• বিজয় ব্যানার্জি

গল্প - থিয়েটারদার শেষকথা

(প্রথম ভাগ)


“থিয়েটারকে এত অবজ্ঞা কেন?”


হঠাৎ পেছন থেকে বাজখাঁই গলার আওয়াজটা আমাদের সবাইকে চমকে দিল। ঘুরে তাকালাম। দেখি এক বুড়ো, এই ষাট সত্তর হবে, ছাপোষা দেখতে, পাকা চুল দাড়ি, পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম, আমাদের আলোচনা সব শুনেছে লোকটা।


কিন্তু, এ এলো কোথা থেকে? লাস্ট লোকাল এটা। ব্যারাকপুর থেকে আমরা চারজন, মানে আমি, নীল, অঞ্জন আর অখিল ছাড়া কামরাতো পুরো খালিই ছিল! কাউকে তো উঠতে দেখিনি এর মধ্যে। অবশ্য আমরা আমাদের মধ্যেই ডুবে ছিলাম। খেয়াল করিনি হয়ত। তাই হবে।


রোজকার মত বাড়ি ফেরার পথে আমরা জুত করে বসে আড্ডা মারছিলাম। চারজনেই চল্লিশ প্লাস। বউ বাচ্চা নিয়ে ছাপোষা সংসার। অখিল এই ক’দিন আগে পঞ্চাশে পা দিল। ওর বউ পায়েস বানিয়ে দিয়েছিল আমাদের জন্য।


লোকাল ট্রেনে যারা রোজ যাতায়াত করেন তারা জানবেন যে এই লোকাল ট্রেনেও কিন্তু একটা সংসার গড়ে ওঠে। প্রত্যেক ডেলি প্যাসেঞ্জারের স্টেশন টু স্টেশন একটা সংসার। বছর পাঁচেক বয়স হল আমাদের এই চার জনের সংসারের। কোকের বোতলে রাম পাঞ্চ করে বসা হয় রোজ। চুমুক দিয়ে কাউনটার পাস করতে করতে পলিটিক্স, খেলা, সিনেমা, পরকীয়া, বউ, বাচ্চা, সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান, চাল, ডাল, কপাল – সব কিছুই আলোচনা হয়। এই অলিখিত সংসারে চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই, কিন্তু অবলীলায় এমন এমন সব সাংসারিক আলোচনা হয়, যেগুলো বউ বাচ্চাদের সঙ্গেও করে ওঠার কথা ভাবতে পারিনা।

রোজ নানান টুকিটাকি কথাবার্তা দিয়ে শুরু হয় আমাদের সংসার। হতে হতে কোন একটা বিষয় মেইন টপিক হয়ে দাঁড়ায়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজকের মেইন টপিক হয়ে উঠেছিল থিয়েটার। অখিল তুলেছিল থিয়েটারের কথা। খুব মনমরা হয়েই তুলেছিল। মন ভারি বলে বেশ অনেকটা খেয়েছিল আজ। আর তাছাড়া আজ শনিবারের রাত। পরের দিন সকালে উঠেই ছোটবার তাড়া থাকেনা বলে শনিবারটা একটু বেশী করেই টানি আমরা। তা যাই হোক, অখিল বলছিল যে ওর মেয়ে একটা বাংলা থিয়েটারের দলে নাম লিখিয়েছে। মেয়ে এবার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করল। দেখতে শুনতেও ভালো। বিয়ের পাত্র দেখে দেওয়ার জন্য আমাদের ছবি দিয়েছিল। তাই জানি। নাম লেখানো নিয়ে বাড়িতে প্যাঁচাল তো হচ্ছেই, আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হল আগামী শনিবার মেয়ে যাচ্ছে দলের সঙ্গে মন্দারমণি দুদিনের অফসাইট ওয়ার্কশপ করতে। কুমারী মেয়ে অচেনা লোকজনদের সঙ্গে দু-রাত বাইরে কাটাবে, এটা ভেবেই ওর বউ দক্ষিণা কালীর মানত রেখেছে ফাঁড়া কাটাতে। দুদিন ধরে উপোষ করে আছে। কিন্তু কোন লাভই হচ্ছে না। মেয়ে যাবেই।


“হঠাৎ থিয়েটার কেন?” বিটনুন দেওয়া চিনেবাদাম চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করল নীল। অখিলের চোখে মুখে বিরক্তি। বোতলে একটা চুমুক দিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “কি জানি! বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে সে খবর রাখার সময় আছে? সেই ভোরে বেরোই। ফিরতে বারোটা। আর এনার্জি থাকে?”


অঞ্জন কাগজে খেলার খবর পড়ছিল। চোখ না সরিয়েই দায়সারা ভাবে বলে উঠল, “অফিসও করব, আবার বাড়িও সামলাবো, হয় নাকি? বৌদিরই উচিত ছিল ঠিক মত খেয়াল রাখা। এসব থিয়েটার ফিয়েটারের চক্করে একবার পরলে বেরনো মুশকিল।“


চৈতন্যের মত দুহাত উপরে তুলে আর্তনাদ করে উঠল অখিল, “তিনি তো বেরোতে চান না! থিয়েটার নিয়েই থাকবেন বলেছেন। আর বিয়ে থাও এখন করবেন না, এটা দয়া করে জানিয়ে দিয়েছেন।“


আমি কথা কম বলি। কম বলি মানে, আমার কথার কেউ খুব একটা পাত্তা দেয়না, তাই চুপচাপই থাকি। কিন্তু, আর যাই হোক শিল্পের অবজ্ঞা সহ্য হয়না। নিজে কোনোদিন চর্চা করিনি, কিন্তু মনের কোনায় কোথাও যেন একটু ব্যথা আছে। অঞ্জনের কথা শুনে তাই চুপ থাকতে পারলাম না। বোতলে একটা চুমুক দিয়ে অঞ্জনের দিকে ওটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “কেন? থিয়েটার কি প্রবলেম করল? শিল্পচর্চা তো ভালো কথা।”


“থামুন তো!“ অখিল খিঁচিয়ে উঠল। “জোয়ান মেয়ের বাপ হলে বুঝতেন।“


এইরকমই হয় রোজ। আজও গুম মেরে গেলাম। নীল কিন্তু ব্যাপারটা থিতিয়ে যেতে দিলনা। ওর সঙ্গে আমার একটা কোল্ড ওয়েভ চলে। এতক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরে দেখছিল। যেই দেখল আমি কর্নারড হয়ে গেছি, ওমনি ফুট কাটল। “বাদ দিন না! ওসব থিয়েটার ফিয়েটার স্রেফ ভাঁওতাবাজি। টাকা কড়ি দেওয়ার তো বালাই নেই, উল্টে নিজের পকেট থেকেই দিতে হবে দেখবেন। আর দর্শক কই? আজকাল কেউ তো যায়না বাংলা থিয়েটার দেখতে, তাও এত ঘটা? অফসাইট ওয়ার্ক শপ মাই ফুট! বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলোর মাথা মুরিয়ে টাকা হাতানো আর জীবন নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই তো হয়না ওসবে। মেয়েকে একদম অ্যালাও করবেন না ওসব গুড-ফর-নাথিং আঁতেলদের সঙ্গে টাইম ওয়েস্ট করতে। তেমন দরকার হলে চড় থাপ্পড়ও লাগিয়ে দেবেন, বুঝলেন?”


অখিল দেখলাম এসব শুনে বেশ একটু হাল্কা বোধ করতে শুরু করেছে। কয়েক ঘণ্টার সংসারে এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়া সম্ভবও নয়।


অন্যদিন হলে চুপ করেই থাকতাম, কিন্তু আজ জানিনা কি ভুত চাপল মাথায়। ফস করে নীলকে চার্জ করে বসলাম, “আর ইউ শিওর থিয়েটারের সবাই ভাঁওতাবাজ?” প্রশ্নটা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীল কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ও আসলে আশাই করেনি যে আমি পাল্টা জবাব দেবো। কোনোদিন দিইনা তো। ওর ভ্যাবাচ্যাকার রেশ শেষ হওয়ার আগেই সেকেন্ড অ্যাটাকটা করে ফেললাম – “আপনার মত কিছু লোকজন আছে বলেই সমাজে অনেক প্রোডাক্টিভ কাজ হতে পারেনা, সেটা বোঝেন?“


কথাটা শুনে নীলের যা চোখ মুখ হল, বুঝলাম এক্কেবারে মৌচাকের বাসায় হাত দিয়ে ফেলেছি।

ঝাঁঝিয়ে উঠল নীল, “আচ্ছা! খুব দরদ দেখছি! থিয়েটার করেন নাকি?” খবরের কাগজের থেকেও মুখরোচক কিছু পেতে যাচ্ছে, হয়ত এই মনে করেই অঞ্জন কাগজটা ফোলড করে বেশ উৎসাহ নিয়ে নীলের প্রশ্নের রেশ ধরে আমায় জিজ্ঞেস করল, “করেন?” আমি মাথা নেড়ে “না” জানালাম। হিতে বিপরীত হল। অঞ্জনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে টিটকিরি মারল নীল, “পাসায় নাই চাম, অন্যেরে শেখাই হরিনাম!” অঞ্জন নীলের ন্যাওটা, বিশ্রীভাবে হো হো করে হেঁসে উঠল। নীল বিজয়ীর মুখ করে অখিলের হাত থেকে বোতলটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে বেশ অনেকটা মেরে দিল।


অখিল বোধহয় বুঝেছিল যে ব্যাপারটা বেশ বিলো-দা-বেল্ট হয়ে যাচ্ছে, তাই সামাল দেওয়ার জন্য আমার উদ্দেশ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার মত করে বলে উঠল, “দেখুন থিয়েটার নিয়ে আমার আর তুলির মায়ের কোনো আইডিয়াই নেই। আমার চোদ্দ গুষ্টিতে কেউ ওই দিকে যায়নি। হতে পারে, ভালো লোক নিশ্চয়ই আছে থিয়েটারে, কিন্তু নীল যা বলল সেটাও তো ঠিক। আপনার ছেলের তো সামনের বছর হায়ার সেকেন্ডারি হয়ে যাবে। তা, সে যদি এসে বলে যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা এমবিএ না হয়ে সে থিয়েটার নিয়েই থাকবে, আপনি কি মেনে নিতে পারবেন?”


কথাটা নেহাত ভুল বলেনি অখিল। আমার ছেলে যদি সত্যিই এরকম কিছু বলে, আমি তো চোখে অন্ধকার দেখবো। আর আমার বউ তো নির্ঘাত হার্টফেল করবে। অখিলের যন্ত্রণাটা এবার একটু বুঝতে পারলাম। শিল্পের প্রতি ভালবাসার থেকে অনেক বড় সেই যন্ত্রণা। বুঝলাম, এই টপিকে চুপ করেই থাকাই ভালো।


নেশাটা বেশ চড়েছে আজ অখিলের। নিজের মনে বলেই চলেছে, “ভেবেছিলাম গ্র্যাজুএশনটা হয়ে গেলে মেয়েটাকে এমবিএ করাবো। কিছু ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছি সেটা ভেবে। প্যারালালি বিয়ের খোঁজ করব। ভালো পাত্র পেয়ে গেলেই বিয়ে দিয়ে দেবো। সেসব প্ল্যান পুরো মাটি করে দিল মাইরি! বলে কিনা, থিয়েটার ইস মাই লাইফ! আরে শালা, বাপের লাইফ হেল করা পয়সায় তো বড় হয়েছিস এতদিন। কি লাইফ দেখলি তুই?” বুঝতে পারছি যে অখিলের ওপর দিয়ে একটা ভীষণ রকম মানসিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কান্না জড়ানো গলায় মনের কোনায় লুকিয়ে রাখা গভীর ব্যথাটা শেষমেশ ও প্রকাশ করেই ফেলল, ”ভালো স্বামী হতে পারিনি, ভালো বাবাও হতে পারলাম না।“


অখিল যেটা বলল, সেটা আসলে আমাদের চারজনেরই অব্যক্ত দগ্ধতা। মনের গভীরে কবেই লিখে নিয়েছি যে আমরা জীবনে ব্যর্থ। হেরো পার্টি। তাই বোধহয় অনেক ভেদাভেদ থাকা সত্যেও আমরা চারজন একে ওপরের সঙ্গে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পেরেছি। হেরো টিম। হেরোদের সংসার। নিজের চোখেই আমরা নিজেদের খুব সাধারণ, ছাপোষা বলে ধরে নিয়েছি। ওর বেশী ভাবতেই পারিনি কোনোদিন। কিন্তু সেই ব্যর্থতার কথা হঠাৎ করে এমনভাবে ফেটে বেরিয়ে আসায় সবাই কেমন থ’ মেরে গেলাম।


অস্বস্তিকর সাইলেন্স। রেলের ঝুকঝুক শব্দ কান ফাটিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।


নিস্তব্ধতা ভাঙল লোকটার প্রশ্ন - “থিয়েটারকে এত অবজ্ঞা কেন?”


আমরা থতমত খেয়ে লোকটার দিকে ঘুরে তাকাতে লোকটা হাত জোর করে নমস্কারের ভঙ্গী করে বলল, “যা ভুলভাল বকে চলেছেন আপনারা থিয়েটার নিয়ে, শুনে আর চুপ থাকতে পারলাম না।“

বোঝো! কি দিন কাল পরেছে মাইরি! একটা উটকো লোক, চিনিনা জানিনা, মুখের ওপর বলে দিল আমরা ভুলভাল বকছি! আর বুড়োর স্টাইলখানাও বলিহারি! নমস্কার জানিয়ে বাম্বু দিচ্ছে! পলিটিসিয়ান নাকি? “আপনি কে, অ্যাঁ, কে আপনি?” নীল গর্জে উঠল। আমাদের মধ্যে ওই সবচেয়ে রগচটা। তার ওপর যা সব কথাবার্তা চলছিল এতক্ষণ, ওর মেজাজটাও খিঁচরেই ছিল নিশ্চয়ই। পেটেও ভালো পরেছে আজ, তাই গলার পারাটাও উঁচু। “চেনা নেই, জানা নেই, অভদ্রতা করছেন কেন?” লোকটা কিন্তু নীলের কথায় বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করল না। উল্টে, স্থির চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে কেটে কেটে বলল, “আর আপনারা যে না চিনে, না জেনে থিয়েটার নিয়ে অভদ্রতা করছেন, সেটা ঠিক আছে?”


সব্বনাশ! এ মাল কে রে! পায়ে পা দিয়ে এত রাতে ঝগড়া করতে এসেছে! পাক্কা এর কপালে ঘোর বিপদ আছে আজ! কাদের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে এসেছে জানে না তো! যা ভাবছিলাম, ঠিক তাই হল। নীল স্প্রিঙ্গের মত লাফিয়ে ওর সিট থেকে উঠে ”এই শালা, কে রে তুই?” বলে লোকটার দিকে ধেয়ে যেতে গেল। ভাগ্যিস লোকটা কামড়ার অন্য কোনায় বসে ছিল। না হলে আজ হয়েছিল আর কি! অঞ্জন বেশ হাট্টাকাট্টা। খপ করে ধরে ফেলল নীলকে। আমিও রিফ্লেক্সে ওর জামা খামচে ধরলাম। নীল আমাদের ছাড়াবার চেষ্টা করছে এগিয়ে যাবে বলে আর কাঁচা খিস্তি দিতে শুরু করেছে লোকটাকে। অখিলও উঠে নীলকে ধরে বসাবার চেষ্টা করছে। মানে সব মিলিয়ে একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হল, লোকটার মধ্যে কোন তাপউত্তাপ নেই! চুপচাপ বসে দেখছে আমাদের। আলো কম থাকায় আর নেশার চোটে এই দূরত্ব থেকে মুখটা ঠিক মত দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু কোনভাবেই মনে হচ্ছে না যে সে বিন্দুমাত্র ভয় পেয়েছে। উল্টে, বাঁ পা ডান পায়ের ওপর তুলে নাচাচ্ছে! আমাদের মধ্যে ধস্তাধস্তিটা বেশ উপভোগ করছে মনে হচ্ছে!


আমরা কোনমতে ধরে বেঁধে নীলকে সীটে বসালাম। ও তখনও চেল্লাচ্ছে। অখিল লোকটার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার প্রবলেমটা কি, মশাই?” অখিলের প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই লোকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমুদে স্বরে বলে উঠল, “আমার কোন প্রবলেম নেই তো! প্রবলেম তো আপনাদের!”


যাহ্‌ শালা, এতো আচ্ছা গেঁড়ো মাইরি! সারা দিন খাটাখাটনি করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছি। আর শেষ পথে ভিড়তে হল একটা আকাট গাম্বাটের সঙ্গে! এই একই ভাবনা বোধহয় আমাদের চার জনেরই হচ্ছিল। অঞ্জন চোখের ইশারায় লোকটাকে অ্যাভয়েড করতে বলল। অ্যাভয়েড - মধ্যবিত্তের শিওর শট হাতিয়ার। কোথাও ব্যাগরা দেখলেই চুপচাপ আমরা ওটা প্রয়োগ করি। এ ব্যাপারে আমাদের হাত পাকা। কিন্তু ও হরি! লোকটা অত দূর থেকেও ঠিক দেখে নিয়েছে অঞ্জনের ইশারা! বয়স হলে কি হবে, লোকটার তো দেখছি ঈগলের চোখ রে ভাই! বিশ্রীভাবে হাঁসতে হাঁসতে আমাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “আমাকে অ্যাভয়েড করে কি হবে? নিজের থেকে নিজেকে অ্যাভয়েড করতে পারবেন কি?” লোকটা হেসেই চলেছে।


শেষের কথাটা কানে যেতে আমার জোরে খটকা লাগল। সত্যি বলতে কি, গা টা ছমছম করে উঠল। আমাদের মনের কথা লোকটা বুঝে গেল কি করে? রাতের ফাঁকা ট্রেনে অতৃপ্ত আত্মার হানা দেওয়া নিয়ে অনেক গল্পগুজব শুনেছি, কিন্তু কোনোদিন অভিজ্ঞতা হয়নি। এ কি সেই? ভাবতেই গা শিরশির করে উঠল। আস্তে করে জামার ওপর দিয়েই পৈতেটা ছুঁলাম। শুনেছি এতে কাজ হয়। তাকিয়ে দেখি বাকীদেরও মুখ ফ্যাকাসে। “আমি ভূত নই! আমি ভূত নই! ভয় পাবেন না!” লোকটা তখনও বুক ফাটা হাসছে আর বলছে। আজব ব্যাপার! লোকটা অন্তর্যামী নাকি?

অঞ্জন আর চুপ থাকতে পারল না। যা বলার ভদ্র ভাবেই বলল অবশ্য। “আমরা আপনাকে কোন ডিস্টার্ব করিনি। তাহলে কেন ফালতু আমাদের পেছনে লাগছেন বলুন তো?” লোকটা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল! “কি বলছেন কি? ডিস্টার্ব করেননি? সেই কখন থেকে তো আমার নামে যাতা রটিয়ে চলেছেন! আর বলছেন ডিস্টার্ব করেননি? আশ্চর্য মিথ্যেবাদী পাবলিক তো আপনারা!“


এইবার আমাদের সবারই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। অঞ্জন নীলের দিকে তাকিয়ে ঝট করে উঠে পরে “চলুন তো, মালটার ক্যালানি খাবার শখ হয়েছে মনে হয়।“ বলে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। নীলও বোতলটা হাতে নিয়ে, “বলছিলামই তো, দু হাত দিলেই সিধে হয়ে যাবে” বিড়বিড় করতে করতে অঞ্জনের পেছন ধরল। আমি আর অখিল মুখ চাওয়াচায়ি করলাম। ও উঠে এগিয়ে গেল। রিফ্লেক্সে আমিও তাই করলাম। খালি বুকের মধ্যে একটু ধুকপুক করছিল।


নেশার ঘোড়ে আবার বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়।


আমাদের আসতে দেখে লোকটা ভয় তো পেলই না, উল্টে হাসি মুখে, “আসুন! আসুন! এইতো, এবার জমবে! এতো দূরে দূরে থাকলে হয়!” বলে আমাদের সম্ভাষণ জানাল। আমরা লোকটার কাছে যেতে যেতে নীল প্রায় মারমুখী হয়ে, “তুই কে রে শালা? নাম কি? এতো ঘ্যাম কিসের?” জিজ্ঞেস করল। লোকটা খুব স্বাভাবিক ভাবে হাঁসি মুখে, “সব বলব। সব বলব। আমি কে, কেন আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি, সব বলব। আগে বসুন তো আপনারা“ বলে দুহাত দিয়ে ওর আশেপাশের সীটগুলো ইশারা করল। আমরা বসতে না বসতেই লোকটা একটা কাণ্ড করে বসল। ছোঁ মেরে নীলের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে আমরা কিছু বোঝার আগেই ঢকঢক করে পুরোটা খেয়ে নিলো। একটুখানিই ছিল অবশ্য। তবুও! লোকটার বুকের পাটা আছে বলতে হবে! ঠিক কে যে কাকে হূল দিচ্ছে গুলিয়ে যাচ্ছে।


বোতলের ঢাকনাটা লাগাতে লাগাতে বেশ উৎফুল্ল ভাবে লোকটা আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মিক্সটা খাসা! কে বানালো?” নাহ, লোকটাকে আর বাঁচানো গেলোনা মনে হয়। নীল আর অঞ্জনের চোখমুখ দেখে মনে হল একটা মারও মাটিতে পরতে দেবে না। অখিল আমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। ধৈর্যও আমাদের থেকে বেশী। সেই সামাল দিল। হাত তুলে আমাদের থামার ইশারা করে যতটা সম্ভব শান্ত সুরে অঞ্জনের হাতের ফুলে থাকা পেশী দেখিয়ে বলল, “এককালে বডিবিল্ডার ছিল। ধকটা আজও আছে, দেখছেন তো? আপনার যা বয়স আর শরীরের অবস্থা দেখছি, বেশী না, ওর একটা হাল্কা থাপ্পড়ই যথেষ্ট। কথা দিচ্ছি আপনি উঠতে পারবেন না। চান কি সেটা? আমরা কিন্তু চাইনা সেরকম কিছু হোক। কিন্তু আপনি গায়ে পরে আমাদের সঙ্গে যে ভাবে লাগছেন, ওকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবেনা। তাই আর ডেঁপোমি না করে বলুন তো, কে আপনি? কি চান আমাদের কাছ থেকে?”


অখিলের টোনটা পুরো কোল্ড ব্লাডেড সিরিয়াল কিলারদের মত ছিল। আমাকে বললে তো আমার গা হাত পা ঠাণ্ডা মেরে যেত। লোকটার ওপর কিন্তু কোন ইমপ্যাক্টই হল না! সে হাঁসি মুখে চেয়ারে বাবু হয়ে গুছিয়ে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি থিয়েটার”।


ট্রেনের আওয়াজে ঠিক মত শুনতে পাইনি ভেবে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি নাম?” লোকটা আবার বলল, “থিয়েটার”। এ আবার কি স্টাইলের নাম রে ভাই! অখিলের মুখ থেকে আপনিই বেরিয়ে এলো, “আপনার নাম থিয়েটার?” লোকটা সজোরে মাথা নেড়ে, “নাম না। আমিই থিয়েটার।“


আমরা চারজন একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কোন সন্দেহ রইল না আর। এক আস্ত পাগলের পাল্লায় পরেছি। আমরা কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কেটে পরব বলে উঠতে যাচ্ছিলাম, লোকটা কেন জানিনা আমারই হাতটা খপ করে ধরে, তীক্ষ্ণ নজরে আমার দিকে তাকিয়ে, গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “বিশ্বাস হচ্ছে না তো? ভাবছেন আমি পাগল, তাই না?”


লে হালুয়া! এতো নতুন হ্যাপা শুরু হল দেখছি! শুনেছি পাগলকে পাগল বলা একদম উচিত না। খুব বিপদের ব্যাপার। হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। সেরকম কিছু হলে এই রাতের বেলা চলন্ত ট্রেনের খালি কামড়ায় কিভাবে সামাল দেবো? উল্টো পাল্টা কিছু হয়ে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে তো!

লোকটা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। পাট কাঠির মত চেহারা, কিন্তু গায়ের জোর আছে বলতে হবে। আমি তো কি করব বুঝেই উঠতে পারছিনা। বুকের ভেতর যেন দামামা বাজতে শুরু করেছে। অসহায় চোখে আমার দলের দিকে তাকালাম। দেখি শালারাও আমার দিকে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে। বুঝলাম, সবারই একই হাল, কেউ বুঝে উঠতে পারছিনা কি করা উচিত। লোকটা আমাদের ভ্যাবলা হয়ে থাকা মুখগুলো এক এক করে দেখল। তারপর বিরক্তির সঙ্গে “ধুর” বলে আমার হাতটা ঝাঁকিয়ে ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

লোকটা হাতটা ছেড়ে দেওয়াতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা! এ যাত্রা…এতক্ষণে খেয়াল হল, ভয়ের চোটে নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেছিলাম!


আমরা চারজনে সন্তর্পণে উঠে আমাদের আগের সীটের দিকে চলে যাচ্ছিলাম, পেছন থেকে লোকটার বাজখাই আওয়াজ শুনতে পেলাম। “যান, যান। চলে যান। গিয়ে আমার পিঠ পিছে আমায় নিয়ে ঠাট্টা, খিস্তি করুন গে, যান। না জেনে, না বুঝে আমার নামে অপবাদ রটান। ওটাই শুধু পারবেন আপনারা। ওটাই মানায় আপনাদের। ওই আপনাদের মুরোদ…


আমরা আর পেছন ফিরলাম না। চুপচাপ সোজা আমাদের আগের জায়গায় চলে এলাম। এবার ইচ্ছে করেই লোকটার দিকে পিঠ দিয়ে বসলাম সবাই। লোকটা কিন্তু ননস্টপ বলেই চলেছে। এবার বেশ চিল্লিয়েই বলছে, “আপনাদের মত লুসারসদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী কিছু আশা করাটাই বোকামি। আনফরচুনেটলি সেই বোকামিটাই এতদিন ধরে করে এসেছি। আজ তো নিজের চোখেই দেখলাম। ডেকে এনে হাঁসি মুখে দুটো কথা বলতে চাইলাম আর উনাদের গুটি শুকিয়ে গেল। ব্লাডি হিপক্রিটস, কাওয়ারডস সব!“


আমরা কেউ বিন্দুমাত্র রেস্পনড করছিনা। চুপচাপ বসে আছি। নীল জানলার বাইরে দেখছে আর চিনা বাদাম চিবোচ্ছে। অখিল পেপার পড়ার ভান করছে। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। ঘড়ি দেখলাম। স্টেশন আসতে আরো ঘণ্টা খানেক বাকী। এতখানি সময় এই পাগলকে নিয়ে কি করব তাই ভাবছি। শুধু অঞ্জনই দেখি চোয়াল শক্ত করে হাতের পাঞ্জা খুলছে আর বন্ধ করছে। আমি কনুই দিয়ে হাল্কা গুঁতো মেরে ওকে নর্মাল থাকার জন্য ইশারা করলাম।

ওদিকে লোকটা তারস্বরে বকেই চলেছে…

”শুনে রাখুন, আমি ভাঁওতাবাজি নই। আই অ্যাম হেলদি লাইভ এনটারটেইনমেনট। এটা মনে রাখবেন, বুঝলেন? আই অ্যাম হেলদি লাইভ এনটারটেইনমেনট।“ বলতে বলতেই ধন ধান্যে পুষ্পে ভরার সুরে “এমন এনটারটেইনমেনট কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল এনটারটেইনমেনটের রাজা, সে যে আমি, আমি, আমি” গেয়ে উঠল।


অখিল দেখলাম পেপারটা মুখের সামনে তুলে রেখে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। আমারও হাসি পাচ্ছিল এবার। অখিলের দেখা দেখি নীল আর অঞ্জনের মুখেও মৃদু হাসির রেখা। লোকটা যে বদ্ধ পাগল তাতে সন্দেহ নেই এবং থিয়েটারের সঙ্গে নিশ্চয়ই ভীষণরকম ভাবে জড়িত ছিল। এমন কিছু হয়ত হয়েছে ওর জীবনে যার জন্য মাথায় পুরো গোল পাকিয়ে গেছে। হঠ করে লোকটার ওপর কেমন যেন একটা মায়া এসে গেল। সত্যি তো, আর যাই হোক বয়স্ক মানুষ। আহা রে, যে রকম পাগলামি করছে লোকটা, যে কোন দিন মারধর খেয়ে কোথাও মুখ থুবড়ে পরে থাকবে! হঠাৎ মনে হল ওর বাড়ির লোকজন কেউ থাকলে খবর দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। আমি অখিলের কানে কানে বললাম আমার ভাবনাটা। ও আমার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। নীল আর অঞ্জনও বুঝতে পেরেছে। ওরাও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।


অখিল একটা জোরে শ্বাস নিয়ে পেপারটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। আমরাও উঠে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকালাম। দেখি লোকটা সীটের ওপর গুটিসুটি হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। আর কথা বলছে না। ঘুমিয়ে পরল নাকি? অখিল এগিয়ে গেল। আমরাও গেলাম পেছন পেছন।


অখিলই শুরু করল। “থিয়েটারদা, ঘুমালেন নাকি?” লোকটার আসে পাশে বসলাম আমরা। অখিল হাল্কা করে লোকটার কাঁধে হাত রেখে নরম সুরে আবার ডাক দিল, “ও থিয়েটারদা!” লোকটা আস্তে আস্তে মুখ তুলল। চোখ দুটো ভেজা। বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া একটা মুখ। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে লোকটাকে…


(পরবর্তী সংখ্যায় এর শেষ ভাগ প্রকাশিত হবে)





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮