• কৌশিক দাশ

অনুবাদ গল্প - তিতিকাকা হ্রদ

তিতিকাকা হ্রদ হল দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ এবং পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী উচ্চতায় অবস্থিত নাব্য হ্রদ। এই হ্রদটি ঠিক পেরু এবং বলিভিয়ার সীমারেখায় অবস্থিত। এত সুন্দর হ্রদ পৃথিবীতে খুব কমই আছে, তাই সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকেরা এই হ্রদ দেখতে আসেন। তবে এটি একটি খুব রহস্যময় হ্রদ এবং এই হ্রদের সৃষ্টি সম্পর্কে একটি খুব সুন্দর গল্প প্রচলিত আছে।

শোনা যায় বহু কাল আগে তিতিকাকা নামে একটি খুব উর্বর উপত্যকা ছিল। সেখানে ছিল বহু মানুষের বসবাস। সবাই সেখানে সুখে শান্তিতে বাস করতো।

তাদের কোনও কিছুর অভাব ছিল না। সেখানকার মাটি ছিল খুব উর্বর ও সমৃদ্ধ। তাদের যা প্রয়োজন হত সব তারা পেয়ে যেত। দুঃখ, কষ্ট, ঘৃণা, মৃত্যু কি জিনিস তারা জানতো না। পাহাড়ের দেবতারা (আপু) তাদের সর্বদা রক্ষা করতো।

শুধুমাত্র একটি জিনিস ছাড়া তাদের ওপর আর কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তাদের একটা ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা ছিল- পাহাড়ের চূড়ায় যেখান থেকে পবিত্র আগুন নির্গত হয়, সেখানে যাওয়া তাদের বারণ ছিল।

বহুকাল ধরে তারা এই নির্দেশ মেনে এসেছে, দেবতাদের নির্দেশ তারা কখনও অমান্য করে নি। কিন্তু শয়তান, অন্ধকার জগতের অশুভ শক্তি, মানুষের এই সুখ শান্তি কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না।

অন্ধকারের সেই শয়তান তখন মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের বীজ বপন করে দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করলো।

তাদের সাহসিকতার পরীক্ষা যাচাই করার জন্য তাদের পাহাড়ের চূড়ায় ওই পবিত্র আগুনের সন্ধানে যাবার জন্য বার বার উৎসাহিত করতে লাগলো।

এরপর একদিন ভোরবেলা ওই পাহাড়ের চূড়ার পবিত্র আগুনের খোঁজে তারা বেড়িয়ে পড়লো। তারা ধীরে ধীরে পাহাড়ে চড়তে লাগলো। পাহাড়ের ঠিক মাঝপথে দেবতারা তাদের দেখতে পেল।

এর ফলে দেবতারা মানুষের ওপর খুব ক্রুদ্ধ হল তাদের আদেশ অমান্য করার জন্য। তাই দেবতারা তাদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিল। পাহাড়ের গুহা থেকে তাঁরা হাজার হাজার পুমা (বুনো বেড়াল জাতীয় প্রাণী) ছেড়ে দিল তাদের গিলে খেয়ে ফেলার জন্য। এই হিংস্র পুমারা তাদের একে একে গিলে খেয়ে ফেলতে লাগলো। তারা তখন শয়তানের কাছে সাহায্য চাইলো, কিন্তু সেই শয়তান তাদের কথায় কর্ণপাত করলো না।

এই করুণ দৃশ্য দেখে সূর্য দেবতা-ইন্তি কাঁদতে শুরু করলো। তার চোখের জলের পরিমাণ এতটাই ছিল যে চল্লিশ দিনের মধ্যে ওই উপত্যকায় বন্যা হয়ে গেল।

শুধুমাত্র একজন মহিলা ও একজন পুরুষ কোন রকমে একটি নল খাগড়ার নৌকায় উঠে তাদের জীবন বাঁচিয়েছিল।

এরপর আবার যখন আকাশে সূর্য উঠলো, তারা দুজনে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল, তারা তাদের নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না- পরিস্কার নীল আকাশের নীচে দেখল যে তারা একটি বিশাল হ্রদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর ওই পুমারা যেগুলি ওই হ্রদের জলে ডুবে গিয়েছিল তারা জলের মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছে আর তারা পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।

সেই দিন থেকে সেই হ্রদের নাম হয় তিতিকাকা হ্রদ বা পাথরের পুমার হ্রদ।

শোনা যায় এই তিতিকাকা হ্রদে নীচে বেশ কয়েকটি শহর আছে যেখানে প্রচুর সোনা, রূপো লুকোনো আছে। আবার এটাও শোনা যায় এই হ্রদে মৎস্য কন্যারা থাকে এবং তারা গান গেয়ে মৃত্যুকে ডেকে আনে।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮