• অন্তরা ঘোষ

গল্প - অন্তমিল

ঢং ঢং করে বেশ কয়েকবার আওয়াজ করে দেয়াল ঘড়িটা জানান দিল রাত দশটা বাজে। শেষ ব্যাচের টিউশনটা শেষ করে অরিন্দম ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকলো ।

অরিন্দম চ্যাটার্জী , আসানসোলের একটি বেসরকারি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সুদর্শন , সৌম্যকান্তি,অমায়িক ও সর্বোপরি ব্যাচেলর বছর পঁয়ত্রিশের অরিন্দম ছাত্র ছাত্রী ও সহকর্মীদের কাছে সমান জনপ্রিয়।অধ্যাপক মহলে মাঝে মধ্যেই কানাকানি হয় যে অরিন্দম নাকি কাউকে ভালোবাসত।কোনো কারণে তাকে জীবনে না পাওয়ায় আর বিয়েই করল না।


স্নান সেরে পাজামা পাঞ্জাবী পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল অরিন্দম।প্রতিদিন রাত দশটায় স্নান করা অরিন্দমের অভ্যেস। সারাদিনের ক্লান্তি যেন এতে দূর হয়। রান্নার মাসি বিকেলেই রান্না করে টেবিলে ঢেকে রেখে গেছে রুটি আর চিকেন। ডিনার সেরে নিয়ে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল অরিন্দম।এই সময়টা তার একান্ত নিজস্ব।ফেসবুক খুলে স্ক্রল করে বিভিন্ন জনের পোস্ট দেখতে লাগল।হঠাৎ এফবি 'র অ্যাড ফ্রেন্ড সাজেশনে একটা মেয়ের ফটো ও নাম দেখে চমকে উঠল। প্রোফাইল পিক- এ মেয়েটির মুখের ছবি বড় করে দেওয়া। গত পনেরো বছর ধরে তো এই মুখই অরিন্দমের মনের মণিকোঠায় খুব গোপনে খুব যত্নে সঞ্চিত আছে। ছবির নিচে নাম লেখা আছে বনলতা সেন। আর কোনো সংশয় রইলো না অরিন্দমের। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। কতদিন ধরে অরিন্দম নিভৃতে , একান্ত নিজস্ব সময় টুকুতে ফেসবুকে সার্চ করেছে বন্যা কে..বনলতা কে এই নামে শুধু অরিন্দমই ডাকতো। বনলতা সেন অনলাইনে ছিল। তাই মিনিট দশেকের মধ্যেই অরিন্দমের পাঠানো বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্টটেড হল। এই দশ মিনিট অরিন্দম বনলতার টাইম লাইনে গিয়ে ফটো দেখছিল। সেই প্রায় একই রকম চেহারা আছে বন্যার। শুধু যেন আগের থেকে একটু ভারিক্কি ভাব এসেছে। একটা ফটোতে অরিন্দমের চোখ আটকে গেল। হালকা নীল জামদানি শাড়ি, খোলা চুল আর ছোট্ট নীল টিপ.. বড় বড়ো টানা টানা দুচোখে সেই আগের মতোই কৌতুক উপচে পড়ছে। পাশে বোধ হয় ওর হাজব্যান্ড দাঁড়িয়ে... বেশ লম্বা চওড়া সুপুরুষ চেহারার ভদ্রলোক মুখে গাম্ভীর্যের পর্দা টেনে রেখেছে।ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে একটি বছর দশেকের ছেলে..একদম বনলতার মুখ বসানো।


অরিন্দম মেসেঞ্জার এ লিখে পাঠালো .."কেমন আছিস বন্যা ?" প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই এলো " 😳😳.. অরি তুইইই i..আমি তো ভাবিইনি যে তোর সাথে আবার কোনোদিন দেখা হবে " !


--আমিও তোকে সোশাল মিডিয়াতে অনেক খুঁজেছি রে..তুই কিন্তু সেই পাগলীই রয়ে গেছিস। ফটোতে তোর পাশের ভদ্রলোক বুঝি তোর উনি..ওরকম রাম গরুড়ের ছানার মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে কেন রে,, একদম তোর বিপরীত।


-আই অরি ..ভাল হবে না কিন্তু.. আমার উনিকে একদম রাম গড়ুর বলবি না,,,আচ্ছা বউয়ের কথা বল... হ্যাঁ রে প্রেম করে বিয়ে করেছিস ? কি করে প্রেম হলো রে..তুই তো ভীষণ লাজুক ছিলি..সবটা খুলে বলনা অরি. ,,, ভীষণ শুনতে ইচ্ছে করছে ! Please বল ,,,


-হা হা হা ... ধুর পাগলী , কী শুনবি আমার কথা.. তুই তোর কথা বল.. তোর কি একটাই ছেলে.. কি মিষ্টি ছেলে .. কী নাম রে ওর.. কোন ক্লাসে পড়ে.. ?


-হ্যাঁ রে.. একটাই ছেলে.. অরণ্য.. ও এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে.. ফটোটা দু বছর আগের তোলা রে... কিন্তু তুই তোর প্রেমের গল্পটা এড়িয়ে গেলি.. তারপর বিয়েটা কবে করলি ? কোথায় গেছিলি Honeymoon এ ? কটা ছানাপোনা তোর ?


-ওরে বাবা একসাথে এত্ত প্রশ্ন ! ধুর পাগলী.. আমি বিয়েই করিনি .. এই বেশ ভাল আছি .. ঝাড়া হাত পা..

.

-বিয়েই করলিনা ! কেন রে.. তুই তো দেখছি সেই ঢেঁড়সই রয়ে গেলি ! নিশ্চয় যাকে ভালবেসেছিলি তাকে বলতে পারিসনি ?


-এতক্ষণে একটা ঠিক কথা বলেছিস বন্যা.. যাকে ভালবেসেছিলাম তাকে কোনোদিন বলে উঠতেই পারলাম না।সেও আমার মনের কথা বুঝল না।


-সত্যিই , চিরকালের মুখচোরা তুই..,, একবার মুখ ফুটে বলে দেখলি না কেন তাকে ? আচ্ছা সেও কি তোকে ভালবাসতো ?


-নিশ্চয় বাসতো.. আজও বাসে আমি জানি..কিন্তু মানতে চায়নি হয়তো !


-আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে অরি , কে সেই মেয়ে যে তোর মত ছেলেকে বুঝল না.. !


-ওই যে রে , সেই পাগলীটা.. যে সেই ছোট্টবেলায় পাঠভবনের দিনগুলো থেকে কলেজের শেষ দিন অবধি সব কিছুতেই আমার উপর নির্ভর করত, আমার সব কথা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করত , পড়া বুঝতে হলে অরি, কোথাও আউটিং যেতে গেলে সঙ্গে অরিকে চাই, অরিকে ছাড়া টিফিন খেত না পাগলীটা, মনখারাপ হলে অরিকে চাই, আনন্দের খবরও সবথেকে আগে অরিকেই শোনাতে হবে, এমনকি মেয়েলি কোনও সমস্যা হলে সেটাও একমাত্র অরির কাছেই খুলে বলত পাগলীটা। শুধু অরির মনের কথাটাই অনুভব করতে পারল না, চলে গেলো একদিন অরিকে ছেড়ে।


-মিনিট খানেক চুপচাপ..কোনও মেসেজ নেই বনলতার দিক থেকে.. তারপর আবার টাইপ করতে দেখা গেলো বনলতাকে ।


-সেদিন কেন বলিসনি অরি , যে তুই আমায় ভালবাসিস ? কেন যেতে দিলি আমায়.. জোর করে কেন নিজের কাছে রাখলিনা..একবার তো মুখ ফুটে বলতে পারতিস !


-বলতেই তো চেয়েছিলাম বন্যা... তোর মনে আছে বন্যা আমাদের এম এ ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন বিকেলে গৌড় প্রাঙ্গণের সামনে ঘণ্টা ঘরে তোকে আসতে বলেছিলাম..বলেছিলাম আমার তোকে কিছু বলার আছে। তুই এসেছিলি একটা সাদা টপ আর লাল স্কার্ট পরে । ভারি মিষ্টি লাগছিল তোকে। এসেই জানতে চাইলি আমি কী বলতে চাই .. কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই তুই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললি তুই আমাকে একটা সুখবর দিতে চাস..তারপর তোর বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার খবরটা শোনালি। তোর চোখে মুখে তখন হাজার ঝাড় বাতির আলো চিকচিক করে জ্বলছিল। .আর আমার জগৎ মুহূর্তের মধ্যে তমসাচ্ছন্ন। এরপরেও আমি কি করে বলতাম ! কী করে তোর চোখে মুখে উপচে পড়া খুশিটাকে কেড়ে নিতাম বল ...আমি যে তোকে খুব ভালবাসতাম . আজও বাসি ।


-জানিস অরি , আমি ভাবতাম তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই ছোটবেলা থেকে দুজনে একসাথে বড় হয়েছি.. তুই আমার অভ্যেস ছিলি , তোকে ছাড়া আমার একটা দিনও চলত না.. কিন্তু তুই আমার মনের কতটা জায়গা জুড়ে ছিলি সেটা সেদিন বুঝলাম যেদিন তোকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি যাই। চারপাশে অচেনা মানুষদের ভিড়ে শুধু তোকে খুঁজেছি। আমার উনি.. জীবনে বিজনেস ছাড়া অন্য কিছু খুব একটা বোঝেন না..বেশির ভাগ সময় বিজনেসের কাজে বাইরে থাকেন..যখন যা চেয়েছি দিয়েছেন..স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও অভাব রাখেননি.. শুধু মনের শূন্যতা উনি কোনদিনই ভরাবার চেষ্টা করেননি। তোর সেই চঞ্চল ছোট ছটফটে বন্যা আজ পাহাড়ের মতো ধীর স্থির শান্ত হয়ে গেছে.. মনে মনে সবসময় তোকে খুঁজতাম.. বুঝতে পারতাম তুই আমার মনের কতটা জুড়ে ছিলি!


-তোর মনে আছে বন্যা শান্তিনিকেতনের দিনগুলো। মাঝে মাঝেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমি তুই সুজন আর মনামি সাইকেলে বেরিয়ে পড়তাম খোয়াইয়ের পাড়ে সোনা ঝুরির দেশে। তুই খুব ভালবাসতিস আমার গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে..তুই চুপটি করে টিলায় বসে একমনে আমার গান শুনতিস। ইউক্যালিপটাসের পাতা ঝরে পড়তো তোর গায়ে মাথায়। মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখতে দেখতে তোর প্রিয় গানটা গাইতাম " তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম"


-খুব মনে আছে ! হ্যাঁ রে , তুই এখনও গানের চর্চাটা রেখেছিস তো.. কি ভালো যে গান গাইতিস তুই। পড়াশোনাতেও কি ভালোই না ছিলি ! ছোটো থেকে ফার্স্ট হয়ে এসেছিস । শুধু ক্লাস এইটে পড়তে একবার ছাড়া। ওই বছর আমি খুব কান্নাকাটি করায় তুই ইচ্ছে করে একটু খারাপ পরীক্ষা দিয়েছিলি। সে বছর আমি প্রথম তুই দ্বিতীয় হয়েছিলি। আর মনে আছে অরি আমাদের বৃষ্টিতে ভেজা সেই বর্ষার দিনগুলোর কথা ?


-সে আবার মনে নেই। বৃষ্টি এলে সুযোগ পেলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম কখনো ছাতিমতলা কখনো আম্রকুঞ্জে... বৃষ্টির জল প্রাণভরে দুজনে গায়ে মাথায় মাখতাম। তারপর দুজনেরই একসাথে সর্দি, কাশি.. ব্যাস , বাড়িতে শুরু হত বকা ! কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো !


-হ্যাঁ ঠিক তাই রে অরি। আর মনে আছে দোলে আমিই প্রথম তোকে রঙ লাগাতাম।আর কেউ লাগলে আমার রাগ হয়ে যেত।

আর প্রতিদিন বিকেলে আমাদের চারজনের কালোর দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডাটাও খুব মিস করি রে ! আচ্ছা অরি , তোর মনে আছে আমি রেগে গেলে তুই কিভাবে আমার রাগ ভাঙ্গতিস ?


-আরে বাব্বা , অনেক সাধ্য সাধনার পরও যখন তোর নাকের পাটা ফুলে থাকত , বাংলার পাঁচের মত মুখ করে থাকতিস , তখন ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে আমাকে দুটো বাটারস্কচ আইসক্রিমের কাপ আনতে হতো। আইসক্রিম দেখে রাগিণীর রাগ মুহূর্তে ঠাণ্ডা। কি ঠিক কিনা ?


-হু , সব মনে আছে দেখছি তোর ! জানিস অরি , তারপর থেকে রাগ বা অভিমান করলে কেউ ভাঙ্গতে আসত না ! তখন সব রাগ তোর ওপর গিয়ে পড়ত। কেন তুই আমায় ছেড়ে চলে গেছিলি.. মনে মনে কতদিন ঝগড়া করেছি তোর সাথে। এবার খুব ক্লান্ত লাগছে রে অরি। আজ আসি রে ,,,,


-অনেকটা রাত হয়ে গেলো তাই না রে। কাল কিন্তু আবার তোর জন্য এই সময় অপেক্ষা করব। একটা অনুরোধ করব রাখবি বন্যা ? তোকে একটা ভিডিও কল করব ? কত বছর তোকে দেখিনি। বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে রে ,,,,


-না না অরি , একদম না। তাছাড়া আমাকে তুই দেখলে চিনতে পারবি না।পেত্নী হয়ে গেছি রে ,,,,


-বড্ড বাজে বকছিস বন্যা। আমি আমার পেত্নীকেই দেখতে চাই। বেশ তাহলে এখুনি একটা ফটো তুলে পাঠা। তোর টাইম লাইনের ফটো গুলো তো সব দু বছর আগের তোলা।


-না অরি .. তুই এখন আমায় দেখলে সহ্য করতে পারবি না। আমি আর তোর সেই বন্যা নেই। আজ আসি। কাল কথা হবে কিনা জানিনা।


-মানে ! তুই এভাবে কথা বলছিস কেন রে..তোর কি কিছু হয়েছে ? মনখারাপ।? কি হয়েছে আমায় খুলে বল না আগের মত বন্যা ,,,,


-বলবো অরি.. একদিন তোকেই সব বলতাম..আজও তোকেই সব বলে যাব। ভালো থাকিস। এবার একটা বিয়ে কর অরি। তবে বন্যাকে ভুলিস না যেন। ভুলে গেলে কিন্তু আগের মতই পিঠে গুম গুম কিল খাবি। আজ আসি। শুভরাত্রি।


বনলতা অফ লাইন হয়ে গেল। বন্যার শেষের কথাগুলো একটু কেমন যেন লাগল অভির। আজ আর ঘুম আসবে না। লাইট অফ করে শুয়ে শুয়ে বন্যার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় কিন্তু ঘুমিয়েই পড়ল অরিন্দম।


পরদিন রাতেও ডিনার করার পর অরিন্দম ফেসবুক খুলে বনলতাকে মেসেজ করল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও অনলাইনে দেখতে পেল না বনলতাকে । মনটা একটু খারাপই হয়ে গেল।বেশ কিছুক্ষণ ওর টাইম লাইনে গিয়ে বনলতার পোস্ট করা যে দু চারটে ফটো ছিল বারবার করে দেখতে লাগল।ওর গতকালের করা দুটো পোস্ট চোখে পড়লো.. " যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে" এই গানটা পোস্ট করেছে। আর আজকে সকালে পোস্ট করেছে একটা মেঘের ছবি.. সেই ছবিতে লেখা " আমায় আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখিস" ...


অরিন্দমের কেমন যেন মনে হল ! এটা যেন বন্যা ওকেই লিখেছে। কেন এমন সব পোস্ট করল বন্যা ! কালকের ওর শেষের দিকের কথাগুলোও কেমন যেন অসংলগ্ন শোনাচ্ছিল ! মনটা একটা অজানা আশঙ্কায় ভরে উঠলো।


পরদিন থেকে সাত দিন খুব ব্যস্ত ছিল অরিন্দম। অনার্সের পরীক্ষার ডিউটি পড়েছিল।খাতা দেখার ব্যাপারও ছিল।সাতদিন পর যখন একটু কাজের চাপ কমলো তখন এফবি খুলে বন্যার খোঁজ করতে গিয়ে দেখল লাস্ট সিন সাতদিন আগে..,,, অর্থাৎ যেদিন ওর সাথে প্রথম কথা হয়েছিল সেদিন ! তারমানে এই সাতদিনে একবারও অন লাইন হয়নি বন্যা ! কী হল কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না অরিন্দম। আরো একবার কি বন্যাকে হারিয়ে ফেললো !


গত একমাস ধরে প্রতিদিন রাতে বন্যাকে মেসেজ করে অরিন্দম কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসে না । লাস্ট সিন এখনও পর্যন্ত সেদিনই দেখাচ্ছে যেদিন ওর সাথে শেষ কথা হয়েছিল।


প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে অরিন্দম।সেদিন সন্ধ্যে বেলায় বসে খাতা চেক করছে এমন সময় মোবাইলে একটা মেইল ঢুকলো। অরিন্দম মেইলটা ওপেন করেই চমকে উঠল !

বন্যার লেখা কয়েকটা লাইন। পড়তে শুরু করলো অরিন্দম..

" অরি আমায় মাফ করে দিস সোনা.. আরও একবার তোকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি.. বেশি সময় নেই আমার কাছে, টাইপ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে.. কিন্তু তোকে যে কিছু কথা না বলে গেলে , চলে গিয়েও শান্তি পাব না ! সেদিন তুই কত আবদার করে একটা ফটো পাঠাতে বললি। আমি পাঠাতে পারলাম না..কেন জানিস ? আমাকে দেখলে তোর কষ্ট হত.. তুই সহ্য করতে পারতিস না... কেমো নিয়ে নিয়ে আমার রেশমের মতো সুন্দর চুলগুলো সব উঠে গেলো রে। মনে আছে তুই কত ভালবাসতিস আমাকে খোলা চুলে দেখতে ! এভাবে কী করে তোর সামনে আসতাম বল।"


এসব কী বলছে বন্যা। কেমো নিতে হয়েছে ! তাহলে কি বন্যার.. উফফ...চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গাল বেয়ে টি শার্টের পকেটের কাছটা ভিজে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । অক্ষরগুলো আবছা হয়ে আসছে। হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে আবার পড়তে শুরু করলো অরিন্দম।


বন্যা লিখেছে "৬ মাস আগে আমার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ল। যখন ধরা পড়ল তখন প্রায় লাস্ট স্টেজ। বোম্বের টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে ভর্তি হলাম। কেমো নেওয়া শুরু হলো। যত দিন যাচ্ছিল তত অবস্থা ক্রিটিক্যাল হতে লাগল।এমনকি উঠে দাঁড়াবার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছি। কিছু খেতে পারিনা। বিছানার সাথে মিশে গেছি। আমাকে দেখলে তোর কষ্ট হত। আমার একাকীত্বের জীবনে আমার ছেলেই ছিল আমার প্রাণ। ও ওর মা কে এই অবস্থায় দেখলে খুব কষ্ট পাবে।তাই ওকে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। বড্ড কষ্ট হচ্ছে জানিস ওকে ছেড়ে যেতে.....

তোর সাথে যেদিন কথা বললাম তার পরদিন থেকে আবার বাড়াবাড়ি হল।বুঝতে পারছি আমার সময় শেষ হয়ে আসছে।

একটা কথা তোকে বলা হয় নি অরি। আমিও তোকে ভালবাসতাম.. খুব ভালবাসতাম। কিন্তু তুই তো জানিস কতটা অভিমানী ছিলাম আমি। চাইতাম তুই মুখ ফুটে বলে দে আমায় তোর মনের কথা । তখনও বিয়েটা ফাইনাল হয়নি।বাড়ির সকলে আমার মতামতের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আমি সেদিন তোকে বলেছিলাম বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম এটা শুনে এবার হয়তো তুই বলবি যে তুই আমাকে ভালবাসিস। কিন্তু দেখলাম তুই কিছুই বললিনা। আমার অভিমান আকাশ ছোঁয়া হল। শুধু তোর ওপর রাগ করে বিয়েতে মত দিয়ে দিলাম। তুইও আমাকে বুঝলি না অরি !

এই জন্মে আমাদের একসাথে পথ চলা আর হলো না রে ,,,,, পরজন্মে কিন্তু তুই শুধু আমার। সব না পাওয়া ইচ্ছেগুলো তোর সাথে পরের জন্মে মিটিয়ে নেবো। এই যেমন ধর ভোরের শিশির ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে দুজনে একসাথে হাঁটবো, পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো গায়ে মেখে দুজনে সারারাত জেগে গল্প করব, তুই পাহাড় ভালবাসিস আর আমি অতল গভীর সমুদ্র। দুই জায়গাতেই আমরা যাব , জীবনের রূপ, রস , গন্ধ ,স্পর্শ দুজনে একসাথে উপভোগ করব। পরের জন্মে কিন্তু এমন ঢ্যাঁড়স হোসনা অরি.. ভালবাসার অধিকারে কাছে টেনে নিস। অনেক কথা বলা হল না , অনেক কথা বাকি থেকে গেল। আমার ট্রেন এসে গেছে। এবার যে আমায় যেতে হবে। একদম কাঁদবি না অরি.. আমি জানি তুই কাঁদছিস.. চোখের জল মুছে ফেল.. খুব কষ্ট হচ্ছে .. আর টাইপ করতে পারছি না রে ,,,,, শান্তিনিকেতনে তোলা তোর আমার একটা ছবি ছিল আমার কাছে। পাঠিয়ে দিলাম। আর একটা কথা , একটা বিয়ে করিস প্লীজ।.. আর সময় নেই রে ,,,,. চললাম...অপেক্ষা করব আর একটা জন্মের..."


বালিশ টা আঁকড়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল অরিন্দম। এবারও বন্যা ফাঁকি দিয়ে চলে গেল ! কেন অরিন্দম বুঝল না বন্যার মনের কথা.. কেন.. কেন...বুক ফেটে যাচ্ছে অরিন্দমের ।ইচ্ছে করছে ছুটে চলে যায় বন্যার কাছে..গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে তুই আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাসনা বন্যা... আমি তোকে ছাড়া বাকি জীবন কি করে কাটাব বল ?


পরদিন বনলতার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে অরিন্দম মনামীকে খুঁজে বের করে বনলতার কথা জিজ্ঞেস করে জানতে পারল কাল রাত বারোটায় বনলতা চলে গেছে সকলকে ছেড়ে। খবরটা শুনে ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কাল মেইল এ বনলতা একটা ফটো পাঠিয়েছিল, দেখা হয়নি অরিন্দমের। এখন দেখল। দোলের দিনের ছবি।বনলতা হলুদ শাড়ি পরে আছে, অরিন্দম বনলতার গালে লাল রং লাগিয়ে দিচ্ছে। দুষ্টু দুষ্টু মুখে আবির মাখছে বনলতা। দুহাত পিছনে, হাতের মুঠোয় ভর্তি আবির , অরিন্দমকে মাখাবে বলে। ছবির নিচে টাইপ করা with my love...


আবার চোখ জলে ভরে এল। বন্যার জায়গায় আর কাউকে আনতে পারবে না অরিন্দম.. কিছুতেই না। ভালবাসার আগুনে পুড়তে পুড়তে একদিন অরিন্দমও হয়তো ঠিক খুঁজে পাবে আকাশের ঠিকানা ।

অপেক্ষা হয়তো পরিণত হবে প্রতীক্ষায়, তবুও বুকের ভেতর বপন করা এই স্বপ্ন কখনোই একতরফা পরিণতিহীন হতে পারে না । অন্তমিলের অপেক্ষায় তাই আজও বসে আছে অরিন্দম ।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮