন্তু এই পদ্ধতিতে লেখাটা পড়তে গেলে তোমাকে ওপর থেকে নীচে পড়তে হবে। মানে প্রতিটা লাইনের শুরুটা পৃষ্ঠার মাথায় আর সব লাইনের শেষ সেই পৃষ্ঠার নীচে। বুঝলে?”


মনে হচ্ছে বুঝেছি, “তার মানে তুমি বলতে চাও আমাদের নিয়মিত বইয়ের পাতায় এক একটা লাইন হচ্ছে এক একটা রো, আর এই নিয়মে এক একটা লাইন মানে এক একটা কলম?”

“একেবারে সঠিক! এতো গেল পদ্ধতি, এবারে কথা হলো মৃগাঙ্কশেখরের ডাইরিতে কি লেখা ছিল? সেই ব্যাপারেও কোন তথ্য কিন্তু দাদুর ডাইরীতে লেখা নেই। আমি ডাঃ হান্ডে কে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছি, উনি এখন দেশের বাইরে, ফিরতে হয়তো এখনো সাত আট সপ্তাহ লেগে যাবে। অবশ্য আমি একটা ইমেল করেছি দেখি রেসপন্স আসে কি না?”

“আর সেই বেলজিয়ামের ভদ্রলোক?”

“নামটা লেখা আছে তবে আর কোন ইনফরমেশন কিন্তু লেখা নেই!” হাতের সিগারেট থেকে ছাইটা অ্যাশস্ট্রেতে ফেলে দিয়ে প্রফেসর আবার বলল, “একটাই কথা আমার খালি মনে হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত এক সৈনিকের ডাইরি যেটা লেখা হয়েছিল প্রায় একশো কুড়ি বছর আগে। সেই ডাইরী নিয়ে এতো দূর থেকে দুজন অজানা মানুষ তোমার দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এলেনই বা কেন? কি এমন তথ্য ছিল সেখানে?”

প্রফেসর নিজের শরীর টা চেয়ারে এলিয়ে দিল, এবারে চোখের দৃষ্টি শিলিঙ্গের দিকে, প্রায় মিনিট খানেক বাদে সে আবার বললে,

“খুব সম্ভব জুলাইয়ের শুরুতে এই দুই ভদ্রলোক এসেছিলেন, আর তারপর থেকে দাদু কিন্তু আর কিছু লেখেননি। আর এখানে এসেই ধাঁধাঁর জটটা ছাড়াচ্ছে না। তোমার দাদুর মতো এই রকম একটা চ্যাম্পিয়ন লোক পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোন তথ্য রেখে গেলেন না! তাহলে কি সে রকম কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়নি সেখানে? সেটা কি করে সম্ভব? নাকি দাদু কিছু তথ্য রেখে গেছেন! আর আমরা সেটা বুঝতে পারছি না!”


আরো প্রায় ঘন্টা খানেক কথা হল, পুরোনো তথ্য নিয়েই আরো খানিকটা নাড়াচাড়া হল। প্রফেসর জোর করাতে ডিনারটাও ওর বাড়িতে করে নিলাম। অনেকদিন বাদে প্রফেসরের হাতের রান্না খেলাম। পড়াশোনা আর গবেষণার কারনে প্রফেসর দীর্ঘ দিন আমেরিকাতে ছিল, সুতরাং রান্না এবং ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় এবং প্রাথমিক কাজগুলো যে তার জানা হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার নিষ্ঠার কথা না বললে অন্যায় হয়। এই আজ যে আমাকে চিকেন আর রুটি বানিয়ে খাওয়ালো, চিকেনের স্বাদ অসাধারণ বললে কম বলা হয় আর রুটি গুলোর প্রত্যেকটার আকার যথার্থ গোল, বেশ পরিনত হাতে তৈরি মনে হবে।


***


অ্যালার্ম ছাড়াই ছটার আগে আমার ঘুম ভাঙ্গে, তবে আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকালে মর্নিং ওয়াক করা আমার বহুদিনের অভ্যাস, আর মর্নিং ওয়াকে আমি মোবাইল ফোন নিয়ে যাইনা। বাড়ি ফিরে দেখি দুটো মিসড কল। দুটোই প্রফেসরের। নিশ্চয়ই ছোটদাদুর ব্যাপারে। নাহলে এতো সকালে সে আমাকে ফোন করতো না। আমার আগের অভিজ্ঞতায় এও দেখেছি কোন রহস্য যখন তার মনে জাল বিস্তার করে সে রহস্যের সমাধান হওয়া পর্যন্ত সে কোন বিশ্রাম নেয় না। সাথে সাথে ফোন ঘোরালাম, একবার রিং হতেই সে ওঠাল,


“ডাঃ হান্ডের সঙ্গে কথা হল। কয়েকটা নতুন তথ্য জানলাম। ডাভিদ কাহেজ হলেন মৃগাঙ্কশেখরের মেয়ের নাতি, পেশায় ইতিহাসের অধ্যাপক। কোন বিশেষ সেমিনারে ডাঃ হান্ডের সঙ্গে পরিচয় হয় আর তারপর তিনি ভারতে আসেন। তা এই সপ্তগ্রামে আসার এক বিশেষ কারন ছিল। মৃগাঙ্কশেখর যে ডাইরি লিখেছিলেন ট্রান্সপজিশন সাইফার ব্যবহার করে, সেটা লেখা হয়েছিল ইংরাজীতে, সেটা স্বাভাবিক। দশ, পনের বছর ধরে যে মানুষটা ইউরোপে নানা দেশে ঘুরছেন তার পক্ষে বাংলা লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু ডাইরির প্রথম পাতায় তার ইচ্ছাস্বরুপ লেখা ছিল, “বঙ্গদেশের সপ্তগ্রামে আমার আদিবাড়িতে বসবাসকারী কোন উত্তরপুরুষ বা বংশধর যদি এই ডাইরি একবার পড়ার সুযোগ পান তবে আমার মনের শেষ ইচ্ছাপূর্ণ হয়”। আর এই কথা গুলো কিন্তু বাংলাতে লেখা ছিল। ডাভিদ গবেষণার কাজে ভারতে আসেন অনেক গুলো কাজ নিয়ে, আর তাঁকে সাহায্য করছিলেন ডাঃ হান্ডে। তো কাজের ফাঁকে তাঁরা সপ্তগ্রামে ঘুরে যাওয়ার প্ল্যান করেন”


আমি চুপ করেই শুনছিলাম, প্রফেসর আবার বলল, “ডাঃ হান্ডে প্রথমে ভারতের ম্যাপে সপ্তগ্রাম জায়গাটি খুঁজে বার করেন। কিন্তু মৃগাঙ্কশেখরের বংশধরের সন্ধান তো অতো সহজে পাওয়া যাবে না। তো তিনি সেখানকার স্থানীয় পুলিশ বা প্রভাবশালী মানুষের সন্ধান করা শুরু করেন। এতে প্রায় সাত আট মাস কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত রতিকান্ত সোম নামে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত এক ব্যক্তির সহায়তায় জানা যায় সোমেশ্বর রায়চৌধুরী হলেন মৃগাঙ্কশেখরের বংশধর। তারপর এই জুলাইএর চার তারিখ তাঁরা এখানে আসেন এবং দাদুর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা মৃগাঙ্কশেখরের ডাইরিটা দাদুর কাছে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু দাদুই রাখতে চাননি। তাতে যুদ্ধবিষয়ক অনেক তথ্য ছিল এবং সর্বোপরি সে ডাইরি লেখা হয়েছিল ট্রান্সপজিশন সাইফার পদ্ধতি ব্যবহার করে। দাদুর মনে হয়েছিল এই ডাইরির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক এবং সে কারনে সে জিনিস তিনি নিজের কাছে রাখতে চাননি। ডাভিদ সে ডাইরি নিয়ে আবার বেলজিয়াম ফিরে যান। হয়তো এতোদিনে তিনি কোন মিউজিয়ামে সে ডাইরি দিয়ে দিয়েছেন”

প্রথম কথা এলো আমার মুখে, “তা সেই এক দুই ঘন্টা মানে, যতক্ষণ ওনারা সপ্তগ্রামে ছিলেন কি নিয়ে কথা হয়েছিল দাদুর সঙ্গে?”


“মূলত আলোচনা হচ্ছিল দাদুর পুরোনো বইয়ের কালেকশন নিয়ে, তবে তার আগে দাদু খুব মনোযোগ দিয়ে প্রায় আধ ঘন্টা – পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে মৃগাঙ্কশেখরের ডাইরিটা পড়েছিলেন। তারপর ওনারা ওখান থেকে চলে আসেন এবং তারপর আর কোন যোগাযোগ হয়নি। হ্যাঁ, আর একটা কথা ডাঃ হান্ডে কিন্তু তোমার দাদুর ব্যক্তিত্বে বেশ আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং ওনার মৃত্যুসংবাদে খুবই দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি অবশ্য ওনার মৃত্যুসংবাদ ছাড়া আর কোন ইনফরমেশন দিই নি”

“তাহলে এখন উপায়?”

“উপায় জানতে হলে অন্যদিক থেকে দেখো। আট – নয় মাসের আগের কথা। ডাঃ হান্ডে খোঁজ করছেন মৃগাঙ্কশেখরের বংশধরের। কেন? মৃগাঙ্কশেখরের শেষ ইচ্ছাপূরণ করে তাঁর লেখা একটি ডাইরি পড়াতে। এই তথ্য তিনি অনেককে দিলেন, এবারে সপ্তগ্রামের স্থানীয় মানুষ মনে করতেই পারে হয়তো মৃগাঙ্কশেখর কোন গুপ্তধনের সংকেত লিখে পাঠিয়েছেন। কিম্বা গুপ্তধন না হলেও হয়তো কোন টাকাপয়সা বা অন্য কোন সম্পত্তি, তাই সেই নিয়ে আমার মনে হয়, স্থানীয় কেউ বা কারা দাদুকে ভয় দেখাচ্ছিলেন বা ওনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। আর এটা ডেফিনিট, যে আর এই সব শুরু হয় ডাঃ হান্ডে এবং ডাভিদের ঘুরে যাওয়ার পর। সুতরাং আগে আমি যেটা অনুমান করেছিলাম এখন সেটা অনেক ডেফিনিট লাগছে, যে এই চাপ যখন ক্রমেই বেড়ে উঠছে তখন উনি হার্ট ফেল করে মারা যান। জানিনা, হয়তো আইনের ভাষায় এটাকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বলা যায় না, কিন্তু আমি একে পুরোপুরি স্বাভাবিক মৃত্যুও বলতে পারব না। এদিকে দাদু তাঁদের কোন তথ্য দিলেন না। তাই তাঁরা মনে করতে শুরু করলেন, দাদু লাইব্রেরীতে বইয়ের গাদায় কোন ক্লু রেখে গেছেন, আর তার সন্ধানে তাঁরা রাতের অন্ধকারে রোজ লাইব্রেরীতে হানা দিচ্ছিলেন”


কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর সে আবার বলল, “তোমার মামার সঙ্গে স্থানীয় পুলিশের চেনাশোনা থাকলে একবার রতিকান্ত সোমের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে বল। লোকাল থানা এনকোয়ারী করলে আরো ভালো হয়! দাদুর মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু জানা গেলেও জানা যেতে পারে। আমিও কথা বলতে পারি, অবশ্যই তোমার মামাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর সে আবার বলল, “তবে আমার আসল প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনো পাইনি। সত্যিই কি দাদু কোন ক্লু রেখে যাননি নাকি রেখে গেছেন সেটা আমরা বুঝতে পারছি না!”


[৪]


ছোটমামাকে সকালে ফোন করে জানিয়েছিলাম। প্রফেসর যা যা সন্দেহ করেছিল সবটাই বললাম, ডাঃ হান্ডে আর সেই বেলজিয়ামের ভদ্রলোক ডাভিদ কাহিজের আসার কথাও। রতিকান্তর কথাও এসে পড়ল। তাছাড়া মূল কারণটা ছিল প্রফেসরের অনুমানের ভিত্তিতে বোধহয় দাদুর মৃত্যুকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলা যায় না। একজন নব্বই বছরের মানুষের ওপর যে বা যারা জোরজুলুম করতে পারে তাদের নিশ্চয়ই শাস্তি হওয়া উচিত। ছোটমামার সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের বড়বাবুর পরিচয় আছে, তিনি নাকি দাদুর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এসেওছিলেন।


ছোটমামা দেরী করেননি। পুলিশের বড়বাবুকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন সন্ধ্যেবেলা রতিকান্তর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পুলিশসূত্রে জানা গেছে রতিকান্তের ব্যবসার কাজে বেশ কয়েকটা গাড়ী আছে আর তাঁর মধ্যে একটা হল সবুজ ওয়াগান-আর! সুতরাং সন্দেহ করার যথেষ্ট কারন থেকেই যায়। জানিয়ে রাখি, রতিকান্ত সোম আগে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন, তিনটে ভিন্ন ব্যবসা আছে, সপ্তগ্রামের ধনীদের যদি একটা তালিকা করা হয় নির্দ্বিধায় তিনি সবচেয়ে আগে আসবেন। যাহোক, মাস খানেক আগে ডাঃ হান্ডে যে তাঁকে যোগাযোগ করেছিলেন সেটা কিন্তু তিনি অস্বীকার করেননি। তারপর দাদুর মৃত্যুর দুই দিনে মহাদেবদার মারফত খবর এসেছিল যে দাদু দেখা করতে চেয়েছেন। কিন্তু পরদিন একটা কাজে তাঁকে বোলপুর যেতে হয়, তাই তিনি দেখা করতে পারেননি, ঠিক করেছিলেন একদিন বাদে যাবেন। কিন্তু আর দেখা হলো না, কারন পরদিন সকালে দাদুর মৃত্যু সংবাদ আসে। কথাপ্রসঙ্গে দাদুর মৃত্যুর পর, প্রতি রাতে তাঁর লাইব্রেরীতে চোর আসা, বা আমাদের গাড়ি ফলো করা, অথবা প্রফেসরের কলকাতার বাড়িতে চুরির চেষ্টা এই সব যখন তাঁকে বলা হয়, তিনি নাকি হঠাৎ করে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন এবং বেশ ধমকানোর সুরে বলে ওঠেন,

“তুমি প্রমান করতে পারবে তোমার ভাগ্নেদের যে সবুজ ওয়াগান-আর ফলো করছিল সেটা আমার? অন্য কোন সবুজ গাড়ী থাকতে পারে না? ধরো যদি করেই থাকে, কিছু অন্যায় আছে কি তাতে? আর তোমারে ভাগ্নের বন্ধুর বাড়িতে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে আমার লোক? তোমরা কি ভাবো বলো তো, বুড়ো বয়সে আমি এসব ফালতু কাজ করবো? আর কিই বা ধন সম্পত্তি তোমার কাকার কাছে ছিল? যার জন্য আমি ওঁর বাড়ি গিয়ে ওনাকে ভয় দেখাবো? থাকলে তো সেই পুরোনো বই আর পুঁথি! সেসব যতো বোগাস! তাতে তোমার কাকার ইন্টারেস্ট থাকতে পারে আমার নেই! কিন্তু এখন আমি যদি তোমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করি? কে বাঁচাবে তোমায়? ইনস্পেক্টর আপনার তো বারন করা উচিত ছিল!”

যদিও ব্যাপারটা অনেকটা ‘ঠাকুরঘরে কে আর আমি তো কলা খাইনি’ হয়ে যায়, কেননা ছোটমামা কিন্তু কখনোই অভিযোগের তীর রতিকান্ত সোমের দিকে তাক করেননি, কিন্তু মেজাজ হারিয়ে ফেলায় আর বেশী আলোচনা হয়নি। তাছাড়া রতিকান্ত প্রভাবশালী, উপযুক্ত প্রমান ছাড়া পুলিশ তাঁকে কিছুই করতে পারবে না। আর সত্যিই আমাদের হাতে কোন প্রমান নেই! তাই ছোটমামাও আর বেশীক্ষন বসেননি। প্রফেসরকে পুরো ব্যাপারটা বলার পর সে মুখে কিছু বলেনি, খালি সপ্তগ্রামের ইনস্পেক্টরের নম্বরটা পেতে চেয়েছিল।



মাঝের দুদিনে প্রফেসরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়নি, আবার হল আজ। অফিস থেকে বেরোতে প্রায় সাড়ে আটটা হল, ক্যামাক স্ট্রীট থেকে হেঁটে পার্ক স্ট্রীট মেট্রো স্টেশন, তারপর ট্রেন, এটাই আমার অফিস থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তা। খানিকটা এগিয়েছি ফোন বেজে উঠল, প্রফেসরের ফোন, খুব সংক্ষিপ্ত কথা হল এবারে, “তুমি অফিস থেকে সোজা এখানে এসো। কথা আছে”

“কি ব্যাপার?”

“ফোনে সব বলা যাবে না, তুমি এসো তাড়াতাড়ি। আমি অপেক্ষা করছি।”

সুতরাং আজ আবার গন্তব্যের দিশা পরিবর্তন হল, প্রফেসরের বাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় নটা পনের। প্রফেসর ঘরের সেন্টার টেবিলে কফির কাপ সাজিয়ে রেখেছিল, আর কফির কাপের ঠিক পাশে দাদুর হাতে আঁকা বিদ্যাসাগরের সেই ছবিটি রাখা। প্রফেসরের চোখ, মুখ আজ খুব উজ্জ্বল, আমার মন বলছে প্রফেসর কোন ‘ব্রেক-থ্রু’ পেয়ে গেছে। তার ঘরে একটি নতুন মুখের সঙ্গে পরিচয় হল, অল্প বয়স্ক ছেলে, বসেছিল প্রফেসরের ডানদিকের সোফাতে, হাতে একটি বই ধরা। প্রফেসর পরিচয় করিয়ে দিল, “সায়ন মিত্র, আমার ছাত্র”


আমি বসে পড়েছিলাম, কফির কাপটা তুলেছি ঠিক এই সময়ে প্রফেসর আবার বলল, “তোমার কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে সায়নের কাছে এবং এই কফির কাপের কাছে খুব ঋণী থাকা উচিত”

সায়নের দিকে তাকালাম, সেও রকম লাজুক মুখে তাকিয়ে আছে। হেঁয়ালিটা ঠিক বুঝলাম না, আমি সেটা বুঝিনি সেটা বুঝে প্রফেসর আবার বলল, “আসলে আমার মাথার মধ্যে গ্রে ম্যাটার এতোটাই কমে এসেছে রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য এখন মিরাকলের দরকার, নাহলে টিউবটা জ্বলেই না!”


এখনো আমি কিছু বুঝিনি, প্রফেসর সিগারেট ধরালো, “তুমি তো জানোই দাদুর ডাইরি, বইয়ের ক্যাটালগ, ট্রান্সপজিশন সাইফার এইসব নিয়ে শেষ কদিন মাথার চুল ছিঁড়ছি, দিনে দু-তিন প্যাকেট করে সিগারেট খাওয়া হয়ে গেছে, কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। তা এটা ঘন্টা দুয়েকের আগের কথা। ঠিক এই সময়ে সায়নের হাতের কফির কাপটা কেমন করে স্লিপ করে বিদ্যাসাগরের ছবির ওপর পড়ে গেল। তুমি জানো এই মনীষীদের ছবির ওপর খাবার বা পানীয় পড়ে যাওয়া ব্যাপারটা আমি জাস্ট সহ্য করতে পারিনা, কিন্তু সায়ন তো ইচ্ছে করে ফেলেনি। অসাবধানে হয়ে গেছে জিনিসটা। বকাবকি করাটা ঠিক নয় আর আমার সেটা আসেও না। তা আমি তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রুমাল নিয়ে ছবিটা থেকে জলীয় পদার্থটাকে শোকানোর ব্যবস্থা করছি, সায়নই আমাকে বলল, ছবির পেছনটা কেমন আশ্চর্য ভাবে ফুলে উঠেছে। আর এবারে আমার মাথার ভেতরে টিউব লাইটটা জ্বলল, ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে টানিছে পশ্চাতে’। এতক্ষন বাদে সেই লাইনের অর্থ বুঝলাম। তারমানে সেই ছবির পেছনের কাগজ সরাও, নিশ্চয়ই কিছু পাওয়া যাবে। প্রথমদিনেই নজর পড়েছিল কিন্তু মাথায় আসেনি সেখানে কিছু লুকোনো থাকতে পারে। আর সেই কারনে দাদু তোমাকে চিঠি লিখে এই ছবি নিয়ে যেতে বললেন আর আসল ক্লু টা দিয়ে গেলেন হাতে লেখা চিঠিতে। সে চিঠি পোস্ট হবার আগে যদি কেউ পড়েও থাকে তার অন্তর্নিহিত অর্থ কিন্তু বুঝবে না। খুব স্বাভাবিক, আমরাও বুঝিনি”


মিনিট খানেক আমার মুখেও কথা আসেনি, প্রফেসর পেছনের কাগজটা সরালো, তারপরে ছবির ভেতরের প্যাকিং টা বেরোলো, তারপর বেরোলো ছবির ঠিক নীচে রাখা একটা চার ভাঁজ করে রাখা কাগজের টুকরো, সেটাকে খুললে হাতে লেখা একটা কাগজ। যেটা লেখা সেটা পড়তে পারলাম কিন্তু বুঝতে পারলাম না, তাতে লেখা আছে






অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি আছি, প্রফেসরের গলা শুনলাম “পড়ার জন্য ট্রান্সপজিশন সাইফার!”

বিদ্যুতের মতো মাথা কাজ করল, পড়তে পারলাম, লেখাটা অনেকটা এই রকম


২৬শে সেপ্টেম্বর আপনাকে উপহার দেবার ইচ্ছা ছিল। আপনি মহাপন্ডিত, মহামানব। আপনি বলেই আমার মতো এক নির্বোধ ছাত্রের জন্য এত পরিশ্রম করেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলাম না, তাই আপনার তৈরি নন্দনকাননের সন্নিকটে ঋজুপাঠের নিচে রইল সে স্মৃতি। আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। খুনের পাপ আমার মাথায়। জানি অন্যায় করেছি। পারলে ক্ষমা করবেন। মৃগাঙ্কশেখর


প্রফেসর একটা সিগারেট ধরালো, “এবারে হিসেবটা মিলল”

“মানে?”

“আমি খালি মনে হচ্ছিল দাদু যদি ক্লু টা পেয়েই থাকেন তিনি নিজে কিছু চেষ্টা করলেন না, কেন? এখন বুঝলাম ব্যাপারটা, প্রায় নব্বই বছর বয়স, বয়সের ভারে অথর্ব অবস্থা, অন্যত্র কোথাও গিয়ে খোঁজাখুঁজি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, হয়তো তোমার মামাদের ওপর তাঁর সেই রকম আস্থাও ছিল না। এদিকে তিনি চাননি সে জিনিসের কোন অপব্যবহার না হোক, তাই তোমাকে চিঠি লিখে ক্লু দিয়ে গেলেন”


মিনিট খানেকের বিরতির পর, আবার প্রফেসরের গলা শুনলাম, “তবে তোমার দাদু কি রকম জিনিয়াস ভাবো, নানা চাপ সত্ত্বেও নিজের ডাইরিতে আর এক খানা ক্লু দিয়ে গেলেন। মৃগাঙ্কশেখরের ডাইরি নিয়ে কিছু লিখলেন না, খালি লিখে গেলেন ট্রান্সপজিশন সাইফারের কথাটা। মানে এই চিঠিটা যদি অন্য কারুর হাতে পড়ত তার পক্ষে সেটাকে বোঝা খুব সহজ কিন্তু ছিল না”

মনে পড়ে গেল, তাই বললাম, “আচ্ছা আর রতিকান্তের ব্যাপারে কিছু জানা গেল?”

“খুব ধুরন্ধর লোক! আর পুলিশও প্রমান ছাড়া কিছু করতে চায়না! তবে এই সব ক্লু পেলেও ও কিছু বুঝতে পারতো না”

আমার ঘোর তখন কাটেনি, “আচ্ছা এই চিঠি কি মৃগাঙ্কশেখরের লেখা?”

“খুব সম্ভব নয়, ১৯০০ সালের আগে চলিত বাংলা সম্ভবত চালু হয়নি, তখন সাধু ভাষাতেই লেখা হত। আমার মনে হয়, মৃগাঙ্কের ডাইরি থেকে দাদু এটা লিখে নিয়েছিলেন তারপর সে কাগজটা এই ছবিতে পেছনে ঢুকিয়ে দেন, আর ছবির পেছনটা আর একবার প্যাক করে দেন”

এতক্ষনে ব্যাপারটা বুঝলাম কিন্তু যেটা বুঝলাম না, চিঠির বক্তব্যটা, “সে তো বুঝলাম কিন্তু মৃগাঙ্কশেখর এই চিঠি কাকে লিখলেন? আর নন্দন কানন? সেই ভুবনেশ্বরে?”

“এই চিঠি লেখা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় একশো তিরিশ বছর বা তারও আগে, সেখানে ভুবনেশ্বরে নন্দনকানন তৈরি হয়েছে ১৯৬০ সালে। সুতরাং সে সম্ভাবনা নেই।”

“তাহলে?”

“তাহলে, ভাবতে হবে!”

“আচ্ছা, চিঠিটা কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা বলে মনে হয় তোমার?”

“সেকি? তুমি এখনো বোঝোনি?”

মাথা নাড়তেই হল, সত্যি বুঝিনি, “মহামানব, মহাপন্ডিত কাকে বলা হয়েছে?”

প্রফেসর আবার বলল “কোন এক মহাপন্ডিত যাকে উপহার দেওয়ার কথা, ২৬শে সেপ্টেম্বর, সেটা তাঁর জন্মদিনই হওয়া উচিত। এই মানুষটাকে কি কেউ কখনো ভুলতে পারবে? কবিগুরু বলেছিলেন বিধাতা বাঙালী বানাতে বানাতে কেমন করে যে এনাকে বানিয়ে ফেললেন?”

আর বলতে হলো না, বুঝতে পারলাম! যথার্থ জায়গায় সংকেত ছিল। যাঁর জন্য লেখা সেই লেখা তাঁর ছবির ভেতরেই রেখে গেছিলেন দাদু। “কিন্তু আর একটা প্রশ্ন থেকে গেল যে?”

“নন্দনকানন?”

“হ্যাঁ”

“কাল দেখাবো, তার জন্য একটু ট্রেনে চেপে বাইরে যেতে হবে”

“কোথায়?”

“খুব দূরে নয়, ঘন্টা তিন চারেক লাগবে”

“জায়গাটা কোথায় তো বলো!”

“কর্মাটাড়! ১৮৭৩ সালে স্থানীয় এক ব্রিটিশ মহিলার কাছ থেকে তিন একরের মত জমি কিনে তিন কামরার ছোট একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, আর তার নাম দিয়েছিলেন ‘নন্দনকানন’। নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় মানে পুত্রকে উনি ত্যাজ্য করে দিয়েছিলেন, তো সেই রাগে নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন কলকাতার মল্লিক পরিবারকে। মল্লিক পরিবারের সদস্যরা কিন্তু সে বাড়ীকে অক্ষত রেখেছিলেন। পরে বিহারের প্রবাসী বাঙ্গালীরা যখন ‘বিহার বাঙালী সমিতি’ তৈরি করেন সেই বাড়ি তাঁরা মল্লিকদের কাছ থেকে কিনে পুনরুদ্ধার করেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মৃগাঙ্কশেখর নন্দনকানন বলতে সেটাকেই বলেছেন।”

“রতিকান্তর সাঙ্গ-পাঙ্গ আবার দলবল মিলে আমাদের ফলো করবে না তো?”

“করতেও পারে! তার জন্য আমি আগে ভাগে একবার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি। ডাঃ সোম এখন এশিয়াটিক সোসাইটির একজন ডাইরেক্টর, আবার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগেরও খুব উচ্চপদস্থ অফিসার, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে প্রায়ই আসেন রিসার্চের জন্য। পুলিশ খুব খাতির করে। ওনার কাছেই জানলাম, কর্মাটাড় দুমকা থানার এলাকায় আসে, তাই দুমকা থানায় কথা বলে রেখেছি। আমাদের সঙ্গে কাল পুলিশ থাকবে যাতে এইসব অবাঞ্ছিত আপদগুলো কোন সমস্যা না তৈরি করতে পারে!”

“আচ্ছা আর একটা কথা! ধন বলতে কি বোঝানো হচ্ছে? কি রকম ধন?”

“সে জানি না, গিয়ে দেখতে হবে। তবে বিদ্যাসাগরের ছাত্র, শিক্ষককে বিদ্যার জিনিসই উপহার দেবেন, আমার বুদ্ধি তো তাই বলে!”


***


কর্মাটাড় স্টেশনের নাম পরিবর্তন হয়ে এখন হয়েছে বিদ্যাসাগর। আমরা দেরী করিনি, পরদিন সকালেই শেয়ালদা থেকে মজফরপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ধরেছিলাম, কর্মাটাড় পৌঁছতে প্রায় একটা বাজল। স্টেশনে আমাদের জন্য তিনজন পুলিশ অপেক্ষা করছিলেন। জানিনা, শেষপর্যন্ত তাদের কোন প্রয়োজন হবে কি না, তবে সঙ্গে থাকাটা নিঃসন্দেহে আমাদের অনেকটা স্বস্তি দিয়েছিল। ‘নন্দনকানন’ আমাদের দেখতেই হত। আগে শুনেছিলাম কিন্তু এখন স্বচক্ষে দেখলাম, বিদ্যাসাগরের তৈরি সে বাড়ি আজ একটা সুন্দর মিউজিয়ামে পরিনত হয়েছে। জায়গাটা পরিদর্শন করতে অবশ্য আমাদের তেমন বেগ পেতে হল না। বাড়ির পরিচর্যা করার জন্য যিনি কেয়ারটেকার রয়েছেন তিনিও সাহায্য করলেন। আমাদের সব কিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। বিদ্যাসাগর নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন সে বাড়ি, রাতের স্কুল চালানোর জন্য ছিল একটি হলঘর, তার এক পাশে শোবার ঘর আর এক পাশে পড়াশোনা করার ঘর। শোওয়ার ঘরে রয়েছে তাঁর খাট আর তার ওপর তাঁর আবক্ষ এক মূর্তি। পিছনের দিকে রান্নাঘর, শৌচাগার ও স্নানাগার। তাঁর ব্যবহৃত অন্যান্য অনেক জিনিসও রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষিত রয়েছে যথাযথ ভাবে।

অবশ্য আমাদের উদ্দেশ্য ‘নন্দনকানন’ নয়, আমাদের বার করতে হবে ‘ঋজুপাঠ’। এটা আমাদের দুজনেরই জানা যে তিন খন্ডে লেখা বিদ্যাসাগরের ‘ঋজুপাঠ’ যা কিনা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয়ের পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে একটি অন্যতম। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই ‘ঋজুপাঠ’এর নিচে বলতে কি বোঝালেন মৃগাঙ্কশেখর? আমাদের কেয়ারটেকার অবশ্য সে ব্যাপারে কোন আলোকপাত করতে পারলেন না! প্রফেসর কাল সারা রাত জেগে পড়াশোনা করেছে, আজ সারা সকাল ট্রেনে বই মুখে বসেছিল, মাঝে মাঝেই ফোনে কথা বলছিল, বুঝতে পারছি ‘ঋজুপাঠ’ আমাদের লাস্ট হার্ডল।


নন্দনকাননের প্রাঙ্গন ছাড়িয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। এটা জানতাম বিদ্যাসাগর নিজে খুব বাগানপ্রিয় ছিলেন। বাড়িতে ঢোকার ডান দিকে নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন একটি কিষাণভোগ আমগাছ। ঝাঁকড়া সেই আমগাছ আজও রয়েছে। রয়েছে বাগানের শেষ প্রান্তে ওনার নিজের হাতে লাগানো একটি ভাগলপুরি ল্যাংড়া আমগাছ। আরো পাঁচটা আম গাছ লাগিয়েছিলেন তবে নন্দনকাননের চত্বরের বাইরে। কোনটাতেই আম আসে না, কিন্তু স্মৃতি গুলো বেঁচে আছে। দেখে সত্যি ভালো লাগে সেই গাছের পরিচর্যা হয়। বাড়ি ছাড়িয়ে সামনে রাস্তা, সে রাস্তা চলে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। ১৩০ বা তার চেয়েও বেশী বছরের পুরোনো কোন স্মৃতি নিয়ে যখন খোঁজাখুঁজি চলছে, সুতরাং নতুন গড়ে ওঠা শহরে ঢুকে লাভ নেই। প্রফেসর বরং অন্য দিকে হাঁটা লাগালো, সে জায়গা অনেক নির্জন, মানুষের আনাগোনা কম। বেশ মিনিট পনের কুড়ি হয়ে গেছে, আমরা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাঘুরি করে খানিকটা ক্লান্ত, সিগারেটের বিরতি নিচ্ছি, অনেকক্ষন থেকে মাথায় ঘুরছিল কথাটা, এবারে বলেই ফেললাম

“আচ্ছা প্রফেসর ব্যাপারটা কেমন নস্টালজিক নয় কি, স্বয়ং বিদ্যাসাগর নিজে যে গাছ লাগিয়েছিলেন সেই গাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে”

“হ্যাঁ ঠিক, কাশ্মীরেও তো তুমি সম্রাট আকবরের রোপিত গাছ দেখতে পাবে”

“আচ্ছা, বিদ্যাসাগর এতো সুন্দর বাড়ির নাম দিয়েছিলেন, গাছেদের নাম দেননি”

হঠাৎ করে প্রফেসর উঠে দাঁড়াল, “কি বললে গাছেদের নাম?” তার গলার স্বর জানান দিচ্ছে সে উত্তেজিত।

“কেন আমি কি ভুল বললাম, আগেকার দিনে তো অনেকে গাছেদের নাম দিতেন”

“ব্রিলিয়ান্ট! তুমি তো জিনিয়াস! তুমি তো রহস্যভেদ করে দিলে”

“মানে?”

“কি শুনলে আগে? সাতটা আম গাছ, ওনার লাগানো, এবারে বিদ্যাসাগর মানে তোমার কি মনে আসে? বর্ণমালা! কি দিয়ে শুরু তাহলে?”

“মানে?”

“বর্ণমালা লেখা হয় কি ভাবে?”

“অ, আ, ই, ঈ”

“তাহলে বর্ণমালা শুরু হয় কি দিয়ে?”

“অ”

“কারেক্ট! এবারে ভাবো, বিদ্যাসাগরের লেখা বই, বর্ণমালা অনুযায়ী এক নম্বরে কে আসছে?”

“বিদ্যাসাগরের বই?”

“হ্যাঁ, বইয়ের নাম। আরে বুঝছো না, এই হিসাব মৃগাঙ্কশেখরের, তাহলে প্রখমে কে আসে?”

আমি এখনো পুরো ব্যাপারটা বুঝিনি, সে আবার বলল, “অ দিয়ে ওনার কোন বই নেই, তাহলে এক নম্বরে আসে ‘আখ্যানমঞ্জরী’, দুই?”

এবারে ব্যাপারটা বুঝলাম, “হ্যাঁ, ই ঈ দিয়ে কিছু নেই, তাহলে দুই হল ‘উপক্রমনিকা’”

“গুড! আর তিন?”

“ঋজুপাঠ?”

“হ্যাঁ, ঠিক! তার মানে তিন নম্বর আম গাছের নিচে মৃগাঙ্কশেখর তাঁর স্মৃতি রেখে গেছেন।”

“কিন্তু তিন নম্বর টা বুঝবে কি করে? মানে কোনটা থেকে গোনা শুরু করবে?”

“অবশ্যই নন্দনকানন থেকে, সেখানে এক আর দুই, আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিকের গাছ, যেটা বাঁদিকে রাস্তা ঢালু হয়ে নিচে চলে যাচ্ছে”

“তুমি সিওর?”

“এটাই হবে মনে হচ্ছে। একটা চান্স নিয়ে দেখা যেতেই পারে”

“কি করে?”

“একটু মাটিটা কুপোতে হবে, কেয়ারটেকার ভদ্রলোককে বলি চলো, দুজনকে লোককে জোগাড় করতে হবে। সত্যি বলতে আমরা তো আর গাছ কাটছি না, কোন বেআইনি কাজও করছি না। খালি একটু খুঁজে দেখা, যদি কিছু পাওয়া যায়। আর সত্যি যদি কিছু পাওয়া যায়, সেতো মিউজিয়ামেই পাঠানো হবে, আমরা তো আর নিয়ে যাবো না। আমার মনে হয় কোন অসুবিধা হবে না, চলো আর দেরী করা ঠিক হবে না”


কেয়ারটেকার মশাইকে ইমপ্রেস করতে প্রফেসরের বেশী সময় লাগেনি। আমাদের সঙ্গে পুলিশ ছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কথা উল্লেখ করতেই কাজ হল। তিনিই লোক জোগাড় করে নিয়ে এলেন। তবে সেসব অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে আরো ঘন্টা খানেক লাগল। যা হোক, দুজন লোক নয় চারজন লোক লাগানো হল, প্রফেসর দুমকা পুলিশ স্টেশনেও একবার কথা বলে রাখল। আর এইসব কাজে পুলিশকে জানিয়ে করাই ভালো। মাটি খোঁড়া যখন শুরু হল তখন ঘড়িতে প্রায় সাড়ে চারটে। যা হোক, বলিষ্ঠ পুরোনো গাছ আর তাকে ডিস্টার্ব করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, গাছের মূলে হাত দেওয়া হয়নি, চারপাশ একটু কুপিয়ে দেখা হচ্ছিল। প্রফেসর প্রথম থেকেই বলছিল গাছের নিচে সে জিনিস থাকবে না। যদি সে জিনিস এখনো থেকে থাকে তবে গাছের চত্বরে আছে। চারপাশ খুঁড়লে হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মিনিট পনের বাদে আমরা যেটা বুঝলাম যতটা সোজা ব্যাপারটা আমরা ভেবেছিলাম ততটা নয়। দেড়শো বছরের গাছ, তার শেকড় মাটির সঙ্গে এমন গভীর বন্ধুত্ব করে ফেলেছে, কোনমতেই সে বাঁধন আলগা হয় না। কিছু কিছু জায়গায় শেকড়ের বাঁধন কাটতে হল, কিন্তু তাতে ও খুব সুবিধা হছিল না। আমরাও অবশ্য হাল ছাড়িনি। গাছ থেকে চার পাঁচ ফিট দূরে একটা বৃত্ত বানিয়ে সে জায়গার মাটি কুপোনো শুরু হল। এবারে সমস্যা হল একটা পাশ ঢালু হয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। যারা এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ তাঁরা বললেন তাতে নাকি গাছের ক্ষতি হবে। সেটা আমাদের কাম্য নয়, সুতরাং যতটা সম্ভব গাছ কে বাঁচিয়ে কাজটা করা হচ্ছিল।


প্রায় এক ঘন্টা বাদে পাওয়া গেল, মাটির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল একটা প্রস্তর ফলক, তারপর সেটাকে সরাতে দেখা গেল একটা বাক্স, ছোট, আকারে বা আয়তনে একটা ল্যাপটপ রাখা যেতে পারে তার মধ্যে। সেটাও পাথরের তৈরি। প্রফেসর সেটাকে হাত দিয়ে বার করল, অনেক দিন আগের জিনিস, প্রথমে সেটা বেরোচ্ছিল না, তারপর দুজনে মিলে টানাটানি করতে সেটা বেরোলো। কিন্তু খুলছিল না, বেশ মিনিট পাঁচেকের চেষ্টায় সেটা খোলা হল। প্রফেসরের অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।


কোন সোনাদানা নয়, সুন্দর প্যাকিং করে চামড়ার মোড়কে একটা বইয়ের মতো কিছু রাখা আছে। এবারে সেটা বেরোতে যেটা দেখলাম সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। এটা দুশো-আড়াইশো পাতার একটা বইয়ের পান্ডুলিপি, যার সম্পূর্ণটাই হাতে লেখা, বইয়ের নাম “বিধবা বিবাহের সপক্ষে”। এত সুন্দর করে সেটা প্যাকিং করা বইয়ের পাতা গুলো নষ্ট হয়নি, লেখাগুলিও অক্ষত। প্রথম পাতায় লেখা রয়েছে “বইটি উৎসর্গীকৃত করা হইল পন্ডিত ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরণে”, আর যেটা আরো আকর্ষণীয় সেটা লেখা পরের পাতায়, “পর্যালোচনা এবং সংশোধন করিয়াছেন ইশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়”। এবারে সেই পান্ডুলিপি খুলতে দেখতে পেলাম, মুক্তোর মতো হাতে লেখা সেই বই, আর তার মধ্যে ততোধিক মুক্তোর মত হাতের লেখায় সংশোধন। বুঝতে অসুবিধা হলো না, কে সেই সংশোধন গুলো করেছেন। অনেক ঐতিহাসিক পান্ডুলিপি দেখেছি, পুরোনো পুঁথি দেখেছি, কিন্তু এই জিনিস কখনো দেখিনি। শিক্ষক নিজে হাতে সংশোধন করে দিয়েছেন ছাত্রের লেখা বইয়ের পান্ডুলিপি। যেখানে ছাত্রের নাম মৃগাঙ্কশেখর রায়চৌধুরী আর শিক্ষক স্বয়ং পন্ডিত ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! বইয়ের উপাদান অতোটা পড়ে উঠতে পারলাম না। একে ভাষাটা আগেকার বাংলা, যেখানে সংস্কৃতের খুব আধিক্য থাকত। আর তার চেয়েও একটা ঐতিহাসিক ডকুমেন্টস খুঁজে পাওয়ার যে উত্তেজনা সেটা আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে বিহ্বল এবং বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল।


প্রফেসরও হয়তো আমার মতো কথা হারিয়ে ফেলেছিল। সত্যি বলতে আমার কিন্তু এক্ষুনি পুরো বইটা পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু অন্য দিকটা দেখাও দরকার ছিল। বুঝুক না বুঝুক চারপাশে কিছু স্থানীয় মানুষের ভিড়ও জমে উঠেছিল। এই রকম একটা জিনিসের নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে। আমাদের দুমকা পুলিশ স্টেশন যেতেই হল। এদিকে সূর্য ঢলে পড়েছে, দিনও শেষ হয়ে আসছে, জায়গাটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে আর তার মধ্যে আমাদের ফেরার ব্যাপারটাও ছিল। আগে তো জানতাম না, এই রকম একটা জিনিস আমরা খুঁজে পাবো যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম বললেও কম বলা হয়। তাহলে হয়তো আর একটু বেশী সময় নিয়ে আসতাম।


অবশ্য তারপর আর কোন প্রবলেম হয়নি। ছোটমামার সাথেও কথা হলো, সত্যি বলতে ছোটদাদুর উত্তরসূরী বলতে মামারা আমার আগে আসেন, তাই তাঁদের একটা অনুমতির দরকার ছিল। জানতাম সহজে পেয়ে যাবো, পেয়েও গেলাম। ছোটমামা আরো দুটো কথা বলল, এক, “আর কাউকে কিছু জানাতে হবে না। ওসব কেউ কিছু বুঝবে না, খালি বাগড়া দেবে”। দুই, “আর তোর বন্ধু কবে আসছে এখানে? বলল কিছু বই নিয়ে যাবে। ও না নিয়ে গেলে আমি বই গুলো রামপুরহাটে পাঠাতে পারছি না”।

পুলিশের কাছে একটা আবেদন পত্র জমা করে দিলাম, যাতে পান্ডুলিপিটা যথাযথ মর্যাদায় মিউজিয়ামে জমা করে দেওয়া যায়। রাতে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের সঙ্গে দুজন পুলিশকেও দেওয়া হল, যাতে কোন বিপদ না হয়। রাতে ট্রেনে ফিরতে ফিরতে অনেক কথা হচ্ছিল, কিছুটা স্মৃতি রোমন্থন, আবার কিছুটা গত এক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর্যালোচনা। প্রফেসর বেশী বলছিল আর আমি শুনছিলাম। রতিকান্তর কথা অবশ্যম্ভাবী ভাবে এলো, প্রফেসরের অনুমান তার লোকেরা এখানেও ছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে ছিল। তবে সে মুহূর্তে জানতে পারল, এইসব বই-টই এর ব্যাপার তৎক্ষণাৎ কেটে পড়েছে! আরো অনেক কথা হচ্ছিল, প্রফেসরের যে কথাটা সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, সেটা একেবারে আমার একদম মনের কথা

“দিন তিন চারেক আমাদের কাছে থাকবে, আমরা একটু পড়ে নেব। আর সত্যি বলতে কি, আমার ইচ্ছে আছে সব কটা পাতার ছবি তুলে কমপিউটারে রেখে দেব। কাউকে দেখাতে নয়, কারুর জন্য নয়, খালি নিজের জন্য, নিজের কাছে। যে মানুষটা একটা ভাষার জন্য বর্ণমালা লিখে দিয়েছেন তাঁর নিজের হাতে লেখা সেই বর্ণ – এর চেয়ে বেশী মূল্যবান সম্পদ হতে পারে কি? এতোটা বোধহয় রতিকান্ত আশা করেনি, নাহলে বোগাস বলে উড়িয়ে দিতো না!”





ছোটবেলার অনেক কথাই কথা এখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। তবে এটা বেশ মনে আছে, মা-র হাত ধরে যখন বাংলা বর্ণের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তখন আপনার সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল। ‘বর্ণপরিচয়ের’ গোলাপী প্রচ্ছদ মলাটে আপনার একটা মুখ, যেটা বেশ অস্পষ্ট দেখাতো। মার কাছে শুনেছিলাম আপনি বর্ণমালা নিয়ে এসেছিলেন বলেই আমরা বাংলা ভাষায় পড়তে আর লিখতে পেরেছি। আপনার জীবনের কিছু শোনা আর পড়া তথ্য এখানে উল্লেখ করলাম। সেইসব তথ্য, কবিগুরুর ‘দুর্ভাগা দেশ’ আর ট্রান্সপজিশন সাইফার ছাড়া পুরো কাহিনীটাই কাল্পনিক।