• সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়

গল্প - পঞ্চাশ বছর আগে দর্জির দোকানে

পুজোর সময় এলেই আমাদের নিয়ে মেজদি যেত শঙ্কর বস্ত্রালয়ে।প্যান্ট জামা সব এক দোকানে। ওই দোকানের স্টক মোটেই ভাল ছিলনা কিন্তু শংকরবাবু বাবার চেনা বলে ওখানেই কিনতে যাওয়া হতো। ক্লাস সেভেনে উঠার পর আমি বিদ্রোহী হয়ে উঠলাম।কিছুতেই আমি আর হাফ প্যান্ট কিনবনা, এবার আমার ফুল প্যান্ট চাই।তখন ফুলপ্যান্ট রেডিমেড খুব একটা পাওয়া যেতনা। আমার ইচ্ছে দর্জির দোকান থেকে ফুলপ্যান্ট তৈরি করা। ওল্ড জি টি রোডের শেষে ছিল সান্যাল টেলর্স। উত্তরপাড়ার তখন নামকরা দোকান জামা-প্যান্ট তৈরি করার।পুজোর মাস দুয়েক আগেই সেখানে নোটিস পড়ে যেত "অর্ডার ক্লোজড।"

মাস দুয়েক আগেই জামা প্যান্টের কাপড় নিয়ে যেতে হতো সান্যাল টেলর্স-এ। সেখানে কাপড় মেপে তারপর মাপ নিতেন সান্যাল বাবু।সৌম্য দর্শন,সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী গলায় মাপার ফিতে। দর্জি আর ডাক্তার এই দুজনের কাছে শরীর ছেড়ে দেওয়াই ভাল ।বিভিন্ন জায়গা মাপা হচ্ছে,হাত,গলা,পুট,কাঁধ,ঝুল,কোমর , ঘের ইত্যাদি এরপর প্রেসক্রিপশন ,কি ধরণের জামা, কটা পকেট,পকেটের ঢাকা হবে কিনা ?কলার: ডগ না নরমাল! জামা :চাইনিজ না ব্রিটিশ?ঝোলা না টাইট? প্যান্ট :বেলবটম না এলিফ্যান্টা! ফোল্ড না প্লেন।এরপর জামা আর প্যান্টের পিসের ধার থেকে একটু অংশ কাঁচি দিয়ে কচ কচ করে কেটে সেই লাল কাগজে স্টেপলার দিয়ে মেরে দিয়ে বলতেন একমাস পরে বাড়িতে চিঠি যাবে তারপর আসবেন। সবাইকার মতো আমিও অপেক্ষায় থাকতাম কবে আসবে চিঠি, একমাস পেড়িয়ে গেছে।যদি চিঠি না আসে!অবশেষে এলো সেই চিঠি ,আমার জীবনের প্রথম চিঠি যেটাতে আমার নাম ঠিকানার জায়গায় লেখা আছে।ভাবা যায় ,সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা! সেই চিঠিতে লেখা আছে"ইওর প্যান্ট ইজ রেডি ফর ট্রায়াল"তার পর একটি তারিখ।নির্দিষ্ট দিনে হাজির হলাম ট্রায়াল দিতে। হাতে বিল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ।আমার ডাক পড়ল তারপর আমার বিলটা নিয়ে বললেন" ট্রায়াল"বলেই লম্বা একটা লাঠি নিয়ে এধার ওধার ঘুরতে ঘুরতে একটা প্যান্ট খপ করে নামিয়ে নিয়ে এলেন।পটাপট তিন চারটে সুতো খুলে আমার হাতে দিয়ে বললেন ওই ঘরে লোক আছে বেরোলেই ঢুকে পড়বে।কিছুক্ষণ পরেই একটা ছেলে সেই ঘর থেকে বেরোতেই আমি ঢুকলাম।ছোট্ট কাঠের ঘর তার দুদিকে দুটো আয়না।পরা প্যান্টটা ছেড়ে নতুন প্যান্ট পড়লাম ,তারপর আয়নাতে নিজের চুল ঠিক করে বাইরে বেরলাম। বাইরে তখন খুব চেঁচামেচি ,একটা ছেলে কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে চেঁচাচ্ছে আমার জামা করেছেন?জামা তো ফিট হয়নি।পয়সাওলা ঘরের ছেলে রিকশা করে এসেছে। খুব পয়সা না থাকলে তখনকার দিনে কোনও ছেলে রিকশা চড়তো না। জানা গেল ছেলেটির জামার পুট ছোট,আরও মারাত্মক ডান হাতার চেয়ে বাঁ হাতা বড়।ছেলেটা যত বলছে আপনি মাপ নিয়ে দেখুন দুটো হাত সমান নয়!সান্যাল বাবুর এক কথা আমার কোনও ভুল নেই,আমি কেন মাপব।ছেলেটা বলছে এই ছোট বড় হাত নিয়ে এই জামা পড়া যায়না,আপনি মেপে দেখুন। আমার মাপের কোনও ভুল নেই আপনারই একটা হাত ছোট অন্য হাতের তুলনায়। সান্যাল বাবু বললেন।তর্কাতর্কি চরমে উঠল আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।সান্যাল বাবু নির্বিকার ভাবে আমার দিকে এগিয়ে এসে প্যান্টটাতে কয়েকটি নীল রংয়ের দাগ দিলেন তারপর বললেন সাত দিন বাদে এসে নিয়ে যেতে।আমি ভয়ে ভয়ে পালিয়ে এলাম আবার যদি আমার পা ছোট বড় বলে!

ওই রাস্তায় আর একটা দর্জির দোকান ছিল তনুশ্রী টেলর্স ।একবার সান্যাল বা অন্য দোকানে অর্ডার ক্লোজড হয়ে যাওয়ায় ওখানে একটা জামা করতে দিয়ে ছিলাম কিন্তু পুজোর সময় সে জামা পাইনি ।অনেকদিন ঘুরে শেষে পাওয়া গেল ,ইঁদুরে কেটে দিয়েছে ।কাপড়ের দাম ফেরত দিলো কিন্তু পুরো টাকা পেলাম না।


দর্জির দোকানের কথা যখন উঠল তখন আর একটা গল্প বলি সেটা অবশ্য বছর কুড়ি আগেকার কথা।পুজোর সময় বাজারের কাছে একটা দোকানে জামা করতে দিয়েছি।মহালয়ার আগে দিয়ে দেবে বলে নিয়ম মেনেই ষষ্ঠীর দিন বিকেলে কয়েকবার তাগাদা করার পর পাওয়া গেল।হালকা হলুদ বা ঘিয়ে রঙয়ের জামা ,খুবই সুন্দর ফিট করেছে।কদিন ঘুরিয়েছে কিন্তু এত ভাল ফিটিংস জামা আমার খুব কম দর্জি করেছে।পরেরদিন ওই জামা পরে আমি পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম।পুজোর দুদিন বাদে ফিরতেই ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি গার্ড আমাকে জানালেন টেলরিং এর দোকানের মালিক আমার খোঁজ করছিল।আজ আবার আসবে বলেছে। কেনরে বাবা,আমি তো টাকা দিয়েই জামা নিয়ে এসেছি।সন্ধে বেলায় ছেলেটি এসে বলল দাদা আপনার জামাটা দিন।আমি বললাম কেন?ওটা আপনার জামা নয় ,আপনার জামা এইটা,বলে প্যাকেট থেকে একটা জামা বার করল।ঠিক আমার জামার মতন দেখতে।আমি বললাম ওই জামাটা তো আমি পরে ফেলেছি আর ওটা আমার মাপেই আমি আর পাল্টাতে চাইনা। ও বলল এটা যার জামা সে আমাকে শাসিয়ে গেছে কালকের মধ্যে জামা না পেলে ও আমাকে দেখে নেবে।ওটা ওর হবু বউ ওকে প্রেজেন্ট করেছে।আপনি ওই জামাটা দিন আমি কেচে ইস্ত্রি করে ওকে দিয়ে দেব।পুরনো জামাটা দিয়ে নতুন জামাটা পরে দেখলাম ,যথারীতি ঝলঝলে একদম ফিট করেনি।আমি বললাম এটাতো ওই লোকটার মাপ দিয়ে জামা করেছ আমার মাপটাও বদলে দিলে!ও বলল এইটাই আপনার মাপ।সেই থেকে আমি লোকটাকে খুঁজে বেড়িয়েছি যার মাপে মাপ দিলে আমার জামা ফিট করে !অনেক খুঁজে আজও পাইনি।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮