• অনন্যা ব্যানার্জী

গল্প - খেলাঘর




বন্ধুদের গেট টুগেদার হবে সঞ্চারীর বাড়িতে। লোপামুদ্রার যাওয়ার খুব ইচ্ছে।


"কিন্তু ওখানে যদি শুভাশিস আসে।" তাই অনেক ভেবে লোপা সকলকে ওইদিন সন্ধ্যায় কিছু কাজ আছে জানিয়ে গেট-টুগেদারে এ আসার প্রস্তাবটা নাকচ করে দিল। ফোনটা রেখে মেয়ে তাতানকে নিয়ে তাড়াতাড়ি শুতে চলে গেল। মাকে বলল -"মা, আজ কেন জানি শরীরটা ভাল লাগছে না, আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ছি।"

তাতানকে গান শোনাতে শোনাতে তাতান কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে, তার খেয়াল নেই লোপার। হঠাৎ সম্বিত ফেরে বাইরের বৃষ্টির শব্দে। আজ আবার কেন জানি মন করছে মন খুলে বৃষ্টিতে ভেজার। আস্তে করে বারান্দার দরজাটা খুলে লোপা এসে দাঁড়ায় সামনের বড় বারান্দায়। বৃষ্টি ধারা এসে স্পর্শ করে যায় লোপার চোখ, মুখ দেহ। এক অবর্ণনীয় আনন্দে কেঁপে ওঠে লোপার শরীর,মন।


ঠিক এইরকম করেই লোপা আর শুভাশিস ভিজতো প্রথম বর্ষায়। ছাতা থাকলেও দুজনের কেউই পছন্দ করতো না ছাতা ধরতে। হাত ধরে মাঠে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিজতো প্রথম বর্ষায়। শুভাশিস এর কথা মনে পড়ে আবার গলার কাছে কষ্টটা যেন রুদ্ধ করতে চায় লোপার শ্বাস। আজ ও লোপা বুঝতে পারেনা কি করে হঠাৎই তাদের সুন্দর সম্পর্কের ওপর নেমে এসেছিল কালো বাদল। আজ ও মনে পড়লে কান্না পায় লোপার। কিন্তু কাউকে বলে না সে কথা।


কাকলি লোপা ও শুভাশিস এক সঙ্গে স্কুলে পড়তো। তারপর কলেজের পরে শুভাশিস ও লোপা জড়িয়ে পড়ে সারা জীবনের বন্ধনে। কবে যে বন্ধুত্ব তাদের মধ্যে একটা দৃঢ় সম্পর্কের বন্ধন হয়ে উঠেছিল, তা টের পায়নি দুজনের কেউই। স্কুলে দুজনে দুজনকে পছন্দ করলেও, কখনো বুঝে উঠতে পারেনি মনের টানটাকে। সেটা দুজনেই বেশী অনুভব করে যখন কলেজের পরে শুভাশিস বাইরে চলে গিয়েছিল। তখনই বাড়ির মতামত নিয়ে দুজনে আবদ্ধ হয় বিবাহ বন্ধনে। ভাল কাটছিল বিবাহিত জীবন। সময়ের নিয়মে আসে তাতান। তাদের পরিবার আনন্দে ভরে ওঠে।


পাঁচ বছরের অ্যানিভার্সারিতে এক নামী রেস্টুরেন্ট খেতে গিয়ে প্রথম দেখা হয় কাকলির সাথে। কাকলি ওখানে এসেছিল অফিসের বন্ধুদের সাথে। শুভাশিস ও লোপাকে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বলে। কথার সূত্রে জানা যায় কাকলি শুভাশিসের অফিসে চাকরি পেয়েছে। তার নতুন কাজ শুরু হবে পরের সপ্তাহে। এরপর মাঝে মাঝে কাকলি ও শুভাশিস যেত বাইরে কফি খেতে, সময় কাটাতো দুজনে। প্রথমে লোপাকেও আসতে বলতো ওরা। কিন্তু সংসারের কাজ, তাতানকে সামলে লোপার যাওয়া হতোনা বেশীরভাগ সময়ে। তারপর প্রায় প্রতিটি উইকএণ্ডেও কাকলি আসতে থাকে তাদের বাড়িতে। না চাইলেও যেন সে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে লোপা ও শুভাশিসের জীবনে। একদিন সন্ধ্যায় কাকলি তাদের শোনায় তার অসফল বিবাহিত জীবনের গল্প। তা শুনে সত্যি চোখে জল আসে লোপা ও শুভাশিসের। একটা করুণা যেন তাদের বন্ধুত্বের বন্ধনটাকে আরো দৃঢ় করে দেয়। তাতান ও খুব পছন্দ করতে থাকে কাকলিকে। প্রতিবার নতুন জামা, খেলনা, দিয়ে ভরিয়ে দেয় কাকলি তাতানকে। আর সারাদিন চলে তাদের নানা খেলা। প্রথম প্রথম লোপার ভাল লাগলেও, পরে এই সবসময় আসা যাওয়া মেলা মেশা যেন অসহ্য মনে হয় লোপার। তাদের জীবনের মধ্যে যেন না চাইলেও জড়িয়ে যাচ্ছে কাকলি। এই বিরক্তি চরমে পৌঁছায় যখন ছয় বছরের অ্যানিভার্সারিতে কাকলি লোপা ও শুভাশিসের সঙ্গে ডিনার করতে যায়। ভদ্রতা করে তারা কাকলিকে না করতে পারে না। এরপর থেকেই শুরু হয় অস্থিরতা। তাতানের শরীর খারাপের সময় শুভাশিস আসতে পারে না অফিসে র কোন কাজে আটকে পড়ে। লোপার মনে হয় এসব ই তার প্রতি শুভাশিসের উদাসীনতা। তারপর একদিন মলে বন্ধু র সঙ্গে শপিং করতে গিয়ে শুভাশিস ও কাকলিকে দেখতে পায় লোপা ওই মলে। সেদিন রাতে শুভাশিস জানায় কাকলি ইউএসে চলে যাচ্ছে। লোপা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে শুভাশিস তাকে কাকলির সঙ্গে শপিং করতে যাওয়ার গল্প বলবে। কিন্তু তা না বলায় লোপার মনের সন্দেহ বাড়তে থাকে। পরে একদিন শুভাশিসের ব্যাগে কাকলির ছবি দেখতে পায় লোপা। সেদিন আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। কোন আলোচনা বা সমালোচনা না করে তাতানকে নিয়ে লোপা চলে আসে তার বাপের বাড়িতে। শুভাশিস অবাক হয়ে যায় লোপার এই প্রস্তাবে। শুধু বলে -"তুমি কোথাও একটা ভুল করছো লোপা। একবার খুলে কথা বলো আমার সাথে।"


না লোপার মত অভিমানী মেয়ে আর কথা বলতে পারেনি শুভাশিসের সাথে। ভাই, মা, বাবা বোঝালে ও সব বিষ লাগে লোপার কাছে। একবার রেগে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ও বলেছিল লোপা। তারপর মা বাবা আর কোন জোর করেনি মেয়েকে। লোপাও ছেলে ও নিজের আর্থিক মেরুদণ্ড আরো একটু শক্ত করতে একটা ছোটদের স্কুলে চাকরি নিয়েছে লোপা। এতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে মনের প্রসারতা। একটু বন্ধুত্ব, একটু আলাপচারিতা তার একাকী জীবনটাকে একটু সুন্দর করে তুলতে সহায্য করেছে।


আজ আবার খুব মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথা। নিজেকেও মাঝে মাঝে খুব দায়ী মনে হয় লোপার আজকাল এত সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। হঠাৎ পেছনে এসে মা দাঁড়ায়। বলে -"বন্ধুরা এত করে বলছে, একবার ঘুরে আয়না শনিবার। তোর মনের পরিবর্তন হলে ভাল লাগবে তোর। "

"না, মা। আমার শুভাশিস কে দেখলে আবার আমার পুরনো স্মৃতি গুলো এসে ভিড় করবে মনের দোরগোড়ায়। অনেক কষ্টে দরজা বন্ধ করে রেখেছি আমি।" - বলে লোপা।

"তুই যা ভাল বুঝিস কর। কোন কথা তো শুনবি না। " - বলে মা গজ গজ করতে করতে চলে যায়। ফোনটা দিয়ে যায় লোপার হাতে।

সঞ্চারী মেসেজ করেছে -"লোপা প্লিজ আসার চেষ্টা কর শনিবার"

"দেখছি কি হয়" - বলে রিপ্লাই করে লোপা। মাথা যেতে না বললেও, মনটা যেন চাইছে যেতে লোপার।


শনিবার বিকেলে লোপা হলুদ পিওর সিল্কের শাড়ীটা পরে কপালে টিপ ও চোখে কাজল পরে তৈরি হয়ে নেয়। হলুদ রঙটা শুভর বরাবরের প্রিয়। আর লোপাকেও এই রঙটায় খুব মানায়। সঞ্চারী ও দোলনের বারবার রিকোয়েস্ট ফেলতে পারে না লোপা। ভাবে তাড়াতাড়ি গিয়ে চলে আসবে আজ।

সঞ্চারীর বাড়িতে পৌঁছে একটু লজ্জায় পড়ে লোপা। ভাবছিল লেট হয়ে গেছে, কিন্তু পৌঁছে দেখে শুভাশিস ছাড়া তখনো কেউ তেমন পৌঁছায়নি ওখানে। লোপা একটু হেসে গিয়ে বসে শুভাশিসের উল্টোদিকে রাখা সোফাটায়। সঞ্চারী প্রথম আলাপচারিতার পরে ভেতরে যায় কোল্ড ড্রিংক আনতে। "শুভাশিস এই এক বছরে যেন কেমন রুগ্ন হয়ে পড়েছে।" - মনে হয় লোপার। মুখে বলে -"কেমন আছো?"

"যেমন দেখছো লোপা।" - অল্প কথায় উত্তর করে শুভাশিস। "তোমাকে এই শাড়ীটায় খুব মানিয়েছে। তাতান কেমন আছে?"

"থ্যাংকস। তাতান ভাল আছে" - উত্তর করে লোপা।

ব্যাগ খুলে কিছু বার করতে গেলে লোপা দেখতে পায় শুভাশিসের ব্যাগে উঁকি দিচ্ছে তাদের তিনজনের দার্জিলিং ঘুরতে যাওয়ার ছবি। "ন্যাকামো" - মনে হয় লোপার কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন চিন চিন করে ওঠে তার। "কাকলি কেমন আছে? ও আজ এল না? "- প্রশ্ন করে লোপা।

"কাকলি তো আগের বছর ইউ এসে চলে গেছে লোপা। আর ও আজ আসবে কিনা, তা আমি না, সঞ্চারী বলতে পারবে।"

কথা শুনে মাথাটা ঘুরতে থাকে লোপার। "তোমরা তাহলে আলাদা থাকো?" - প্রশ্ন করে লোপা।

"তাতান ও তুমি চলে যাওয়ার পরে আমাকে কার সঙ্গে থাকতে এক্সপেক্ট করো তুমি,লোপা?" - প্রশ্ন করে শুভাশিস।


লোপার মনে হয় আজ শুভর চোখে যেন অশ্রুবিন্দু জ্বল জ্বল করে উঠল এই কথাগুলো বলতে গিয়ে।

"তুমি যেরকম ছেড়ে গিয়েছিলে, বাড়িটা আজ ও তোমাদের অপেক্ষায় ওইরকমই আছে। শুধু নুইয়ে পড়েছে সামনের তুলসী গাছটা, একটু ভালবাসার অভাবে। সন্ধ্যাবেলায় আজ কেউ আর প্রদীপ দেয়না তুলসী মঞ্চে। শুধু ধুলো জমেছে রান্না ঘরের তাকে। আজ কেউ নিজের হাতে পরিষ্কার করে না তাকে। আলমারি খুললে আজ ও পাই তোমার গন্ধ। শাড়ীগুলো ও যেন কাঁদে আজকাল আমার সঙ্গে। রাতে ঘুম না এলে তারা আদরে এলিয়ে দেয় স্নেহের আঁচল।"


এইসব শুনে লোপা আর চুপ করে থাকতে পারে না। শ্রাবণের ধারার মত অশ্রুধারা নেমে আসে তার চোখ বেয়ে। এগিয়ে আসে শুভ। আস্তে করে ধরে লোপার হাত। বলে -"একটু সামনা সামনি কথা বলে নিলে, আমাদের জীবনের মূল্যবান এই সময়টা নষ্ট হতে পারতো না। কাকলি ইউএস যাবে বলে আর ও এখানে একা বলে বন্ধু হিসেবে আমি ওর সঙ্গে শপিং, ওর ভিসা করতে সাহায্য করছিলাম তখন। তুমি যে আমাকে এতটা ভুল বুঝতে পারো তা ছিল আমার কল্পনার অতীত।"

"তুমি আমাকে সব বললে না কেন শুভ?" - বলে আরো জোরে কেঁদে ওঠে লোপা।

"তুমি তো আমাকে সে সুযোগ দাওনি লোপা। আমার কিছু বলার আগে তুমি আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলে মনগড়া কলঙ্কের ভার।"


লোপা এবার নিজের ভুল বুঝে কাঁদতে থাকে অবিরাম ধারায়। বাইরেও তখন নেমেছে বৃষ্টি। লোপার হাত ধরে শুভ এসে দাঁড়াল বাইরের বারান্দায়। শ্রাবণের ধারা এসে আবার ও সিক্ত করে যায় দুটি হৃদয়কে। লোপা লজ্জায় মুখ লোকায় শুভর বুকে।


পেছনে সঞ্চারী এসে দুই বন্ধুকে এক হতে দেখে খুশী হয় মনে মনে। তাড়াতাড়ি ফোন লাগায় সুদূর ইউএসেতে।


"হ্যাঁ কাকলি, আমি তোর কথামত পেরেছি আবার শুভকে তার ভালবাসা ফিরিয়ে দিতে। ইয়েস উই ডিড ইট।"

কাকলির মুখেও আজ পরিতৃপ্তির হাসি। তার দোষে যে সুখের সংসার ভেঙে গিয়েছিল, তা এক হয়ে গেছে শুনে কিছুটা হলেও যেন নিজের দোষ লাঘব হল তার। এই ঘটনার পর শুধু লোপা নয়, তার নিজেকে দোষী মনে হত ছোট্ট তাতানের কাছেও।

ফোন রেখে সঞ্চারী এবার ছুটে যায় বারান্দায়। "তোরা একা একা ভিজবি? আমাকেও নেয়ে তোদের সাথে।"

ছোটবেলার মত তিন বন্ধু আনন্দে ভিজতে থাকে বারান্দায়। দূর থেকে শোনা যায় গান -

"আজ হোক না রঙ ফ্যাকাসে তোমার আমার আকাশে চাঁদের হাসি যতই হোক না ক্লান্ত ....... ...... আজ ই বসন্ত। "



(অলংকরণ - অরূপ রায় চৌধুরী)

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮