• সূর্য সেনগুপ্ত

স্মরণে - আমার সাথে নবনীত দেব ও নবনীতা দেব সেনের তিনটি সাক্ষাতকার



নবনীতা দেব সেনের সাথে আমার প্রথম দেখা ও আলাপ হয় ১৬ নং টাউনসেন্ড রোডে। সেটা গত শতাব্দীর সত্তর দশকের কথা। টাউনসেন্ড রোড ও বকুলবাগান রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ইঁট রঙের তিনতলা বাড়িটা থেকে তখন শিশু পত্রিকা ‘রামধনু’ প্রকাশিত হত। ফাউন্ডার ও সম্পাদক বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য তখন গত হয়েছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র অমিত প্রতিভাশালী সাহিত্যিক (বাংলা সাহিত্যর জাপানী গোয়েন্দা হুকাকাশির স্রষ্টা) ও অধ্যাপক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যও অকালে গত হয়েছেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশনের এক স্তম্ভ (এবং বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশনের হোতা প্রেমেন্দ্র মিত্রর স্নেহভাজন) ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য তখন রামধনুর সম্পাদক। রামধনুর বাড়িতে শিব্রাম, ধীরেন্দ্রলাল ধর, সুকুমার দে সরকার, রবীন্দ্রলাল রায় থেকে শুরু করে ছোকরা শিশু সাহিত্যিকদের ভিড় লেগে থাকতো। আমিও গিয়ে জুটতাম। ঈশ্বরের দোহাই, আমি কদাপি শিশু সাহিত্যিক ছিলাম না। কিন্তু যেহেতু ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণের জ্যেষ্ঠা কন্যা, উদীয়মানা কবি ও যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপিকা সুচেতার আমি ছিলাম একদম প্রাণের ভাই (আমরা ছিলাম মামাতো-পিসতুতো ভাই বোন) তাই আমি ওখানে ভালোই কল্কে পেতাম।


এই রকম একটা শিশু সাহিত্যের পরিমণ্ডলের মধ্যে ১৬ নং টাউনসেন্ড রোডের পূব দিকের একতলার ঘরে স্থানান্তরিত হোল “শিশু সাহিত্য পরিষদ”। হয়তো সেখানে আগে থেকেই ছিল, স্মরণে নেই, কিন্তু তৎকালীন সভাপতি নরেন্দ্র দেব, অর্থাৎ নবনীতা দেব সেনের পিতা, তাঁর পরিচালনায় রমরম করে চলতে লাগল পরিষদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর সুযোগ্যা পত্নী রাধারানী দেবী। দিদির সুপারিশে আমি সেই পরিষদের সেই নবলব্ধ উৎসাহের কালের প্রথম দিন থেকেই সেখানে বরকন্দাজের কাজে লেগে পড়েছিলাম এবং সভাপতি মশাইয়ের স্নেহভাজন হয়ে উঠলাম এবং তারপর যখন একদিন সভাপতি মশাইয়ের কন্যা নবনীতা এলেন, নরেন্দ্র দেব মশাই তাঁর সাথে আমার আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, এই হোল সুজ্জো, পরিষদের এক অত্যুৎসাহী সদস্য। আমি ধন্য হলাম এবং হেঁ হেঁ করলাম। যদিও তখনো তিনি তেমন খ্যাতি অর্জন করেন নি।

কাল ওনার চিরবিদায়ের সংবাদ পেয়ে স্মৃতির কোটর হাতড়ে কথাবার্তা যা হয়েছিল তার কোন হদিস পেলাম না, কিন্তু মানুষটা, যা মনে আছে, ছিলেন এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। মিশুকে, আর সুন্দরী না হয়েও তিনি সামনে এসে দাঁড়ালে দুবার তাকাতে হয় এমন ছিল মুখশ্রী, আর ছিল দুটি পেনিট্রেটিং চোখ। সাজসজ্জার মধ্যেও ছিল এক রুচিসম্পন্ন ঔজ্জ্বল্য। সব মিলিয় সত্যিই এক আকর্ষণীয় মানুষ।


আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতকার ঘটেছিল ‘ভাল বাসা’য়। নরেন্দ্র দেব ও রাধারাণী দেবী বাসার নাম ছিল ভালবাসা। তৎকালীন কলকাতার এক খ্যাত নামা গৃহ। হিন্দুস্থান রোডের ওপর সনাতন দু তলা বাড়ি সামনেই প্রবেশদ্বার আর দরজার পাশে মার্বেলের ট্যাবলেটে লেখা বাড়ির নাম। সেখানে আমার যাবার উপলক্ষ ছিল “শিশু সাহিত্য পরিষদ”এর সভা। গিয়েছিলাম পম্পাদির (সুচেতা ভট্টাচার্য) সাথে।


এবং তাঁকে শেষ দেখেছিলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং-এ, আমার মায়ের ঘরে। মা ছিলেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা আর উনি পড়াতেন তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। আমি কোন একটা কাজে গেছিলাম ওখানে – মাঝে মাঝে যেতে হত। উনি ‘নিরুপমাদি ......’ বলে ঘরে প্রবেশ করে, আমাকে দেখে চিনতে পেরে সহাস্যে বলেছিলেন, আরে, কেমন আছ।


তাঁর সাহিত্যর সাথে খুব একটা পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু মনে আছে ২০১৪ সালে আমার বাংলা ভাষা নিয়ে একটা লেখায় তাঁর একটা উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, সেটার পুনরাবৃত্তি করে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করি।


নবনীতা দেব সেন বলেছেন,

“বাংলা ভাষার যে মুখটিকে আমরা মা বলে চিনি, তাকে ধরে রাখতে পারবো কি না জানি না। বাংলা ভাষার সংসার সামলাতে হলে সৎ মায়ের খোঁজ করতে হবে। ভাষা চিরকালই উল্টেপাল্টে বড় হয়, কিন্তু মুছে যায় না। কথ্য ভাষা মরে যাবে এটা হতে পারে না। এমনটা কেউ বলছেও না। কিন্তু আমার উদ্বেগ হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে।”



(ছবি ঋণ - ইন্টারনেট)

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮