• ব্রততী চক্রবর্তী

গল্প - মুক্তি

পোড়ো জমিদার বাড়িটার ঠাকুর দালানের পর বিরাট বাগান। বেলাতেও মুক্তির গা ছমছম করে।মুক্তি বাগদী ছাড়া ও বাগানে আর কেউ ঢোকার সাহসও করে না। শোনা যায়, বংশের সবচেয়ে লম্পট জমিদার কেদার নারায়ণ রায় এককালে এই বাগানে তন্ত্র সাধনা করতেন। অশরীরী আত্মারা নাকি ঘুরে বেড়ায় বাগানে। পরে কেদার নারায়ণের প্রপৌত্র জ্ঞানদা নারায়ণ, অমঙ্গলের কবল থেকে জমিদারি আর গ্রামবাসীদের বাঁচাতে বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে এই দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মায়ের প্রতিষ্ঠার পর নাকি আর ওঁদের উপদ্রব হয়নি গ্রামে। কিন্তু বাগানের ভিতরটা আজও একইরকম নিষিদ্ধ আর ভয়ের জগৎ হয়ে রয়েছে সবার মনে।


তবে ওসব ভয় করলে, মুক্তির চলে না। তিন তিনটে পেট চালাতে হয় ওকে। কাজ সেরে ফেরার সময় নোনা আতাটা, জামরুলটা, অসময়ের পাকা পেঁপেটা পাড়তে প্রায়ই ওকে ঢুকতে হয় ওই জঙ্গলে। পেটের শত্তুরগুলোর জন্য নিয়ে যেতে হয়। সন্ধে নেমে আসে মুক্তির ফেরার সময়। সন্ধেবাতির আলোয়, মুক্তি দেখে দুর্গা মূর্তির সোনার সাজ, অস্ত্রশস্ত্র সব ঝিকমিক করে কেমন! আর মায়ের কোল ঘেঁষে ছেলেমেয়েগুলো কেমন আহ্লাদী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে! মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখে জল চলে আসে মুক্তির। মুক্তি কোঁচড়ে লুকোনো নোনা আতা দু'টো আরো ভালো করে ঢেকে নিয়ে, বাড়ির দিকে এগোয়। কোলপোছা ছোট মেয়েটা বড় ভালবাসে নোনা আতা।


আজ ঘরে ঢুকে মুক্তি আগে দু'টো চাল আলু সেদ্ধ বসিয়ে দিলো। কানাইলাল আসার আগেই বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে দিতে পারলে বাঁচোয়া। জানেনা আজ আবার কি রয়েছে কপালে। কানাইয়ের মদ আর জুয়োর পয়সা না জোটালে মুক্তিকে সে রাতের মত আড়তদারের ঠেকে বিক্রি হতে হয়। তারপর সারারাত চলে ঠেকের জোয়ান আর বুড়োগুলোর অত্যাচার। সে কথাগুলো মনে পড়তেই এক চিলতে চাপা হাসি যেন বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিলো মুক্তির দুই ভুরু আর ঠোঁটের কোনে। মুক্তিও তার শরীর বোঝে এখন।


‌রান্নার জন্য শুকনো কঞ্চি দিয়ে একফালি ঘেরা জায়গা পিছনের উঠোনটায়। সকালে ঝাঁট দিয়ে জড়ো করা শুকনো পাতাগুলো হুহু করে জ্বলছে উনুনে, চাল ফুটছে তোবড়ানো ডেকচিতে।ফুটন্ত চালের গন্ধে আর আগুনের আলোয় মুক্তির চোখে বার বার ভেসে উঠতে লাগলো মন্দিরের দুর্গা মূর্তির মুখ টা।অন্ধকারটা আজ চাপ ধরে আছে যেন, বাতির সলতেটা আরেকটু উসকে দিয়ে ও বসে রইল, উনুনের পাশে। হঠাৎ চাপা গোঙানি আর ধস্তাধস্তির আওয়াজে চমকে উঠল মুক্তি। কুঁড়ের সামনে থেকে আসছে আওয়াজ টা। আর মুহূর্তমাত্র দেরী করল না মুক্তি আজ। এক হাতে শুইয়ে রাখা বঁটি, আরেক হাতে একটা জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ টেনে কয়েক লাফে কুঁড়ের পাশ দিয়ে সামনে চলে এল। ওর ন'বছরের বড়মেয়েটাকে তখন পিছমোড়া করে, মুখে গামছা বাঁধছে কানাই। আজ রাতের জন্য নিয়ে যাবে আড়তদারের ঠেকে। মুহূর্তে কাঠের আগুন ঝিকিয়ে উঠল মুক্তির চোখ আর মরচে ধরা বঁটিটায়।

‌পরদিন সকালে কানাইলালের ছিন্নভিন্ন আধপোড়া নিথর দেহ পাওয়া গেছিল কুঁড়ের সামনে। মুক্তি আর ওর বাচ্চাগুলোকে তারপর আর কেউ দেখেনি কোথাও। অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি ওদের। গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করে জমিদার বাড়ির নিষিদ্ধ বাগানে ঘোরাফেরা করার জন্য, অশরীরীরা গ্রাস করেছে মুক্তি আর ওর বাচ্চাদের।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮