• পৌলমী দে পুরকাইত

গল্প - বেদেনী

মনটা আজ খুব খুশি খুশি মায়ার। খিলখিল করে হাসছে আর বিলের জলে পা দোলাচ্ছে। হবেই না কেন অনেকদিন পর গতকাল রাতে শান্তিতে ঘুমিয়েছে সে। এখন তার আর ভয় লাগে না নিজের মিঞারে। অনেক সাহস হয়েছে। যখন তখন সে বিলের ধারে এসে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকে। গফুর মিঞা দেখলেও আর সে পাত্তা দেয় না তাকে। তবে কিছু বলেও না আর তাকে মিঞা। এখন ভারী ভালোমানুষ হয়েছে তার সোয়ামী।


গ্ৰামের বাউন্ডুলে মেয়ে মায়া। পড়াশুনায় মন লাগতো না তার। মা বাপ গ্ৰামের পাঠশালায় ভর্তি করিয়েছিলো বটে কিন্তু বার বার সে পালিয়ে যেত পাঠশালা থেকে। তার চেয়ে মাঠঘাট, বনবাদাড় খালবিলে ঘুরে বেড়ানোতেই মজা ছিলো তার। এর বাগানের কচি পেয়ারা, আমের কুষি ওর বাগানের ঢিল মেরে জাম পাড়া, দীঘির জল তোলপাড় করা এসবেই মন পরে থাকতো মায়ার। দেশ গাঁয়ের মেয়ে বেশিদিন বাড়িতে রাখা ঠিক নয় এই ভেবে খানিক জোর করেই ভালো ছেলে দেখে মা বাপ মায়ার বিয়ে দিলো গফুর মিঞার সাথে। কালো পেটাই করা চেহারা গফুরের। যৌবন উপচে পড়ছে যেন। আল্লা তাকে অনেকটা সময় নিয়ে পাথর কুঁদে বানিয়েছে মনে ভাবে মায়া। মুখে না বললেও মনে মনে তার ভারী পছন্দ হয় গফুরমিঞাকে। গাঁয়ের অবস্থাসম্পন্ন হাজি সাহেবের বাড়িতে মুণিষের কাজ করে গফুর। বিয়েতে মায়ার বাপকে দুহাজার দেনমোহর দিয়ে মায়াকে নিজের ঘরে আনতে পেরেছিলো গফুরমিঞা। ভালোবাসা আর মায়ার শখ আহ্লাদ পূরণে কোন খামতি রাখে নি সে। গফুর মিঞার একলা ঘরে চারচাঁদ লেগেছিলো মায়া আসতে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘরে ফিরে দুটিতে ভালোবাসার গল্প আর খুনসুটিতে কেটে যেত।


বিয়ে হলে কি হবে সংসারে মন লাগে না মায়ার।

চলনবিলের ধারেই গফুরমিঞার ঘর। মায়ার খুব ইচ্ছে করে যেতে ওই বিলের ওপারে। গ্ৰামঘোরা মেয়ে সে। না জানি কেমন দেশ আছে সেখানে মনে মনে ভাবে মায়া। গফুর মিঞার মোটেই হুকুম ছিলো না বাড়ির বাইরে পা দেওয়ার। বলতো," মাইয়া মানুষের অত বাইরন বাইরন মন ভালো নয় বিবি, দিনেরাতে যখন তখন বাইরিলে জ্বিনপরী ধরে।" তাও সুযোগ পেলেই মায়া যেতো ওই চলনবিলের ধারে। কে জানে তার কেমনতর যেন মোহ ছিলো বিলের জলে!


দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়। গফুরের আর মায়ার ইচ্ছে এবার তার ঘর আলো করে একটা পরী আসুক। চাঁদের হাট বসুক ঘরে। আহ্লাদে জড়িয়ে ধরে গফুরমিঞা মায়াকে। ঝিমধরা জ‍্যোৎস্নায় ভেসে যায় গফুরমিঞার উঠোন। কিন্তু কী যে হলো!? দুবছর ঘুরে গেলেও কোন চাঁদের হাট বসে না ঘরে।


গফুরমিঞার মন বদলায় ধীরে।


বেদেনী নিলোফারের ঘর ছিলো তাদের ঘরের কাছেই। সাপের মতোই হিলহিলে তার শরীর। রাস্তা দিয়ে গেলে মনে হতো যেন লাউগাছে লাউডগা সাপ বাইছে। মিঞার মনে বীণের সুরে বাজতো তাই দেখে ভালোই বুঝতো মায়া। তারপর যে কী হলো মায়া আর বোঝেনা। মিঞার কাজ সেরে ফিরতে দেরি হতে লাগলো। ঘরে ফিরলে ঠিক মতো কথা বলে না তার সাথে। সবসময় মাথা গরম থাকে মিঞার। মনখারাপ হলে মায়া গিয়ে বসে সেই বিলের ধারে। একদিন মায়া বিলের ধারে বসেই দেখলো সেই নীলোফারের কোমর জড়িয়ে গফুরমিঞা শোবার ঘরে দোর দিলো। লজ্জায় ঘেন্নায় দুঃখে চোখ দিয়ে জল উপচে পড়ে বিলের জলে। শব্দ আসে টুপটাপ টুপটাপ। কোনো বিবির কী ভালো লাগে নিজের পুরুষমানুষটা অন্যের সঙ্গে তারই শোবার ঘরে দোর দেবে!? কিছু বললেই চড়থাপ্পর জুটতো সঙ্গে লাথি ঝাঁটাও বাদ যেত না।


বিলের জলে পা দোলাতে দোলাতে নিজের মনেই একবার হেসে উঠলো মায়া। বিলের জল ছোঁয়া ঠান্ডা বাতাস দোল খেয়ে গেলো মায়ার গা ছুঁয়ে। এখন তার আবার ভালোমন্দলাগা!


অনেকদিন দেখতে দেখতে একদিন মায়ার রাগ উঠলো মাথায়। রান্না করলো না সে সারাদিন। বাড়ি আসতেই ক্ষিদের মুখে খেতে চেয়ে না পেয়ে গফুরেরও মাথা গরম হলো । কিল, চড়, লাথি, ঘুঁষি কটা দিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। সন্ধ‍্যের পর ফিরলো গফুর মিঞা। মায়ার রাগ কমেছে ততক্ষনে। মিঞা আদর করে ডেকে ওঠায় মায়াকে। আগেরদিনের বাসিপান্তা, কাঁচা পেঁয়াজ আর লঙ্কা নিয়ে দুজনে খেতে বসে পাশাপাশি। বসতেই মায়ার নাকে ঝাপটা দিলো গফুর মিঞার গায়ের সেই জোলো আঁশটে গন্ধ যেমন সাপের গায়ে থেকে বেরোয়। মোটেই সহ্য হয় না তার এই গন্ধটা। রাতের খাওয়া সেরে দুজনে ঘুমাতে যায়। মায়া আর ওঠেনি পরদিন। গাঁয়ের লোক ভিড় জমিয়েছিলো গফুরের বাড়ি জানাজা জন্য।


এখনো কবরের মাটির নীচে ওই আঁশটে গন্ধটা নাকে এলেই ঘুম ভেঙে যায় মায়ার। সে বিলের জলে গিয়ে গা ধুয়ে আসে। আজকাল গফুর মিঞাও তার পাশেই থাকে। মায়ার কাছে এসে বসতে চায় গফুর। পাগলা কুকুরের মতো তাড়ায় তাকে মায়া। সে রাতে সাদাখরিশটাকে গফুর আর নিলোফার পরামর্শ করেই তার মাথার কাছে ছেড়ে দিয়ে গেছিলো। ভোলেনি সে কথা মায়া। গফুরমিঞার সাথেও নিলোফার একই কাজ করেছিলো। কেন কে জানে!? "লোভ লোভ" বলে ফিসফিসিয়ে ওঠে গফুর। ভাব করতে চায় সে মায়ার সাথে।


মায়া আর গফুর মিঞার এবার অনেকদিন পর মতের মিল হয়েছে । ভোরেরবেলা দুটিতে চলনবিলের জলে বসে পা দোলায় । বিলে অনেক গভীরে পাঁক আর শেওলার আস্তরনে তাদের লম্বা পাজোড়া দিয়ে জলটা ঘুলিয়ে দেয় একবার। হি হি করে হাসে মায়া। গফুর মিঞা মায়াকে বলে, "চল মায়া এবার শান্তি অনেকদিন পর। কাল যাব নৌকা বেয়ে বিলের ওপারে।" খুশি উপচে পড়ে মায়ার মায়াবী চোখে।


বেলা গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত ঘরের দোর খোলা নেই দেখে দরমার বেড়ার ফাঁক দিয়ে পাড়ার লোক দেখে নিলোফারের খরিশরাখা বেতের ঝুড়িটা ঘরের মেঝেতে উল্টে আছে। নীল হয়ে গেছে নিলোফার।


নিশ্চিন্ত হয় মায়া আর গফুরমিঞা। ঘুমাতে যায় কবরে।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮