• শর্মিষ্ঠা বসু

গল্প - কোজাগরী




চন্দনকাঠের বাক্সে বহু ব্যবহারে বিবর্ণ কাগজ সযত্নে ভাজ করে রাখলো শ্রুবাবতী ! তার স্বামীর লেখা শেষ চিঠি ! তারপর, দ্বিতলের অলিন্দে এসে দাঁড়ালো কিছুক্ষন! অনিন্দ্যসুন্দর মুখমণ্ডলে বিষাদের ছায়া! সন্ধ্যা সমাগমে কুলায় ফিরছে পক্ষিকুল! আর ঠিক ক তিনদিন পরে কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমা ! জমিদারভবনে এখন উৎসবের স্পর্শ লেগেছে ।আসন্ন মহালক্ষ্মী পূজার প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ ! সংলগ্ন অতিথি ভবন থেকে অলস হাস্য- পরিহাস ও বাক্যালাপের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ! আলোকিত পুষ্পশোভিত অট্টালিকা ও অট্টালিকা সংলগ্ন উদ্যানবাটিকা! মঞ্জরিত পুষ্পগন্ধে আমোদিত চারদিক! দুই চোখ বাষ্পাকুল হলো শ্রুবাবতীর । বড় দুঃসহ এই নিঃসঙ্গ জীবন! বড় যন্ত্রণার স্বামীর জন্য নিষ্ফল প্রতীক্ষায় দিনযাপন ! শত কাজের মাঝেও বুকের অতল থেকে উঠে আসে নীরব কান্না ! নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে শূণ্য দৃষ্টি প্রসারিত করে আত্মমগ্ন হলো শ্রুবাবতী।


হঠাৎ অদূরে অস্ফুট একটা শব্দ পেয়ে চমকে উঠলো সে। শরীরের অভ্যন্তর কেঁপে উঠলো যেন ! কে ওখানে ? উদ্যানবাটিকা সংলগ্ন এই গুপ্তপথ তো সকলের পরিচিত নয় ! কিছুক্ষন নিস্তব্ধ চারদিক ! দূরদূরান্তে কোথাও কোনো শব্দ নেই ! তারপর আবার শুস্ক পত্রের মড়মড় শব্দ শোনা গেলো ! ত্রাসবিহ্বল শ্রুবাবতী প্রশ্ন করলো কে? কে ওখানে ?


নৈশ স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে এক ক্ষীণকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো ! হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হলো শ্রুবাবতীর । এ তো সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ! প্রস্তরমূর্তির মতন কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো সে ! তারপর ধীরে ধীরে বললো তুমি ? কোথা থেকে ?


যন্ত্রচালিত পুত্তলিকার মতন স্বল্পালোকিত সোপান অবতরণ করলো শ্রুবাবতী । তারপর অর্গলবদ্ধ দ্বার উন্মোচন করলো সন্তর্পনে ! অপলকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো সে। এই কি তার স্বামী রুদ্রনারায়ণ ? চার বৎসর পূর্বের সেই অগ্নিবর্ণ , সুঠামদেহ , দীর্ঘদেহী যুবক আজ রুগ্ন , ভগ্নস্বাস্থ্য , শীর্ণদেহ !






অবিভক্ত বাংলাদেশের সুন্দর এক গ্রাম ! চারদিকে শ্যামল শস্যভূমি! ছবির মতন সুন্দর এই গ্রামের মানুষ ফসল ফলায়, সুখী গার্হস্থ্যে পরিবারের ভরণপোষণ করে, কুটিরের অঙ্গনপ্রান্তে শাকসবজির চাষ করে, গৃহপালিত পশু প্রতিপালন করে ! এখানে নগরজীবনের কর্মচাঞ্চল্য নেই ! স্নানার্থীরা ঘাটে স্নান করে, পূজার্থীরা দেবায়তনে পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করে , দলবদ্ধ হয়ে গ্রামের পথে ক্রীড়া করে বালকবৃন্দ ! জীবন এখানে শান্ত , নিরুপদ্রব , নিস্তরঙ্গ !


এই গ্রামের প্রজাবৎসল জমিদার দর্পনারায়ণ চৌধুরী বাণিজ্যশেষে গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিলেন ! সূর্য তখন মধ্যাহ্নে উপনীত ! বাতাসে উষ্ণতার স্পর্শ অনুভূত হচ্ছে ! ক্লান্ত বোধ করলেন দর্পনারায়ণ ! অনতিদূরে এক বৃক্ষলতাপূর্ণ জনবিরল স্থান দেখতে পেয়ে বাণিজ্যতরী থেকে অবতরণ করলেন তিনি । নিকটেই এক সরোবরের স্বচ্ছ শীতল জলে অবগাহন করে পরম তৃপ্তি বোধ হলো !


সরোবর পার্শ্বে এক ভগ্ন দেবায়তন প্রাঙ্গনে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন দর্পনারায়ণ ! হঠাৎ এক উজ্জ্বল ধাতব বস্তুর দিকে নজর পড়লো তার ! নিকটে যেতেই দেখলেন অষ্টধাতুর অপরূপ এক লক্ষ্মীমূর্তি ! সেইদিন রাত্রে এক বিচিত্র স্বপ্ন দেখলেন দর্পনারায়ণ ! মৃগচর্মাসনে উপবিষ্টা চতুর্ভূজা মহালক্ষী ! দুই হস্তে স্বর্ণকমল , অপর হস্তদ্বয়ে স্বর্ণপ্রদীপ ! নানা অলংকারে শোভিতা দেবীর সর্বাঙ্গ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে জ্যোতি ! তারপরেই ঘন কুয়াশায় আবৃত হলো চরাচর ! স্বেদসিক্ত দেহে উঠে বসলেন দর্পনারায়ণ! গৃহে ফিরে স্বপ্নে দেখা সেই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করলেন নিজের নাটমন্দিরে ! কোজাগরী লক্ষ্মীপূণিমায় তিনদিন ব্যাপী মহোৎসব চললো !


এর কিছুমাস পরের কথা ! শ্রাবনী পূর্ণিমার রাত্রি ! সমস্ত রাত্রির বর্ষণে ভেসে গেছে গ্রাম ! হঠাৎ মাঙ্গলিক শঙ্খধব্নীতে মুখরিত হলো রাজভবন ! ঘৃতপ্রদীপ জ্বলে উঠলো, ধূপের গন্ধে আমোদিত হলো চারদিক ! শিশুকন্ঠের ক্রন্দনধ্বনি শোনা গেলো ! এক দেবতুল্য সন্তানের জন্ম দিলেন ব্রহ্মময়ী ! মহালক্ষ্মীর আশীর্বাদে পিতা হলেন নিঃসন্তান দর্পনারায়ণ ! মহা ধুমধাম সহকারে নামকরণ উৎসব হলো কুমারের ! পিতা দর্পনারায়ণ তার পুত্রের নাম রাখলেন রুদ্রনারায়ণ !


অসাধারণ মেধাবী কুমার রুদ্রনারায়ণ ! তবে পিতার মতন জমিদারিতে আগ্রহ নেই তার ! জ্ঞানার্জনের প্রভূত আকাঙ্ক্ষা আর অধ্যয়নের অনন্ত আকর্ষণে তার দিন অতিবাহিত হয় পাঠগৃহে ! প্রখর বুদ্ধিমান , সুদর্শন সর্ববিদ্যায় পারদর্শী বিবাহযোগ্য পুত্রের বিবাহের জন্য উদ্যোগী হলেন দর্পনারায়ণ ! নিকটবর্তী গ্রামের রূপবতী , সর্বসুলক্ষণা একাদশবর্ষীয়া বালিকা শ্রুবাবতীর সঙ্গে নির্বিঘ্নে বিবাহ সম্পন্ন হলো ঊনবিংশবর্ষীয় রুদ্রনারায়ণ চৌধুরীর ! নৃত্য গীত হর্ষোল্লাসে মুখর হলো জমিদার ভবন !


শ্বশুরগৃহে এসে চমৎকৃত হলো শ্রুবাবতী ! ইতিপূর্বে এতো বড় প্রাসাদ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার! প্রায় ত্রিশ বিঘা জমির উপর বিলাসবহুল অট্টালিকা ! একপ্রান্তে অতিথিভবন , অপরপ্রান্তে নাটমন্দির ! প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানে অগণিত ফুলের সমারোহ ! প্রাসাদের পিছনে আম, জাম , কদলী, নারিকেল প্রভৃতি ফলের বাগান ! এতো বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত নয় শ্রুবাবতী । পিতৃগৃহে সাধারণ গৃহস্থের স্বাচ্ছন্দ্যে দিনযাপন করেছে সে ! বংশগৌরব আর রূপের জোরে প্রবেশাধিকার পেয়েছে জমিদারবাড়িতে ! অবাক বিস্ময়ে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করে শ্রুবাবতী । এতো বড় প্রাসাদে দিবালোকেও দিগ্ভ্রম হয় তার !


এ বাড়িতে সকলের স্নেহের পাত্রী শ্রুবাবতী । শুধু স্বামী নামক মানুষটিকে বড় অদ্ভুত লাগে তার ! এক ভিন্ন গ্রহের অধিবাসী যেন ! অধ্যয়নে নিমগ্ন মানুষটির প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করে সে ! বিবাহের পরে স্বামীর সঙ্গে কোনোরকম বাক্য বিনিময়ের সুযোগ হয়নি তার । অবাক লাগে শ্রুবাবতীর । সখীদের নিকটে শোনা স্বামী সংক্রান্ত কাহিনীগুলির সঙ্গে ঠিক ক মেলানো যায় না তার স্বামীকে ! অধীর আগ্রহে সুযোগের অপেক্ষা করে সে ! এই মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হওয়া বড় প্রয়োজন !


চারদিকে মসীকৃষ্ণ অন্ধকার ! শয্যায় উঠে বসলো শ্রুবাবতী । পাশে নিদ্রারত ব্রহ্মময়ীরদিকে তাকালো একবার তারপর সন্তর্পনে নির্গত হলো শয়নকক্ষ থেকে! দ্রুতপদে এগিয়ে চললো স্বামীর পাঠগৃহের দিকে ! নিস্তব্ধ অন্ধকার পুরী! সোপান বেয়ে উপরে এলো শ্রুবাবতী । দ্বিতলের একপ্রান্তে একটি বৃহৎ কক্ষ , এটি রুদ্রনারায়ণের পাঠগৃহ ! পাঠগৃহটি প্রকান্ড , কক্ষের মাঝামাঝি একটি কাঠের টেবিল ! দেওয়ালজোড়া কাঁচের আলমারিতে অজস্র পুস্তক ! দুইপার্শ্বে বেশ কিছু কাঠের কেদারায় ইতস্তত জরির কারুকাজ করা তাকিয়া ছড়ানো ! একপ্রান্তে একটি আরাম কেদারায় অর্ধশায়িত রুদ্রনারায়ণ ! নিমীলিত নেত্র ! দ্বারদেশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে শ্রুবাবতী। এই সুঠাম , সুন্দর , অগ্নিবর্ণ মানুষটি তার স্বামী !


শ্রুবাবতী । নৈশ স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে রুদ্রনারায়ানের কণ্ঠস্বর শোনা যায় ! স্তব্ধ হয়ে যায় শ্রুবাবতী । বেতসপত্রের ন্যায় কাঁপতে থাকে ! তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় রুদ্রনারায়ণের দিকে ! রুদ্রনারায়ণ গভীরভাবে অবলোকন করে শ্রুবাবতীর মুখখানি ! ঘনান্ধকার রাত্রি, ক্ষীণ চন্দ্রমার আলোয় আরো মোহময়ী লাগে রত্নালঙ্কারে আবৃত এই একাদশবর্ষীয়া বালিকাকে ! কি অনির্বচনীয় রূপ ! আত্মসংবরণ করলেন ঊনবিংশবর্ষীয় যুবক ! ধীরে ধীরে টেনে নিলেন পাশে রাখা উপনিষদ ! পাঠ করে শোনাতে থাকলেন শ্রুবাবতীকে।


প্রতিদিন রাত্রে এই গোপন সাক্ষাৎ চলতে লাগলো ! এক বিচিত্র অভিসার ! সারাদিন এই রাত্রিটুকুর প্রতীক্ষায় থাকে শ্রুবাবতী । এক নতুন পৃথিবী , এক অমৃতলোক আবিষ্কার করছিলো সে ! আর পত্নী সান্নিধ্যে এক নতুন সত্তা উন্মোচিত হচ্ছিলো রুদ্রনারায়ণের । এ এক বিচিত্র অনুভূতি , স্বপ্নের মতন! নিস্তরঙ্গ জীবনে অনাস্বাদিত আলোড়ন ! শ্রুবাবতী বিদায় নেওয়ার পরেও রত্নালঙ্কারে সজ্জিতা অপাপবিদ্ধা দুটি চোখের দৃষ্টি বারবার মনে আসে তার । মধুসঞ্চার হয় প্রাণে ! এক নিবিড় অন্তরঙ্গতা অনুভব করে রুদ্রনারায়ণ ! কিন্তু না, এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায়না কোনোভাবেই ! এক বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সামিল হতে হবে তাকে ! এই জীবন তার জন্য নয়!


“ বিশাল দেশ আমাদের ! নদ নদী গিরিসমতল , অরণ্য ....,” একনাগাড়ে কথা বলছিলো রুদ্রনারায়ণ ! বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে শ্রুবাবতী। আজ বড় অচেনা লাগছে মানুষটাকে ! “ আমাদের দেশ আজ বর্বর লোভী ইংরেজ দের অধীনে “ দুই চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ছে রুদ্রনারায়ণের !

উত্তেজনায় রক্তবর্ণ মুখাবয়ব , মুখমন্ডলের পেশি সুদৃঢ় ! “ নৃশংস , অত্যাচারী ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত করতে হবে দেশকে”! ক্রোধের আগুনে জ্বলজ্বল করে রুদ্রনারায়ণের দুই চোখ ! নীরবে শুনে যায় শ্রুবাবতী ! এই গ্রামের অন্য মানুষদের মতন ইংরেজ শাসন ও শোষণের কথা সে জানেনা । তখন বিদেশি , শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে উত্তাল হয়েছে ভারতবর্ষ কিন্তু এই গ্রামে তার আঁচ লাগেনি এতটুকু ! বহির্জগতের সঙ্গে এই গ্রামের মানুষের বিশেষ সম্পর্ক নেই ! এখানে প্রত্যুষে পাখির কূজনে নিদ্রাভঙ্গ হয় , ভাটিয়ালি গেয়ে নৌকা বায় মাঝিমাল্লার দল , কৃষিক্ষেত্রে ধান বপন করে কৃষক ! ইংরেজ শাসনের খোঁজ রাখেনাএ গাঁয়ের মানুষ !


রাত প্রায় এক প্রহর অতিক্রান্ত ! ধীরপদে পাঠগৃহ থেকে বাইরে আসে শ্রুবাবতী ! নিঃশব্দে এসে শয়ন করে ব্রহ্মময়ীর পাশে , প্রতিদিনের মতন ! সে রাত্রে ঘুম আসেনা আর ! এক অজানা অমঙ্গল আশঙ্কায় বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করে সে ! শূন্যদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে রাতের আকাশের দিকে !


এইভাবেই ছয়মাস অতিক্রান্ত হয়! একদিন প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হলো শ্রুবাবতীর । প্রভাতের ক্ষীণ আলো আসছে বাতায়ন পথে ! দূর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট ক্রন্দনধ্বনি শুনে এগিয়ে যায় শ্রুবাবতী । অমঙ্গল আশঙ্কা গ্রাস করছে অন্তঃকরণ ! দুঃসংবাদ পেতে বিলম্ব হয়না ! গত রাত্রে গৃহত্যাগ করেছে রুদ্রনারায়ণ ! মৃন্ময়ী মূর্তির মতন নিস্পন্দভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শ্রুবাবতী । ধীরে ধীরে তুলে নেয় গৃহত্যাগের পূর্বে রুদ্রনারায়ণের লেখা পত্রখানি ! নিরাপদ আশ্রয়ে আহার বিহার বিলাসিতায় জীবন oনষ্ট করতে চায় না কুমার রুদ্রনারায়ণ ।দেশের কল্যাণ তার লক্ষ্য ,,দেশের মুক্তি তার স্বপ্ন! পত্রে লেখা অক্ষরগুলি ঝাপসা লাগে শ্রুবাবতীর । ভুলুন্ঠিত হয়ে সংজ্ঞা হারায় সেই মুহুর্তে ।


রুদ্রনারায়ণের অন্তর্ধান সংবাদ পল্লবিত হয় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ! ঘটনার রুঢ়তায় রোদন বিস্মৃত হলেন দর্পনারায়ণ ! পুত্রশোকে শয্যা গ্রহণ করলেন ব্রহ্মময়ী ! স্বরযন্ত্র প্রায় বিকল , মস্তিষ্কেও আঘাতের লক্ষণ প্রকট ! অক্লান্ত সেবা করে যায় শ্রুবাবতী । তবু একদিন আর নিদ্রাভঙ্গ হয়না ব্রহ্মময়ীর ! বর্ষা অন্তে এক শারদপ্রাতে তার আত্মা নশ্বরদেহ ত্যাগ করে যাত্রা করে অমৃতলোকের পথে ! স্তব্ধ হয়ে যায় শ্রুবাবতী । সর্বগ্রাসী এক যন্ত্রনায় ক্ষতবিক্ষত হয় দেহ মন ! দুঃখবোধ , অসহায়বোধে প্লাবিত হয় চিত্ত !


ব্রহ্মময়ীর মৃত্যুর পরে পাঠগৃহে আশ্রয় নেয় শ্রুবাবতী । দিবারাত্র চলে অক্লান্ত অধ্যয়ন । শ্রুবাবতীর জ্ঞানস্পৃহা , মেধা ও অনুসন্ধিৎসা দেখে তার জন্য চতুস্পাঠীর অধ্যাপক নিযুক্ত করলেন দর্পনারায়ণ ! শুরু হয় বাংলা, সংস্কৃত , ব্যাকরণ , গণিতশিক্ষা ও অনুশীলন ! অধ্যয়নে নিমগ্ন হয় শ্রুবাবতী । নবজীবনের সূচনা হয় তার। পাঠগ্রহনের সঙ্গে সঙ্গে আয়ুর্বেদাচার্যেরকাছে আয়ুর্বেদশিক্ষা গ্রহণ শুরু করে শ্রুবাবতী ।


ব্যস্ততায় অতিবাহিত হয় দিন ! অতিথিশালার একটি কক্ষে ভেষজ ঔষধির সাহায্যে গ্রামবাসীর চিকিৎসা শুরু করে সে ! প্রজাদের মঙ্গল, প্রজাদের আরোগ্য তার নেশা , তার জীবনসাধনা !


“ বাবামশাই”, শ্রুবাবতীর কণ্ঠস্বর শুনে তাকালেন দর্পনারায়ণ ! অস্পষ্ট দীপালোকে তাকিয়ে দেখলেন পুত্রবধূর নিষ্পাপ মুখখানি ! সপ্তদশবর্ষীয়া এই নারীকে চরম বঞ্চনা করেছে ভাগ্যদেবতা ! কি এক অন্তর্লীন বেদনা গোপনে বহন করে চলেছে প্রতিনিয়ত ! বাষ্পাকুল হলো বৃদ্ধের দুই চোখ ! “ কিছু বলবি মা , “ স্নেহার্দ্র কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন করেন দর্পনারায়ণ ! “ প্রাসাদসংলগ্ন ছোটমন্দির প্রাঙ্গনে একটি নারী বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করতে চাই বাবামশাই ! আপনার অনুমতি. প্রয়োজন ! শ্রুবাবতীর আত্মপ্রত্যয়ে প্রসন্ন হলেন দর্পনারায়ণ ! এ যে অতি উত্তম প্রস্তাব ! গ্রামের মেয়েরা যাতে জ্ঞানসূর্যালোকের সন্ধান পায় তার প্রচেষ্টা ! দর্পনারায়ানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শ্রুবাবতী । এই নির্মম , নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাবামশাই তার একমাত্র অবলম্বন ! রুদ্রনারায়ণের গৃহত্যাগের পর চার বৎসর অতিক্রান্ত প্রায় ! বুক ঠেলে উঠে আসে ভাষাহীন নীরব কান্না ! কিন্তু না, থামার সময় নেই এখন ! বাইরে এসে দাঁড়ায় শ্রুবাবতী। মস্তিষ্কে দৃঢ় সংকল্পের প্রস্তুতি চলছে যেন !



জীর্ণবস্ত্র পরিত্যাগ করে দীর্ঘসময় ধরে পুস্পসুবাসিত জলে স্নান করলেন রুদ্রনারায়ণ ! বড় তৃপ্তিবোধ হচ্ছে এখন ! প্রায় চারবৎসর পরে আজ নিজগৃহে ফিরেছে সে ! বড় কঠিন জীবন তার! পদে পদে আত্মরক্ষা আর জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম ! তবু শৃঙ্খলমুক্ত করতে হবে দেশকে ! দেশমাতৃকার এই অবমাননা , এই অপমান মেনে নেওয়া যায়না !


রৌপ্যপাত্রে রাখা মিষ্টান্ন আহার করলেন রুদ্রনারায়ণ ! আসন্ন পূর্ণিমার আলোয় চন্দ্রালোকিত কক্ষ ! মৃদু আলোকে শ্রুবাবতীর দিকে চোখ পড়লো হঠাৎ ! উপবাস ও কৃচ্ছসাধনে শীর্ণকায়া প্রায় আভরণহীন এক নারী ! অনিন্দ্যসুন্দর মুখমন্ডল ! অজ্ঞাত আকর্ষণে ভিতর কেঁপে উঠলো তার ! উত্তাল হয়ে উঠলো দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা ! শপথের কঠোরতা , দৃঢ়তা , সংকল্প সব হিমবাহের মতো গলে যাচ্ছে তীব্র ভালোবাসার তাপে !


নিনির্মেষ তাকিয়ে থাকে রুদ্রনারায়ণ ! কি অপরূপ সুন্দর এই নারী ! কি অপূর্ব এর কৃষ্ণবর্ণ অক্ষিপল্লব ! মুহূর্তের জন্য রুদ্রনারায়ণের মনে হয় এই পথ ভ্রান্ত ! অন্ধের মতন ছুটে চলেছে দেশমাতৃকার মুক্তির মোহে ! এ অন্যায় , এ পাপ ! দহনে দগ্ধ হয় রুদ্রনারায়ণের অন্তর ! সমস্ত চেতনা জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে অপরাধবোধের যন্ত্রনা ! শ্রুবাবতীর এই জীবনের জন্য দায়ী সে নিজে ! নিদারুন গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয় তার মন ! প্রায়ান্ধকার কক্ষে একটি ঘৃতপ্রদীপ জ্বলে মৃদুমৃদু ! বাতায়নপথে আসা নির্মল গন্ধহীন বাতাসে এখন শীতলতার স্পর্শ !


প্রকান্ড শয়নকক্ষে শুভ্রশয্যা পাতা ! বাতাস এখন আমোদিত পুষ্পগন্ধে ! শ্রুবাবতীর নিকটে গিয়ে দাঁড়ালেন রুদ্রনারায়ণ! তৃষিত দৃষ্টিতে কিছুসময় তাকিয়ে রইলেন তার দিকে ! তারপর দৃঢ় আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ করলেন তাকে ! লজ্জায় মুখ সিঁদুরবর্ণ হলো শ্রুবাবতীর । মুহূর্তে স্তব্ধ হলো জ্যোৎস্নালোকিত চরাচর , নির্বাপিত হলো কক্ষের ঘৃতপ্রদীপখানি ! বর্ষণমুখর হলো তৃষিত মরু ! মধ্যরাত্রে গ্রামবাসী অর্গলবদ্ধ গৃহে সুখনিদ্রায় রাত্রি অতিবাহিত করলো ! শুধু অজস্র নক্ষত্রখচিত আকাশ সাক্ষী রইলো এক বিরহ তাপিত নর নারীর প্রেম বিনিময়ের !


স্নানঘরে প্রবেশ করে স্নান করলো শ্রুবাবতী । স্নানশেষে সিন্দুরবিন্দু অঙ্কন করলো সীমন্তে ! সূর্যোদয় এর বিলম্ব আছে এখনো ! অপলকে তাকিয়ে ছিল রুদ্রনারায়ণ ! সেদিনের সেই চঞ্চলা বালিকা বধূ আজ সপ্তদশবর্ষীয়া পূর্ণাবয়ব যুবতী ! বিমর্ষ চিন্তানুভূতিতে ক্লিষ্ট হলো তার মন ! এগিয়ে এসে শ্রুবাবতীর করকমল স্পর্শ করলেন তিনি ! তারপর ধীরে ধীরে বললেন , “ আমায় মার্জনা করো শ্রুবাবতী । পাপ, পুন্য , ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা আমার জানা নেই ! শুধু এটুকু বলতে পারি তোমার স্নিগ্ধ , পবিত্র এই চোখ , তোমার সীমন্তে আঁকা এই সিন্দুরবিন্দু আমায় বহু রাত্রি জাগিয়ে রেখেছে ! চোখ বুজলেই ভেসে উঠেছে তোমার অপাপবিদ্ধ এই মুখ ! অধোবদন হলো শ্রুবাবতী । অধর দংশন করে রোধ করছে অবরুদ্ধ ক্রন্দন !


কক্ষে ক্ষণিক স্তব্ধতা ! নিস্পলক নেত্রে কিছুক্ষন চেয়ে রইলো শ্রুবাবতী । তারপর ধীরে ধীরে বললো “ তোমার অবহেলার যন্ত্রনা আমার সহ্য হয়ে গেছে ! সংসার, স্বামী , সন্তানের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা আমার জন্য নয় এই সত্যও গ্রহণ করেছি আমি ! তোমার ভালোবাসা পাইনি তবু আমার জীবন অপূর্ণ একথা বললে মিথ্যাচার হবে ! এই নাটমন্দির , ঐ তুলসীমঞ্চ , এই অতিথিভবন , ঐ ঠাকুরদালান সব আমার ! এই গ্রামের সব প্রজা আমার সন্তান ! তোমার এখনো অনেক কাজ বাকি ! তুমি ফিরে যাও !


স্তম্ভিত হলেন রুদ্রনারায়ণ! সেদিনের সেই হাস্যমুখী বালিকা আজ আত্মসচেতন মর্যাদাশালিনী এক নারী , আত্মপ্রত্যয়ে দৃপ্ত ! বাষ্পাচ্ছন্ন হলো জমিদারতনয়ের দুই চক্ষু !


নবদিবসের আবির্ভাবলগ্ন সমাসন্ন ! আর কিছুক্ষন পরেই ঊষার প্রথম কিরণস্নাত হবে ধরিত্রী !নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো শ্রুবাবতী । অশ্রুভারনত আনত পবিত্র মুখ! সিঁদুরের ক্ষীন আভা বিস্তৃত সারা মুখে !


বিদায়লগ্ন সমাগত ! প্রভাতের প্রাক্কালেই চলে যেতে হবে রুদ্রনারায়ণকে ! এখানেও নিরাপদ নয় , চতুর্দিকে সন্দেহজনক চরের আনাগোনা ! এগিয়ে এলো শ্রুবাবতী ।মাথা নত করে প্রণাম করলো স্বামীর যুগ্মচরণে ! মস্তকে হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন রুদ্রনারায়ণ ! তারপর বললেন, তুমিই জয়ী শ্রুবাবতী ! জীবনযন্ত্রনায় জ্বলতে জ্বলতে আলোর পথ দেখিয়েছো সবাইকে ! জ্যোতির্ময় করেছো অন্ধকার ! তোমার বিভায় ঘুচে যাক সব দৈন্য , দুঃখ , ক্লেশ !


নিস্তব্ধ অন্তঃপুর পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন রুদ্রনারায়ণ ! হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন পিতামাতার শয়নকক্ষের দ্বারদেশে ! তারপর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন ! দ্রুতপদে সোপান অবতরণ করে নির্গত হলেন পথে ! নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শ্রুবাবতী ! অহর্নিশি অন্তরে যে মানুষটি বিরাজ করছে তার সঙ্গে হয়তো আর কোনোদিন সাক্ষাৎ হবেনা।


নির্জন পথ ধরে হেঁটে চলেছেন রুদ্রনারায়ণ! আর কিছুক্ষন পরেই শুভ্রালোকে পরিপূর্ণ হবে চারদিক ! একটি দুটি পাখির নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে এখন ! অপ্রকৃতিস্থের মতন হেঁটে চলেছেন তিনি ! পিছনে পরে থাকছে বহু স্মৃতি বিজড়িত গৃহ , প্রাঙ্গন , গোশালা , নাটমন্দির ! গতরাত্রের কিছুস্মৃতি তরঙ্গের মতন আছড়ে পড়ছে চোখের সামনে ! শিশিরসিক্ত মৃত্তিকায় পডে থাকছে তার পদচিহ্ন !


স্তব্ধ হয়ে তার গমনপথের দিকে চেয়ে রইলো শ্রুবাবতী । হাঁটতে হাঁটতে আর পিছনে তাকালো না রুদ্রনারায়ণ ! তাকানোর সাহস হলোনা ! তাকালে দেখতো অপূর্ব সুন্দর সর্বংসহা এক পাষাণমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে সেইখানে ! মুখ কষ্টবিদ্ধ যন্ত্রনায় পান্ডুর ! দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ধারা !



(অলংকরণ - অভিষেক চৌধুরী)



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮