• প্রদোষ সেন

গল্প - অলৌকিক








।।১।।


চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলেও চেষ্টা করি পুজোর সময়টা কলকাতায় আসার। সকলে যে প্রতিবার আসতে পারি তা নয়। অনেকের আবার নতুন জীবনের ব্যস্ততা আর আকর্ষণ এতটাই বেশী, তারা কিছুদিন পরেই আসা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা কয়েকজন সেই দলে পড়িনি। অন্তত এখনো অবধি। তাই কর্মক্ষেত্রে খুব অসুবিধে না হলে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য আসি।

আমাদের মধ্যে জয়জিতের কথা একটু আলাদা করে বলতেই হয়।


বরাবরই ওর সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে একটা ঝোঁক ছিল। যেটা আজও আছে। ও একটা বাংলা ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কাজ করে। এছাড়া আরও অনেক ব্যাপারে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে। জয় (সংক্ষেপে আমরা ওকে ‘জয়’ বলি) কলকাতায় একটা মাঝারি সাইজের কোম্পানিতে চাকরি করে। কথাপ্রসঙ্গে অনেকবার আমাদের বলেছে কলকাতার বাইরে গিয়ে চাকরি করার কোন ইচ্ছে ওর নেই। তার একটা কারণ এই যে সেক্ষেত্রে ওর বাকি কাজগুলো অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।


আমাদের পুজোর আড্ডা বেশীরভাগই হয় জয়জিতের বাড়িতেই। আমরা বাকিরা থাকি ফ্ল্যাট বাড়িতে। আর ওদের নিজেদের দোতলা বাড়ি। হরিশ মুখার্জী রোডের ওপর। একটু পুরনো ডিজাইনের। কিন্তু জায়গা অনেক। গ্রাউন্ড ফ্লোরে একটা বসার ঘর আছে, যেখানে ছয়-সাত জন বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া যায়। আমাদেরও কিছু বলতে হয় না। ও নিজে থেকেই আমাদের বলে রেখেছে।

সেবার যখন গেলাম ওর বাড়িতে দেখি জয় আর অর্ক বসে আছে।


ষষ্ঠী আসতে তখনও দুইদিন বাকি। আর আমি অফিসে ম্যানেজ করে এবার একটু বড় ছুটি নিয়েছি। তাও মাত্র দুজনকে দেখব আশা করিনি।


“কিরে বাকিরা কোথায়?” জিগ্যেস করলাম।


আমাদের তিনজনের মধ্যে একমাত্র জয় স্মোক করে।


আমার প্রশ্নটা শুনে আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা সিগারেতে একটা টান দিল। তারপর বলল “আয়, বস তো।“


“চা খাবি তো?” জিগ্যেস করতে বললাম “হ্যাঁ খেতে পারি।“


বাড়ি পুরনো হলেও, আদব-কায়দা সবই নতুন। ঘরের কোণে একটা টেবিলে চায়ের ইলেকট্রিক কেটলি, কাপ, টি-ব্যাগ আর অন্য সব সরঞ্জাম রাখা। তিনকাপ জল কেটলিতে ঢেলে গরম করতে দিয়ে জয় নিজের চেয়ারে এসে বসল।


জিগ্যেস করলাম “বাড়িতে কি এখন একা?”


“না না। বাবা-মা দুজনেই আছে ওপরে। হঠাৎ জিগ্যেস করছিস কেন এটা?”


“না এই চা-টা নিজে করছিস।“


“কারণ আমার এটা নিজের কাজের অফিস-ও বলতে পারিস। তাই এই ব্যবস্থাগুলো করতেই হয়েছে।“


“আই সি।“ চারদিকে তাকিয়ে ঘরটা আর একবার দেখলাম। গত বছরের তুলনায় এবার কিছু পরিবর্তন করেছে।


“ইম্প্রেসিভ”। অর্কও মন্তব্য করল ঘরটা দেখে।


“আচ্ছা এবার ঘরের ব্যাপারটা ছাড়। আর আমার কথাগুলো একটু শোন।“


দুজনেই ওর দিকে দেখলাম। বলল “তোদের একটা গল্প শোনাবো। শুনে বল কেমন লাগল।“


জিগ্যেস না করে পারলাম না “আমাদের শোনানোর কি আছে? তোর ম্যাগাজিনের জন্য তো? তোর ভাল লাগলেই তো হল।“


“হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস। কিন্তু আগে এটা শোন, তারপর। আমাদের পত্রিকাতে ভর্তি শুধু প্রেমের গল্প আর মাঝেমধ্যে একটা-দুটো ভ্রমণ কাহিনী। এটা একটু অন্য টাইপের।“


চায়ের জলটা ফুটে গেছে।


জয় উঠে যাওয়ার আগে অর্ক বলল “তুই বোস, আমি নিয়ে আসছি।“


“ওকে। আমার এক চামচ চিনি দিবি।“


বললাম “তা এবার শুরু কর গল্পটা।“


একটু হেঁয়ালি করে বলল “আমি বলব না। যার অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার মুখ থেকে শোনাবো।“


“যার অভিজ্ঞতা মানে? এখানে তো আছি আমরা তিনজন।“


একটু হেসে বলল “বলছি, সব বলছি।“


সেবার পুজো পড়েছে একটু দেরিতে। এই সময় দিন ছোট হয়ে আসে তাড়াতাড়ি। তার ওপর আজ সকাল থেকেই একটু মেঘলা করে আছে। মোবাইলে সময় দেখলাম। বিকেল পাঁচটা বেজেছে। কিন্তু দিনের আলো সেই তুলনায় একটু কম। আর ওদের একতলার এই ঘরটায় সূর্যের আলো একটু কম আসে।


জয়জিত উঠে ঘরের দুটো আলো জ্বালিয়ে দিয়ে এসে বসল নিজের জায়গায়। “এই ঘটনাটা আমি শুনলাম আমার এক দাদুর কাছ থেকে। উনি এখন এখানে এসেছেন কিছু দিনের জন্য।“


কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামতে হল। চা গুলো রেডি হয়ে গেছে। নিয়ে আবার জায়গায় এসে বসলাম।


জয়জিত শুরু করল “আমার দাদামশাই, মানে আমার মার বাবা, তো মারা গেছেন আগেই। ইনি হলেন আমার দাদামশাইয়ের খুড়তুতো ভাই। মানে আমার মার কাকা। তাই আমার সম্পর্কে দাদুই হচ্ছেন। ইনি একসময় মিলিটারিতে ছিলেন। এখন বয়স বললেন আশির ওপর। কিন্তু চেহারায় একটা মিলিটারি ছাপ আছে। দেখলেই বুঝতে পারবি।“


“তা ঘটনাটা কি নিয়ে?” অর্ক জিগ্যেস করল।


“সেটা ওনার মুখ থেকেই শোন।“


মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওনাকে দেখলাম আমাদের ঘরের দরজায়। জয় গিয়ে নামিয়ে নিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে একা ওঠা-নামা হয়ত অসুবিধে। এই বয়সে। জয়ের কথাটা ঠিক। চেহারায় একটা ফৌজি ছাপ আছে। প্রায় ছফুটের কাছাকাছি হাইট। হাব-ভাবেও বোঝা যায়।




।।২।।



ভদ্রলোকের কথা বলার, বিশেষত গল্প বলার, স্টাইলটা যে ভাল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমাদের সঙ্গে কয়েকটা কথা বলার পরই সেটা বুঝতে পারলাম।


“কলকাতায় ম্যাকিনন অ্যান্ড ম্যাকেঞ্জি বিল্ডিং চেন?” আমাদের জিগ্যেস করলেন।


জয় মনে হল চেনে। কিন্তু আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন ভদ্রলোক। বললাম “নামটা শুনেছি। বোধয় এখন একটা হেরিটেজ বিল্ডিং, এর বেশী কিছু জানিনা।“


“হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ। বাড়িটি তৈরি হয় স্বাধীনতার বেশ কিছুদিন আগে। স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর। যতদূর মনে হয় ১৯২৫ কি ৩০ সালে। তখনকার ব্রিটিশ আর্কিটেকচার। বাড়িটা দেখলে এখনো একটা বেশ সম্ভ্রম জাগে। এরকম বাড়ীর তো হেরিটেজ বিল্ডিং তকমা পাওয়ারই কথা। ঘটনাচক্রে একই বিল্ডিং মুম্বাইতেও আছে। খুব সম্ভবত ডকের কাছে। সে বাড়ীর ডিজাইন-ও অনেকটা কলকাতার বাড়িটার মতই। যাই হোক এবার আসল কথায় আসি।“


এক সেকেন্ড থামতে জয় জিগ্যেস করল আর এক কাপ চা বা কফি চলবে কিনা। আমরা দুজনেই ‘না’ বললাম । ওর দাদু ‘হ্যাঁ কফি খেতে পারি’ বলাতে গিয়ে কেটলিতে জল গরম করতে দিল জয়।


ওর দাদু গল্পের আসল পর্বটা শুরু করলেন।

“১৯৭৯ সালের কথা বলছি। তার কিছুদিন আগে আর্মি সার্ভিস থেকে ভল্যান্টারী রিটায়ারমেন্ট নিয়েছি। আর চাকরিও একটা পেয়েছি কলকাতায়। তার আগে বলি, আর্মিতে আমার প্রথম পোস্টিং ছিল অরুণাচল। ফিল্ড পোস্টিং। তিন বছর ওখানে কাটিয়ে ট্রান্সফার হলাম লাদাখ। বুঝতেই পারছ তখনকার দিনের লাদাখ বা অরুণাচল। সত্যিকারের দুর্গম জায়গা বলতে যা বোঝায় তাই। আজ গেলে বোঝাই যায় না কতটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। তারপর কিছুদিন কাটালাম দিল্লীতে। হেড কোয়ার্টারে। বছর দুয়েক থেকে আবার ট্রান্সফার হলাম রাজস্থান। জয়সলমীর। ওখান থেকে গেলাম মধ্যপ্রদেশ। প্রথমে জব্বলপুর, তারপর পাঁচমারি। সব মিলিয়ে প্রায় পনেরো বছর আর্মিতে কাটানোর পর রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কলকাতায় আসি। সেটাও মূলত বাড়ীর কারণে।


কলকাতায় এসে একটা চাকরিও পেয়ে গেলাম। চাকরিটা ছিল একটা ব্রিটিশ কোম্পানিতে। এদের অনেকগুলো বিজনেস ছিল, তার মধ্যে আমাদের ডিপার্টমেন্ট ট্রেডিং দেখত। ইন্ডিয়ান মশলা, পালস বা এই ধরণের আরও জিনিস বাইরে এক্সপোর্ট হত। আর আমাদের অফিসটা ছিল ওই ম্যাকিনন বিল্ডিং-এ। বুঝতেই পারছ আর্মিতে ওইরকম একটা অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ কাটানোর পর এই চাকরিটা ছিল একদম অন্যরকম। কিন্তু একটা কিছু তো করতে হবে। আর মাইনে তখনকার দিনের হিসেবে খারাপ নয়। তাই থেকে গেলাম। আর আমি বলব আমাদের কোম্পানির কলকাতা অফিসের হেড জুলিয়েনের কথা। জুলিয়েন থমাস। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক। রিয়েল নাইস জেন্টলম্যান। আর আমাকে খুব পছন্দ করতেন। সেটার অবশ্য কারণ ছিল। কারণটা এই যে অফিসে আমি বোধয় একমাত্র পাংচুয়াল স্টাফ ছিলাম। আর্মি থেকে শেখা অভ্যেস। কোনদিন নড়চড় হয়নি। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, ঠিক টাইমে পৌঁছে যেতাম।


একদিন তো আমাকে বলেই ফেললেন। শঙ্কর, তোমাকে একটা কথা বলছি। তুমি তো বাঙালি, তাই বলছি। ডোন্ট মাইন্ড এনিথিং। তোমাদের বাঙালিদের অনেক ভাল জিনিস আছে, কিন্তু ওয়ার্ক কালচার ইজ ভেরি পুওর। দেখ তুমি, বেশিরভাগ টাইমে আসে না। কাজটা সিরিয়াসলি নেয় না।


আমি আর কি বলব? সবটাই সত্যি। আর তখন বামপন্থীদের রাজত্ব, যেখানে কাজ কিভাবে না করা যায় সেটা বেশ ভালভাবেই রপ্ত করা হয়েছিল। এইভাবেই চলতে লাগল। "


“কফি রেডি।“ জয়ের কথায় থামতে হল।

আমরা না বলা সত্ত্বেও দেখলাম আমাদেরও কফি বানিয়েছে।


কফিতে দু-তিন বার চুমুক দিয়ে, ভদ্রলোক আবার শুরু করলেন।

“হ্যাঁ একটা ব্যাপার তোমাদের বলতে ভুলে গেছি যে আমি ওখানে কি করতাম। আমার কাজটা ছিল, সহজভাবে বললে, এখনকার লজিস্টিকস ম্যানেজারের মত। আমাদের একটা বড় গুদামঘর ছিল স্ট্র্যান্ড রোডেই, অফিস থেকে ধরো এই এক কিলোমিটার বা তার থেকে একটু বেশী দূরে। আমাদের জিনিস আসত ট্রেনে বা ট্রাকে, বিভিন্ন জায়গা থেকে। চলে যেত ওই গুদামে। ওখান থেকে আবার এক্সপোর্ট হত কোলকাতা পোর্ট দিয়ে। আমার কাজ ছিল এই মেটিরিয়ালস মুভমেন্ট-টা দেখা, যাতে পুরোটা ঠিক ভাবে আর টাইমে হয়। এটা শুনতে সহজ হলেও করতে গিয়ে বুঝতাম কত ঝামেলা। অনেক জায়গাতেই আর্মি পরিচয় দিয়ে সুবিধে হত, কাজও হত। আবার অনেক সময় কিছুই হত না। আর একটা ব্যাপার ছিল যে এক্সপোর্ট কনসাইন্মেন্টের ডেট মিস করা যেত না। মিস করলে বোম্বে থেকে ফোনও চলে আসত। যতদূর মনে আছে আমি কোনদিন ওই কাজে ফেইল করিনি। সেটা ছিল দ্বিতীয় কারণ, যে জন্য আমার বস আমাকে পছন্দ করতেন।

এবার আসল ঘটনার কথায় আসি।


সেটা ১৯৭৯-র কথা। ১৮ ই সেপ্টেম্বর। ১৭ তারিখ রাত থেকে কলকাতায় শুরু হল বৃষ্টি। ডিপ্রেশন কি ওই ধরণের কিছু হয়েছিল। কখনো মুষলধারে, কখনো আবার আস্তে। সারারাত হয়ে পরদিন সকালেও থামার কোন লক্ষণ নেই। আমি যখন ১৮ তারিখ সকালে অফিসে গেলাম তখন স্ট্যান্ড রোডে বেশিরভাগ জায়গায় জল জমে গেছে। খুব বেশী না হলেও জমেছে। মুশকিলটা হল সেদিন আমাদের একটা বড় কনসাইন্মেন্ট সাউথ ইন্ডিয়া থেকে আসার কথা। ট্রাকও কলকাতায় এসে গেছে। এবার মালগুলো নামিয়ে গুদামে তোলানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

অফিসে পৌঁছে দেখলাম জুলিয়েন সাহেব এসে গেছেন। একজন সিকিউরিটি গার্ড, নাম ছিল ইদ্রিস, তাকেও দেখলাম। এছাড়া বাকি অফিস তখনো খালি। জুলিয়েনকে স্বভাবতই একটু চিন্তিত দেখাল।

আমাকে জিগ্যেস করলেন “আজ কি ওগুলো আনলোড করাবে?”


বললাম “আমি আজকেই করাব। বৃষ্টি যদি না থামে তাহলে কাল করানো আরও অসুবিধে। তাছাড়া আমাদের গোডউন সেফ জায়গা। জল কোনভাবেই ঢুকবে না। একবার জিনিসগুলো ঢুকিয়ে দিতে পারলে কোন চিন্তা নেই।“


উনি বললেন “আমি তোমার সঙ্গে একমত। বাট লুক অ্যাট কি ওয়েদার।“


বৃষ্টির বেগটা তখন বেড়েছে। দিনের আলো বেশ কম। মনে হচ্ছে না সবে সকাল দশটা বাজে।


জুলিয়েন আবার বললেন “পরাগ আজ আসছে। ফোন করেছিল। তোমাকে হেল্প করবে যদি কিছু দরকার হয়। আমি আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাব। তুমি তো জানো আমার বাড়ীর কাছে কি অবস্থা হয়। গাড়ি ডুবে যাবে, যা অবস্থা দেখছি।“


বললাম “হ্যাঁ আপনি বেরিয়ে যান। গাড়ি নিয়ে তারপর আটকে যাবেন।“


যতদূর মনে আছে উনি থাকতেন প্রিটোরিয়া স্ট্রীট বা ওর কাছাকাছি কোন এরিয়ায়। একটা কালো রঙের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি ছিল। যেটা একমাত্র ওনার ড্রাইভার জলের মধ্যে দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারত।

জিগ্যেস করলাম “আপনার ড্রাইভার আছে তো?”


………



দুপুর বারোটা নাগাদ অফিসে শুধু আমি, সিকিউরিটি গার্ড ইদ্রিস আর একজন বোধয় স্টাফ ছিল, যে তার পরেই বেরিয়ে গেল। বাইরে বৃষ্টি একভাবে পড়ে যাচ্ছে, আর জল বাড়ছে। আমাদের অফিস বিল্ডিং-র বাইরে চত্বরে জল তখন ঢুকছে। তার একটু পরেই, তখন একটা মত বাজে, যেটা ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হল। ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। বাইরে দিনের আলো কম। তার ওপর ইলেকট্রিসিটি নেই। ইদ্রিসকে বলে এমারজেন্সি আলোগুলো জ্বালালাম। কিন্তু তাতে আলো যথেষ্ট হচ্ছে না। এইসময় একটা ফোন এল জুলিয়েনের অফিসে।


ফোনটা ধরে ‘হ্যালো’ বলতে ওপাশ থেকে পরাগের গলা শুনতে পেলাম। তোমাদের আগে বলা হয়নি পরাগ ছিল একটি মারাঠি ছেলে। পরাগ আম্বেকার। কলকাতায় কিছুদিনের জন্য আমাদের অফিসে ছিল। কমার্শিয়াল সেকশনে কাজ করত। স্টোর এন্ট্রি এসবও দেখত। ফোন ধরতে আমাকে বলল “দাদা আজ যেতে পারব বলে তো মনে হচ্ছে না। কোন ট্যাক্সি নেই, অন্য ট্রান্সপোর্ট-ও কিছু পাচ্ছি না।“

বাইরে যা অবস্থা ওকে রিকোয়েস্ট করারও সাহস পেলাম না।


জানলা দিয়ে একবার বাইরেটা দেখলাম, হাঁটুভর জল আর মাঝেমধ্যে একটা বাস বা ম্যাটাডোর যাচ্ছে জলের মধ্যে দিয়ে ঢেউ তুলে। শেষ দু ঘণ্টায় বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে তো বটেই, আর টানা একভাবে হয়ে যাচ্ছে।

বললাম “ঠিক আছে না পারলে এস না। রিস্ক নিয়ে লাভ নেই।“

ও বলল “আপনিও আর বসে না থেকে বেরিয়ে পড়ুন। আজ কোন মাল ডেলিভারি হবে না। আমি ফোন করে ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।“

আমার তখন নিজেরও একটু চিন্তা হচ্ছিল কিভাবে ফিরব।

ওকে সেটা বললাম।

বলল “আমি কথা বলে দেখছি, যদি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যায়। হলে আমি আপনাকে ফোন করে জানিয়ে দেব।“


ফোনটা রেখে ঘরের বাইরে প্যাসেজে এলাম। ঘরের মধ্যে এমারজেন্সি ল্যাম্পের আলো ছিল। সে তুলনায় প্যাসেজটা অন্ধকার। ভিতরেই ফিরে গেলাম। এমনি সময় অফিসে যখন লোক থাকে বুঝতে পারি না। কিন্তু তখন চারদিকে একটা নিস্তব্ধ ভাব। তার ওপর আগেকার দিনের বাড়ি, উঁচু সিলিং, লম্বা করিডর – সব মিলিয়ে যেন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর্মিতে চাকরি করেছি। অনেক রকম সিচুয়েশান ফেস করতে হয়েছে। তাই সহজে আমি বিচলিত হয়ে পড়ি না। কিন্তু ওই সময় একটু হলেও চিন্তা হচ্ছে যে কিভাবে ফিরব। আর তখন তো আজকের সময় নয়। বাইরে কোথায় কি হচ্ছে অফিসে বসে জানতেও পারছি না। বেশ খানিকক্ষণ বসে আছি নিজের জায়গায়। তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

পরাগের ফোন।

“একটা গাড়ি পাওয়া গেছে। পৌঁছে যাবে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে। ড্রাইভার আমাদের অফিস চেনে। আপনাকে অফিস থেকেই পিক-আপ করবে। তাই আপনি অফিসেই থাকবেন।“

কথাগুলো শুনে একটু স্বস্তি পেলাম।

কিছু বলার আগে পরাগ-ই আবার বলল “বাইরে জলের মধ্যে কিন্তু বেরোবেন না। কয়েকটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে আজ, ইলেকট্রিকের লাইভ তার খুলে।“

“ওকে” বলাতে ও ফোন রেখে দিল।


ঘড়িতে তখন সময় দেখাচ্ছে দুটো পনেরো। মানে গাড়ি আসতে তিনটে তো বাজবেই। ওয়েট করা ছাড়া উপায় নেই। বাইরে তখন দিনের আলো খুব কম। বৃষ্টি চললেও বেগটা সকালের তুলনায় একটু কমেছে। আর মাঝে মধ্যে শোনা যাচ্ছে মেঘের গর্জন, যেটা আগে ছিল না। জানিনা বৃষ্টিটা অন্তত কাল সকালের মধ্যে ধরবে কিনা।


নিজের টেবিলে কাগজগুলো গুছিয়ে রেখে একটু বসলাম। সকাল থেকে যা গেছে আজ। এখন গাড়িটা এসে গেলেই হল। ভাবলাম একবার মি, জুলিয়েন-কে ফোন করে একবার জানিয়ে দিই যে আজ কোন কাজ হয়নি, যা হওয়ার কাল দেখব। টেবিলে ফোনটা তুলে ডায়াল করতে গিয়ে দেখি ডায়াল-টোন নেই। বৃষ্টির মধ্যে বোধয় লাইন গণ্ডগোল করছে। জুলিয়েনের ঘরে গিয়ে ফোনটা করব ভাবলাম। ওটা আলাদা লাইন, ঠিক থাকতেও পারে। কিন্তু গিয়ে দেখি ঘর বন্ধ। তালা দেওয়া। এরকম তো কোনদিন হয়না!

তাহলে কি ইদ্রিস বাড়ি গেল?


জানি ওর থাকার জায়গা অফিসের পিছনেই। কিন্তু আমি অফিসে থাকতে ও বাড়ি যাবে? কোনদিন তো এরকম দেখিনি। একবার ভাবলাম বেরিয়ে পিছন দিকে দেখি। তারপর মনে হল এই বৃষ্টিতে আর যাব না। গেছে কোথাও হয়ত। এসে যাবে। অগত্যা নিজের জায়গায় গিয়ে বসলাম।

কতক্ষণ বসে ছিলাম মনে নেই। বোধয় একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল।

মনে হল নিচে একটা গাড়ি হর্ন দিচ্ছে।


তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে দেখি একটা জীপ টাইপের গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। জলের কথা ভেবে কোম্পানি বোধয় বুদ্ধি করে এই গাড়ি পাঠিয়েছে। কিন্তু ইদ্রিসকে তখনো দেখতে পেলাম না। আশ্চর্য লাগল খুবই।

আর এদিকে আমাদের অন্য সিকিউরিটি গার্ড আজ দিনের বেলা আসেনি, রাতে ডিউটি করবে। গাড়িতে উঠবো বলে বেরিয়েছি। মুহূর্তের জন্য ভুলে গেছি যে জলের মধ্যে যাওয়াটা বিপদজনক। পরাগ বার কয়েক সাবধান করে দেওয়া সত্ত্বেও।

ঠিক জলে পা দেব, তার আগেই মনে হল একটা জোরে ধাক্কা খেলাম সামনে থেকে। আর আমি ছিটকে পড়লাম পিছন দিকে। অনেকটা ইলেকট্রিক শক লাগার মত মনে হল।

মিলিটারি থেকে তখন জাস্ট রিটায়ারমেন্ট নিয়েছি। শারীরিক ক্ষমতা খুব একটা কম ছিল না। কিন্তু এত জোরে ধাক্কাটা লেগেছিল যে কয়েক সেকেন্ড লাগল ওটা সামলে উঠে দাঁড়াতে। ততক্ষণে দেখি ড্রাইভার গাড়িটা নিয়ে ভিতরে চলে এসেছে। ও বুঝতে পারেনি। ভেবেছে বোধয় মাথা ঘুরে বা ওইরকম কোন কারণে পড়ে গেছি।

ওই আমাকে উঠতে সাহায্য করল। তারপর গাড়িতে উঠে বাড়ি ফিরলাম। কিন্তু ঘটনাটা আমার কাছে ধাঁধার মত হয়ে রইল। বাড়ি গিয়েও বেশ খানিকক্ষণ ভুলতে পারলাম না।

যাই হোক সেদিন সন্ধ্যের পর থেকে বৃষ্টিটা একটু কমল। মুষলধারে যেটা পড়ছিল সেটা দেখলাম ঝিরঝির করে পড়ছে। জুলিয়েনকে ফোন করে একটু আশ্বস্ত করলাম যে এই দুর্যোগ মনে হচ্ছে কেটে যাবে আজ রাতের মধ্যেই। কাল থেকে আবার কাজকর্ম চালু করা যাবে।


সাধারণত আমি একটু দেরিতে শুলেও, সেদিন খুব ক্লান্ত লাগছিল। ভাবছি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব। তখন জাস্ট দশটা বেজেছে। এই সময় একটা ফোন এল। “হ্যালো” বলতে শুনতে পেলাম ওপাশ থেকে আমাকে কেউ জিগ্যেস করল “আপনি ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছে গেছেন তো?”

বললাম “হ্যাঁ পৌঁছে গেছি। আপনি কে বলছেন?”

“চিনতে পারলেন না? আমি ইদ্রিস।“

আমি আর কিছু বলার আগেই লাইনটা কেটে গেল। বার দু-তিনেক হ্যালো বলে উত্তর না পেয়ে, অফিসের নম্বরে ফোন করলাম। নিশ্চয়ই অফিস থেকেই ফোন করেছে। কিন্তু কানেকশন পেলাম না। আবার একটু আশ্চর্য লাগল। হঠাৎ আমাকে ফোন করল কেন?


......


পরদিন সকালে তখন নটা বাজে।

বৃষ্টিটা ধরলেও আকাশ মেঘলা করে আছে। নিম্নচাপের পর যেরকম হয়। জুলিয়েনের ফোন। আশ্চর্যই হলাম এত তাড়াতাড়ি ফোন পেয়ে। কোনদিন তো এই সময় ফোন করেন না। কোন অঘটন ঘটলো না তো?

যে খবরটা পেলাম সেটার জন্য অবশ্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।

কাল বিকেলের দিকে ইদ্রিস মারা গেছে। ঠিক সময়টা কেউ বলতে পারছে না কিন্ত ডেডবডি সন্ধ্যের দিকে আমাদের আর একজন সিকিউরিটি দেখে। তারপর পুলিশে খবর দেয়।

বুঝতেই পারছ আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মুহূর্তের জন্য মনে হল তাহলে আমাকে রাতে ফোনটা করল কে? কেই বা আমাকে গাড়িতে ওঠার আগে ওই ধাক্কাটা দিয়েছিল? সেটা কি আমাকে প্রাণে বাঁচানর জন্য?

এই চিন্তাগুলো এমনভাবে মাথার মধ্যে আসছিল যে ভুলে গেছি ফোনটা ধরে আছি।

আমাকে চুপ দেখে জুলিয়েন সাহেব বার দুয়েক “হ্যালো” “হ্যালো” বলতে সম্বিৎ ফিরল।

শুধু জিজ্ঞাসা করলাম “কিভাবে হয়েছে?”

“সেটা বোধহয় পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে জানা যাবে। তবে সিং মানে আমাদের আর একজন সিকিউরিটি যা বলছে, তাতে মনে হয় জলে শর্ট-সার্কিট হয়ে গেছে।“

আমাকে চুপ দেখে জিগ্যেস করলেন “অফিসে আসছ তো?”

“হ্যাঁ, আসছি” বলে ফোন রেখে দিলাম।

এই ঘটনার তিন দিন পরে পুলিশের কাছ থেকে জানা গেল পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলেছে জলের মধ্যে শর্টসার্কিট হয়েই ওর মৃত্যু হয়। এই অবধি বলে থামলেন ভদ্রলোক।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললেন “দ্যাখো আমি কোনদিন ভূত বা ওই ধরণের কিছুতে বিশ্বাস করিনা। তবে ওই ঘটনার কোন সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা আজ অবধি পাইনি।“


আমরা পরস্পরের দিকে তাকালাম। কফির কাপে চুমুক দিলাম।

উত্তর আমাদের কাছেও নেই।










লেখক পরিচিতি - প্রদোষ সেনের স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে কলকাতায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কর্মজীবনের শুরু চেন্নাইতে। তারপর কিছুদিন কলকাতায় কাটিয়ে, বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত। চাকরিক্ষেত্রে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে ঘুরে বেড়ানো, একটু-আধটু লেখালেখির মাধ্যমে সাহিত্য চর্চার ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে চান। কাজের সূত্রে বা ভ্রমণের নেশায় ঘুরতে হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। তার প্রতিফলন হয়ত পাঠকরা দেখতে পাবেন কিছু লেখায়।











নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮