• জনৈক সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা

গল্প - আমি হতে পারিনি আকাশ

ঋণ স্বীকার : 'মনিহার' ছায়াছবির গান (কথা - মুকুল দত্ত, হেমন্ত মুখার্জির সুরারোপিত এবং কণ্ঠে)




(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)


শেখরের বন্ধু নিলয়ের নিজের দাদা শ্রী তমাল মুখার্জী হলেন আলিপুর জাজ কোর্টের নাম করা অ্যাডভোকেট। ভাইয়ের বাল্যবন্ধু হিসেবে শেখরেরও বেশ সমাদর ছিল ওনাদের বাড়িতে। তমালবাবুর ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে ওনাদের বাড়িতে একদিন সেলিব্রেশন হলো। বলা বাহুল্য, শেখরেরও নেমন্তন্ন ছিল। কত যে নতুন ধরনের সুস্বাদু পদ আর কি আন্তরিক আতিথেয়তা। একেবারে পূর্ণতৃপ্তি । ফেরার আগে ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামীজী’ বইখানা অ্যাডভোকেট সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে যখন শেখার ওনাকে প্রণাম করল, তখন তিনি শেখরের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন

"আমি জানি, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিষয়ে তোমার খুব আগ্রহ, খুব শ্রদ্ধা । আমাদের আলিপুর জাজ কোর্টে বিপ্লবীদের চিঠিপত্র, গানের খাতা, ব্যবহার করা জিনিস ইত্যাদি যেগুলো ইংরেজ আমলে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেগুলোর সঙ্গে নানা অপ্রকাশিত ডকুমেন্ট সাজিয়ে একটা মিউজিয়াম গড়া হয়েছে । দেখলে খুব আনন্দ পাবে । সময় সুযোগ হলে, নিলয়ের সঙ্গে গিয়ে একদিন দেখে এস।"

অত্যন্ত খুশি হয়ে শেখর বলল " আমি নিশ্চই যাব বড়দা ।"

মাসখানেক পরে সত্যিই সুযোগ হলো । শেখর সম্প্রতি ‘ফেডারেল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স’ - এর কলকাতার এসপ্ল্যানেড ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে এসেছে । আর নিলয় এখন ‘উজ্জীবন ব্যাঙ্কের’ চৌরঙ্গী ব্রাঞ্চে পোস্টেড । সর্বভারতীয় ভাবে ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের ইউনিয়ন গুলো এবং অফিসারদের সংগঠনগুলো যৌথভাবে একদিন ধর্মঘট ডাকলো । ঐদিন সুযোগ পেয়ে দুই বন্ধুতে গেলো আলিপুর জাজ কোর্টে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মানার্থে গড়ে তোলা মিউজিয়াম দেখতে । মিউজিয়ামে উপস্থিত হয়ে আর তার সুবিন্যস্ত সংগ্রহশালা দেখে দুই বন্ধু অভিভূত । নিলয় খালি হাতেই গেছিলো । শেখর কিন্তু সঙ্গে নিয়ে গেছিলো ডায়েরি আর পেন । ঐদিন ভিসিটরদের ভিড় ছিলোনা বলে মিউজিয়ামের কিছু কর্মী অনেক পুরোনো এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টগুলোকে ডিজিটাইস করছিলেন । শেখরের মন ভরে গেছিলো । গ্লাস কেসে মেলে ধরা বিপ্লবীদের খাতার পাতা , চিঠিপত্র ইত্যাদি ও তন্ময় হয়ে দেখছিলো আর নোটস নিচ্ছিল ডায়রিতে । হঠাৎ একটা বিবর্ণ চিঠির পাতায় শেখরের চোখ পড়লো ।

সেখানে একজন বিপ্লবী তাঁর সহধর্মিনীকে লিখছেন “আমাদের সংগ্রাম শুধুমাত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে নয় । আমাদের সমাজের মধ্যে যেসব অসৎ , অত্যাচারী, অর্থলোভী , ক্ষমতাশালী ও কুচক্রী শয়তানেরা দেশের দুর্বল , গরিব আর বিপন্ন মানুষদের শোষণ করছে আর ক্রমাগত পায়ে ঠেলছে , তাদের বিরুদ্ধেও আমাদের লড়াই জারি থাকবে । তোমরা মেয়েরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে, সব প্রতিবন্ধকতা পায়ে ঠেলে এগিয়ে এস । সেই লড়াইতে তোমাদেরও সামিল হতে হবে । বন্দেমাতরম।“

সেই চিঠি পড়ে শেখর মনে মনে বলে উঠলো “হে বিপ্লবী বীর , আপনারা যে দেশ গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনের সংগ্রামে নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন , সেই স্বপ্নকে আমরা আজও সাকার করতে পারিনি । কোনোদিন পারবো বলেও মনে হয়না । আমাদের ক্ষমা করুন।“


বেদনা-দীর্ণ হৃদয়ে শেখর চোখের জল সম্বরণ করলো । ডায়েরি বন্ধ করে দিলো । এর আগে শেখর বছর খানেকের জন্য সালানপুর কোলিয়ারী ব্রাঞ্চে ডেপুটি ম্যানেজারের পোস্টে নিযুক্ত ছিল । সেখানে চাকরি করার অভিজ্ঞতা আর বিহারের সীমান্ত ঘেঁষা বাংলার এক টুকরো ছবি তার মনের পর্দায় ভেসে উঠলো । মিউজিয়ামে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলনা । ‘ভিসিটর্স বুকে’ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন লিপিবদ্ধ করে নিলয়কে নিয়ে বেরিয়ে এলো ।

“আঁধারেরও আছে ভাষা ,

সেও কাঁদে সেও হাসে ।

তারও বুকে আছে তৃষা ,

সেও যেন ভালবাসে”

‘বিভাস’ ছায়াছবির গান (কথা - গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, হেমন্ত মুখার্জির সুরারোপিত এবং কণ্ঠে)



সময়কাল ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাস। ব্যাঙ্কের অফিসারদের ট্রান্সফার পোস্টিং পলিসি অনুযায়ী শেখর নন-সি -সি- এ এলাকার গ্রামীণ শাখার দায়িত্ব পালনের জন্য ওই ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে এসেছিলো কলকাতা থেকে । কলকাতায় বেড়ে ওঠা একটি ছেলে হিসেবে শেখরের কাছে প্রথম দর্শনে বি-সি-সি-এল (ভারত কোকিং কোল লি: )এর সালানপুর কোলিয়ারীর পরিবেশ সাংঘাতিক রকমের বেদনাদায়ক মনে হয়েছিল । সেখানকার রুক্ষ শুষ্ক কয়লার ধুলো মাখা পরিবেশ, কোলিয়ারীর মানুষদের চালচলন , কথাবার্তা , চোখ -মুখের চাউনি সব দুর্বিষহ লাগছিলো । প্রথমদিন ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর যখন ট্রান্সফার অর্ডারটা ওনার হাতে তুলে দিলো, তখন তিনি হ্যান্ডশেক করে শেখরকে স্বাগতম জানালেন । তারপর ব্যাঙ্কের অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে শেখরের নাম এন্ট্রি করলেন শ্রী শেখর নস্কর , ডেপুটি ম্যানেজার । যখন বললেন সই করতে , তখন শেখর একটু মনমরা হয়ে থমকে গেলো। তাই দেখে ম্যানেজার বললেন "কি ভাই, কি ভাবছেন ? এই পরিবেশে তিন বছর কাজ করব কি করে ? তাই তো ? ওরকম আমাদেরও মনে হয়েছিল । তারপর আস্তে আস্তে সব সয়ে গেলো । এই করে আমিই তো দু বছর কাটিয়ে দিলাম । আমি যতক্ষণ আছি , কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না । সব সয়ে যাবে। নিন , সই করুন । " শেখর একটু ভরসা পেলো, সই করলো



বেশ মনে আছে, জয়েনিং ডেটটা পড়েছিল বুধবারে। সপ্তাহের ওই দিনটা সেই সময়কার নিয়মানুসারে রুরাল ব্রাঞ্চ এর জন্য নির্দিষ্ট ‘নন পাবলিক, বিসনেস ডে’ কিন্তু ব্যাঙ্কের জন্য ‘ওয়ার্কিং ডে’। তাই ম্যানেজারের পক্ষে সুবিধে হল শেখরকে সব স্টাফ ও সাব - স্টাফের সঙ্গে পরিচয় করানোর, সব ঘুরিয়ে দেখানোর ও বোঝানোর। তিনি দেখালেন , গোটা দোতলা বাড়িটাই কোলিয়ারির সম্পত্তি । তারই দোতলার একদিকে ব্যাঙ্ক -ব্রাঞ্চ আর একদিকে ব্যাঙ্কের স্টাফ - অফিসারদের যৌথভাবে থাকার জন্য ফ্রি -কোয়ার্টার । বাড়িটার একতলা দুভাগে বিভক্ত । একদিকে কোলিয়ারীর ম্যানেজারের কোয়ার্টার , আর একদিকে কোলিয়ারীর হেলথ সেন্টার । একতলার এই দুই ভাগের মধ্যবর্তী পাঁচিল ঘেরা একটি প্যাসেজ চলে গেছে ব্যাঙ্কের প্রবেশ পথে । কোলাপ্সিবল গেট পার হলেই সিঁড়ি । সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠে ডানদিকে গেলে ব্যাঙ্ক , বাঁদিকে গেলে সেই ফ্রি কোয়ার্টার । দোতালার ছাদের দুই প্রান্তে কংক্রিট -এর তৈরি ওয়াটার ট্যাঙ্ক, বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের সাহায্যে জল তুলে নেওয়া হয় প্রয়োজনমত।


ফ্রি -কোয়ার্টার এর অন্য সব ব্যবস্থাই মোটামুটি বাসোপযোগী । তবে ট্যাঙ্ক ভর্তি হয় কোলিয়ারীর খাদানের জলে , যেটি হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা । দোতালার বারান্দা থেকে ম্যানেজার দেখালেন উল্টোদিকে মাত্রা তিনশো মিটার দূরে থেকেই শুরু হয়েছে ওপেন কাস্ট কোলিয়ারী ।


দুপুর পৌনে একটার সময় শেখর শুনতে পেলো পুরো কোলিয়ারী চত্বর জুড়ে কয়েকজন মিলে হুইসিল বাজিয়ে চলেছে । কারণ জিজ্ঞাসা করাতে ম্যানেজার বললেন " এবার ডিনামাইট চার্জ করে ব্লাস্টিং হবে মাটির ওপর দিককার স্তরের পাথর ফাটিয়ে কয়লা বার করার জন্য । তাই সকলকে সতর্ক করা হচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে সাড়ে যাওয়ার জন্য । " যখন ব্লাস্টিং হল , তখন শেখর দেখলো যে ব্যাঙ্ক -বিল্ডিংটা কেঁপে কেঁপে উঠলো বারে বারে, ঠিক যেমনটা ভূমিকম্পের সময় হয় । যখনই ব্লাস্টিং, তখনি কাঁপুনি। এইরকমটাই চলে আসছে।


খানিক পর থেকে শেখর টের পেল পাথুরে এলাকার ঠাণ্ডার কামড় । ব্যাঙ্কের ক্যান্টিনে সকলের জন্যই রান্না হয়েছিল । বেলা দুটোর পর সকালে মিলে লাঞ্চ করল । তারপর হালকা গল্প গুজব । অন্যান্য স্টাফেরা শেখরকে বলল, কেমন করে তারা এই পরিবেশে মন বসিয়েছে ।


বেলা তিনটের পর ঘণ্টি বাজিয়ে কোলিয়ারী চত্বরে এসে হাজির হল কোলিয়ারীর ওয়াটার -স্প্রিংকলার -কার। চত্বরের অন্যান্য সমস্ত কোয়ার্টার থেকে লোকজন বালতি, হাঁড়ি, গামলা নিয়ে বেরিয়ে এলো স্প্রিংকলার থেকে পানীয় জল তুলে নিয়ে যাবার জন্য । ব্যাঙ্কে পানীয় জল জোগান দেওয়ার জন্য কিন্তু ঐ জল - সরবরাহ কাজে নিযুক্ত দুটি কর্মচারী বড় বড় দুটি বালতি ভর্তি জল নিয়ে দোতালায় এসে হাজির হল । শেখর সেই জল এক গ্লাস খেয়ে দেখলো , কি সুস্বাদু আর কর্পূরের গন্ধ যুক্ত। এইবার শেখর চাক্ষুষ করলো যে এখানে ব্যাঙ্ক এবং ব্যাঙ্কের স্টাফ -অফিসারদের খাতিরই আলাদা ।


ব্যাঙ্কে অফিসার দুজন , ম্যানেজার আর ডেপুটি ম্যানেজার । স্টাফ দুজন , ক্যাশিয়ার, গোবিন্দ দাস আর একজন জেনারেল ক্লার্ক সমীর সাহা। এছাড়া দপ্তরী গোপাল দেবনাথ, আর একজন পার্ট টাইম সুইপার অসীম সাহা, সেই আবার ক্যান্টিন বয় । গোবিন্দ সীতারামপুরে একটি ছোট ফ্লাট ভাড়া করে সস্ত্রীক থাকে । এদের প্রত্যেকের সঙ্গেই কোলিয়ারী এলাকার প্রতিটি লোকের বিশেষ আলাপ আছে ।


বিকেল পাঁচটার সময় সমীর তার নতুন ডেপুটি ম্যানেজার কে নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে পুরো কোলিয়ারী চত্বরটা ঘুরে ঘুরে দেখালো যে এটা সি-আই-এস-এফ এর নজরদারিতে আছে । এলাকাটার বাইরে একদিকে পাহাড়ি পথ যেটা কখনও উঁচু কখনও নিচু হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার জনমানবশূন্য পথ পেরিয়ে চলে গেছে সালানপুর বাজারের দিকে। কোলিয়ারীর আর একদিকে বিস্তীর্ণ পাথুরে জমির ওপর জঙ্গল, যার মধ্যে দিয়ে ভাঙা-চোরা উৎরাই চড়াই, ঝর্ণা আর ছড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু ঝাঁঝালো গন্ধের বনতুলসীর অজস্র ঝোপ। বনতুলসীর পাতা কুল পাতার মাতা দেখতে। এই প্রথম শেখর জানল যে বনতুলসীর ঝোপ হচ্ছে কোলিয়ারীর নিশানা । সেসব অতিক্রম করে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পায়ে চলা পথ পেরিয়ে সীতারামপুর স্টেশন পৌঁছানো যায়।


এই স্টেশন থেকে গাড়ি অথবা অটোয় কোলিয়ারী আস্তে গেলে সালানপুর বাজার পর হয়ে ঐ পাহাড়ি জনমানব শূন্য পথের মধ্যে দিয়েই আস্তে হয় । কোলিয়ারী এলাকাটা তাই সবদিক দিয়েই একটা ঘেরাটোপের মধ্যে। আর এই ঘেরাটোপের মধ্যে ব্যাঙ্ক বিল্ডিং বাদে আর রয়েছে তিনটে তিনতলা ফ্লাট বাড়ী, যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ার এবং অফিসারদের কোয়ার্টার । এ ভিন্ন আছে পৃথক পৃথক একতলা বাড়িতে কোলিয়ারীর স্টাফেদের কোয়ার্টার । একদিকে মজুরদের কোয়ার্টার। সি-আই-এস-এফের ক্যাম্পের কাছে রয়েছে কোলিয়ারীর বিরাট দোতলা অফিস বিল্ডিং । এই এত বিল্ডিং-এর মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে গজিয়ে উঠেছে তিনটে বড় বড় মুদির দোকান । এইসব দোকান থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসই পাওয়া যায় , যার জোগান আসে সালানপুর বাজার থেকে গরুর গাড়িতে বোঝাই করে ।


এত কিছু দেখাশোনা করতে গিয়ে শেখর আর সমীরের অনেকটাই সময় লেগে গেলো । সন্ধ্যা নেমে এসেছে , শীত জাঁকিয়ে পড়েছে । তাই সবাই ফিরে এলো ব্যাঙ্কের কোয়ার্টারে । মুড়ি-বাদামের সঙ্গে গরম চা দিয়ে হলো সান্ধ্য জলযোগ । বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে শেখর জানতে পারলো যে ব্যাঙ্কের এই ক্যান্টিনটা আসলে কমন মেসের ক্যান্টিন । ব্যাঙ্কের থেকে সাবসিডি সামান্য যেটুকু পাওয়া যায়, তাই দিয়ে অবশ্য কিছুটা সাশ্রয় হয় ।


রাত্রি সাড়ে-নটার পর সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলো । তারপর ম্যানেজার বললেন "আমি যে ঘরে থাকি , সে ঘরে আর একটি চৌকি আছে । তার ওপর আপনার বেডিং পেতে শুয়ে পড়ুন ।" শীতের রাত, সকলেই যে যার শয্যায় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

পরেরদিন সকালবেলা তৈরি হয়ে ম্যানেজার এবং তাঁর নতুন ডেপুটি শেখর নস্কর সকল নটার সময় ব্যাঙ্কের অফিস এ এসে উপস্থিত হলেন । শেখর ম্যানেজারের কাছ থেকে তার দায়িত্ব বুঝে নিলো । ঠিক দশটায় ব্যাঙ্কের লেনদেন এবং কাস্টমার সার্ভিস পুরোদস্তুর চালু হয়ে গেলো।

এমনি করে দিনের পর দিন চাকরি করতে করতে শেখর বুঝে নিলো ব্যাঙ্কের কাস্টমার কম্পোজিশন, তাদের চাহিদা, তাদের পছন্দ-অপছন্দ , লেনদেনের ধরণ । শেখর দেখলো যে ব্রাঞ্চের কাস্টমারদের অধিকাংশই অশিক্ষিত , টিপ-ছাপ দিয়ে টাকা পয়সা জমা-তোলা করে । সেসব লেনদেনের নির্দিষ্ট ফর্ম তাদের হয়ে শেখরকেই নিজের হস্তাক্ষরে পূরণ করে দিতে হয় । গোড়ার দিকে শেখরের মনে হত এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হয়ে যাচ্ছে । দায়িত্ব যে কোনো সময় নিজের ঘাড়ে চলে আসবে । শেখর দেখলো যে ম্যানেজার এবং অন্যান্য স্টাফ ব্যাপারগুলো সহজ ভাবেই নিচ্ছেন । “অতয়েব যস্মিন দেশে যদাচার” । শেখর দেখলো যে খুব কম সংখ্যক কাস্টমার চেক কেটে লেনদেন করেন । আর কোলিয়ারীর মজুরদের মধ্যে যারা উইথড্রয়াল স্লিপ সই করে টাকা তোলে, তাদের আবার গর্বের শেষ নেই । যারা সই করতে পারেনা তাদেরকে ওরা তাচ্ছিল্য জ্ঞান করে।


আবার কিছু প্রতাপশালী কাস্টমার আছে, যারা কিছুটা লিখতে পড়তে পারে । তারা আসে সীতারামপুর , কুলটি থেকে । তারা হঠাৎ হঠাৎ এসে লক্ষ লক্ষ টাকা জমা করে বি-সি-সি-এল এর ফেভারে ডিমান্ড ড্রাফট পারচেজ করে নিয়ে যায় কয়লার বরাত ধরবার জন্য । সেই টেন্ডার যদি কপালে লেগে গেলো তো ভালো, নয়তো যদি বি-সি-সি-এল সেই ডিমান্ড ড্রাফট না গ্রহণ করে ফিরিয়ে দেয় তবে ড্রাফট নিয়ে তৎক্ষণাৎ ব্যাঙ্কে ছুটে আসে। দাবি করে অবিলম্বে সেই ডিমান্ড ড্রাফট ক্যানসেল করে তার টাকা পারচেজারের একাউন্টে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য । এসবের জন্য ব্যাঙ্কের কাছে প্রয়োজনীয় ইনডেমনিটি বন্ড আগে সাবমিট করতে বললে খুব বিরক্তি প্রকাশ করে বেশ রুক্ষ ভাবে । যাই হোক, দিনে দিনে শেখর এই সব কাস্টমারদের কাছে 'নস্করবাবু' নাম পরিচিত হয়ে উঠলো ।


এইভাবে দিনের পর দিন গড়িয়ে যেতে লাগলো । সোমবার সকালবেলা ব্যাঙ্কে উপস্থিত হওয়া, সন্ধ্যে পর্যন্ত কাজ নিয়ে থাকা। সব কাজই খাতায় কলমে করা । কারণ তখন কম্পিউটার, কোর ব্যাংকিং সলিউশন, এ-টি-এম কার্ড এসব ভবিষ্যতের গর্ভে । তারপর সপ্তাহান্তে শনিবার দুপুর দুটোর মধ্যে ব্যাঙ্কের কাজ সেরে চাবি -তালা দিয়ে বিকেলের মধ্যে রওনা দিয়ে ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া, তারপর বাড়ী। এইভাবে ট্রেনে আসা যাওয়ার সময় দুজন সহযাত্রীর কথাবার্তা শেখর শুনেছিলো । একজন প্রশ্ন করলেন "ইয়ে সীতারামপুর কৌন্সি মুলক হ্যাঁয়?"

" মুলক তো হ্যাঁয় বঙ্গাল কা , লেকিন মহল যো হ্যাঁয় ও বিহার জ্যায়সি ।"


এবারে একবার ম্যানেজারবাবু ছুটি নিলেন এক সপ্তাহের জন্য । ব্রাঞ্চের পূর্ণ দায়িত্ব পড়ল শেখরের ওপর । এরকম সময় একদিন সীতারামপুর থানা থেকে এক সিনিয়র পুলিশ-অফিসার ব্রাঞ্চে এসে উপস্থিত হলেন। খোঁজখবর নিলেন কোনোরকম অসুবিধা হচ্ছে কি না । কোনো বিপদের সম্ভাবনা নেই জেনে স্বস্তি প্রকাশ করলেন । ইতিমধ্যে শেখর পুলিশ অফিসারটিকে যথোচিত আপ্যায়ন করল এবং ব্যাঙ্কের ভিসিট বুকটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিল । ভিসিট বুকে প্রয়োজনীয় লেখালেখি করে তিনি সেটি আবার শেখরকে ফিরিয়ে দিলেন । তারপর বললেন "শেখরবাবু , আপনাদের এই ব্রাঞ্চটা এমন অবস্কিউওর জায়গায় যে আমাদের তাই নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় । খুব সতর্ক হয়ে থাকবেন , কোনো বিপদের আশঙ্কা বুঝলেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন । আশপাশের রিপোর্ট মোটে ভালো নয় । " পুলিশ অফিসার চলে যাওয়ার পর শেখর চিন্তা করে দেখলো যে আমাদের ব্রাঞ্চটা সত্যিই এমন এক জায়গায় লোকেটেড, যে ব্যাঙ্কের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী বা নেতা আমাদের খবর নিতে আসেন না।




রঘুপতি । " তবে এস বৎস , আর - এক শিক্ষা দিই ।

পাপপুণ্য কিছু নাই । কে বা ভ্রাতা , কে বা

আত্মপর ! কে বলিল হত্যাকাণ্ড পাপ !

এ জগৎ মহা হত্যাশালা । জানো না কি

প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষকোটি প্রাণী

চির - আঁখি মুদিতেছে ! সে কাহার খেলা ?

হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি ।

প্রতিপদে চরণে দলিত শত কীট

তাহারা কি জীব নহে ?"


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ' বিসর্জন ' নাটক থেকে উদ্ধৃত ।



ছুটি ফুরিয়ে যাওয়ার পর, পরের সপ্তাহে সোমবার ম্যানেজার কাজে যোগদান করলেন । তার পরের দিন মঙ্গলবার রেজিস্টার্ড পোস্টে ধানবাদ থেকে ' কোল মাইনস প্রভিডেন্ট ফান্ড' - এর একটা লম্বা খাম এলো । খাম খুলে ম্যানেজার দেখলেন যে একটি ফরওয়ার্ডিং লেটার এর সঙ্গে ব্রাঞ্চের এক কাস্টমারের নামে ইস্যু হওয়া প্রায় দেড় লক্ষ টাকার একটি একাউন্ট পেয়ী চেক রয়েছে । ফরওয়ার্ডিং লেটারে স্পষ্টভাবে নির্দেশ লেখা আছে , কার অ্যাকাউন্টে এবং কত নম্বর অ্যাকাউন্টে চেকটির টাকা জমা করতে হবে । এরপর তিনি শেখরকে নির্দেশ দিলেন যে চেকটি যেন তাড়াতাড়ি ব্যাঙ্কের বরাকর ব্রাঞ্চের মাধ্যমে কালেক্ট করা হয় এবং টাকাটা যেন প্রাপকের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয় । কাজটা সম্পূর্ণ হাতে তিনদিন সময় লাগলো ।


অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পরার পর একদিন ঐ প্রাপক ব্রাঞ্চে এলো টাকা তুলতে । টাকা পাওয়ার পর কাস্টমারটি ব্রাঞ্চ থেকে যথারীতি বেরিয়ে গেলো । তখন বেলা একটা বাজে । খানিক পরে শেখরের কানে এলো কে যেন বাইরে রাস্তার দিক থেকে চিৎকার করে কাঁদছে । ব্যাপারটার কারণ জানবার জন্য শেখর কৌতূহলী হয়ে উঠলো । চট করে নিজের সিট ছেড়ে উঠে শেখর ম্যানেজারের ঘরের কাছে এসে দেখলো যে ওনার ঘরে চারজন অ্যাকাউন্ট হোল্ডার বসে রয়েছে, লোনের অনেক ডকুমেন্টে সই সাবুদ চলছে । এই সিচুয়েশানে বাইরের কোনো ব্যক্তির কান্নাকাটির প্রসঙ্গ অবতারণা করা ঠিক হবেনা , এরকম চিন্তা করে শেখর পিছিয়ে এলো । তখন লেজার কাউন্টারে সমীর কাজ করছিলো । শেখর সমীরকে চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলো "বাইরে একজন হা -হুতাশ করে কাঁদছে শুনেছেন ? কে কাঁদছে ? কেনই বা কাঁদছে ? "

সমীর বলল "কাস্টমাররা চলে গেলে , টিফিন আওয়ারে আপনাকে সব বলব । "


টিফিন আওয়ারে আর সবাই যখন কোয়ার্টারে এসে উপস্থিত হয়েছে তখন সমীর বলল " শেখরদা , যে মাঝ বয়সী লোকটা একটু আগে টাকা তুলে নিচে নেমে গেলো , সেই কাঁদছিলো । ঐ লোকটার কাছ থেকে সুদখোর গুলোর চড়া সুদ সমেত প্রচুর প্রাপ্য হয়েছিল । সেই টাকা কেড়ে নিচ্ছিলো । কারণ এরপর দেনাদার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে । রিটায়ারমেন্ট হয়ে গেছে , তাই মজুরগুলো যে যার নিজের দেশে গ্রামে ফিরে যাবে ।"

"তাই বলে রাস্তায় ধরে এইভাবে টাকা কেড়ে নেবে ?"

"আসলে এসবের পেছনে একটা শয়তানের চক্র কাজ করে । আপনাকে সেদিন যে মুদিখানা গুলো দেখালাম, ওরাই ফাঁদ পাতে । মজুরগুলোকে মুদির দোকান থেকে লাগাতার ভাবে চাল -ডাল-তেল -মশলা ইত্যাদি যাবতীয় জিনিস ধরে বিক্রি করে যায় । তার সঙ্গে মদের নেশা ধরিয়ে মজুরগুলোর বিচার বুদ্ধি একেবারে শেষ করে দেয় । এমনি করে মুদিরা এবং সুদখোরগুলো যখন দেখে যে সুদে -মূলে ধারের অঙ্ক বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে , তখন লোক লাগিয়ে ওই মজুরগুলোকে বাধ্য করে ভলান্টারী রিটায়ারমেন্ট এর জন্য অ্যাপ্লাই করতে । এদিকে তো বি-সি-সি-এল পুরানো কর্মীদের ভি-আর-এস দিতে দারুণ আগ্রহী । আর ভি-আর -এস দেওয়া হয়ে গেলেই সেই অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর প্রাপ্য প্রভিডেন্ট-ফান্ডের টাকা তার ব্যাংকারের কাছে চেক মারফত পাঠিয়ে দেয় । তারপর কি কি হয় , তা তো আজ নিজেই দেখতে পেলেন।"

"তা বলে এতো বড় অন্যায়ের কোনো বিহিত হবেনা ? এতো ডাকাতি , পুলিশে খবর দেওয়া উচিত। " "এরকম কত অন্যায় অত্যাচার দিনের পার দিন হচ্ছে জানেন কোলিয়ারীতে ? মজুরদের মাস মাইনের টাকা এখানে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়, তাই মার যায় না । কিন্তু ওদের ওভারটাইম ডিউটির দরুন প্রাপ্য টাকার পেমেন্ট আর অন্যান্য খুচরো পেমেন্ট হয় কোলিয়ারী অফিস থেকে । সেখানে ক্যাশিয়ারের কাউন্টারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পেমেন্ট নিতে হয় । মনে করুন কোনো মজুরের প্রাপ্য হয়েছে ৬১৭ টাকা , ক্যাশিয়ার তাকে মাত্র ৬০০ টাকা ঠেকিয়ে ছেড়ে দেবে । বাকি ১৭ টাকা দাবি করলে বলবে যা যা:, খুল্লা নহি হ্যাঁয়। এখানে এরকমটাই দস্তুর ।" শেখরের চোখ মুখ দিয়ে রাগ ফেটে পড়ছে দেখে সমীর একটু থামলো ।


খানিক পরে সে আবার বলল "এখানকার অধিকাংশ মানুষই কোরাপ্ট । কিন্তু তাদের লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন আর যাবতীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের দেখভাল আমরা করি, প্রয়োজনে সাহায্য করি ব্যাঙ্ক কর্মী হিসেবে। সেই কারণে ব্যাঙ্কের সকলের ওপর এখানকার মানুষদের অগাধ বিশ্বাস আর ভরসা । তাই এরা আমাদের খুব খাতির করে ।"


সীতারামপুর স্টেশন থেকে সালানপুর আসা যাওয়ার পথে শেখর দেখেছে এখানকার মানুষজন কেমনভাবে পুকুরঘাটে ডাঙ্গস পিটিয়ে কাপড় কাচে । সমীরের কথাগুলো সোনার পর শেখরের মনে হলো ওর বুকের ওপর কে যেন ডাঙ্গস পেটাচ্ছে । এখানকার পরিবেশের সঙ্গে প্রতিদিন অ্যাডজাস্ট করে চলা যে কি দুর্বিষহ ব্যাপার হবে , তা ভেবে শেখর ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়ল। টিফিন আওয়ারে ভাল করে খেতেই পারলো না। ব্রাঞ্চে ফিরে যেতে ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করলেন "কি হলো শেখরবাবু , চোখ - মুখ এতো থমথমে কেন ? টিফিন করেছেন তো ?" জবাবে শেখার বলল " হ্যাঁ , তবে আপনার তো এখনো খাওয়া হয় নি ?" ম্যানেজার মৃদু হাসলেন " এইবার হবে ।"


সেদিন ব্যাঙ্কের আর সব কাজ যথারীতি শেষ হলো । বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় সমীরকে সঙ্গে নিয়ে শেখর একটু বাইরে ঘুরতে বেরোলো । চারপাশের খোলামেলা জায়গা, মাঠ, দিগন্তে সূর্যাস্তের বর্ণময়তা দেখে শেখরের মন একটু হালকা হলো । একটা চায়ের দোকানে গিয়ে দুজনে একটু চা খেলো । তারপর সন্ধ্যা নামতে ব্যাঙ্কের কোয়ার্টারে ফিরে এলো । এই ব্রাঞ্চে খবরের কাগজের ডেলিভারি দেয় বিকেলবেলা । খবরের কাগজ পড়ে ঘণ্টাখানেক সময় কাটলো । এখানে কোনো টিভি নেই , ট্রানজিস্টার ও নেই । বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র বলতে ঐ এক খবরের কাগজ ।


অবসর সময় কাটানো বলতে গল্পগুজব করা আর শুয়ে বসে থাকা । রাত্রি সাড়ে নটা বাজতে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া সেড়ে শুয়ে পড়া।


সালানপুর কোলিয়ারী ব্রাঞ্চের দিনগুলো শেখরের এইভাবে গতানুগতিক ভাবে কাটতে লাগলো । তবে গতানুগতিকতা কাটানোর জন্য গোবিন্দ, সমীর, গোপাল, অসীমরা বিকেলের দিকে স্ট্রং রুমে ক্যাশ উঠিয়ে দেওয়ার পর নিজেদের মধ্যে হাসি ঠাট্টা করে, নানারকম ক্যারিকেচার করে । এসব ব্যাপারে গোবিন্দ আর গোপাল বিশেষ পারদর্শী। এখানকার মদন মুদি কেমন ‘অমানুষ’ সিনেমার অভিনেতা উৎপল দত্তের স্টাইলএ বেঁকে বেঁকে হাঁটে , ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ সিনেমায় ভোলা ময়রার চরিত্রে অসিতবরণ কেমন ভুঁড়ি দুলিয়ে নেচেছিলেন সেই ‘বর্ষাকালে ব্যাঙ ডাকিলে রাধার পোয়া বারো’ এই গানটার সঙ্গে, কয়লার ডাম্পারএর ড্রাইভার শিখ-পাঞ্জাবি গর্জন সিং কিরকম বাজখাঁই গলায় কথা বলে আর উচ্চকিত হাসে, সেসব নিখুঁত ভাবে ওরা নকল করে দেখায় । ম্যানেজারবাবুও এইসব হাসি মজায় ‘অম্বলে সম্বরা’ দেন। তাই দেখে শেখরও একদিন বুঝলো, যে এখানে গোমড়া মুখো হয়ে থাকলে বাঁচা যাবে না। পরিবেশের কারণে মনের ওপর যে চাপ, মস্তিষ্কের যে ভার, নিদেনপক্ষে সেগুলো কাটাতেই হবে । তা না পারলে মেন্টাল অ্যালার্টনেস নষ্ট হবে, ব্যাঙ্কের কাজ কর্মে ভুল ভ্রান্তি ঘটিয়ে অযথা বিপদ ডেকে আনা হবে। শেখরও তাই ধীরে ধীরে নিজের অভিমান ও উন্নাসিকতা কাটানোর চেষ্টা শুরু করল ।

এইভাবে এক-দু মাস কাটার পর আবার সি-এম-পি-এফ থেকে একটা চেক এলো প্রায় দু-লক্ষ টাকার। যথারীতি সেই চেকের কালেকশন, বেনিফিশিয়ারির অ্যাকাউন্টে জমা পড়া, তারপর অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের টাকা তোলা। তারপর ব্যাঙ্কের বাইরে রাস্তায় পা রাখা মাত্র সুদখোর মুদির চেলা-চামুণ্ডার খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া । সেকথা জানাজানি হতে শেখর খুবই বিচলিত হয়ে পড়ল । শেখর একবার গোবিন্দকে বলল “আপনি তো এই কোলিয়ারী এলাকার বাইরে সালানপুরে থাকেন, আমাদের মতো বন্দিজীবন নয় আপনার। অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপও হয়েছে নিশ্চই আপনার এতদিনে । এইসব সুদখোর আর তাদের পেটোয়া অত্যাচারী গুণ্ডাগুলোর এগেইনস্টএ পুলিশে বলে কোনো অ্যাকশন নেওয়া যায় না?”


উত্তরে গোবিন্দ বলল “একদিন বিকেলবেলা ছুটির পর বাড়ী ফেরার সময় আমাকে তেজেন্দ্র সিং তার স্কুটারের পেছনে বসিয়ে নিয়ে গেলো । আপনি নিশ্চই এতদিনে জানেন যে সে একজন ক্ষমতাশালী সুদখোর । ভাঙা-চোরা রাস্তার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ঝাঁকুনির চোটে পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমি তেজেন্দ্রর কোমরটা জড়িয়ে ধরেছিলাম । ওর কোমরে হাত পড়তেই আমি পরিষ্কার ফীল করলাম যে ওর কোমরে মাল সাঁটানো আছে”

“কি মাল?”

“আরে রিভলভার, রিভলভার ! অতয়েব বুঝতে পারছেন তো , নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এরা কত নিচে নামতে পারে ? পুলিশ এদের সম্বন্ধে সবকিছু জানে । সেই কারণে আমরা ওদের চটাতে যাই না ।


ঐদিন রাত্রিবেলা সাড়ে আটটার সময় ডাইনিং টেবিলে চা - জলখাবার খেতে খেতে ম্যানেজারবাবু শেখরকে বললেন “কি ব্যাপার বলুন তো ? আপনার চোখ মুখ দেখলে মনে হয় আপনি ভেতরে ভেতরে গুমড়োচ্ছেন! আমরা প্রত্যেক সোমবার সকালে সারা সপ্তাহের জন্য বাড়ী ঘর, বৌ - বাচ্চা ছেড়ে এখানে চলে আসি । মাঝখানে বাড়ির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকে না । সেই শনিবার রাত্রির আগে বাড়ির মানুষদের মুখ দেখতে পাই না । এই অবস্থায় আপনি যদি সবসময় গুমড়ে গুমড়ে থাকেন, তাহলে তো আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন! আর আমাদেরও কি সেটা দেখতে ভালো লাগে?”


উত্তরে শেখর বলল “ম্যানেজার বাবু , আপনি তো সবই জানেন । এখানকার মুদিগুলো, সুদখোরগুলো যে ভাবে অজ্ঞ - মূর্খ মজুরগুলোর ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করে, টাকাপয়সা কেড়ে নেয়, তা জেনে বুঝে খুব বিবেকের দংশন হয় । সর্বস্বান্ত হয়ে যখন মজুরগুলো চিৎকার করে কাঁদে , তা সহ্য করা যায় না । "

“এমন তো নয় , যে আমাদের ব্যাঙ্ক প্রেমিসেস এর মধ্যেই টাকা পয়সা লুঠ করে ! যা কিছু অপ্রীতিকর ঘটে , তা ব্যাঙ্ক চত্বরের বাইরে রাস্তায় ঘটে । সেটা নিয়ে তো আমাদের কোনো রেসপনসিবিলিটি থাকে না । এখানে সি-আই-এস-এফের ক্যাম্প আছে, তারা বুঝবে। এমন তো নয়, যে আমাদের ব্যাংকে এসে সুদখোরগুলো ফ্রড করছে আর আমরা চোখ বুজে বসে আছি! অতয়েব এসব ঝামেলার মধ্যে আমরা কেন নিজেদের জড়াবো?” একটু থেমে আবার বললেন “শুনুন শেখরবাবু, মানে রাখবেন আপনি এখানে চাকরি করতে এসেছেন। বিপ্লব করতে আসেননি। বাড়িতে আপনার মা কোমর ভেঙ্গে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছেন, আপনার স্ত্রী একটা দেড় বছরের ছেলে নিয়ে এক সংসার সামলাচ্ছেন । তারা আপনার মুখ চেয়ে বসে থাকেন। আর আপনি চাইছেন তো, যে আমি বিষয়টা পুলিশের কাছে ইনফর্ম করি ? আমি আপনাকে লিখে দিচ্ছি, এসব করলে ফল উল্টো হবে । এসব সুদখোরগুলো কি খতরনাক তা আপনি জানেন না । ওরা কিন্তু আপনাকে আলাদা করে চিনে রেখেছে, কারণ ওরা ব্যাংকে এসে যে সব লেনদেনের কাজ করে তা নিয়ে আপনি খুঁত খুঁত করেন । এমনিতেই কারুর সিগনেচার সামান্য ডিফার করলে আপনি অনেক আপত্তি তোলেন । সে কারণে ওরা আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘নাকশারবাবু’ বলে হাসাহাসি করে । অতয়েব জেদাজেদি ছাড়ুন । বি প্রাকটিক্যাল । এর বেশি আর বলতে চাই না”


শেখরের মনে পড়ে গেলো যে একদিন গোবিন্দ ওদের বলেছিলো “এই , তোমরা আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট বাবুকে কি বলে ডাকছো ? নক্সালবাবু না নাকশারবাবু?”

ম্যানেজার বাবু আবার বললেন “হ্যাঁ , আর একটা কথা খেয়াল রাখবেন । আপনি তো প্রায় রবিবারই দুপুরের জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেস ধরে সন্ধ্যার আগে আমাদের কোয়ার্টারে চলে আসেন এবং সেই রাতগুলো নিছক একা থাকেন।”

শেখর চুপ করে রইল । ওর কান মাথা এখন ঝাঁ ঝাঁ করছে । এদিকে কথায় কথায় রাত্রি দশটা বেজে গেছিলো । অসীম খেতে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল । তাই সবাই রাতের খাওয়া সেরে যে যার মত শুয়ে পড়ল । এত শীতের রাতেও শেখরের ঘুম আসছিলো না । মাথা গরম হয়ে গেছিলো । ওর মনে পড়ে গেলো , গত শনিবার রাতে কলকাতায় বাড়ি ফিরে যখন নিজের ঘরে ঢুকে ছেলেটাকে দেখতে গেলো , তখন ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে । ওর গায়ের ওপর একটা কাঁথা সুন্দর করে বিছানো রয়েছে । কাঁথাতে ছুঁচ সুতোর কাজে একটা সহজ সরল কবিতা লেখা রয়েছে

আকাশের মত হও উদার ,

পর্বত সম ধীর ।

বাতাসের মত হও নির্মল ,

প্রেমে সাগর সুগভীর । '

কবিতা থেকে শেখরের চোখ সরছিলো না । তা লক্ষ্য করে শেখরের স্ত্রী বলল “কি ব্যাপার? আজ যে নির্নিমেষ নয়নে ছেলেকে দেখছো এতক্ষণ ধরে?”

“হ্যাঁ , ছেলেকে তো দেখছিই । তার সঙ্গে কাঁথাটা । এটা কে তৈরি করে দিয়েছে?”

শেখরের স্ত্রী উত্তরে বলল “তোমার দিদিভাই । কেমন, সুন্দর হয়েছে না?”

“দিদিভাই এই বয়সেও এতো সুন্দর ছুঁচ সুতোর কাজ করে যাচ্ছে?”

এইসব কথা স্মরণ করতে করতে শেখরের মন ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, ঘুমিয়ে পড়লো ।



এর এক সপ্তাহ পরে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ব্যাঙ্কের হেড অফিস থেকে একটা প্রমোশন টেস্টের ইন্টারভিউ কল পেলেন । ইন্টারভিউ এর আগের দিন শেখরকে ব্রাঞ্চের চার্জ হ্যান্ড ওভার করে কলকাতায় বাড়ি চলে গেলেন । ইন্টারভিউতে ওনার পারফরমেন্স খুবই ভালো হয়েছিল । উনি দ্রুত প্রমোশন পেয়ে গেলেন এবং কলকাতার হাজরা রোড ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে গেলেন । ওনার পরিবর্তে নতুন একজন ম্যানেজারও বদলি হয়ে এলেন ব্রাঞ্চে।

জয়সিংহ । দূর হোক চিন্তাজাল! দ্বিধা দূর হোক !

চিন্তার নরক চেয়ে কার্য্য ভালো, যত

ক্রূর , যতই কঠোর হোক ।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ' বিসর্জন ' নাটক থেকে উদ্ধৃত ।


এদিকে সালানপুর কোলিয়ারী ব্রাঞ্চের দিনগুলো একইভাবে চলতে লাগলো । কিছুদিন পরে আবার একটা বড় অংকের চেক এলো সি-এম-পি-এফ, ধানবাদ থেকে। চেকের পেয়ী এবার একজন ওড়িশাবাসী মজুর। নাম নকুল বেহেরা, শেখরের মুখ চেনা । চেকটার টাকা যথারীতি কালেক্ট করা হলো এবং নকুল বেহেরার অ্যাকাউন্টে জমা করা হলো। এই ঘটনার পারে শনিবার বিকেলবেলা যখন শেখর একা সীতারামপুর স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে, তখন ঐ নকুল হঠাৎ এসে উপস্থিত হলো। আচমকা শেখরের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। শেখর শশব্যস্ত হয়ে বলল “আরে আরে, করছো কি? কি হয়েছে বলো”


নকুল তখন বলল “আমার মায়ের চিকিৎসার জন্য একবছর আগে তেজেন্দ্র সিং-এর কাছ থেকে আমি চল্লিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলাম । এছাড়া কোনো উপায় ছিল না । আমার ইচ্ছে ছিল মাঝখানে মাঝখানে কিছু কিছু জমা করে ধারটা শোধ করব। কিন্তু তা আর করতে পারিনি। এখন সেই দেনা সুদে আসলে লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তেজেন্দ্রের চেলারা আমাকে মদের নেশা ধরাবার খুব চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। তা যদি হতো, তাহলে আরো ডুবে যেতাম । এদিকে দেনার পরিমাণ খুব বেড়ে যাচ্ছে দেখে একদিন তেজেন্দ্র আমাকে ডেকে পাঠিয়ে খুব ধমকি দিলো । ভি-আর-এসের জন্য দরখাস্ত আদায় করালো। সাহেব জানেন, আমার ভি-আর-এস হয়েও গেছে। এবার ধানবাদ থেকে আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আপনাদের ব্যাংকে এসে জমা পড়ে যাবে । আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে আমাকে পরিবার নিয়ে আমাদের মতো কুলি-মজুরদের ধাওড়া ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে । এদিকে আমার কিছু টাকার খুব দরকার। আমি কিন্তু সইটা কোনোরকমে করতে পারি। আমি যদি আপনাদের ব্যাংকে টাকা তুলতে যাই, তাহলে তেজেন্দ্রর লোকেরা সুযোগ বুঝে সব লুটে নিবে। সাহেব, আমার মুণ্ড খারাপ হয়ে যাচ্ছে । আমি কি করব আপুনি বলে দিন” এই পর্যন্ত বলে লোকটা কাঁদতে শুরু করলো ।

তখন শেখর বলল “কেঁদো না, শান্ত হও। আমি যা জানতে চাইছি, আমাকে বলো। উড়িষ্যায় তোমার বাড়ি কোথায়?”

“গঞ্জামে, সাহেব”

“বেশ! গঞ্জামে আমাদের ব্যাঙ্কের একটা ব্রাঞ্চ আছে। তুমি কি সেখানে আমাদের ব্যাঙ্কটা দেখেছো কখনো?”

“হাঁ সাহেব, দেখেছি”

“এখানে আমাদের ব্রাঞ্চের পাশবইটা তোমার কাছেই আছে তো?”

“হাঁ সাহেব , আছে”

“তাহলে শোনো, এবার আমি তোমায় যা যা বলবো, আর তাই তাই যদি তুমি করে যাও, তাহলে তোমার একটা টাকাও মার যাবে না । আমার ওপর ভরসা রাখতে হবে কিন্তু । কি, রাজি তো?”

“হাঁ সাহেব , আপনাকে ছাড়া আর কাকে ভরসা করবো ? কে আছে আমার ?”

“শোনো , তোমার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গেছে”

কথাটা শুনে নকুলের কান্না ভেজা চোখে মুখে একটা বিষাদ মাখা হাসির আলতো ছোঁয়া লাগলো।

“আগামী সোমবার দিন সকালবেলা ব্যাংকে এসে তোমার পাশবইতে ঐ জমা পড়া টাকাটা শুধু লিখিয়ে নাও। দুনম্বর কথা, আমি তোমায় এখন দুশো টাকা দিচ্ছি। এর বেশি দিতে পারছি না । ওটা দিয়েই এখনকার মতো কাজ চালাও । তিননম্বর কথা, আমি চাই আমাদের ব্রাঞ্চে তোমার যে অ্যাকাউন্ট আছে, টাকা সমেত সেই অ্যাকাউন্ট আমাদের ব্যাঙ্কের গঞ্জাম ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিতে, যাতে করে তোমার নিজের জায়গায় বসে সব টাকা পেয়ে যাও । তবে কাজটা এমনভাবে করতে হবে, যাতে লোক জানাজানি না হয়। তার জন্য আমি ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে তোমার জবানিতে একটা দরখাস্তের বয়ান লিখে তোমায় এখন দিচ্ছি। তুমি সেটা নিয়ে গঞ্জামে গিয়ে সেখানে লেখা পড়া জানা কোনো লোককে দিয়ে নতুন করে লেখাবে। তারপর সেই নতুন দরখাস্তের নিচে সই করে সেটা জমা করবে আমাদের ব্যাঙ্কের গঞ্জাম ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের হাতে। তার সঙ্গে জমা করে দেবে তোমার এখানকার পাশবইটা । ওখানকার ম্যানেজার দরখাস্তটা পড়লেই বুঝতে পারবেন, কি করার দরকার। চারনম্বর কথা, এই দরখাস্ত আর পাশবই নিয়ে, তোমার পরিবারকে নিয়ে, সুযোগ পেলে সোমবার নয়তো মঙ্গলবার ভোরের আলো ফুটতেই সালানপুর কোলিয়ারী এলাকা ছেড়ে চুপি চুপি পালিয়ে যাও। তারপর যেভাবে পারো গঞ্জামে চলে যাও। আবার বলছি, আমার ওপর ভরসা রেখো। ব্যস।"

নকুল শেখরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে হাত জোড় করে চেয়ে রইলো আর তার চোখ দিয়ে জলের ধারা নামতে লাগলো ।

শেখর আবার বলল, “যা বলেছি, সব মনে থাকবে তো?” উত্তরে নকুল শুধু ঘাড় নাড়লো ।

তার খানিক পড়ে স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ালো । এক বুক আশা আর উত্তেজনা নিয়ে শেখর ট্রেনে উঠলো । বাড়ি ফিরতে হবে।

পরের সোমবার থেকে সবকিছু শেখরের পরিকল্পনা মাফিক হতে থাকলো। ঠিক সময়ে গঞ্জাম ব্রাঞ্চের চিঠি এলো ব্যাংকে। গঞ্জাম ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের অনুরোধ অনুসারে নকুলের অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করা হলো এবং অ্যাকাউন্টের যাবতীয় টাকা ব্যাঙ্কের অ্যাডভাইসের মাধ্যমে গঞ্জাম ব্রাঞ্চে রেজিস্টার্ড পোস্টে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আর তার সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হলো নকুলের অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্ম এবং স্পেসিমেন সিগনেচার কার্ড। আর পাঁচটা কাজের ভিড়ে এই কাজটাও নিঃশব্দে মিশে গেলো ।


তার পরের সপ্তাহে এন-পি-বি-ডব্লিউ- ডি তে টিফিনের সময় সকলে খেতে বসেছে । এমন সময় গোবিন্দ বলল “এখানে নকুল বেহেরা নামে একটা উড়িয়া মজুর ছিল। তেজেন্দ্র সিং-এর কাছে ওর প্রচুর ধার ছিল।“ সমীর বলল “হ্যাঁ, লোকটাকে চিনি। তবে ও ব্যাংকে কমই আসতো। কেন, তার কিছু হয়েছে না কি? অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি? মারা গেছে?”

গোবিন্দ বলল “ওসব কিছুই হয়নি”

“তবে কি হয়েছে?”

“ভি -আর -এস নেওয়ার পর লোকটা গা ঢাকা দিয়েছে। তেজেন্দ্র সিং লোকটাকে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে । যদি ওর নাগাল একবার পায় না! ওকে ছিঁড়ে খাবে, ওর হাড়গুলো খালি পাওয়া যাবে”

শেখর মনের উৎফুল্ল ভাব গোপন করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকালো। আর মনে মনে বলল “আর নাগাল পেয়েছে”


ইতিমধ্যে মায়ের শয্যাশায়ী অবস্থার কারণে শেখর কম্প্যাসনেট গ্রাউন্ডে ট্রান্সফারের জন্য রিজিওনাল ম্যানেজারের অফিসে অ্যাপ্লিকেশন জমা করে রেখেছিলো । তারপর আসানসোল ব্রাঞ্চে একজন অফিসার রিটায়ার করেন । সেই ভেকেন্সি ফিল আপ করার জন্য রিজিওনাল ম্যানেজারের অফিস থেকে শেখরের নামে একটা ট্রান্সফার অর্ডার ইসু হয়। আর সেই অনুসারে শেখর আসানসোল ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে আসে । এর ফলে লাভ হলো এই যে উইক এন্ডে বাড়ি ফিরে শেখর এখন একটু বেশি সময় থাকতে পারে আর ফেরার দিন হাওড়া থেকে সন্ধেবেলার বিধান এক্সপ্রেস ধরে রাত দশটার মধ্যে আসানসোল শহরে মেসবাড়িতেও পৌঁছে যেতে পারে।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮