• কৌশিক মন্ডল

ছন্দে ছোটগল্প - এখনো সাধারণ মেয়ে

বাবার বড় আদরের ছিলাম আমি গর্ব ভরে ডাকতেন - রাণী ওমনি আমি বলতাম - আমি একটি গল্প জানি এক যে ছিল রাজা, এক যে ছিল রাণী বাবা থামিয়ে দিয়ে বলতেন - না মামণি, আর নয় সেই এক কাহিনী তুই হবি সত্যি কারের রাণী লোকে জানবে তোকে তোর নিজের নামে, তোর নিজের কাজে কোন রাজা-উজিরের নাম-পদবী আগে-পিছে লাগবে না যে তুই মেয়ে বলেই নয় সাধারণ করবি তুই অসাধ্য সাধন মা তুই করিসনে ভয় করবি তুই পৃথিবী জয়! রাণী তখনো গুনতে শিখিনি সাত সমুদ্র তেরো নদীর এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়ে সাধের বাবা অথৈ জলে হঠাৎ ফেলে চিরতরে চলে গেল নৌকা নিয়ে মা গিয়েছে আগে ভাগেই হারাবার তো আর কিছু নেই আছে বৈকি! এক অন্য রাণীর স্বপ্ন বাকি হার মানলে চলবে নাকি? রাণী তখনো হারতে শিখিনি হাত-পা ছুঁড়ে বেসামাল উথাল-পাথাল মাঝ দরিয়ায় ভাসতে থাকি প্রতিবেশীর কান্না আত্মীয়ের করুণা দিনের পর দিন ভাল লাগেনা তবু নিরুপায় তাদেরই সহায় গোগ্রাসে বাড়তে থাকি পেটের ক্ষীদে যেমন-তেমন মনের ক্ষীদে বাঁচিয়ে রাখি কেউ না জানে আপন মনে শব্দ বুনে কষ্ট ভোলাই রাতের কালি কলম জোগায় মনের কথা, রাণীর ব্যাথা দু-এক কথা লিখতে থাকি যখন লেখায় সমস্ত মন বলল সবাই মেয়েমানুষের কি হবে এত লেখাপড়ায় অনাথ মেয়েটার একটা পরিচয় তো চাই বারো ঘরে খোঁজ লাগাও না ভাই কাজ চালানো একটি পাত্র কি নাই? জুটল পাত্র যারপরনাই অমুক জ্যাঠার তমুক শালার পিসতুতো ভাই কনে দেখতে এল পাত্র ঘটা করেই সাঙ্গপাঙ্গ সঙ্গে নিয়েই ক্ষীদের শরীর চোখ ঘুরিয়ে, ওড়না সরিয়ে দেখল সবই চুল দেখল, নখ দেখল গোড়ালিটাই বা বাদ কেন যায়! হোক না পাত্র তথৈবচ পাত্রী তো নিখুঁত চাই! যাবার আগে হাল্কা হেসে পাত্রমশাই নিচু গলায় জানতে চায় - আর সখ আহ্লাদ, কিছু নাই? হ্যাঁ, ওই একটু-আধটু লেখালেখি করে থাকি - নম্র সুরে আমি জানাই পাত্র অবাক, হেসেই গড়ায় - যাঃ বাবা, লেখার সখ! আমায় নিয়ে বই লিখবে নাকি? বিয়ে পাকা হল সামনের মাসেই ছেলের চাহিদা কমই - সোনার চেন, ঘড়ি, খাট-পালঙ্ক ইত্যাদি আর মাত্র একটা মোটর-সাইকেল গাড়ি গাড়ির নাকি তার শখ ভারি মেয়েকেও, দু-একটা গয়না দিতেই হয় বিয়ে তো বারবার নয় শুভাকাঙ্খীদের মিটিং বসল, ঠিক হল সব যোগাড় হবে সবার যৌথ অবদানে একটা শুভকাজ হবে সমবেত প্রচেষ্টায় একপ্রকারের বারোয়ারি বিয়েই বলা যায় কম তো কথা নয়! হঠাৎ বুকে বাবার মুখটা উঠল ভেসে বললে বাবা - গড্ডলিকায় মা, যাসনে ভেসে ওমনি আমিও বললুম - হ্যাঁ, বাবা! অনেক হল অজ্ঞাতবাস, আর নয় এবার পালাই! এক ছুট্টে স্টেশনে যৎসামান্য জমানো টাকার গুপ্তধনে ট্রেনের টিকিট নিলাম কিনে কু ঝিক্ কু ঝিক্ ছোট্টবেলার স্বপ্ন নিয়ে চলল ট্রেন দূর-দূরান্তে চলল রাণী সেই স্বপ্নে নিজেকে খুঁজে আনতে তারপরে, অনেক ঘুরেও অনেক বিড়ম্বনা সহ্য করেও রাণী এখনো হাল ছাড়িনি! জানি সবার মনে প্রশ্ন অনেকখানি – কি হল? কেমন করে দিন চলল? কি লাঞ্ছনা? কতটা আপোস সইতে হল? বাঁচার জন্য – শরীরও কি বেচতে হল? এটাই নয় মূল কাহিনী। রাণীর মত রাণী হব বলে, তিলে তিলে লিখেছি নিজের জীবনী ফিরেছি প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে যদি কারও মনে ধরে যদিও এখনো, বালি সে গুড়ে। মানুষ সবাই, ভীষণ ব্যস্ত একটা সাধারণ মেয়ের তলানিতে তলিয়ে যাবার গল্প শোনার সময় কোথা? অবশ্যি, চটক থাকলে অন্য কথা হার মেনে, আহা! হতাম যদি বারবণিতা! শুনতে তার কথা, সময় তখন গাছেই ফলে রাণী তখন সবার কোলে হয়নি তেমন। রাণীর লেখা হয়নি ছাপা কষ্ট বুকের পাথর চাপা বাবার কথার হয়নি পূরণ আমি এখনো সাধারণ কিন্তু তোমাদের ঘরে আজও, কত সাধারণ মেয়ে স্বাধীন হবার চেষ্টা করে তাদের বাড়তে দিও নিজের মতন হয়ত পেলে একটু যতন সাধারণ মেয়েই হবে অসাধারণ!

[if !supportLineBreakNewLine] [endif]

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮