• মালা মুখোপাধ্যায়

গল্প - হঠাৎ দরজায় তিনটি টোকা

বাইরের দরজায় শিকল নেড়ে তিনবার টোকা পড়ে। চমকে ওঠে অমলের মা। ঘুম ভেঙে যায়। ফিসফিস করে অমল আর বিমল কে ডাকে।

গ্রামের শেষে অমলদের বাড়ি। দু কামরার চালাঘর। খড়ের চাল। স্বামী বাইরে থাকে, কাজের সুবাদে। দুটি ছেলে নিয়ে থাকে লতা। এতো রাতে কে? ভয় পেয়ে যায়। চোর ? ছিচকে চোর? কিই বা আছে ওদের বাড়িতে! ছেলে দুটো ছোট। একজন দশ , অন্যজন বারো। চোখ কচলাতে কচলাতে বড়ো টা উঠে পড়ে। --কি হয়েছে? --চোর। চুপ। ঐ দ্যাখ । তিনটি টোকা

বছর বারোর অমল বাবার মতো ভারি গলার চেষ্টায়,--- কি হয়েছে লতা? হঠাৎ ঘুম ভাঙালে কেন? এই কে রে------- বিমল ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে। দাদা বাবা হয়ে গেল!

মা ও, ভয় দমন করে দু'বার ঢোক গিলে, স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি গলা উঁচু করে,বলে, তুমি ঘুমাও। সারাদিন ট্রেন জার্নি করে এসেছো। আমি দেখছি।

বাড়ির চারপাশে কেউ নেই। মাঠের ধারে বাড়ি। তিনটি প্রাণী খুব ভয়ে ভয়ে থাকে। একটু খুট করে আওয়াজ হলেই লতা ছেলে দুটোকে জড়িয়ে ধরে,রাম রাম রাম রাম বলে। ছেলে দুটো ও কোরাসে বলে। মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরও একটু জুরে দেয়------ ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি,রাম লক্ষণ বুকে আছে, করবে আবার কি? সাহস পায় ছেলে দুটো এই কথাটা বললে। ধুর মুর করে,ঠং ঠং করে রান্না ঘরে বাসনের শব্দ। নির্ঘাত ভূত দাদা। আবার বলবো ভূত আমার পুত------- দুটি ইঁদুর সারা ঘর ছোটাছুটি করছে। নেংটি ইঁদুর মা,অমল মা কে সাহস দেয়। ইঁদুর ভূতও হতে পারে দাদা! বিমল অমলের হাতটা চেপে ধরে। চুপ। অমল ভাইকে চেপে ধরে।

ইঁদুরেরা আসলে ভূত। এক একদিন এক একটা ভয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে লতা ছেলে দুটো কে নিয়ে। আজ আবার কি উপদ্রব। স্পষ্ট শুনেছে লতা দরজায় তিনটি টোকার শব্দ। কেন?কে? চোর না ভূত? বিদ্যুৎহীন গ্রাম। সন্ধ্যাতেই গ্রাম একেবারে নিশুতি রাত। এখন ঘড়িতে রাত বারোটা । খুব গরীব হলেও একটা সুন্দর দেওয়াল ঘড়ি আছে। সে ব্যাটাও এই নিঝুম অন্ধকারের নিস্তব্ধতাকে খান্ খান্ করে ভেঙে দেয় ঢং করে একটি গুরু গম্ভীর শব্দ তুলে। ভাই দুটো সাহস পায় । আশপাশে কোনো বাড়ি ঘর না থাকুক , ঘড়িটা জ্যান্ত আছে , ওদের সঙ্গী। লতার কোনো দিকে কান নেই,মনও নেই।ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মন প্রাণ সঁপে দিয়েছে বাইরের দরজার দিকে। আবার সেই মুহূর্তেই দরজায় টোকা। গুনে গুনে ঠিক তিন বার।

এবার কি করবে লতা? ভয়ে কাট । কিন্তু ভয় করলে তো চলবে না। দরজা খুলে বাইরে যাওয়াটা বোকামি হবে। ওদের হাতে অস্ত্র থাকবে।চিনে ফেললে ,খালাস!! দরজার পাশেই একটা ছোটো জানালা আছে,তার পাল্লায় সামান্য ফাঁক ও আছে,ঐ ফাঁক দিয়ে দেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে একটা লোক। লাল পাড় সাদা শাড়ি। পূর্ণিমা রাতে বেশ গা ছমছমে ব্যাপার। না,আর চুপ করে থাকা যায় না।

লতা চিৎকার করে ওঠে। এই ওঠো তো,কে রে? যাবো? যাবো দেখবি? দাঁড়া, দরজা টা খুলছি। ঐ দ্যাখো ঐখানে বড়ো লাঠিটা আছে ,নাও। দাঁড়াও আমি টর্চটা দেখায়।

বিমল চিৎকার করে দেয় ,চোর চোর------ ভাগ্য ভালো সেই সময়ে চৌকিদার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, ছুটে আসে। বেঁটে মোটা তেল চকচকে লাঠিটা ঠুকতে ঠুকতে। বৌঠান------- একমাত্র চৌকিদার সকল বৌদিদের বৌঠান বলে ডাকে। হাতে প্রাণ ফিরে পায় তিনটি প্রাণী। খুব আনন্দ হয়।জলে ডোবা ব্যক্তির ডাঙ্গায় ওঠার মতো আনন্দ। দরজা খুলে বাইরে আসে। চৌকিদার সব শুনে, সাহস দেয়। সে এসে গেছে। ধরতে পারলে মেরে পাট পাট করে দেবে। দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ো বৌঠান । কোনো ভয় নাই। ছেলে দুটোর মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দেয়। ওরা তিনজনে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। চৌকিদার রাস্তার দিকে। আবার হঠাৎ তিনটি টোকার শব্দ। সকলে দাঁড়িয়ে যায়। চৌকিদার শব্দের উৎসের দিকে লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে যায়। পিছনে লতা বৌঠান,আর তার গায়ে লেপটে আছে দুই ছেলে। ঘরের উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে , ছোট কুলুঙ্গি তে ছোট পিচবোর্ডের ভিতর থেকে আসছে শব্দ। ওটা ধীরে ধীরে নামানো হয়। খোলা হয়। দেখা যায় টিকটিকির ডিম,আর টিকটিকিটা ছুটে পালিয়ে যায়।

দাদা টিকটিকি ভূত------- চোর! অমল বলে। চৌকিদার হাসে। সব থেকে সাহসী মা মাথায় ঘোমটাটা আর একবার টেনে দেওয়ার চেষ্টা করে।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮