• দেবী

গল্প - অস্তিত্ব

ভালোবাসা মানে কি? কিছুতেই এর উত্তর খুঁজে পায় না মধ্যবয়সী রিয়া। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । সব চিন্তাভাবনা গুলো আরও বেশী করে হারিয়ে যাচ্ছে অতীতে আর বর্তমানে। রিয়ার প্রথম বিয়ে ছিল তার ভালোবাসার পরিণাম। কিন্তু কিছুদিন বাদেই তার কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হতে লাগলো যাকে সে নিজের সবটা উজাড় করে দিতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করে নি, যার সব দুঃখ, না পাওয়াকে ভুলিয়ে দিয়েছে রিয়া সে মানুষটা তাকে শুধুই ব্যাবহার করেছে প্রতি মুহূর্তে। তবুও রিয়া হার মানেনি, প্রতি মুহূর্তে আরও বেশী করে চেষ্টা করেছে সম্পর্কটাকে নিয়ে এগিয়ে যেতে কারণ রিয়ার কাছে বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ছিল তার ভালোবাসা। জীবনটাকে সাধারণভাবে টেনে নিয়ে যেতেও হিমশিম খাচ্ছিল রিয়া কিন্তু সে হারতে চায়নি তার পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, তার নিজের কাছে। কিন্তু যতদিন যাচ্ছিল ততই রিয়ার উপর অত্যাচার বাড়ছিল, শুধুই শারীরিক নয় মানসিক ও। তবু সে দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে যেতে চাইছিল জীবনের মূল স্রোতের সাথে, আপ্রাণ চেষ্টা করছিল নিজের ভালোবাসার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে। হঠাৎ একদিন সে বুঝতে পারলো তার মধ্যে একটি নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। আনন্দে খুশিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে রিয়া। একটু একটু করে বড় হতে থাকে রিয়ার গর্ভজ শিশুটি। তার প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। রিয়া তার সব ভালোলাগা- মন্দলাগা -দুঃখ -কান্না ভাগ করে নিতে থাকে তার মধ্যে বড়ো হতে থাকা ভ্রূণ-টির সাথে। পরিপূর্ণ হতে থাকে রিয়া, আর চেটেপুটে অনুভব করতে থাকে তার মা হাওয়ার অনুভূতি।


তার পর অনেক পথ পেরিয়ে, রিয়া দ্বিতীয় বার জীবন শুরু করেছে আর্য র হাত ধরে। মাঝে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়, আঠারো বছর। একজন পরিপূর্ণ নারী তার সবটা উজাড় করে বাঁচতে চেয়েছে আরও একবার। মাঝে তার জীবনে যা যা ঝড় বয়ে গেছে তার সবটাই সে জানিয়েছে আর্যকে। সে সব জেনেই রিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। রিয়া বহুবছর ধরে মানসিকভাবে বিপন্ন, সে আজও ওষুধ খায় মানসিকভাবে নিজেকে স্থির রাখার জন্যে কারণ সে একজন মানুষ সেটাই ভুলে যায়, তার প্রতি সবার ব্যাবহার দেখে। আর্য যখন রিয়ার জীবনে আসে তখন রিয়া আরও একবার মানুষকে বিশ্বাস করার সাহস জোগাড় করে আর্যর হাত ধরে কারণ রিয়ার বড়ো লোভ ছিল তারও একটা সংসার হবে, ভালোমন্দতে মেশানো একজন ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে কাটিয়ে দেবে বাকি সময়টুকু হেসে খেলে , সারাজীবন অনেক কেঁদেছে একা চুপ- চাপ,অন্ধকারে - সবার অলক্ষ্যে। এবার একটা কাঁধ পাবে সে নিজের সব অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার জন্যে।


হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি রিয়ার মুখে ঝাপটা দিয়ে গেলো, মনে করিয়ে দিল তার অস্তিত্ব যা সে আবার আরও একবার হারিয়ে ফেলেছে ভালোবাসার কাছে। তার মনে হলো সে একই জায়গাতে ঘুরপাক খাচ্ছে, থমকে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে সে আবার নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিল। আজ সে আবার একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে সে পালিয়ে যেতে চেয়েছে সবসময়। ভয় পেয়েছে, কষ্ট পেয়েছে... নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছে। আজ তার অস্তিত্ব বলে কিছু নেই.....সবটা দেওয়ার পরেও আজও তার ভালোবাসা তাকে এক চিলতে চিনতে পারেনি বা হয়তো প্রয়োজন বোধ করেনি কারণ তার কাছে রিয়া মূল্যহীন। আজও রিয়া পরাজিত একজন মানুষ, যাকে সবাই উপদেশ দিয়েছে, সমালোচনা করেছে, বিচার করেছ্‌ কিন্তু তার মনটা পড়ার কোনো দায় কারুর কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয় নি। সে ব্রাত্য থেকে গেছে আজও। শুধুই দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখেছে রিয়া কিন্তু তার সেই স্বপ্নের পরিণতি বার বার তাকে আরও গভীর খাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আকাশ আজ কিশোর থেকে যুবক, তার জগৎ-এ রিয়ার অস্তিত্ব খুবই কম। আর্যও এখন অনেক অপরিচিত রিয়ার কাছে, তার চিন্তা মূল্যবোধ রিয়ার প্রতি বড়ই অবাক করে রিয়াকে, অস্থির করে তোলে, রিয়া আজও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে চূড়ান্ত ভাবে। সে জীবন থেকে এটুকু শিখে নিয়েছে সে একা। তাই সে আজও একা এগিয়ে চলেছে তার শেষ পরিণতির দিকে। রিয়া কোনোদিন কাউকে কিছু প্রমাণ করতে চায় নি তার নিজের ব্যাপারে, বড়ো মুখচোরা সে। সে শুধুই বিশ্বাস রেখেছে যে তাকে ভালোবাসবে তাকে কিছু বলে দিতে হবে না, সে সব বুঝবে নিজে থেকেই। কিন্তু আজ সে বুঝে গেছে কেউ কাউকে বোঝে না... বা বুঝলেও রিয়া সেই ভাগ্যবতীর দলের মধ্যে পড়েনা যার থাকা বা না থাকাটা কোথাও কারুর মনে এতটুকু দাগ কেটে যায়। আত্মার মানুষ বলে কোনো কিছু হয় কিনা সেটাই বুঝতে পারেনা রিয়া। আকাশকেও অপরিচিত লাগে রিয়ার। মানুষ বদলে যাচ্ছে নাকি তার চিন্তা। নীল আকাশ, পাখি এরা কি কেউ পারে রিয়াকে একটা জীবন ফিরিয়ে দিতে যা সে খুঁজে এসেছে তার ভালোবাসার মধ্যে সব সময়। আজও সে একই বিন্দু তে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে সে শুরু করেছিল, শুধু বদলে গেছে সময়, মুখ। আজ রিয়া আবার বুঝতে পারে সে একা, একদম একা... আসলে এটাই সবথেকে বড়ো সত্যি যা রিয়া সারাজীবন বুঝেও বোঝেনি, তার মন বারবার অস্বীকার করেছে এই চরম সত্যিকে মেনে নিতে যে তাকে কেউ ভালোবাসেনি, শুধুই সময় এর সঙ্গে মিথ্যে কিছু প্রতিশ্রুতি আর আবেগ, যা বারবার সময়ের নিষ্ঠুর খেলায় হারিয়ে গেছে আর রিয়া বারবার নতুন করে বাঁচতে চেয়েছে। আজ সে বুঝেছে 'আসলে সত্যি বলে সত্যিই কিছু নেই'। একজন মানুষ হিসাবে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার লড়াই চলছে তার নিজের মধ্যেই। আজ সে বুঝে গেছে তার ভালোবাসা কোনোদিন তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়নি আর আজও দেয় না। আজও তার ভালোবাসার কোনো প্রভাব পড়েনা তার থাকা বা না থাকায়, এটাই বাস্তব কিন্তু রিয়ার অবুঝ মন কোনোদিন এই চরম বাস্তবতাকে স্বীকার করার সাহস দেখাতে পারেনি, তাই আজও সে সবার কাছে একজন নিচু মনের, স্বার্থপর মানুষ, তার ভালোবাসার হুমকি সবকিছুতে বর্তমান, তাকে ত্যাগ করার । আজ আর কিছু রিয়াকে ভাবাবে না, আর কিছু তাকে বেঁচে থাকার ইন্ধন যোগাবে না... আজ সে মুক্তির জন্যে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে....এক পশলা বৃষ্টি আবার তাকে স্নান করিয়ে দেবে, ধুয়ে মুছে দেবে তার জ্বালা যন্ত্রণা...... এবার সে শুধুই মুক্তি চায় নিজের জন্যে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮