• শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রচ্ছদ কাহিনী - সাহিত্যে ট্র্যাজেডি

আরম্ভ করি একটা সাহসী মন্তব্য দিয়ে দিয়ে। ট্র্যাজেডি ছাড়া কোন সার্থক সাহিত্য হয় না। (শুধুমাত্র সুকুমার রায়কে বাদ রাখছি) হতেই পারে না। সহমত না হলে চিঠি লিখুন। হোক কলরব, হোক আলোচনা, পলেমিক, চুলোচুলি- কারণ সেখান থেকেই বেরিয়ে আসবে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব এবং তথ্য, অনেক কাজের কথা- ঋদ্ধ হবো সকলেই। সাহিত্যে ট্র্যাজেডি নিয়ে দিনের পর দিন আলোচনা করা যায়- এই স্বল্প পরিসরে এতো গুরুগম্ভীর আলোচনা অসম্ভব। আমার আজকের এই আলোচনা যাকে ফেসবুকের ভাষায় বলে ‘conversation starter’ । সম্পাদকমশাই একটু দিগনির্দেশ করেছেন- শিরিন- ফারহাদ, লায়লা-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট। কিন্তু একটা বিদ্রোহী বিদ্রোহী ভাব আনতে ওদিক পানেই যাব না। চার মহাদেশের কয়েকটি সেরা মিথ, উপন্যাস বা গল্প নিয়ে দেখি না একটা এঁড়ে তর্ক করা যায় কি না।


ট্র্যাজেডি কাকে বলে? যা পড়ে মন খারাপ হয়, মন ভাবুক হয়, গলার কাছে একটু দলা পাকিয়ে ওঠে বা মনে হয় এমনটা না হলেই তো ভালো হতো। পাশ্চাত্য সাহিত্যিকরা মোটামুটি দুভাগে ভাগ করেন ট্র্যাজিক সাহিত্যকে- গ্রিক ট্র্যাজেডি। যেখানে ভাগ্যই এক নির্দিষ্ট এবং মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সঙ্গে আছেন দেবদেবীরা- তিন দেবীর জন্য ইলিয়াডের মতো অতো বড়ো এক মহাকাব্যই রচনা হয়ে গেলো- সবাই কলকাঠি মানুষ নামক সর্বংসহা জীবটিকে নানা রকম কষ্ট দিচ্ছেন। অন্যদিকে আছে ইংলিশ ট্র্যাজেডি, যে সেনেকার মডেলে তৈরি। এখানে বেশীর ভাগই বাস্তব চরিত্র বাস্তব চরিত্র নিয়ে। আমাদের দেশে সংস্কৃত সাহিত্য আবার বেশীটাই বিরহবেদনাবিধুর। তাহলে দেখতে পাচ্ছি- বিরহ, দুর্ভাগ্য, মৃত্যু এই নিয়ে গড়ে উঠেছে ট্র্যাজিক সাহিত্য।

পুরাণ বা মিথ, লোককথা বা রূপকথা- মন দিয়ে পড়ে দেখুন, এক ট্র্যাজেডি সবসময় বর্তমান। লখিন্দরকে সাপে কামড়ানো থেকে শুরু করে এর নৌকাডুবি হচ্ছে, ওর হাত থেকে মরা শোলমাছ পালিয়ে যাচ্ছে আবার কারুর বা আগুন লেগে ঘরবাড়ি পুড়ে যাচ্ছে। এমনকি ছেলেভুলানো ছড়ায় মিস্টার হারাধনের দশ দশটি ছেলে এরকম বীভৎস মৃত্যুবরণ করেছে- এতেও যদি দুঃখ না হয়, তাহলে আর কিসে দুঃখ হবে? ভেবে দেখুন বেহুলা কতোটা কষ্ট পেয়েছিল, বা ডুবে যাওয়া মাঝিমাল্লাদের পরিবার কি করে চলেছিল? তাঁদের স্ত্রীদের কি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল সন্তান প্রতিপালনের জন্য। নিজের ছেলেকে সাপে কামড়ানো থেকে না বাঁচাতে পারার অসহায়ত্ব একজন বাবার মনে কতোটা দুঃখ দিতে পারে, আর বেহুলাকে ইন্দ্রের সভায় ‘নাচ’ করে দেবতাদের ‘মনোরঞ্জন’ করে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার গ্লানি- আমরা আসলে এই uncomfortable truth গুলো ভেবে দেখতে পছন্দ করি না। নারীত্বের এই অপমান উহ্য রেখে দিলেই কি বিয়োগান্ত নাটক মিলনান্তিকে পরিণত হবে? হতে পারে? আসলে পুরাণ বা মিথ তৈরিই হয় ভয়কে কেন্দ্র করে। আর ভয় তো অবদমিত দুঃখেরই আরেক প্রকাশ। একই যুক্তি প্রযোজ্য গোয়েন্দা গল্পের ক্ষেত্রেও। কেউ খুন হলে সে তো অতি দুঃখজনক ঘটনা। , কেউ কি শুনেছে যে লটারিতে কোটি টাকা পাওয়ার ভয়ে কেউ জর্জরিত হয়ে পড়েছে বা চাকরিতে প্রোমোশনের ভয়ে কেউ অফিস যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে? রামায়ণ আর মহাভারতের কথা ছেড়েই দিলাম- তার তো পাতায় পাতায় ট্র্যাজেডি।


পাশ্চাত্য সমালোচকরা যেমন লেওনারড কনভারসি এবং রিচার্ড সেওআল ট্র্যাজেডির উদ্ভব বলতে গ্রিক নাটককেই ধরেছেন। পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের প্রাচ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বলি তাঁরা খুব কিছু ভুল বলেন নি। হোমার থেকে নিয়ে এস্কিলাস, সোফোক্লেস এবং ইউরিপিডিস- এই তিন মহান নাট্যকার যারা আমার এই লেখার সারবত্তা বুঝে গেছিলেন আড়াই হাজার বছর আগে- যে সার্থক সাহিত্যসৃষ্টি করতে হলে সার্থক ট্র্যাজিক সাহিত্যই সৃষ্টি করতে হবে- নাটক দেখে কাঁদতে কাঁদতে লোকে বেরুবে- তখন অ্যাথেন্সের অডিটোরিয়াম থেকে আর আড়াই হাজার বছর পর আমাদের অ্যাকাডেমি আর রবীন্দ্রসদন থেকে।

শেক্সপিয়ারের সময় থেকেই আরম্ভ হয় ইংরাজি ট্র্যাজেডির। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, ওথেলো, রোমিও জুলিয়েট -প্রতিটিই ক্লাসিক। অবশ্য তিনি কয়েকটি কমেডিও লিখেছেন- কিন্তু তাতে ট্র্যাজেডির আধিক্য কিছু কম নয়। যেমন ধরুন মার্চেন্ট অফ ভেনিস- শাইলকের সেই বীভৎস চাহিদা-এমন একটি নাটক যেখানে শোলে সিনেমার মতো খলনায়কের নাম লোকে মনে রেখেছে এতদিন! আর মনে রাখেনি যে নাটকের ক্লাইম্যাক্স এ এক গভীর ইহুদি-বিদ্বেষ। নইলে শাইলক দ্য জ্যু বলা হতো না- এক অভিধাতে সমস্ত ইহুদিজাতিকে অর্থলোলুপ পিশাচে পরিণত করার পরও কি আপনাদের মনে এই নাটক একটি কমেডি হিসেবে স্থান পাবে?

সত্যি কথা বলতে কি দুঃখ এবং আনন্দের মধ্যে সীমারেখা অতি ধূসর এবং অস্বচ্ছে। ফিরে আসতে হবে প্রিয় কবি কাহলিল গিব্রানের কথায় “your joy is your sorrow unmasked” এক গভীর ব্যঞ্জনায় চোখ খুলে যায়- একটু বিশদে দেখে নি-


Your joy is your sorrow unmasked. And the selfsame well from which your laughter rises was oftentimes filled with your tears. And how else can it be? The deeper that sorrow carves into your being, the more joy you can contain. Is not the cup that holds your wine the very cup that was burned in the potter’s oven? And is not the lute that soothes your spirit, the very wood that was hollowed with knives? When you are joyous, look deep into your heart and you shall find it is only that which has given you sorrow that is giving you joy. When you are sorrowful look again in your heart, and you shall see that in truth you are weeping for that which has been your delight. Some of you say, “Joy is greater than sorrow,” and others say, “Nay, sorrow is the greater.” But I say unto you, they are inseparable. Together they come, and when one sits alone with you at your board, remember that the other is asleep upon your bed.


সত্যিই যদি তাই হয়, তাহলে প্রতিটি কমেডির অন্তরে রয়েছে এক ট্র্যাজেডি। তাই তো সমস্ত রূপকথার গল্প, উপকথার গল্প, লোকগাথায় নায়ক নায়িকাকে পেরুতে হয় নানা ঝড়ঝাপটা- গল্পটা তারই গল্প। শেষে এক লাইন আনন্দ “তারপর তাঁরা সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘরকন্না করতে লাগলো।” ভেবে দেখুন ওই এক লাইন লেখার জন্য কতো ভয়, দুঃখ আর বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে বেচারাদের।

এবার একটু চোখ দি আমেরিকান সাহিত্যে। এর তো আর প্রাচীনত্ব পাই না- এর বেশীরভাগটাই আধুনিক সাহিত্য। কয়েকটা নাম নেওয়া যাক- আরনেস্ট হেমিংওয়ে, স্টেইনবেক, অ্যালিস ওয়াকারের কালার পার্পল বা টনি মরিসনের বিলভেড অথবা জন আপডাইকের টেররিস্ট- প্রায় সবই ট্র্যাজিক সাহিত্য। জে ডি স্যালিঙ্গারের ক্যাচার ইন দ্য রাই এ যে সামাজিক বিপন্নতা তুলে ধরা হয়েছে তা সত্যি বলতে কি ট্র্যাজিক ছাড়া আর কিছু নয়। স্টেইনবেকের গ্রেপ্স অফ রাথ বা ইস্ট অফ ইডেনের কথা ভেবে দেখুন- এই দুটো বই থেকে দুঃখ কষ্ট বাদ দিয়ে দিন, বইয়ের চেহারা দশ ভাগের এক ভাগ হয়ে যাবে আর স্টেইনবেকের নোবেল পুরস্কারটাও বাদ চলে যাবে। লাতিন আমেরিকার কথায় না ঢোকাই ভালো। লাতিন আমেরিকার যে কোন দেশের যে কোন মহান সাহিত্যিকের মহান শিল্পসৃষ্টির কথা ভাবলেই তাঁর ট্র্যাজেডিটাই প্রথম নজরে পড়ে। হুয়ান রুলফোর পেড্রো পারামো বা হুয়ান ভাস্কেজের সাউন্ড অফ থিং ফলিং বা রেপুটেশন অথবা মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড বা প্রায় যে কোন সার্থক উপন্যাসে ট্র্যাজেডি একটা বড়ো ভূমিকা নিয়েছে। সম্পূর্ণ অন্যরকম তিনটে উপন্যাস- ডনা ফ্লোর অ্যান্ড হাড় টু হাজব্যান্ডস ( হর্হে আমাদো), ইনফান্তেয ইনফারনো (কাব্রেরা ইনফান্তে) আর ইন প্রেইজ অফ স্টেপ মাদার ( মারিও ভারগাস ইয়োসা)- তিনটে বইই প্রায় সেক্স কমেডি - কিন্তু তিনটে বইতেই আপাত মজার প্লটের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে একাকীত্বের এক ফল্গুনদী। তাই তো বলছিলাম সার্থক সাহিত্য মানে ট্র্যাজেডি। কমেডি, মানে সার্থক কমেডি ভালো লাগতে পারে, আমরা হাসতেও পারি কিন্তু তাঁর নিচে ফল্গুধারার মতো বোয়ে যাবে এক ট্র্যাজিক গল্প। বিশ্বাস না হয় পড়ে দেখুন আবার শিবরাম চক্রবর্তী, পরশুরাম অথবা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। হয় সেগুলো ট্র্যাজেডি, নয় সার্থক সাহিত্য নয়।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮