• রাণা চ্যাটার্জী

গল্প - মেঘ রোদ্দুর

"যখন খুশি যে ব্যাগ ভর্তি সবজি বাজার নামিয়ে দিচ্ছ ,গাধার মতো কি আমি খেটেই যাব !"- লকডাউনে দুশ্চিন্তায় ঘুপচি ফ্ল্যাটে এমনিতেই দমবন্ধ অবস্থা তাই ঘামে জবজবে হয়ে উত্তেজিত হওয়া মোটেও অমূলক নয় গিন্নির ।রাত করে শুয়ে কখন যে সকাল হচ্ছে ঘড়ি দেখে চমকে উঠছে আবির। তার পর ওই হচ্ছে হবে করে যেদিন বাজার যাচ্ছে তো ফিরতে সাড়ে বারো! বাপরে বাপ এত বেলা আর সত্যিই সবজি কেনা বড্ড বেশি হয়ে গেছে তাই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গিন্নির জাজও।


রাঁধুনি সারভেন্টদের সেই শুরুর দিন থেকেই ছুটি দিয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল অদিতি।বাড়িতে বুঝিয়েছিলো ওরা গরীব মানুষ ঝুপড়িতে থাকে ছেলে মেয়ে নিয়ে,একটু সুরক্ষা ওদের যেমন প্রয়োজন আমাদের ভালোর জন্যও এটা দরকার।পরে যখন টিভিতে এমন করার নির্দেশ দেখেছিল গর্বিত হয়েছিল আবির এত সুন্দর দূরদৃষ্টির পরিচয় দেখে।স্বভাবত বাড়িতে মহিলাদের সংসারের কাজ,ফরমাস মেটানো,রান্না আর মেয়ে বাপের নিত্য নতুন খাবার খাওয়ার ইচ্ছাও সমান তালে বাড়ছে।


আবির কম বেরুচ্ছে বলে বেশি জিনিস কিনছে তা নয়! প্রথম প্রথম মানুষ তো কোনো নিষেধ তোয়াক্কা না করে বেরুচ্ছিল বাইরে। এখন তুলনায় বিপরীত চিত্র পুলিশের সক্রিয়তা ও মানুষের নিজেদেরও মনে ভয় বৃদ্ধি পাওয়ায়।বাজারে পৌঁছে আবিরের খুব খারাপ লেগেছিল সামনের দোকানদার গুলোর বিক্রি বাড়লেও একদম পিছনের দিকে যে মাসি ঠাকুমারা অল্প বিস্তর সবজি নিয়ে বসে,তাদের বিক্রি ভীষণ কমেছে।বাজারে জোগান নেই, দামও আগুন ।ওদিকে কিছু কিনতে যেতেই ওরা যতটা দরকার আরো বেশি নিয়ে যাবার এতো অনুরোধ যে আবির কাকে যে না করে!এক দুবার" উফ বলছি তো এত লাগবে না,বাড়িতে রেগে যাবে"-বলেও দুটো ব্যাগ একদম উপছে পড়লো।


এমনিতেই গৃহবন্দি সবার মেজাজ খিঁচড়ে যাচ্ছে বরং দৌড়ঝাঁপ জীবন ঢের ভাল ছিল,এটা বুঝতে আর কারুর বাকি নেই।সব কিছুতে এ এক হঠাৎ যেন মস্ত ব্রেক তাতে বিশ্ব দুনিয়া ওলট পালট। প্রায় সব বাড়িতেই দাম্পত্য জীবন যাদের প্রায় মধ্যগগনে রাগ আছড়ে পড়ছে কর্তার ওপর।আর এ এমন এক জ্বালা না ক্লাব না ঠেক আড্ডা সবকিছুতে কঠোর রাশ। ওই শুরু হয়েছে পাশের ফ্লাটে পাল দা আর বৌদির মধ্যে চরম তর্কাতর্কি।"হম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সং সেজে শোনো কে কি বলছে আর গদাই লস্করি চালে বেলা একটায় বাজার এনো"-গিন্নির হাঁক শুনতে পেয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না ভেবে "যাই একটু কাজ করি"-বলে সারপ্রাইজ দিতে আবির বাথরুম পরিস্কার করতে দৌড় দিলো।


"বাব্বা বাবু আজ ঝকঝকে করে বাথরুমের টাইলস পরিষ্কার করেছে দেখছি"-স্নান সেরে জল টপ টপ মাথায় গিন্নি খুশি খুশি চোখে প্রশ্ন করতেই কে যেন আবির কে ভেতর থেকে বললো ,"একদম গলে যাবি না,গম্ভীর থাক,স্বাভাবিক হয়েছো কি আবার কোনো ত্রুটি ধরা পড়তেই নেমে আসবে ঝাঁজ"।হম মন কথন ঠিকই সাবধান করছে কিন্তু রিয়েক্ট না করলে উল্টো ফল হবে যে এই চিন্তায় আবির এক পলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে বসলো।ভাবছে এটা একদম ঠিকই যখনই গলে গিয়ে একটু পাগলামি অমনি কিছু না কিছু ঝাড়।দাম্পত্য জীবন এক দশক ছাড়ালেই এমন জোয়ার ভাঁটা হয়তো আসতেই থাকবে ভেবে মুচকি হেসে ওঠে মনে মনে।


"ও আমি বুঝি ক্ষ্যাপা পাগলা এসেছি,একাই বকে যাচ্ছি,ওনার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই,আবার হাসি পাচ্ছে-থাকো না একা একাই-লক ডাউন উঠতে দাও আমি মেয়েকে নিয়ে বেশ কটা দিন মায়ের কাছে যাবো"-কৈ হাসছি, এ আচ্ছা কেলো হলো তো,দুরবাবা যা করছি তাতেই দোষ,কিছুই করবো না যাও"নিজের মধ্যে প্রমিস করে মুখ ঘুরিয়ে নিলো আবির।


বাড়িতে ঠায় বসে থেকে সে বেশ বুঝছে সাইক্লোন ঝাঁজে প্রেম অস্তমিত ,বাড়ছে ব্যবধান। রাতে চুপিচুপি শুতে এসে জ্ঞানপাপী হয়ে রোজই প্রমিস ,"এত রাত জাগব না প্রায় আড়াইটে বাজল"! ঘুমিয়েও রাগ পুষে অদিতি পাশ ফিরলেও নিজেকে এত অনিয়ম করায় দোষী দোষী লাগে আবার ক্লান্ত শরীর ব্যবধান ঘোচায় আঁধারে। ভোরে নরম হাসির সূর্য বেলা বাড়তে রাগের তেজে আবির্ভূত।



লেখক পরিচিতি - বর্ধমান শহর নিবাসী রাণা চ্যাটার্জী সারল্য ও প্রতিভার মেল বন্ধনে এবং সাহিত্যের প্রতি অকুন্ঠ ভালোবাসায় সৃষ্টি করে চলেছেন একের পর এক কবিতা,মুক্তগদ্য,গল্প,নিবন্ধ ছড়া যা পাঠকদের বারে বারে মুগ্ধ করেছে। চাকরি, নিত্য রেল সফরে ভাবুক মন আঁকি বুঁকি কাটে কল্পনার ক্যানভাসে। এ যাবৎ প্রায় শতাধিক কবিতা,অর্ধ শতক গল্প ও খান কুড়ি নিবন্ধ তার ঝুলিতে। যুক্ত হয়েছেন টাইমস গ্রুপের "এই সময় " দৈনিক সহ, সেরা শিশু পত্রিকা "কিশোর ভারতী"র সঙ্গে। কবিতা প্রকাশিত হয়েছে নতুন কৃত্তিবাসে সহ দেশ বিদেশের নানা পত্রিকা ব্লগে। তার অন্যতম একক সংকলন,"মেঘ বালিকা তোমায়", "নাভিপদ্ম","এক মুঠো মেঘ নিয়ে এসো", "কস্তুরী মৃগ" উল্লেখ যোগ্য।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮