• পিয়াংকী

গল্প - শিকল

"মা , ওমা , মা , আমায় একটু ধরে ওই জানলাটার কাছে বসিয়ে দাও না, আজ আকাশটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে!"


"ঠাম্মা, আমার স্কুলে যাবার সময় তো হয়ে গেলো , ভাত দিলে না তো এখনো , সায়ম এসে যাবে এক্ষুনি , ক্রিং ওয়ালা সাইকেল বাঁশি শুনতে পাচ্ছ ? !"


"তোরা দুজনই একসাথে তাড়া দিস কেনো ? আমার বয়সটা কী কমছে দিনকে দিন ?" রাগের তালে গজরাতে থাকলেন সত্তর বছরের তরুণী গীতশ্রী দেবী ।


আজ ষোলোই নভেম্বর , পাঁচ বছর হয়ে গেলো ওদের চলে যাবার , এই বয়সে এসে সেবা-যত্ন পাওয়া যার প্রাপ্য , পরিস্থিতির জুয়া খেলায় হেরে গিয়ে ন্যুব্জ শরীরে এখনো প্রতিদিন তিনি সন্তান আর নাতির দায়িত্ব কর্তব্য সামলে চলেছেন ।


গীতশ্রী ব্যানার্জী । স্বামী মারা গিয়েছেন যখন, তখন ছেলেরা ছোটো । সেই থেকে শুরু করে আজ এই মূহুর্ত পর্যন্ত প্রতিটা দিনই তার কাছে কোনো না কোনো সাবজেক্টের পরীক্ষা । দিয়েই চলেছেন । না শেষ হয় পরীক্ষা , আর না বেরোয় রেজাল্ট !


বড় ছেলে জন্ম থেকেই অসাড় , স্পেশাল SMA চাইল্ড , নাম অরুণ , বয়স চল্লিশ । ছোটো ছেলে তরুণকে মনের মতো করে মানুষ করেছিলেন গীতশ্রী । বিয়েও দিয়েছিলেন , একটা ছেলে হলো , নাতির মুখের আদলে খুঁজে পেলেন স্বামীকে,আদরে ভরতে আর ভরাতে চাইলেন স্নেহের ঋজুকে ।

একটু একটু করে শান্তির মুখ দেখছিলেন উনি , বৌমা আর নাতি ঋজুর দাপাদাপিতে পুরোনো বাড়িটা ফিরে পাচ্ছিলো বেঁচে থাকার অক্সিজেন , চুন খসা দেওয়ালে রংয়ের পোচ দিচ্ছিলো সে নিজেই, কাজল-টিপ্-লিপস্টিক দিয়ে সেজে উঠছিলো আস্তে আস্তে ।


স্বামীর রেখে যাওয়া একটা ছোট্ট দোকান , সেটার পজিশনটা অবশ্য খুব ভাল , মানিকডাঙ্গার মোড়েই।স্বামীর মৃত্যুর পর ওটাই গীতশ্রীর প্রথম আর শেষ সম্বল , দুমুঠো নুন ভাতের উৎস । পরম যত্নে ওকেও আদর করতেন গীতশ্রী , ছোটো ছেলে একদিন বললো ,"মা , গোটা জীবনটাই তো তোমার মোড়ের মাথায় কেটে গেলো , দুদিন বিশ্রাম নাও। আমি সুমি কে নিয়ে ভাবছি একটু দার্জিলিং ঘুরে আসবো , ঋজু জার্নির ধকল নিতে পারবে না , ও বরং তোমার কাছেই থাকবে , একটা সপ্তাহের তো ব্যাপার ,দোকান বন্ধ থাক ক'দিন !"


অভিমানী চোখের অশ্রুহীন জল খুব তাড়াতাড়ি গিলে নিয়ে গীতশ্রী ছেলেকে বললেন , "যা বাবা একটু হাওয়া বদল করে আয় , তোর দাদাকে আর ঋজুকে নিয়ে দুটোদিন তো....আমার শরীরটাও একটু বিশ্রাম চাইছে।"


নিজে হাতে ছেলে-বৌমার লেট হানিমুন ট্যুর লাগেজ গুছিয়ে দিলেন । সকাল ৬:২০ র ট্রেন হাওড়া থেকে।


পরের দিন সকাল সাতটা । ওরা পৌঁছে গিয়েই মাকে ফোন করলো । তার পরেরদিন দুপুর এগারোটা , ঋজুর ঠাম্মা সবেমাত্র রান্না শুরু করেছেন , একটা ওভেনে ভাত ফুটছে আর অন্যদিকে লাউশাকের চচ্চরি ,"অরুণটা খুব ভাল খায় রাস্তায় হোটেল চালিয়ে গীতামাসি হয়ে গেলাম , নিজের সন্তানদের শখের কোনো রান্নাই খাওয়াতে পারলাম না, তরুণ আর বৌমা ফিরে এলে সপ্তাহে একদিন করে দোকানটা বন্ধ রাখবো , ভাল ভাল রান্না করবো ,আনন্দ মজা হবে " ভাবতে ভাবতেই একা একা হেসে উঠলেন সত্তর এর বৃদ্ধা !


এমন সময় নোকিয়ার সেই পুরোনো সেটটা মনখারাপিয়া টোনে বেজে উঠলো !


"কে বলছেন "বলতে বলতেই ওপার থেকে আধো হিন্দি বাঙ্গলা মেশানো কণ্ঠস্বর ,"আপকি লড়কা অউর উসকি ওয়াইফ কা অ্যাকসিডেন্ট হুয়া হ্যায় " হাত থেকে খসে পড়ল খুন্তি , স্বরযন্ত্র হলো বিকল ! মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া কাকে বলে ,সেটা টের পেলেন গীতশ্রী দেবী ,সব শেষ হলো...তখনও গ্যাসে পুড়ছে লাউশাক চচ্চরি!


আদরের তরুণ হাওয়া বদল করে মৃত স্ত্রী নিয়ে ফিরে এলো ডেডবডি হয়ে !


খুব শখ করে গীতশ্রী বাড়ির উত্তর কোণের ফাঁকা একচিলতে জায়গায় লাগিয়েছিলেন কয়েকটা রজনীগন্ধা , ওদের মৃতদেহ এলো আর সেই সাথে ফুটে উঠলো একথোকা সাদা দুঃখ !


নীরব-নির্বাক-নিস্তব্ধ গীতশ্রী ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে একমনে ভাবতে থাকলেন, "মৃতের ওপর জীবন্ত হয়ে ফুটবি বলে আজ কি তোদের এতো উল্লাস ?"


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮