• রাহুল দেব লাহিড়ী

গল্প - বাবান

লোকটা সমুদ্রের তলায় কি যেন খুঁজে বেড়ায়। কি সুন্দর তার সাঁতার কাটার ভঙ্গি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছে বাবান। ছোট ছোট টিলার মত যে জায়গাগুলো, যার গায়ে গজিয়ে থাকা গাছ আর শ্যাওলা গুলো মাথা দোলায় লোকটা গেলেই, সেগুলো হল কোরাল রিফ। প্রবাল প্রাচীর। তার ভেতর আবার খুদে খুদে গর্ত। মাঝে মাঝে ভোঁতা মুখ মাছ মুখ বাড়ায় তার ভেতর থেকে। লোকটা কাছে এলেই ঢুকে যায়। যেন লুকোচুরি খেলছে। মুগ্ধ হয়ে বাবার সাথে বসে দেখে বাবান। তার বয়েস মাত্র সাত। সমুদ্রের তলায় যে লোকটা নামে আঁটোসাঁটো ড্রেস পড়ে, তার হাতের তালু খোলা। কি সুন্দর সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে লোকটা। তার পায়ের দিকে মাছের পাখনার মত কি যেন লাগানো। সে দুটো নাড়িয়ে অনায়াসে জলের তলায় সাঁতার দেয় সে। পিঠে যে অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানো, সেটার থেকে নল বেরিয়ে এসে লোকটার মুখে লাগানো মাস্ক এ অক্সিজেন ঢোকে। লোকটা নিঃশ্বাস নেয়, তার শব্দ শোনা যায়, আর ভুরভুরি ওঠে জলের ওপর অবধি। বাবান দেখে আর দেখে। বড় হয়ে বাবান নামবে সমুদ্রের তলায়। নৌকো থেকে ড্রেস পড়ে রেডি হয়ে লোকটার মত পিঠের দিক করে ঘুপ করে ডুব দেবে জলের তলায়। কত মাছ দেখবে সে। আর কচ্ছপ। কচ্ছপ খুব ভালো লাগে বাবানের। মাঝে মাঝে মাছের ঝাঁক এসে লোকটার আশেপাশে ঘোরে বিভিন্ন স্টাইলে।


বাবা অফিসে বেরিয়ে গেলে বাবানের ছুটি। স্কুলে পুজোর ছুটি শুরু হয়ে গেছে তার। মা আর বাবান দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটু গড়ায়। বাবানের মা ছেলেকে নিয়ে শুয়ে পড়েন। বাবান বায়না ধরে গল্প শোনার। গল্প বলতে বলতে মায়ের কথা জড়িয়ে আসে। তারপর নাক ডাকার আওয়াজ ফোঁস ফোঁস। ভালো লাগেনা বাবানের। ঘুম আসেনা কিছুতেই। বাতাসে একটা শিরশিরে ভাব। তার বাড়ির পেছনে ছোট্ট কলপাড় আর একফালি বাগান। সেটাতে কয়েকটা গাছের মধ্যে একটা শিউলি। সে রাতভর ফুল বিছিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঝিমোয় দুপুরে। লেবু গাছটা বাবানকে দেখলেই খুশি হয়ে মাথা দোলায়। শিউলি গাছটার পাতায় আর গুঁড়িতে অনেক শুঁয়োপোকা। মা বারণ করেছেন গাছটার কাছে যেতে। বাবার কাছে বাবান জেনেছে ওই শুঁয়োপোকা গুলো নাকি বড় হয়ে প্রজাপতি হবে। বাবান বিশ্বাস করেনি। একদিন বাবান বসে বসে দেখবে কি করে শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি বেরোয়।


কলপাড়ের একদিকে একটা চৌবাচ্চা আছে বাবানদের। তাতে টাইমের কলের জল ধরে রাখা হয়। চৌবাচ্চার সামনের বাঁধানো একফালি জায়গায় মলিপিসি বসে বাসন মাজে সকালে আর বিকেলে। এই চৌবাচ্চাটা খুব প্রিয় বাবানের। সামনাসামনি চৌবাচ্চাটার কাছে দাঁড়ালে সেটা বাবানের বুক অবধি পৌঁছয়। তাতে কি! সে বাসন মাজার পিঁড়ি টা টেনে আনে। তারপর সেটার ওপর চড়ে পা উঁচু করে দুই কনুই এর ভরে দাঁড়ালেই চৌবাচ্চার ভেতরটা দেখতে পায়।


আজ মায়ের পাশে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছেনা বাবানের। নিঃশব্দে উঠে পড়ে সে। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে কলপাড়ে দাঁড়ায়। আকাশটা ঝকঝকে নীল। অনেকটা নেমে এসেছে যেন। সাদা সাদা কয়েকটুকরো পেঁজানো তুলোর মত ছেঁড়া মেঘের টুকরো উড়ে বেড়াচ্ছে। তিনটে চিল। অনেক- অনেক উঁচুতে ঘুরছে গোল হয়ে। যেন স্লো মোশান এ। মুগ্ধ হয়ে দেখে বাবান। একটা পাখি বসেছে শিউলি গাছটায়। পিঁরিক-পিঁরিক করে ডাকছে। তার লেজটা নেচে উঠছে প্রতিবার ডাকের সময়। কালো চকচকে রং পাখিটার। বুকের কাছটা সাদা। পা টিপে টিপে বাবান হাজির হয় লেবু গাছটার কাছে। পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয় তার গায়ে। গাছটা হেসে ওঠে গা দুলিয়ে-যেন সুড়সুড়ি লেগেছে।


বাবানের হাতে জলবিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্র। এটা বানিয়েছে স্কুলে বন্ধুদের কাছে থেকে শিখে। একটা জর্দার কৌটোর ঢাকনা। সেটার চারপাশটা মুড়ে দেয়া। মাঝে দুটো ছোট্ট ফুটো। তার ভেতর দিয়ে সুতো গেছে। সুতোর মুখটা বাঁধা। দুদিকের সুতোর প্রান্তগুলো দুই হাতের বুড়ো আঙুলের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে হয়। তারপর সামান্য পেঁচিয়ে নিতে হয়। এবার হাতদুটো সমান তালে বাইরের দিকে টানো। চাকা ঘুরবে বনবন করে। একবার সামনে, একবার পেছনে। দারুণ ব্যাপার। স্কুলের বন্ধু অংশুমান তাকে বলেছে, এই যন্ত্রটা যদি জলের উপর ঠিকঠাক ছুঁয়ে ঘোরানো যায়, তাহলে নাকি আগুনের ফুলকি ওঠে। জলবিদ্যুৎ! বাবান আজ দেখবে জলবিদ্যুৎ বেরোয় কিনা।


বাবান এবার গিয়ে দাঁড়ায় চৌবাচ্চার সামনে। পিঁড়িটা টেনে নেয়। তারপর তার ওপর উঠে দুই কনুই এর ভরে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকায়। জলটা স্থির। নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছে বাবান। ধীরে ধীরে চোখ সয়ে আসে। জলের তলায় চোখ যায়। কি সুন্দর শ্যাওলা গাছ। মাথা দোলাচ্ছে অবিকল সমুদ্রের তলার সেই গাছগুলোর মত। একটা ইঁটের টুকরো। তার গায়েও শ্যাওলা। যেন প্রবাল প্রাচীর। বুকের ওপর ভর দিয়ে হাতদুটো ডুবিয়ে দেয় বাবান। এবার তার হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে শ্যাওলার মাঝে। নিজেকে অবিকল সেই লোকটার মত মনে হচ্ছে। সমুদ্রের তলায় লোকটা ঘুরে বেড়ায় অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে।


হাত তুলে আনে বাবান এবার। জলবিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্রটা হাতে ধরে। তারপর বোঁ বোঁ করে ঘোরানো শুরু করে যন্ত্রটা। চাকাটা জলের উপর ঠেকলেই জল ছিটকে পড়ছে। কিন্তু বিদ্যুতের ফুলকি তো উঠছেনা! মন দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যায় বাবান। চাকাটা সামনে আর পেছনে ঘুরে আসে বনবন, বোঁ বোঁ করে। খুব জোরে জোরে সুতোগুলো টানে বাবান। একসময় ছিঁড়ে যায় সুতো।

হায়হায় করে ওঠে বাবান। চাকতিটা হেলে দুলে সুতো সহ চৌবাচ্চার তলায় সেই ইঁটের টুকরোটার পাশে পৌঁছয়। বাবানকে যেমন করে হোক তুলে আনতেই হবে চাকতিটা। বাবান বুকের ভরে প্রাণপণ হাত বাড়ায় তার দিকে। একটু একটু করে ঝুঁকে সামনে বুকের ভরে ঘষটে যায় বাবান। তারপর হাত বাড়ায়। পা দুটো তার অজান্তে উঠে আসে অনেকটা। তারপর একসময় টুপ করে পড়ে যায় জলে।


তলিয়ে যেতে থাকে বাবান সেই লোকটার মত। স্লো মোশনে। বুদবুদ ছাড়ে লোকটার মতোই। তারপর হাত পা ছোঁড়ে প্রাণপণ। ধীরে ধীরে এলিয়ে যায় ছোট্ট শরীরটা। স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। নীল আকাশটা আরেকটু নিয়ে নেমে আসে প্রিয় বাবানকে দেখতে। শিউলি গাছে বসা পাখিটা মুখের পোকা ফেলে আবার চেঁচানো শুরু করে প্রাণপণ- পিঁরিক-পিঁরিক।


বাবানের মায়ের ঘুম ভাঙে হঠাৎ। কিসের অমঙ্গলের আশঙ্কায় বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে যেন। অভ্যাসে হাত চলে যায় বাবানের শোয়ার জায়গাটায়। বাবান নেই সেখানে। এক ঝটকায় উঠে আসেন বাবান এর মা। তারপর খোঁজা শুরু করেন গোটা বাড়ি। একসময় মা পৌঁছন কলপাড়ে। সেখানে কালো একটা পাখি চৌবাচ্চাটার ধারে বসে চিৎকার করছে প্রাণপণ। ছুটে যান সেদিকে। তারপর তাকাতেই দেখতে পান বাবানের ছোট্ট শরীরটা। তারপর বাবাকে খবর দেওয়া, এম্বুলেন্স ডাকা, হাসপাতাল - এসব ঘটে যায় অত্যন্ত দ্রুততায়।


বাবান একমনে গল্প করে চলে লোকটার সাথে। সে আর লোকটা নৌকার ধারে বসা। বাবান মুগ্ধ হয়ে শোনে জলের তলার অভিজ্ঞতা। জেনে নিতে চায় জলবিদ্যুৎ তৈরির প্রণালী লোকটার কাছে। মাথার ওপর ঘুরে চলে তিনটে চিল। বাবাই লোকটার সাথে এবার নামবে জলে।


জলে নামতেই মুখের থেকে একগাল জল বেরিয়ে আসে বাবানের। জলের তলা থেকেই যেন শুনতে পায় মায়ের ডাক- বাবান? বাবান! ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে তার। বাবা মা কে দেখে উৎকণ্ঠিত হয়ে মাথার কাছে দাঁড়ানো। মায়ের চোখে জল। মৃদু হাসে। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে নিশ্চিন্তে। পাশ ফিরে।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮