• দীপাঞ্জন মাইতি

হাসি মানুষের সহজাত প্রকাশ - তবে হাস্যরস সহজাত নয়







“রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা,

হাসির কথা শুনলে বলে,

“হাসব না-না, না-না!”

সদাই মরে ত্রাসে— ওই বুঝি কেউ হাসে!

এক চোখে তাই মিটমিটিয়ে

তাকায় আশে পাশে।”


রামগরুড়ের ছানাগুলোর কি বিপদ না! বেচারারা জানেই না হাসির কত্ত কারণ। আমি নিশ্চিত ছানা কেন রামগরুড়ও কল্পনা করতে পারে নি বাংলার হাস্য-সম্রাট সুকুমার রায় ছানাদের ‘হাসির মানা’কেই হাসির কারণ মত সাজিয়ে ফেলেছেন। ঠিক এটাই হল হাসির ব্যাপার – হাসির আবহে গোমড়া মুখো লোকটাই হাসির কারণ; মানে কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রাণীর অস্বাভাবিক কার্যকলাপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হাসির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যেমন আমার জীবনে হাসির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যখন আমায় বলা হল ‘সাহিত্যে হাস্যরস’ বিষয়ে লিখতে হবে.. যদিও আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না তবে সত্যি বলছি হাসির কথা লিখতে বসে আমার এ ক’দিনে বাস্তবিকই চোখের জলে নাকের জলে অবস্থা হয়েছে। তবে এই যাত্রায় একখানা মূল বিষয় বুঝতে পেরেছি হাসিটা মানুষের সহজাত প্রতিক্রিয়া।


আচ্ছা আপনাদের নিশ্চয় রামগরুড়ের চেহারাখানা মনে আছে! ঐ চেহারায় অমন ভ্যাটকানো মুখ দেখে হাসি পাবে না? পাবেই তো। এই ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন হঠাৎ গোপাল ভাঁড়ের মত চেহারার কাউকে দেখলেন বা দুই বন্ধুকে কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলেন যাদের সাথে মিল পাওয়া যায় চাচা চৌধুরী আর সাবুর; কথা বার্তা তো পরে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাপার দেখলেই তো হাসি পাবে। আমি জানি বড়রা ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন মোটা মানুষকে দেখে হাসতে নেই, আমরাও ছোটোদের শেখাই। কিন্তু সে তো নিজেরাই বুঝতে পেরেছি বেশ খানিকটা বড় বয়সে এসে; আর গল্পগুলো পড়েছি অনেক ছোটবেলায়। সেই বয়সে কিন্তু হাসির ফোয়ারা ছোটানো গোপাল ভাঁড়ের কথাগুলোর পশ্চাৎপটে অমন একখানা মিষ্টি দুষ্টু গোলগাল চেহারারও একটা বড় ভূমিকা ছিল। ঠিক যেমন ছোট্টখাট্টো চাচা চৌধুরীর কথা শুনে দৈত্যাকার সাবুর অসম বন্ধুত্ব; বিশেষ করে সাবুর চাচা চৌধুরীর কথা শুনে চলার মধ্যে যে অসামঞ্জস্য আছে তা থেকে প্রথম হাসির উদ্রেক হয়। আর একবার হাসির আবহ তৈরি হলে তারপর তো হাসির রোল.. একেবারে সেই – “হা রে রে রে আমায় রাখবে ধরে কে রে..”


হাসির কথায় হাসতে হাসতে আমরা কিন্তু একটু একটু করে হাসির ভাগ বিভাগে ঢুকে পড়েছি। হাস্যরসের অনেকগুলি ভাগ আছে যেমন – কৌতুক, ব্যাঙ্গ, বিদ্রূপ, শ্লেষ ইত্যাদি। হাস্যরসের এই বিভাগগুলি বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত এবং বিভিন্ন ভাষা ভেদে তাদের বিভিন্নতার সূক্ষ্মতাও বিভিন্ন। যেমন - ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রে Humor, Comic, Ridicule, Wit, Satire, Banter, Lampoon ইত্যাদি। তবে গ্রীক, রোমান, ইংরেজি, বাংলা ইত্যাদি বিভিন্ন সাহিত্যে হাস্যরসের ইতিহাসে বিবর্তনের একটি মূল ধারা দেখা যায়। খুব অদ্ভুতভাবে আমার মনে হয়েছে এই বিবর্তনের মূল ধারা যেন আমাদের ছোট থেকে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পরিণত হওয়ার মতই। ভাষা যত পরিণত হয়েছে, পরিণত হয়েছে হাস্য-রসবোধ। তাই কোনও বিশেষ ভাষার ইতিহাসে না গিয়ে হাস্যরসের বিবর্তনের ধারা এবং তার মূলে থাকা মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করে দেখেছি আমি।


বিবর্তনের কথায় যখন এলো তবে তো শূন্য থেকেই শুরু করতে হয়। হাসির যাত্রা শুরু ঠিক বিবর্তনের কোন বিন্দু থেকে বলা মুশকিল তবে মানুষের পূর্ব-পুরুষ মানে শিম্পাঞ্জিদের হাসতে পারা ক্ষমতা নিয়ে কিন্তু কোনও সংশয় নেই। তাই বোধহয় কান্নার পর যে কোন মানব শিশুর সবচেয়ে সহজাত প্রকাশ মাধ্যম হল হাসি। একটি সভ্যতার বিবর্তনের সাথে জড়িয়ে থাকে ভাষা, ইঙ্গিত এবং সংযোগসূত্রের বিবর্তন আর ঠিক এই জায়গাতেই কিন্তু হাসির ভূমিকা। যে কোনও ভাষা সাহিত্যে হাস্যরসের বিবর্তন ধারা বুঝতে গেলে সেই জাতির বিবর্তন ধারাকে চিনতে হবে। ভাষা সাহিত্য, হাস্য রস, জাতি সবাই যেন জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। আর তাদের বিবর্তনে ধারা যেন একটি শিশুর পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত হওয়ার পদচিহ্ন ধরে হেঁটে চলে।


হাস্যরস অর্থাৎ Humor শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ Humorem থেকে, যার অর্থ হল তরল পদার্থ। খ্রিষ্টপূর্ব চার শো শতকে চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক গ্রীক চিকিৎসক হিপ্পোক্রেটস বিশ্বাস করতেন মানুষের শরীরে চার ধরনের তরল পদার্থ আছে যাদের অনুপাত ভিন্নতায় শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়। জন্ম নেই বিষাদ, আনন্দ, কান্না, হাসি। প্রায় ষোড়শ খ্রিষ্টাব্দ অবধি এই হিউমার পরিবর্তিত হতে হতে শারীরিক থেকে সম্পূর্ণ রূপে মানসিক অবস্থাসংক্রান্ত একটি বিশেষণে পরিণত হয়। তবে তখনও কিন্তু হিউমার, মুহূর্ত দীর্ঘ মানসিক অবস্থার প্রকাশ যেমন আমরা সচরাচর ‘মুড’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। ষোড়শ শতকে ইংরেজি সাহিত্যের ব্যবহারে দেখা যায় হিউমার শব্দটি মূলত অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মানসিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। ঠিক যেমন চাচা চৌধুরী আর সাবুর বন্ধুত্ব এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতির কথা বলা তেমন। আর এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে মানুষের কাজ কর্ম যে হাস্যরসের জন্ম দেয় সেই সূত্রেই ষোড়শ শতক থেকেই হিউমার এর অস্তিত্ব সাহিত্যের স্বার্থে পাকাপাকিভাবে হাস্যরসের সাথে জড়িয়ে যায়।


অসামঞ্জস্য সে শারীরিক হোক বা ব্যবহারিক তার সাথে কোথাও না কোথাও একটা অসহায়তা জড়িয়ে থাকে। আর ঠিক সেজন্যেই তা কখনই হাসির বিষয় হওয়া উচিত নয়। ঐ যে একটু আগে বলছিলাম না – বড়রা ছোটোদেরকে মানা করেন কিন্তু গোপাল ভাঁড়কে দেখে হাসি পায়। ঠিক তেমনই মাথায় রাখতে হবে তখন হাস্যরসের না হোক হাস্যরসরূপে হিউমারের শৈশব কাল। একদিকে যেমন প্রাত্যহিক কোনও না কোনও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনা হাসির জন্ম দেয় তেমনই সেই পরিস্থিতির অনুকরণও কিন্তু হাসির উদ্রেক করে। এই থেকেই যাত্রা শুরু ইংরেজি সাহিত্যে তথা শিল্পে হাস্যরস সৃষ্টির চেষ্টা। অর্থাৎ সাহিত্যে পাঠককে হাসানোর জন্য কোনও পরিস্থিতি পৃথক ভাবে তৈরি করা বা নাটকের দৃশ্যে হাসির আবহ গড়ে তোলার সপ্রতিভ চেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যায় এই সময় থেকে। তবে এখানে একটা বিশেষ জিনিস বুঝতে হবে মূলত একদম প্রাথমিক অংশে হাস্যরস কিন্তু পরিহাসমূলক ছিল। কারোর অস্বাভাবিকতাকে নিয়ে পরিহাসের মাধ্যমে কোথাও না কোথাও একটা তার অস্তিত্বকে তুচ্ছ নির্দিষ্ট করার মধ্যে পাঠক, দর্শক, লেখর, নাট্যকার উপভোগ্য একটি বিষয় খুঁজে পান। ঠিক এই জায়গাটাই যে কোন ভাষার ইতিহাসে মিলে যায়। গ্রীক বা রোমান সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক ক্ষেত্রে যেখানে বীর গাথা ভিত্তিক শ্রূতিকথা, রচনা বা নাটকের কথা জানা যায় সেখানে বিজয়ীদের যতটা বীররূপে ধন্য ধন্য করা হয়েছে বিজিতদের কিন্তু ঠিক ততটাই পরিহাস করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সূচনা কালে মঙ্গলকাব্যে যে সামান্য হাস্যরসের উপাদান পাওয়া যায় তা মূলত চড়া ধাতের শারীরিক গোছের। পাশাপাশি একদম শুরুর সময় থেকেই উপহাস বা ব্যাঙ্গের উপস্থিতি দেখা যায় ভীষণ মাত্রায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রমাপ্রসাদের ভক্তি গীতির ব্যাঙ্গ করে প্যারোডি গান বেঁধেছেন আজু গোঁসাই।


বিবর্তনের ধারা বজায় রেখে উপহাস – ব্যাঙ্গ কখন যেন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে পরিহাস – বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বাংলা সাহিত্যে প্যারোডি গান থেকে কবিগানের পালা অবধি হাস্যরসের যাত্রা। যদিও কবিগান বাঙলা সংস্কৃতির এক বিশদ অংশ জুড়ে রয়েছে তবু কবির লড়াইয়ে বিদ্রূপ কে ইংরেজি সাহিত্যের রিডিকিউল থেকে খুব পৃথক করা যায় না। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতকের হিউমার অষ্টাদশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে রিডিকিউল অর্থাৎ ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে আত্মতুষ্টির দ্বারা সৃষ্টি হাস্যরসে পরিণত হয়েছিল। এ যেন হাস্যরসের বয়ঃসন্ধি.. এক অবুঝ আগ্রাসী বয়স। হাস্যরসের এই দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করা যায় হোমার, প্লেটো থেকে শুরু করে হবস্ এর মত মহান লেখক ও দার্শনিকদের সৃষ্টিতেও। তাদের লেখাতেও যেন হাস্যরস মূলত কোনও একপক্ষকে তুচ্ছ করার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে।


তবে সময়ের সাথে সমাজ বদলায়। বদলায় পাঠক, দর্শক। মানুষের বোধ বুদ্ধি এবং আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় ঠিক যেমন বয়ঃসন্ধি পেরনো সেই মানুষটির মত যে যৌবনের মূল স্রোতে মিশেছে, চিনতে শিখেছে ভালো মন্দ। ততদিনে ইংরেজি সাহিত্য যৌবনের মধ্য গগনে তবে হাস্যরস তখন সবে যৌবনের চৌকাঠে। মানবিক আবেদন, আবেগ এবং বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে হাস্যরসের নবজন্ম হল যেন। একদিকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োগে শব্দচয়নে সাজানো বক্তব্যের মাধ্যমে হাস্যরস হয়ে উঠল ঝকঝকে তকতকে যার পোশাকি নাম ‘Wit’ । এই সময় থেকেই মূলত ইংরেজি সাহিত্যে হাস্যরসের এক আমূল পরিবর্তন আসে। একদিকে যেমন হিউমার অনেক মানবিক রূপ নেই ফলে কৌতুকের গ্রাহ্য পরিধি নির্ধারিত হয় ঠিক তত দূর যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা আঘাতের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। অনাদিকে উইটের শানে ধারানো হয়ে ওঠা ব্যাঙ্গ অনায়ের বিরুদ্ধে যেন এক অস্ত্রে পরিণত হয়। সমাজের একাধিক অসামঞ্জস্যকে কৌতুকের মোড়কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কবি লেখক নাট্যকারেরা। অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যে হাস্যরসের যে এক আমূল পরিবর্তন হয় তা কিন্তু বাংলা – ইংরেজি উভয় সাহিত্যেই প্রায় সমান্তরাল। এবং এই সময় থেকেই হাস্যরসের বাকি বিভিন্ন গ্রন্থি ধারে ভারে সূক্ষ্মতায় একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে নতুন নতুন ধারার জন্ম দেয়। বাংলা সাহিত্যে ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয় হাস্যরস নিয়ে এখনও কাজের অনেকটা বাকি। মূলত কৌতুক, বিদ্রূপ এবং ব্যাঙ্গ নিয়েই কাজ হয়েছে। এবং সব থেকে দুঃখের কথা বাঙালি কাঁদিয়ে যাওয়া সাহিত্য সৃষ্টিকে যতটা সম্মান দিয়েছে কখনই তা হাসিতে ভরিয়ে দেওয়া কলমকে দেয় নি। হাস্যরসকে বাড়বই খানিক তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখেছে বাঙালি। তাই চড়া ধাতের না হলে কতিপয় বাঙালি পাঠক বা দর্শক হাস্যরসের উৎস বিন্দু ছুঁতে বার্থ হয়েছেন। আর ঠিক সেই জন্যই সুকুমার রায়, শিবরাম, রাজশেখর বসুর মত কালজয়ী কলমকাররা আজও তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন বলে আমার মনে হয় না।


এখনও হিউমার নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা চলছে। থিয়োরি অফ সুপিরিয়োরিটি অর্থাৎ তুচ্ছ জ্ঞানে হাস্যরস থেকে অষ্টাদশ শতকের পর যে থিয়োরি অফ ইনকংগ্রুয়েন্সি অর্থাৎ অসামঞ্জস্যই হাস্যরসের মূল উৎস - এই বিশ্বাসে এসে দাঁড়িয়েছে সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং মনোবিদ্যার গবেষকরা। তবু এখনও মানুষের মন এবং সেই মনে হাসির উদ্রেক কি করে হয় বুঝতে হয়ত অনেকটা পথ বাকি। তবে মূল কথা হল হাসি মানুষের সবচেয়ে সহজাত প্রকাশ। হাসতে.. হাসাতে পারাটাই মানুষের পরিচয়।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮