• কুন্তল ঘোষ

রম্যরচনা - রুটি

সেদিন রাতে মনটা ঠিক ভালো ছিল না। ঘুমটাও হল একটু আধা খ্যাচড়া। তবু লকডাউনের বাজারে অলসতা কাটিয়ে সময় মতোই সকালে উঠে পড়লাম। বাড়িতে এখন কাজের লোক নেই, তাই সকাল থেকে অনেক রূপই ধারণ করতে হচ্ছে প্রয়োজন মতো। কখনো কুন্তল মাসি, কখনো কুন্তল স্যার, আর কখনো বা কুন্তল বাবুর্চি। তবে কোনো রোলটাই আমার কাছে বিরক্তির নয়। ঠিক হলো ব্রেকফাস্টে রুটি তরকারি খাওয়া হবে আর দায়িত্বটাও ভাগ হলো আধাআধি, মানে তরকারিটা বউ আর রুটির দায়িত্বটা আমার। তরকারিটা যথারীতি ভালো হলেও রুটি গুলো সেদিন ঠিক মনের মত হয়ে উঠলো না। কোনোটা যেন মুখ-পুড়ি হয়ে ড্যাব ড্যাব করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, আর কোনোটার যেন গালটা ফোলাতে খুব কষ্ট। আর আমার আজকের এই লেখনী এই রুটির ওপর। আসুন আরো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।



আসলে রুটি তৈরির অভিজ্ঞতাটা আমার প্রায় গত দুই দশকের পুরানো, যদিও রোজের অভ্যাস না। সাধারণত আমার হাতে রুটি গুলি মনের সুখে ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে যায়, কিন্তু আজ তা হলোনা।

জিজ্ঞাসু মন, তাই শুরু হলো বিশ্লেষণ। আসলে রুটি হচ্ছে খুব আদুরে স্বভাবের। ঠিকঠাক যত্ন আত্তির না পেলেই ওনার খুব গোসা করার প্রবণতা আছে। জল কম বা বেশী দেওয়া ওনার একদম পছন্দের না।যেমনটা পছন্দের না ওনাকে ভালো করে না মাখাটাও। আর ঠিকঠাক জল দিয়ে তারপর ভালো করে মেখেও যদি ঠিক পাত্তা না পায়। মানে যদি সময়মতো রুটি না বানানো হয়, একটু শুকিয়ে যায় আর বেশ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে রুটি তৈরির সময়। এতেই কিন্তু উনি ক্ষান্ত নন, ওনার চাটুর সাথে সম্পর্কটাও আমার মোটেই পছন্দের নয়। চাটু যদি একটু কম বা বেশী তাতে, ব্যাস এমন মুখটা বাঁকাবে যে মনে হয় দিই যেন গালে দুটো ঠাস ঠাস করে। তারপর গা জ্বালা দেবে তার ন্যাকামি দেখে যদি চাটুতে একটু কম বা বেশী সময় ওনাকে রাখা হয়। সব মিলিয়ে বউ কে মানিয়ে নেওয়া বুঝি অনেক সোজা, উনি তো পুরো গার্ল ফ্রেন্ড! পুরো মনোযোগ পেলে তবেই উনি ফুলে ফেঁপে নিজের খুশী জাহির করবেন, নচেৎ হয় গাল পুড়িয়ে, না হলে মুখ বেঁকিয়ে প্রতিবাদ।


যাইহোক সেদিন ব্রেকফাস্ট করতে করতে মনে অনেক ভাবনার উদয় হলো। এই রুটি বানানো বুঝি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্ত পদক্ষেপে কোনো না কোনো ভাবে অবিরত করে যেতে হয়। সে কোনো সম্পর্ক স্থাপনে হোক বা কার্যে। এই ধরুন বাড়ির ছোট্টো বাচ্চা বা বয়স্ক, সকলেরই চাহিদা একটু আদর, একটু আন্তরিকতা, একটু ভালোবাসা, একটু সহানুভূতি আর সমব্যথী হওয়া। শুধু এক বারের জন্য হলে হবে না। মধুরতা যদি নিরন্তর বজায় না রাখা হয় তাহলে সেই মুখ বাঁকা রুটি সব সম্পর্ক থেকেই বের হয়ে আসে। আসলে রুটি তৈরির স্টেপ গুলোর মতো সম্পর্কের কোনো স্টেপেও যদি একটু অবহেলা হয় তাহলেই যায় ভারসাম্য বিগড়ে। বেশী করে ফেললেও কিন্তু পরিত্রাণ নেই। একদম পিঠে চড়ে বসবে, আর তারপর নামানো ততোই কঠিন। এখানেই বুঝি জড়িয়ে রয়েছে নিপুণতা, সময়ের সাথে সাথে রুটি বানানোর কলা কৌশল গুলি শিখে ফেলাটা তাই অতি প্রয়োজনীয়। এটাই বুঝি জীবনে সাফল্যের চাবি কাঠি।


শুধু ঘরের লোক কেনো? এই রুটি তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকে অহরহ সব সম্পর্কে। ঘরের পোষ্যটারও ল্যাজ নাড়িয়ে সামনে আসার মধ্যে থাকে কিছু প্রত্যাশা, একটু আদরের, একটু সময় নেবার আর দেবারও।


আবার ধরা যাক কর্মস্থল। অনেক বস বুঝি রুটি বানানোয় বেশ পারদর্শী। যাদের অধীনে কর্মরত ব্যক্তিরা ফুলে ওঠা রুটির মতো খুশী মনে কাজ করে, আর তাদের কর্মক্ষেত্রে অবদানটাও সাধারণের থেকে অনেক বেশী। আর কিছু বস সারা জীবনেও রুটিটা ঠিক করে সেঁকতে শিখলো না। তাই সারা জীবন লোকের গালাগাল খেয়েই মরে।


ফর্মুলাটা কিছু আলাদা না বন্ধুত্বে এসেও। সংস্কৃতে আসল বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও (উৎসবে ব্যসনেচৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে রাজদ্বারে শ্মশানে চ যস্তিষ্ঠতি স বান্ধবঃ।) বুঝি অনেকটা রুটি বানানোর পারদর্শিতার মতো। যতো দেবে তার থেকে অল্প বেশীই পাবে। আর অনেক মানুষ আছে যাদের বিচার ধারায় বন্ধুত্বের কোনো মূল্য নেই। তাই তাদের জীবন বন্ধুহীন।


প্রেমের ময়দানে তো রুটি সেঁকার নিপুণতা আরো তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তো সাফল্যের পুরো অঙ্কটাই রুটি সেঁকার নিপুণতার ওপর নির্ভর করে।

শুধু সম্পর্ক স্থাপনে কেন? শিল্প, কলা, অভিনয় সর্বত্র যেন সেই সূক্ষ্ম উপাদানটি খুবই প্রয়োজনীয়। না দিতে পারলেই গোসা, আর মুখ বেঁকিয়ে প্রতিবাদ ।

শুধু জীবিত জগতেই না, রুটি তৈরির ধ্রুব সত্যটি কল কারখানা, ঘরের মেশিন, সর্বত্র সমান ভাবে প্রযোজ্য।


দেখুন না ঘরের সেলাই মেশিনটাকেই বেঁকে বসে তেলটা সময় মতো না দিলে, আর বেশী প্রতারণা হয়ে গেলে সোজা ধর্মঘট। বলেই দেবে তোমার কথায় আর চলব না।


তাই বলি কি জীবনের সব ধাপে জলটা পরিমাণ মতো দিতে শিখুন। মাখামাখিটাও খুব খেয়াল করে, গরম টা ঠিক ততোই করুন যতো টা সম্পর্কে প্রয়োজন। আর সময়ের গণ্ডিটা, কম দেওয়া যতো ক্ষতিকারক, বেশীটাও ততোই।


আশ্চর্যের ব্যাপার রুটিরা সব বোঝে।




লেখক পরিচিতি - কুন্তল ঘোষ অধুনা দিল্লি-বাসী, জন্মসূত্রে হুগলীর শিয়াখালার মানুষ। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও প্রকৃতি প্রেম আর বেড়ানোর সখ ছোটো থেকেই। আর সেই শখকে সার্থক করতেই চাকরীর প্রথম জীবনে শুরু হয়েছিল আর এক শখ মোটর সাইক্লিং। আর বাসস্থানটা দিল্লী হওয়ায় হিল্লি-দিল্লি-মক্কা করার সুযোগও এসে গিয়েছিল। বাইকে চেপে হিমাচল, কুমায়ুন, গাড়য়াল ও রাজস্থানের বেশ অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরির শুরু সেই সময়েই। মাঝে এক দশক প্রায় পুণেতে কাটিয়ে তারপর আবার চাকুরী সূত্রে বর্তমানে দিল্লি-বাসী । আর সেখান থেকেই কখনো বেড়ানোর সাথে সাথে হঠাত করে লেখার পোকা মাথায় চেপে বসে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮