• অনিতা ঘোষ

গল্প - উপহার (বিভূতির আলোয়)

(অপু দুগ্গার স্রষ্টার প্রতি ক্ষুদ্র শ্রদ্ধার্ঘ্য রইলো।)



—- মা ও মা

—- কি হল রে?

—- দাদা কই গো?

—- জানিনা রে, আমার রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে।

দেখ গে সেদিকে।


বকা খেয়ে একটু কালো হয় দুগ্গার মুখটা। তার ওড়নার খুঁটে বাঁধা আছে একটু বনকুল আর নুন। দাদা ভালবাসে, তাই খুঁজছিল। কিন্তু দাদাটা যে কোথায় গেল...


পাশের ঘর থেকে তার বাবার ডাক শুনতে পায় দুগ্গা,

—- মা দুগ্গি, একটু আয় দিকিন এদিকে।

—- যাই বাবা, বলে ছুটে যায় দুগ্গা, বাবা ঢাকের বাঁধন ঠিক করছে । আজ চতুর্থী, আজই তো রওয়ানা হতে হবে, কলকাতার পুজোর বায়না আছে যে।


খুবই অভাবের সংসার তাদের। তাদের মানে হরি তার বৌ জয়া, মেয়ে দুগ্গা আর ছেলে অপু। অপুর বয়স ১৫ আর দুগ্গা ১৩। হরি হল গে ঢাকি। একটু নাম আছে, পুজো পালা পাব্বনে তাই ডাক পড়ে। ওইতেই যা টাকা পায়। জয়া ঝুড়ি বোনে তাতেও আসে কিছু।

অপুর ইস্কুলের পাট হয়তো চুকবে কবছরেই, দুগ্গাটা যায় ইস্কুলে, তবে ওর টোটো করে বেড়ানোতেই মন বেশী। আর দাদার ন্যাওটা প্রচণ্ড। দাদাও বোনকে চোখে হারায়।


—- বাবা ডাকলে?

— হ্যাঁ রে মা, একটু ধর দিকি, বাঁধনটা শক্ত করে।

— এই যে বাবা ধরি।


— দুগ্গি, দুগ্গু, ডুগি ,

—- দাদা, বলে ছুট দেয় দুগ্গা।

হরি একগাল হাসে, মেয়েটা দাদা বলতে অজ্ঞান।

— দাদাভাই, তোর জন্য কি রেখেছি দেখ। দাদার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পড়তে বলে দুগ্গা, সাথে এগিয়ে দেয় বনকুল কটা।

—- উফ্, মেয়েটার ধিঙ্গিপনা দ্যাখো!!! জয়ার গলা,

দাদা তেতেপুড়ে এল, এট্টু জল না দিয়ে, আহ্লাদিপনা শুরু হল।

—- থাকনা মা, আমিইতো ডাকলাম ওকে।

—- তুই আর সাফাই গাসনে অপু, যা জামা ছাড় গে। বোনকে অত্ত আস্কারা দিসনে, পাত্তস্থ কত্তে হবে আর কবচ্ছরের মধ্যে। ঘরের কাজ শেখার নাম নেই, খালি টোটো, আর দাদাকে দেখলে গলে যাচ্ছে।যাকগে অপু, তুই যা স্নান সেরে নিগে। সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়বি তবে বেলা থাকতেই।

— হ্যাঁ যাই মা। অপু বাবার সাথে যাবে কলকাতা, সেও ঢাক বাজায়।

দুগ্গার কালো মুখটা দেখে অপুর মনটা মুচড়ে ওঠে। বড্ড আদরের তার বোনটা। একদম ছেলেমানুষ, নিজের মনেই ঘুরে বেড়ায়, শুধু তার কাছেই যা একটু আবদার। মার কাছে সবসময় বকা খায়। পড়াশোনাতেও মাথা নেই তেমন, দেখতেও আহামরি নয়, কেমন যেন খামখেয়ালী। তবে দাদার একটু হাসি দেখার জন্য সব করতে পারে পাগলিটা।


এই যে বনকুল, কোথা থেকে এনেছে কে জানে। সেদিন অপুর হাত কেটে গেছিল, কি কান্না দুগ্গার। বারবার করে ওষুধ লাগাতো। রোজ জিজ্ঞেস করত, দাদা তোর আর ব্যথা আছে? তার এই পাগলি বোনটা সাত চড়ে রা কাড়েনা, কিন্তু দাদার জন্য খুব টান। এখন তার কালো মুখ দেখে কষ্ট হল খুব অপুর, কিন্তু মার ভয়ে কিছু আর বললনা সে।


স্নান সেরে খেতে বসেছে বাপ বেটায়, খেয়ে দেয়ে বেরোবে।

দুগ্গা দাঁড়িয়ে ছিল বাঁশের খুঁট ধরে।

—অপু মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে, ডুগি রে, কি আনব বল?

—কালো গড়নের রোগা মেয়েটা পিছন ঘুরে বলে, কিছু লাগবেনা রে দাদাভাই। তুই সাবধানে আসিস। তুই বরং ফিরে এসে আমাকে একটু বেড়াতে নিয়ে যাবি? ট্রেনে করে?

—সে যাব নয়, কিন্তু তা বললে কি হয়? বলনা পাগলি।এবার ওরা বেশী টাকা দেবে আর আমি আলাদা বকশিশ পাব রে।আচ্ছা বেশ আমি নিয়ে আসব আমার বুনুর জন্য।


রওয়ানা হয়ে যায় বাপ বেটায়। খেয়াপার, তারপর ট্রেন, তারপর বাস তারপর অটো। প্রায় ৪-৫ ঘণ্টার রাস্তা।গ্রামের সীমানা ধরে এগিয়ে চলেছে এক প্রৌঢ় আর এক কিশোর। একজনের চোখে সংসারের জোয়াল ঠেলে চলা অকালে মরা স্বপ্নের রেশ আর আরেকজনের চোখ সবে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। পেরিয়ে চলেছে তারা কাঁচা সড়ক। ঢাকের পালকগুলো দুলছে, স্বপ্নের উড়ান যেন বেয়ে চলেছে দুই রঙে। তাল গাছের সারি ছুঁয়ে বিকেলের মেঠো রোদ্দুর। বৌ কথা কওয়ের বোল ছুঁয়ে ইষ্টিকুটুম উড়ে বসল পাশের পেয়ারা গাছটায়।


কোথায় যেন ঘুঘু ডাকছে। দূরে মেঠো পথের বাঁক মিশেছে সদরে যাবার খেয়াঘাটে। দূরে দেখা যায় ধানিজমি, দুপাশে কাশফুল। কালো রোগা মেয়েটা দাঁড়িয়ে দেখছে, তার বাবা আর দাদা যাচ্ছে। অপুর বুকটা মোচড় দেয় সেদিকে চেয়ে, আহারে পাগলিটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, বাড়ি গিয়ে আবার বকুনি খাবে মার কাছে।মারও জুটতে পারে কপালে। ওকে ছেড়ে থাকতেও ইচ্ছে করেনা অপুর, কিন্তু অভাবের সংসারে কি এ বিলাসিতা চলে? এই ভেবেই নি:শ্বাস ফেলে পা বাড়ায় অপু।


কলকাতায় পৌঁছে ধাঁধা লেগে যায় চোখে। কত আলোর রোশনাই। কোথাও যেন দু:খের লেশ নেই।দিনগুলো কাটে স্বপ্নের মতন। পাওনাও বেশ ভালই হয়েছে। অপুর মনও বেশ খুশি। বুনুর জন্য একটা বেশ সুন্দর কুর্তা কিনল ও। মার জন্য শাড়ি। বাবা আর নিজের জন্য দুটো টি শার্ট। এবার ফেরার পালা, কতদিন দেখেনি বোনটাকে। আর ওদের এখনও মোবাইল নেই। তবে আরেকটু টাকা জমলে কিনতে হবে, নয়তো মা বড় চিন্তা করে। ওরা কোন খবর দিতে পারেনা। পুজোর দাদাদেরও অসুবিধে হয় যোগাযোগে। পাশের বাড়ির দাদাকে ওদেরই একজনের মোবাইল থেকে ফোন করে বলেছিল মাকে তাদের পৌঁছনোর কথাটা জানিয়ে দিতে।


বাস, ট্রেন, খেয়া পেরিয়ে সন্ধে পেরোয় বাড়ি ঢুকতে। পল্লী লক্ষ্মীদের শঙ্খধ্বনি আকাশকে মুখরিত করছে, তুলসী-তলার প্রদীপ জানান দিচ্ছে গার্হস্থ্যর শ্রীর। সব অমঙ্গল ঘুচে যাক। ঝিঁঝিধ্বণি আর হিমেল বাতাস গায়ে মেখে ঘরে পৌঁছয় অপু। মা এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুগ্গা কই?

মাকে শুধোয় অপু,

—বুনু কই মা?

—ওর তো জ্বর, শুয়ে পড়েছে।

—কই?

—ঐ তো ঘরে, তুই হাত পা ধো তারপর...

ততক্ষণে অপু ছুটে গেছে ঘরের দিকে। দুগ্গা ঘুমোচ্ছে, কদিনে যেন রোগা হয়েছে আরও মেয়েটা। মিশে গেছে বিছানায়। অপুর চোখের কোল চিকচিক করে ওঠে।আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বসে থাকে পাশে কিছুক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে এসে মাকে জিজ্ঞেস করে,

—কবে থেকে জ্বর মা?

—তা তো সাতদিন হবে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিলাম। কোন ডাক্তার নেই। নার্স দুটো ওষুধ দিল।খাওয়ালাম। একটু কমল, আজ আবার যে কে সেই।

—-হুমম, কাল দেখি তবে সদরে নিতে হবে।

সকালবেলা, অপু আসে দুগ্গার কাছে। দাদাকে দেখে উঠে আসতে চায় দুগ্গা, অপু ইশারায় বলে শুয়ে থাকতে। কপালে হাত দিয়ে দেখে উত্তাপ নেই। জ্বর ছেড়েছে তার মানে।


দুগ্গা গল্প করে অপুর সাথে কলকাতার, কিন্তু একটু বাদেই ঘুমিয়ে পড়ে। বেচারি বড় দুর্বল। কিন্তু এর মধ্যেও দাদাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে ভোলেনা।


দুপুরবেলা, রোদ রাঙা হয়ে ছুঁয়েছে গাছের ডাল। জঙ্গুলে ঝোপঝাড়ের গন্ধ আসছে উত্তর দিক থেকে। মার গলা পায় অপু,

—ও দুগ্গা, চা দিকি। ও দুগ্গা কি হল, ওঠ মা। ওগো এসো তোমরা, ও অপু, ইদিকে আয়।

দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে দৌড়য় অপু , তার বাবাও ছুটে আসে। অপু ঘরে ঢুকতেই টের পায় অদৃশ্য কেউ যেন বলে দিল আর সময় নেই বেশী। দুগ্গার মাথাটা ধরে ঝাঁকায় সে, “এই

ডুগি, এই বুনু, তাকা, কি হল তোর?”

একঝলক দৃষ্টি আর তারসাথে নড়ে ওঠে ঠোঁট দুটো। তারপর শুধু নীরবতা। মায়ের বুকফাটানো আর্তনাদ ছাপিয়ে যায় সবকিছু।


অনেক রাত এখন।সদরের ডাক্তার এসে জ্বরের কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। উঠোনে শোয়ানো আছে দুগ্গার দেহটা। এবার সবাই এগোবে শ্মশানের দিকে। অপুর কোনদিকে মন নেই। যন্ত্রচালিত পুতুলের মতন সব কাজ সারছে সে। মিটল মুখাগ্নি, দাহকাজ, শেষ সব।


এবার ঘরে ফেরার পালা। ঘরে ঢোকার মুখে বাঁশের খুঁটিটা। থমকে দাঁড়ালো অপু। একটা রুগ্ন কালো মেয়ের, তার একমাত্র বোনের, শেষ ইচ্ছেটা.., এটাকে ছুঁয়েই ব্যক্ত করেছিল পাগলিটা। খুঁটিটায় হাত বোলায় অপু, তারপর পাগলের মতন জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ওঠে, “বোন কটা দিন দিলিনা আমায়? তোকে বেড়াতে নিয়ে যেতে, দাদাটাকে শেষ উপহারটাও দিতে সময় দিলিনা!!!”






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮