• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে

'এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;

বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,

কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।' - জীবনানন্দ দাশ

কুয়াশা আর শিশিরে মাখানো শীতের ঘ্রাণ কখনো মায়াবী কখনো বা করুণ। আর সেই করুণ সুর আরো প্রকট হয়ে ওঠে যখন প্রতিটি দিনের বয়ে আনা খবরে শান্তির থেকে অশান্তির ভাগ যায় বেড়ে।


আজকাল খবর মানেই সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা, দাঙ্গা, খুন, জখম এবং ধর্ষণ। একের পর এক অমানবিক ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত হই। কিন্তু আমাদের এই আতঙ্ক ক্রমশ বেড়েই চলে। কারণ এক পাশবিক ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই আমাদের চেতনাকে ছিন্ন ভিন্ন করে নতুন আরেক খবর যা ততোধিক পাশবিক।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে চলন্ত বাসে গণ-ধর্ষণের ঘটনার ভয়াভয়তায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ছিল গোটা দেশ। দেশ জুড়ে মানুষের প্রতিবাদের জেরে যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার জন্য ফৌজদারি আইনে সংশোধনও করা হয়। তারপর কেটে গেছে সাত বছর কিন্তু অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয় নাই। যদিও বেশিরভাগ যৌন নিপীড়নের ঘটনাই পুলিশের কাছে রিপোর্ট হয় না, তা সত্ত্বেও, সরকারের তথ্য অনুসারে, বছরে প্রায় বত্রিশ হাজার ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশের কাছে জমা পড়ে । অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ টি ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ পুলিশের কাছে জমা পড়ে। গত একমাসে কয়েকটি পাশবিক ঘটনা দেশের অন্তরাত্মাকে আবার করে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। নভেম্বরে হায়দ্রাবাদে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারে কিছু দুষ্কৃতিকারী তার কদিন পরেই উন্নাওয়ের এক ধর্ষিতাকে, আদালতে যাওয়ার পথে, পুড়িয়ে মারে ধর্ষণে অভিযুক্তেরা।


একের পর এক এই ধরনের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত! এর বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে একসাথে লড়তে হবে। এই লড়াই শুধু আইন প্রণয়ন করে করা যাবে না। শুধুমাত্র আইনি বিচারের শেষে কিছু ধর্ষককে ফাঁশিতে মৃত্যু দণ্ড দিয়ে বা বিনাবিচারে পুলিশের এনকাউন্টারে কিছু ধর্ষককে মেরে ফেললে এই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের সবাইকে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক স্তরে লড়াই করতে হবে। আমাদের অবচেতনে যুগ যুগ ধরে বয়ে আনা, নারী এবং পুরুষের বৈষম্য দূর করতে আমাদের সামাজিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের বুনিয়াদী পরিবর্তন আনতে হবে। এই বদল এত সহজ নয়। হাজার হাজার বছরের ভুল শিক্ষায়, সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে মজ্জায়-মজ্জায় লিঙ্গ বৈষম্যের যে বিষ বইছে তাকে বদলানো এত সহজ নয়। আর সেই বদল শুরু করতে হবে আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের চেতনায়। আমাদের এই লড়াই ততদিন জারি রাখতে হবে যতদিন না চেতনার আয়নায় নিজেদের দেখে লজ্জায় মুখ ঢাকার প্রয়োজন ফুরায়।


সাহিত্যের নয় রসের অন্যতম রস ‘করুণ রস’। সাহিত্য-রস-পণ্ডিতদের মতে সাহিত্যে সব থেকে মধুর রস হল করুণ রস। পাশ্চাত্য সাহিত্যে ট্র্যাজেডির আবির্ভাব গ্রীসের নাট্যমঞ্চে বিখ্যাত নাট্যকার এস্কিলাস, সোফোক্লেস এবং ইউরিপিডিস এর হাত ধরে। তারপর বিগত আড়াই হাজার বছর ধরে পাশ্চাত্য সাহিত্যে ট্র্যাজেডির বিবর্তন হয়েছে গ্রীক ক্লাসিকাল ট্র্যাজেডি থেকে রোমান সেনেকা ট্র্যাজেডি হয়ে ইংলিশ শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডির যাত্রাপথে। ভারতীয় সাহিত্যে করুণ রসের প্রয়োগ সম্ভবত আরো প্রাচীন। আচার্য অভিনব গুপ্তের মতে করুণ রসই সাহিত্যের মুল রস এবং সেই রস থেকেই অন্যান্য রসের জন্ম – “একো রসঃ করুণ এব নিমিত্তভেদাদ / ভিন্ন পৃথক্ পৃথগিবাশ্রয়তে বিবর্তান”। ব্যাধের তীরে ক্রৌঞ্চ পাখি নিহত হলে, নিহত পাখির শোক থেকে উচ্চারিত হল প্রথম শ্লোক ‘মা নিষাদ’। সংস্কৃত আদি মহাকাব্য রামায়ণ শুধু রাম এবং রাবণের যুদ্ধের কাহিনী নয়। রামায়ণের পাতায় পাতায় আছে সীতার বিরহ এবং শোকের কাহিনী। ক্লাসিক গ্রীক নাটকের দুই ধারা ছিল - ট্র্যাজেডি নাটকের শেষ হত মৃত্যুতে, অন্তে ‘বিয়োগ’ থাকত বলে ট্র্যাজেডি নাটকের বাংলা প্রতিশব্দ ‘বিয়োগান্তক নাটক’ এবং বিপরীত ধারা হল কমেডি বা ‘ মিলনান্তক নাটক’। কিন্তু শেষে মৃত্যু আছে বা নেই শুধু সেটা দিয়ে কোনো সাহিত্যকে ট্র্যাজেডি বা কমেডি বলে দাগানো সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় মহাভারতের কাহিনী মূলত একটি ট্র্যাজেডি কারণ - “মিলন অথবা মরণ, সে ত কাব্যের বাহ্য আকার মাত্র, তাহাই লইয়া কাব্যের শ্রেণী নির্দেশ করিতে যাওয়া দূরদর্শীর লক্ষণ নহে। যে অনিবার্য নিয়মে সেই মিলন বা মরণ সংঘটিত হইল, তাহারই প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। মহাভারতের অপেক্ষা মহান ট্র্যাজেডি কে কোথায় দেখিয়াছ? স্বর্গারোহণকালে দ্রৌপদী ও ভীমার্জ্জুন প্রভৃতির মৃত্যু হইয়াছিল বলিয়াই যে মহাভারত ট্র্যাজেডি তাহা নহে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্ম কর্ণ দ্রোণ এবং শত সহস্র রাজা ও সৈন্য মরিয়াছিল বলিয়াই যে মহাভারত ট্র্যাজেডি তাহা নহে-কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন পাণ্ডবদিগের জয় হইল তখনই মহাভারতের যথার্থ ট্র্যাজেডি আরম্ভ হইল। তাঁহারা দেখিলেন জয়ের মধ্যেই পরাজয়।“ ( ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য সমালোচনা - রবীন্দ্রনাথ) ।

সাহিত্য-রস-পণ্ডিতদের মতে যেহেতু বিরহ করুণ রসেরই প্রকাশ সেহেতু সম্ভোগ-শৃঙ্গারের থেকে অধিক মধুর হল বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার অর্থাৎ বিরহ। সেকারণেই আড়াই হাজার বছর পরেও মেঘদূতের বিরহ কাতর যক্ষের বেদনা আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। লায়লা-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, হীর-রাঞ্ঝার প্রেমের বিয়োগান্তক সমাপ্তি তাদের কাহিনীকে অমর করে তোলে । বৈষ্ণব সাহিত্যে মনের মানুষের জন্য রাধার বিরহ এমন সর্ববিস্তারী যে মিলনেও রাধার মন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় আকুল হয় - ‘দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া’। কৃষ্ণ মথুরায় চলে গেলে, সেই চিরবিচ্ছেদের বিরহজ্বালায় সৃষ্টি হয় মাথুর যা বৈষ্ণব পদাবলির ছত্রে ছত্রে আমাদের আকুল করে তোলে - ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর / এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’ । মনের মানুষের জন্য এই বিরহই বিভিন্ন রূপে ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এবং গানে অরূপের সন্ধানে। সেই প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশ্বে যে সব মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে তাঁর বেশীরভাগেরই অন্তঃরে বইছে করুণ রসের ফল্গুধারা । তাই নীড়বাসনার সকল পাঠক পাঠিকাদের সঙ্গে সাহিত্যের এই অনন্য ধারাকে আর একবার স্মরণ করে নিয়ে এলাম এবারের নীড়বাসনার সংখ্যা, ‘সাহিত্যে করুণ রস বা ট্র্যাজেডি’। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

অবশ্য শুধু করুণ রসের সাহিত্য নয়, প্রতিবারের মত এবারেও বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে অনুবাদ গল্প, কবিতা এবং অণু গল্প, কবিতা নিয়ে 'অনুস্বর্গ'। এছাড়া অন্যান্য গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ তো থাকছেই যেমন থাকে তাঁর সাথে থাকছে আমাদের বন্ধু গ্রুপ ‘লাল পলাশের পথে’র সহযোগিতায় আয়োজিত সাহিত্য প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের কবিতা এবং গল্প।

গত ৭ ই নভেম্বর আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন আমাদের প্রিয় সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেন। বিশিষ্ট কবি দম্পতি পিতা নরেন্দ্র দেব ও মাতা রাধারানী দেবীর কন্যা নবনীতা দেব সেনের ‘প্রথম প্রত্যয়’ ছিল তাঁর কবিতা কিন্তু উপন্যাস, গদ্য, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ, রম্যরচনা - সাহিত্যের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তার ছিল অবাধ বিচরণ। ১৯৯৯ সালে তিনি সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পান তাঁর আত্মজীবনী মূলক রম্যরচনা 'নটী নবনীতা' গ্রন্থের জন্যে। এছাড়াও তিনি ভারতীয় ভাষা পরিষদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০০ সালে উনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা বিশেষ ভাবে শোকাহত। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। উনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন, ওনার সাহিত্য দর্শনের প্রতিফলনে যা বাঙ্গালী সাহিত্য প্রেমিককে আগামী দিনের কাজ করার প্রেরণা যোগাবে।

২০১৬ সালে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছিল। আপনাদের ভালবাসাকে পাথেয় করে, গত চার বছরে বেশ কিছুটা পথ আমরা একসাথে পেরিয়ে এলাম। ভালো লাগছে আজ আমাদের দ্বাদশ সংখ্যা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে। আমাদের সমস্ত লেখক, শিল্পী এবং সহযোগী বন্ধুদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ আমাদের সমস্ত পাঠক বন্ধুদের।

আশা করি আমাদের এবারের সংখ্যা আপনাদের ভাল লাগবে। আপনাদের সাহিত্য-চেতনা আমাদের সাথে ভাগ করে আমাদের আরো সমৃদ্ধ করে তুলুন। আপনারা সঙ্গে থাকলে, আমরা আরো অনেকটা পথ এগোতে পারব এই আশাই রাখি।

আপনাদের সবাইকে জানাই ইংরাজি নূতন বছরের আগাম শুভেচ্ছা। সামনের ছুটির দিনগুলো আপনাদের খুব ভাল কাটুক। আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সাহিত্যে থাকুন আর আমাদের সঙ্গে থাকুন।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮