• স্বাতীলেখা ঘোষ

প্রবন্ধ - রবীন্দ্রসংগীতের সেকাল ও একাল

এই রকম একটা কথা শুনেছিলাম মাঝে, রবীন্দ্রনাথের তো একালে কোন অস্তিত্ব নেই, তিনি তো একদমই সেকেলে। আমরা নাকি এখন মডার্ন বাঙালী। আজকাল পুজোর মণ্ডপে, পয়লা বৈশাখে বলিউডের “লেটেস্ট” গান না হলে, লোকে যে ঠিকঠাক “খায়” না। তবে আমার কি মনে হয় এখনো বেশ কিছু মানুষ আছেন যারা বোধহয় একটু “সেকেলে” থাকতেই পছন্দ করেন। বলিউডের ধাক্কা তাঁদের মনের ভিতর থেকে রবিঠাকুর কে এখনও পাকাপাকি ভাবে উৎখাত করে ফেলতে পারেনি। তিনি যেন আঁকড়ে ধরে আছেন তাদের মনের কোন এক নিবিড় কোনা। তাঁর সেই “সেকেলে” গান আর কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি তাদের জুগিয়ে যাচ্ছেন প্রাণ শক্তি, “একালেও”। এই লেখাটা তাঁদের কথা ভেবেই লেখা, কিভাবে রবিঠাকুর তাঁদের একান্ত অনুভূতির তারগুলোকে, নাড়া দেন “একালে”ও, সেটাই তুলে ধরার একটা ছোট্ট চেষ্টা করলাম।


আগেই জানিয়ে রাখি আমি কিন্তু কোন রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ নই, তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লিখতে বা বলতে গেলে প্রথমেই যেটা মনের আকাশে ভেসে ওঠে, সেটা হল –

গগনং গগনাকারঃ সাগরঃ সাগরোপম।


যেমন আকাশ কে আকাশ ছাড়া অন্য কারোর সঙ্গে তুলনা করা যায় না, যেমন সাগর কে একমাত্র সাগরের সঙ্গেই তুলনা করা যায়, ঠিক তেমনই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে তুলনা করব কার সাথে, এই সঙ্কট মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাঁকে গোটা বিশ্ব জেনেছে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যকার হিসেবে, তবে তাঁকে কি আরেকজন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যকারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে? কিন্তু তিনি তো শুধু সাহিত্যকার নন তিনি তো কবিও, তিনি যে একই সাথে গীতিকার আবার সুরকারও, গল্পকার আবার প্রবন্ধকারও, নাট্যকার, নাট্য পরিচালক এমনকি চিত্র পরিচালকও। একদিকে তিনি যেমন চিন্তাবিদ আবার অন্যদিকে শিক্ষাবিদও। তিনি যে রবি, তাই তাঁর প্রকাশে আলোকিত লক্ষ লক্ষ জীবন, চেতনা। তাই তাঁর সম্বন্ধে কিছু লিখতে যাওয়া যেন শুধু ধৃষ্টতা, তাই শুধু তাঁর রচনা আমাদের নিজের জীবনকে কিভাবে ছুঁয়েছে, সেই অনুভূতির কথাই লেখার চেষ্টা করলাম।


রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক, বলতে গেলে তারই রচিত “উৎসর্গ" কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা “প্রসাদ” থেকে কয়েকটা পঙক্তি ধার নেওয়া যেতে পারে।


“শিশির কহিল কাঁদিয়া তোমারে, রাখিব বাঁধিয়া, হে রবি আমার নাহি তো এমন বল, তোমাছাড়া মোর ক্ষুদ্র জীবন শুধুই অশ্রুজল।“


ক্ষুদ্র শিশির কণা আকাশের রবির সঙ্গে সংলাপ করছে। আমার সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটাও অনেকটা সেরকমই। আর আমাদের মতো ক্ষুদ্র শিশির কণাদের কে তাঁকে নিয়ে চর্চা করার জন্যে একটু যেন সাহস তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন সেই কবিতার পরবর্তী দুটো পঙক্তির মাধ্যমেই। শিশির কণাদের উদ্দেশ্যে কবি বলেছেন-


“আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো, তবু শিশির কণারে ধরা দিতে পারি, বাসিতে পারি যে ভালো”


ক্ষুদ্র শিশির কণার মধ্যে যেমন রবি প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনই রবীন্দ্রসাহিত্যের আলো আমার, আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত প্রতিবিম্বিত হতে থাকে। তিনি যেন বাঙ্গালীর চিন্তনে, মননে, সবসময় বিরাজমান।


রবীন্দ্রসংগীতের সেকাল ও একাল সম্বন্ধে লিখতে গেলে, প্রথমেই একটা প্রশ্ন মাথায় উঁকি দেয়, সত্যিই কি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেকাল ও একাল বলে কিছু হয়? তাঁকে কি সময়ের মাপকাঠি দিয়ে বাঁধা যায়? তারপর মনে হয়েছে তাঁর গান নিয়ে এখন যে নানা রকম ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, তার নিরিখে হয়ত এই বিভাজন করা যায়। আজকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত শুদ্ধ না অশুদ্ধ, তা নিয়েও তো কত আলোচনা চলছে, অথচ মোজার্ট বা বিথোভেনের সঙ্গীত নিয়ে কিন্তু এত কাটাছেঁড়া করা হয় না। সবসময় সর্বত ভাবে মূল আকারেই পরিবেশন করা হয়। তবে রবীন্দ্রসংগীতের উপর এইরকম ছড়ি ঘোরানো কেন? হয়ত একালের কিছু শিল্পীরা বলতে চান, যে রবীন্দ্রসঙ্গীত তার মূল আকারে খুবই কাঁচা, আর যে কেউ চাইলেই যেন তার “ইম্প্রুভড ভার্সন” তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের সুর, তালকে তো তার বানী থেকে তো আলাদা করা যায় না। তার গানের সূক্ষ্ম সুর যেন ছোট ছোট ভেলা, যে গুলো কে আলাদা আলাদা শব্দ বয়ে নিয়ে যায় মনের গভীরে, আর ছোঁয়া দেয় আলাদা আলাদা অনুভূতির তার গুলো কে। আবার জীবনের আলাদা আলাদা পর্যায়ে, একই গান, একই রচনা আলাদা আলাদা অনুভূতির তার কে ছোঁয়া দেয়। সে যেন নতুন মানে, নতুন সাজে সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাদের জীবনে স্তরে স্তরে চিত্তশুদ্ধি ঘটায়। গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, রবীন্দ্রসঙ্গীত তার মূল রূপে আমাদের “কাউন্সিলিং” ও করে। আমাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, পারিবারিক সব রকম সঙ্কটে আমাদের একান্ত বন্ধুর মতো পাশে এসে দাঁড়ায় আর যেন হাত ধরে হতাশা থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। আর সেই সুরের ভেলাটাকে সরিয়ে নিলে শুধু পড়ে থাকে কিছু নিষ্ক্রিয় শব্দ, যার অবলম্বনে আধুনিক বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ, কিশোর কিশোরীদের মনে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারলেও, মনের অনুভূতির তার গুলোকে স্পর্শ করতে পারে না। মনের মধ্যে পাকাপাকি ভাবে ছাপ ফেলতে পারে না, তাই খুব সহজেই স্মৃতি থেকে মুছেও যায়।


রবীন্দ্রসঙ্গীতে আমরা যে আকারগত বিন্যাস দেখি –“স্থায়ী-সঞ্চারী–অন্তরা” তা তার সমসাময়িক অন্য সঙ্গীতকারদের (যেমন দিজেন্দ্রলাল (জন্ম: সন ১৮৬৩); রজনীকান্ত (জন্ম: সন ১৮৬৫); অতুলপ্রসাদ (জন্ম: সন ১৮৭১); দিলীপ রায় (জন্ম: সন ১৮৯৭)) গানে তেমন টা দেখা যায় না। তবে রবীন্দ্র প্রাক্কালের কিছু কিছু ধ্রুপদ সঙ্গীতে গানের আকারগত এই বিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়, যদিও তা খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না। রামপ্রসাদী আর বাউলেও এই ফরম্যাট দেখা গেলেও, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের আকারগত বিন্যাসে এনেছিলেন এক অভিনবত্ব। রবীন্দ্রসঙ্গীতে স্থায়ী ও অন্তরার মধ্যে সুরের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়, কিন্তু সঞ্চারী অংশের সুর সম্পূর্ণ এক আলাদা দিগন্ত খুলে দেয়। গানের জগতে এ এক অনবদ্য সৃষ্টি। লক্ষ্য করলে দেখা যায় পরবর্তী যুগের বাংলা গান অনেক ক্ষেত্রেই সেই বিন্যাস অবলম্বন করেছে। সঙ্গীতকার রাহুল দেব বর্মণ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সলিল চৌধুরী বা আরো অনেকের গানের গঠনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব দেখা যায়।


তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়কী শৈলী একদমই অনমনীয় নয়। গায়ক নিজস্ব চিন্তন মনন দিয়ে তাঁর গান তাঁর নিজের মতো করে পরিবেশন করতে পারেন এবং সেই জন্যই একই গান বিভিন্ন শিল্পীর গলায় বিভিন্ন ভাবে ফুটে ওঠে। সবচেয়ে দুঃখের যে এত স্বাধীনতার পরেও কিছু শিল্পী তাঁর গানের উপর “রোলার কোস্টার“ চালিয়ে গানের আত্মাকেই মেরে ফেলছেন। সেই সঙ্গীতকে বিকৃত করে হয়ত তাঁদের নতুন কিছু সৃষ্টি করার অক্ষমতা চাপা দেওয়ার রাস্তা খোঁজেন। তা না করে, যদি রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরে ডুবে তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায় তাহলে খুব সহজেই অনুভব করা যাবে যে, সুরের যে চয়ন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের জন্যে করেছেন তার পেছনে কতটা ভাবনা চিন্তা রয়েছে, আর সেটা নিছকই কোন আকস্মিক ঘটনা নয়, যে প্রতিনিয়ত তার পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে, সময়ের সাথে সাথে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেখা যাক।


“আজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে আসবে যদি শূন্য হাতে, আমি তাইতে কি ভয় মানি ,জানি ,বন্ধু তোমার আছে তো হাত খানি “


—এখানে “শূন্য হাতে“ জায়গাটি রাগ বেহাগের একদম নিচের স্বরে নেমে গিয়ে এক গভীর শূন্যতা, একাকীত্বের অনুভূতিকে উদ্দীপিত করে শ্রোতার মনে। আবার “আমি তাইতে কি ভয় মানি জানি“ সুর স্বরগ্রামে চরাই ওঠে এবং “তোমার আছে তো হাতখানি“ এখানে সুরের সমতা দেখতে পাই, কারণ তিনি নির্ভয় মনে চরম নিশ্চিন্ততা আর ভরসা জাগাতে চেয়েছেন। তাঁর প্রতিটি গানের বানী এবং সুরে মনোনিবেশ করলে আমরা দেখতে পাবো সেগুলো কত খানি যথাযথ। আবার এত বাঁধনের মধ্যেও পরিবেশক, শ্রোতা আর পাঠকদের স্বাধীনতা দিয়েছেন, নিজের মতো করে অনুভব করার, নিজের মতো করে পরিবেশন করার, নিজের মতো করে পাওয়ার।


সুর ও কথার চয়নের আর একটা অসাধারণ নিদর্শন “তুমি কি কেবলই ছবি?”


তুমি কি কেবলই ছবি? শুধু পটে লিখা ওই যে সুদূর নীহারিকা যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড় ওই যারা দিনরাত্রি আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি তুমি কি তাদের মতো সত্যও নও? হায় ছবি ,তুমি শুধু ছবি ...


কোন এক জায়গায় কবি এক নারীর চিত্র দেখেন, আর সেটি দেখে তাঁর মনে এক গভীর অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং সেই থেকেই এই গানের জন্ম। এবং অবধারিত ভাবে তা শুধুমাত্র একটা ছবি হয়েই ধরা দেয়নি তাঁর মনে। ছবিতে প্রতিবিম্বিত নারীর সৌন্দর্য বিশাল ”নিখিলের” সাথে একাত্ম হয়ে গেছে তার রচনায়। তাঁর মতো স্রষ্টার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উত্তরণের পথে তিনি যে সুরের নির্মাণ করেছেন তা অনির্বচনীয়। গানটি শুরু হয়েছে একটি সামান্য প্রশ্ন দিয়ে- “তুমি কি কেবলই ছবি? শুধু পটে লিখা”, আর সব শেষে গিয়ে কবি তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন ”কবির অন্তরে তুমি কবি...নও ছবি ,নও ছবি, নও শুধু ছবি।” স্বরলিপিটা দেখলে বুঝতে পারা যাবে, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সুরের ভেলা কি ভাবে গায়ক এবং শ্রোতাদের কে সেই প্রশ্ন থেকে উত্তরের দিকে সুরের সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, অনুভূতির উথাল পাতালের মধ্যে দিয়ে। যেমন “ওই যে সুদূর নীহারিকা “ আর “ওই যারা দিন রাত্রি“...এই দুটো “ওই” য়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন শুধুমাত্র সুরের সূক্ষ্মতার মাধ্যমে। দুটো “ওই“ এই ব্যবহার করেছেন “পা-সা”, তবে প্রথমে ব্যবহার করেছেন “পা-স্পর্শ” স্বর, এবং পরে একই শব্দের জন্যে ব্যবহার করেছেন “পা-অর্ধ” স্বর। এরকম অজস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে তাঁর সৃষ্টি কে গভীর ভাবে অনুভব করার চেষ্টা করলে। একি নিছকই আকস্মিক ঘটনা? না কোন দুর্ঘটনা? না..., এই সূক্ষ্ম আর সচেতন সুরের নির্বাচনই বোধহয় রবীন্দ্রসঙ্গীত কে পৌঁছে দিয়েছে গানের পরিভাষার ঊর্ধ্বে, আর রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে গেছে “কাল” এর পরিসীমার ওপারে।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮