• সৌরভ ব্যানার্জী

ধারাবাহিক বড়গল্প - আকাশের বুকে মেঘ


পর্ব - ১


এই গল্প বিরহের না মিলনের সেই ভার পাঠক পাঠিকার উপরেই থাক , পরিবেশক এইখানে নিমিত্ত মাত্র।


সময় টা বছর খানেক আগের ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিক,বিকেল বেলা , দুর্গাপুরের মুচিপাড়ার একটি নবনির্মিত ফ্ল্যাটের নিচে গাড়ি রাখার জায়গায় অভ্যস্ত হাতে গাড়িটাকে পার্ক করল আকাশ ! ব্যাগ আর মোবাইল টা হাতে নিয়ে গাড়িটাকে লক করল । দোতলায় তার ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে অভ্যাস-বসে একবার মোবাইল খুলে ফেসবুকে নজর বোলাতেই নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট!! আহিরি চ্যাটার্জি !! এই নামের তো কাউকে চেনে বলে মনে পড়ে না ... আকাশের !! কে এই ভদ্রমহিলা ?? প্রোফাইল পিকচার টাকে আবার এক-ঝলক দেখে ,নাহ কিছুতেই চিনতে পারে না । আকাশের অভ্যাস হল অচেনা মানুষ দের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সে কিছুতেই একসেপ্ট করে না । ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা ,ডিলিট করে দেবে ভাবছে এমন সময় একটা মেসেজ ইন-বক্সে ।


- স্যার আপনি ভালো আছেন ? প্রায় ১৯ বছর পরে আপনাকে দেখলাম ।


আকাশ একটু অবাকই হয় । এইরকম ভাবে কি কেউ অচেনা ভদ্রমহিলা কথা বলতে পারেন ? নিশ্চয় চেনা কেউ হবেন । আবার একবার ছবিটা দেখে আকাশ । মধ্য তিরিশের একজন ভদ্রমহিলা সঙ্গে দুটি ফুলের মত শিশু । এইবারে ভদ্রমহিলার চোখ দুটো বড় চেনা লাগছে তার কিন্তু নাম টা ... নাহ কিছুতেই মনে করতে পারে না সে !!! নিরুপায় আকাশ মেসেজ করে ...


- আমি না ঠিক মনে করতে পারছি না , একটু ডিটেলে বললে ভাল হয় ।


কিছুক্ষণের মধ্যে জবাব আসে ...


- আমি মেঘনা ...আপনি বিনয় ভবনে পড়া কালীন আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল । আপনি আমায় ফিজিক্স পড়াতেন ।


আকাশ একটু অবাকই হয় , এই সেই ' মেঘনা ' ? সেইদিনের সেই ষোড়শী , তন্বী ... আজকে এত পাল্টে গেছে !!ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা একসেপ্ট করে সেও পাল্টা জবাব দেয় ।


- ওহ হো ... হোয়াট আ প্লেসেন্ট সারপ্রাইস ! কেমন আছো তুমি ? এখন কোথায় আছো ? তোমাকে এত দিন পরে দেখে দারুণ লাগছে ।


লিখেই তার মনে হল ... " বেশি লিখে ফেললাম ? "


ওমনি সে শেষ লাইন টা পাল্টে দিয়ে লিখল ... " তোমার গল্প বলো "


প্রায় আধঘণ্টা পরে জবাব আসে ...


- আমি এখন আগরতলাতে আছি , আপনি কেমন আছেন...??


- চলে যাচ্ছে ... মিলিয়ে মিশিয়ে । আমার কথা বাদ দাও ।তোমার গল্প বলো ।


- আপনার কথা বাদ দিলে তো ... অনেক কিছুই বাদ দিতে হয় , যাই হোক আপনি আমার গল্প জানতে চেয়েছেন , বলব নিশ্চয় তবে সে তো অনেক বড় গল্প ... এইভাবে মেসেজ করে হবে না । একদিন ফোন করে সব বলব । ভালো থাকবেন গুড নাইট ।


খটকা টা লাগল এইখানেই ,শুধুই খটকা না কি কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা ও হল । কি এমন গল্প যা মেসেজে বলা যাবে না !! তাহলে কি ? নাহ এটা কি ভাবছে আকাশ ? কেন ভাবছে ...এইসব ?? নিজের মনে নিজেই হাসতে থাকে সে । খটকা টা কিন্তু অমূলক ছিল না সেইটা বোঝা গেল পরের দিন বিকেলেই ।





পর্ব - ২


দিন দুই পরে বেলা ৯ টা স্কুলের জন্যে ... তৈরি হচ্ছে আকাশ , মোবাইল টা বেজে উঠল । স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মনটা বিষিয়ে গেল । ইতি !! উফ এখন আবার কি মনে করে ? মুক্তি পেয়েও মুক্তি নেই কেন আকাশের ?


- বলো ...


- এই মাসের টাকা টা এখনও পেলাম না কেন ?


চড়াৎ করে মাথায় রক্ত উঠে গেল । একটা কড়া জবাব দিতে গিয়েও কোনরকমে নিজেকে সংবরণ করল। ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলার চেষ্টা করে আকাশ ...


- টাকাটা কিন্তু আমি তোমাকে হাতে করে পাঠাই না ইতি , ব্যাঙ্কেই একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করা আছে । প্রত্যেক মাসে নির্দিষ্ট দিনে সেইখান থেকেই তোমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়ে যায় । এখন গোলমালটা ব্যাঙ্কের হলে সেই দায়িত্ব টা নিশ্চয় আমার নয় । তাই না ?


- খুব যে বুলি ফুটেছে দেখছি ! কে জানে কি চক্কর করে রেখেছ !! একটা কথা জেনে রাখ টাকা না পেলে কিন্তু আমি তোমাকে ছিঁড়ে খাব ...।


- তার আর খুব বেশি বাকি রেখেছ কি ইতি ... আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে যে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিয়ে করেছিলাম ?ওকে ... তুমি যা পার কর ।


বলেই নিজের ফোন টা সুইচ অফ করে দিল ...আকাশ । বিষিয়ে যাওয়া মন টা নিয়ে গাড়ি টা স্টার্ট করল। স্কুলে পৌঁছে প্রথম দুটো পিরিয়ড ও আনমনে কাটল তার । দুটো পিরিয়ড পরে প্রায় সাড়ে ১১ টার দিকে ল্যাবে এসে আবার মোবাইল টা অন করল ।নেট অন করতেই একগাদা মেসেজ ঢুকল তার মধ্যে একটা মেঘনার । সামান্য একটা গুড মর্নিং কিন্তু সেইটাই যে আজকে কেন এত ভাল লাগল কে জানে !? জবাবে সে লিখল ।


- গুড মর্নিং অ্যান্ড হ্যাভ আ নাইস ডে ।আচ্ছা তুমি হোয়াটস অ্যাপ কর নিশ্চয় ? আমার হোয়াটস অ্যাপ নং ...৯৪৩৪.........


কিছুক্ষণের মধ্যেই হোয়াটস অ্যাপে জবাব এলো ... আকাশ তখন অন লাইন...


- আপনি তো এখন নিশ্চয় স্কুলে । এখন কি ফ্রি আছেন ?


- কিছুক্ষণ ...কেন বলতো ?


- নাহ কিছু না , এমনি জিজ্ঞেস করছি । আসলে কতদিন পরে আপনাকে খুঁজে পেলাম বলুন প্রায় ১৯ বছর !! আচ্ছা আপনি কি ভাল কবিতা আবৃত্তি করতেন ! এখনও কি কবিতা আবৃত্তি করা হয় ?


- হয় না বলব না তবে কমে গেছে অনেক ।


- কেন ?


- সে অনেক কথা মেঘনা , অনেক বড় গল্প ।অত কথা শোনার তোমার ধৈর্য থাকলে হয় ।


- ধৈর্য টা আমার চিরকালই বেশি মশাই !! এতটা বোধহয় না থাকলেই ভালো হতো । যাকগে আমার কথা বাদ দিন আপনার তো মনেই নেই সেইসময়ের কথা ।


- ও মা মনে না থাকার কি হল ?


- তাই তো চিনতে পারেন নি আমায় বলুন ?


এরপরের মিনিট পাঁচেক মেসেজের মাধ্যমে ই মামুলি কথা বার্তা হল । আকাশ কবে চাকরি পেল? কবে বিয়ে করল ? মেঘনার বিয়ে হল কবে ? তার স্বামী কি করেন এইসব ।এইখানে অনেক কথা বলতে পারল না আকাশ না কি বলতে চাইল না ? মুশকিলের কথাটা প্রথম জিজ্ঞেস করল মেঘনাই ।


- আপনার এখনও সেই আগের মত রাগ আছে ? অবশ্য আপনার রাগ নিয়ে আমার কি ? আপনার বউ সহ্য করুক গিয়ে আপনার রাগ ।আমার জানেন তো এই মাঝের সময় টার কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে । আপনার কথা , আপনার সংসারের কথা । আচ্ছা প্রোফাইল পিকচারে আপনার একার ছবি কেন ? আপনার বউ এর ছেলে মেয়ের ছবি কই ?


একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে আকাশ লেখে ...


- শুনবে ? আচ্ছা আমি তোমাকে ... লিখেই দি , কি জানো আমি কোনদিনই খুব ভাল বক্তা নই । লিখতে পারলেই বোধহয় আমার কিছুটা সুবিধা হবে ।


- এটা কিন্তু একদমই ঠিক কথা হল না । আপনি খুব ভাল বক্তা ... আপনার কথা আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম । আচ্ছা আপনার যা সুবিধা তাই করুন । আপনি আপনার সময় মত লিখুন আমি কাজের ফাঁকে ঠিক পড়ে নেব । দুপুরে ৩ টের দিকে ১০ - ১৫ মিনিট সময় পেলে কথা হতে পারে , না হলে কালকে হবে এখন আসি , ছেলে স্কুল থেকে আসবে , মেয়ে কে চান করাব খাওয়াব, অনেক কাজ !!


- এসো , আমারও ক্লাসে যাওয়ার সময় হয়ে এলো , তিনটের দিকে যদি ফ্রি থাকি কথা হবে ।


সেইদিন আর কথা হয় না , সারাদিন প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে কাটে আকাশের , স্কুল ছুটি হওয়ার আগের পিরিয়ডে শেষ অবধি লিখতে সময় পেল আকাশ ।


- মহিলারা রহস্যময়ী এই কথাটি আমি অর্ধেক বিশ্বাস করি । বেশীর ভাগ মহিলাই তাঁদের আগে বলা কথাকে কন্ট্রাডিক্ট করেন এঁদের কে রহস্যময়ী বলতে আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি ও অসুবিধা আছে । আবার কিছু মহিলা আছেন যাঁরা এইটে বেশ ইচ্ছে করেই করেন । (বিশেষ করে তাঁদের পুরুষ বন্ধুদের ঘেঁটে দিতে ) তাঁরা বুদ্ধিমতী কিন্তু রহস্যময়ী নন জীবনে যে কজন মহিলার সাথে আমি বেশ মন দিয়ে মেলামেশা করেছি তাঁদের মধ্যে বেশীর ভাগেরই এই গুণ টি যথেষ্ট পরিমাণে ছিল । এখন কথা হচ্ছে পুরুষ বন্ধুদের ঘেঁটে দিতে যে সকল মহিলারা নিজেদের কন্ট্রাডিক্ট করেন , সেইটে নিছকই মজা তাতে ক্ষতি বা লাভের কোন আশঙ্কা বা আশা নেই ।

মুশকিল হয় যে সকল মহিলা নিজেদের জীবনেই এই কন্ট্রাডিকশন শব্দ টি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে নেন ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের কে নিয়েই ।


যে সময়ের গল্প তোমাকে বলতে চাইছি বা তুমি শুনতে চাইছ সেই সময়ের বাকিদের কথা না হয় বাদই দিলাম সমস্যাটা হল আমার স্ত্রীর মধ্যেই এই কন্ট্রাডিকশন এর মড়ক পোকা টি সাংঘাতিক পরিমাণে ছিল । এর পরে কি হল বা কেন আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে রাজি হলাম সেইটা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে । এই জেট গতির যুগে যা আমাদের সকলেরই বড্ড কম । আবারও বলছি ভেবে দেখো সেই সময় তোমার আছে কি না ?


সারাদিন আর সময় পায় না আকাশ । বাড়ীতে এসে বসে পড়ে ১১ ক্লাসের ব্যাচ নিয়ে । প্রায় রাত্রি ৯ টার দিকে মোবাইল টা খুলে দেখে সন্ধ্যার দিকে জবাব দিয়েছে মেঘনা ।


- আমি বাকরুদ্ধ ও হতভম্ব !! এত দিন পরে আপনাকে খুঁজে পেয়ে এইরকম কথা শুনতে হবে ভাবিনি !! যাই হোক আপনার বলার ইচ্ছে যদি থাকে তাহলে আমার শোনার সময়ও নিশ্চয় আছে । একটা কথা কি জানেন যাকে নিয়ে আমার গল্প তার জীবনের গল্প তো আমায় শুনতেই হবে ।বাকি কথা কাল হবে ।।


খটকা টা আগের দিনেই লেগেছিল , আজকে সেইটা আরো বেড়ে গেল শেষের কথাটায় । " যাকে নিয়ে আমার গল্প " ...এই কথা লেখার মানে ? এটা কি লিখল মেঘনা ? কেন লিখল ? যদি সত্যিই গল্প থেকে থাকে সেই সময় কিছু ... বলল না কেন মেয়েটা ? আকাশ তো অনেক বারই ! আচ্ছা কালকেই জিজ্ঞেস করতে হবে মেঘনা কে এই কথাটার কি মানে ? কত কিছুই মনে মনে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে আকাশ ।





পর্ব - ৩


আকাশের ইচ্ছে ছিল পরের দিনেই জিজ্ঞেস করবে কথা গুলো , মুশকিল টা হল পরের দিন কেন সেইদিনের পরে প্রায় ৩ দিন কোন কথাই হতে পারল তার মেঘনার সাথে , কারণ টা আসন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা । এই কটা দিন গুড মর্নিং ,কেমন আছেন , কি খবর এইরকম কিছু কেজো কথা বার্তা হল , কোনদিন বা তাও হল না । শনিবার দিন টা স্কুলের হাফ ছুটি , ওইদিন ল্যাবের কিছু কাজ বাকি ছিল বলে আকাশ স্কুল ছুটির পরে বাড়ি গেলো না । ঘণ্টা খানেক কাজ করে কিছুটা কাজ সামলাল । বেলা তিনটের দিকে একবার মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে প্রথমেই মেঘনা কে একটা মেসেজ করল ...


- কি খবর ? কেমন আছো ?


অন্য মেসেজ গুলোর উত্তর দেওয়ার আগেই ... মেঘনার জবাব এলো ...


- আছি ভালোই । খবর তো আপনি দেবেন , গত কদিন ধরে কি খুব চাপ চলছে স্কুলে ?


- হ্যাঁ গো ... প্রচণ্ড । যাক আজকে এখন কিছুটা ফ্রি । তুমি এখন কি করছ ?


- এই তো ছেলে মেয়ে গুলোকে ঘুম পাড়ালাম । এখন এমনি সময় কাটাচ্ছি... বন্ধুদের সাথে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে আড্ডা দিচ্ছি ।


- বাহ খুব ভালো । তুমি দুপুরে ঘুমাও না ।


- না ঘুমাই না । চাকরি করতাম তো সেই অভ্যাস টা থেকে গেছে ।


- বাহ ... চাকরি ছাড়লে কেন ? বেবি ছোট বলে ?


- না পুরোটা সেইটা না । অনেক কারণ আছে সেইসব গল্প পরে হবে ।এখন আগে আপনি বলুন আপনার কথা।


- আমার আবার কি কথা ? একজন সহজ সাধারণ মানুষের গল্প ।


- ওমা তাতে কি হয় ? আপনিই তো কতবার আমায় বলতেন ...সিম্পল ইস বিউটিফুল ।


- এত কথা তোমার মনে আছে !!? এখন তো মানুষ সহজ হওয়া কে... সাধারণ হওয়া কে... সস্তা বলে মনে করে ।


- সে যারা করে তারা করুক আমার কি তাতে ? আর আপনার বলা কথা আমি ভুলে যাব এইটা আপনি ভাবলেন কি করে ??


আবার খটকা !! আর এইবারে কিন্তু বেশ বড় রকমের ।

কিছুক্ষণ পরে আকাশ লেখে ...


- আচ্ছা তুমি আমায় একটু সময় দাও , এই ধরো পনের মিনিট । আমি একটু লেখার চেষ্টা করি দেখি তোমার প্রশ্নের কতটা জবাব দিতে পারি ? একটু অপেক্ষা করো কেমন ?


- আপনি মানেই তো আমার কাছে অপেক্ষা । সেইদিনেও তাই ছিল আজকেও তাই । সময় টা পনের মিনিট না হয়ে একশ পঞ্চাশ মিনিট হলেও আপত্তি নেই আমার ... কোন তাড়াও নেই । আপনি আপনার মত লিখুন ।


পনের মিনিট নয় । এদিক ওদিক করে প্রায় তিরিশ মিনিট পরে এইটুকু লেখে আকাশ ।


- জানো মেঘনা আমার সাথে জীবনের একটি অদ্ভুত বোঝাপড়া আছে । আমি দেখেছি কোন ব্যক্তি বা বস্তু যাকেই আমি ভালবাসি বা ভালবাসার উপক্রম করি সেইটেই জীবন আমার থেকে দুরে সরিয়ে দিয়েছে একবার না বারবার এই ঘটনা ঘটেছে । শুধু কি তাই ? এই জীবনে আমার কত ভাল সম্পর্ক যে শুধু ভুল বোঝাবুঝির জন্যে ভেঙ্গে গেছে তার ইয়ত্তা নেই । মাঝে মাঝে খুব মনে হয় মানুষ যদি একটু নিজের অহং টুকু ত্যাগ করতে পারত ! এই তালিকায় বোধহয় আমার নাম টাও থাকবে !!


আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ , আমি না কি মহিলাদের মন বুঝি না , অবশ্য শতকরা নব্বই ভাগ পুরুষেরই এই দুর্নাম আছে । অন্যদের কথা বলতে আমি পারব না তবে আমার ক্ষেত্রে কথাটি সর্বৈব সত্য । সত্যিই যদি আমি মহিলাদের মন বুঝতেম তা হলে এই লেখার রং কে বোধহয় রামধনু ও হিংসা করত । ও হ্যাঁ এইটা আবার মোটেই আমার আফসোস বা হতাশা প্রকাশ নয় , তবে নিজের কথা লিখতে বসে যদি সত্যি টাই না লিখতে পারি তা হলে যে সেটা ভারী-রকমের অন্যায় হবে ।


এই অবধি লিখে আরো একটি কথা বলতে ইচ্ছে করছে আমার ।। এখন কথাটা হল ...লিখব তো ! কিন্তু কি লিখব ?আগেই বলেছি যে সত্যি কথা ছাড়া অন্য কিছু লিখতে আমার বড্ড আপত্তি । পরিসংখ্যান বলে শতকরা আশি শতাংশ পুরুষ কিন্তু মহিলাদের চোখে নায়ক হবার লোভ সামলাতে পারে না ; তাই তারা ঠিক এই রকম অবস্থায় কিচ্ছুটি বলে না। বাকি কুড়ি শতাংশের উনিশ শতাংশ-বললেও পুরোটা বলে না । আমাকে সেই সৃষ্টিছাড়া শতকরা এক ভাগ হয়ে উঠতে হবে যে নিজেকে সবটা দেখাতে পারবে , আশাকরি সেই সাহস ও সততা আমি দেখাতে পারব । তোমাকে সেইদিনেও অনেক কথা বলতে পেরেছিলাম আজকেও তা পারব এই আশাই রাখি ।আজকে এইটুকুই থাক ।।


মেসেজ টা সেন্ড করে নিজের ফ্ল্যাটে ফেরে আকাশ । ক্লান্ত লাগছে , একটু গড়িয়ে নেয় । বিকেলে উঠে কিচেনে গিয়ে চা করে , নিজের স্টাডি রুমে গিয়ে বসে । প্রায় সাড়ে ৫ টা একটু পরেই তার ক্লাস টেনের ব্যাচ টা আসবে । কি পড়াবে‌ আজকে তাই দেখছিল আকাশ । কি মনে হল চার্জে বসানো মোবাইল টা একবার খুলে দেখল প্রায় ঘণ্টা খানেক আগেই মেসেজ করেছে মেঘনা ।


- আপনার কথা শুনেই বুঝতে পারছি এই কথা গুলো বোধহয় না বলতে পারলেই আপনি খুশি হতেন । যাইহোক আমি জোর করে শুনতে চাইব না । যদি আপনার বললে নিজের ভালো লাগে তবেই বলবেন । নইলে বলার দরকার নেই ।তবে একটা কথা বলব ? আপনি কিন্তু সত্যিই মহিলা দের মন বোঝেন না । যাক এতদিন পরে সত্যি কথাটা স্বীকার করলেন বলে ভাল লাগল ।।


এই অবধি তো সব মোটামুটি ঠিকই ছিল , মোবাইল টা রাখার ঠিক আগেই সেই মারাত্মক মেসেজ টা এলো ...


- আমারও আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে ... ইচ্ছে হলে উত্তর দেবেন, ইচ্ছে না হলে সেই সময়ের কোন কিশোরীর অবুঝ মনের প্রশ্ন মনে করে উপেক্ষা করবেন । আমার কিন্তু কোনোদিনই আপনার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই বরং বলতে পারেন আজকের আমি হয়ে ওঠার পিছনে আপনার অনেক অবদান । ভালো থাকবেন সোমবার দুপুরে কথা হবে ।


মোবাইলটার দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকল আকাশ । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে মনে মনে বলল ...


- কেন মেঘনা আজকে কেন ? আজকে আর কি জিজ্ঞেস করবে আমায় ?আমি তো আজকে সেইদিনের ছেলেটার ছায়া মাত্র । আচ্ছা সেইদিন কেন কিছু বল নি আমাকে ?? আমিই তো তোমাকে একগাদা কথা বলেই যেতাম ... কি সব বলতাম কেন যে বলতাম ? তোমার কথা টা কেন শুনতে পেলাম না বলো তো ... সেইসময় ?"






পর্ব -


রবিবার দিন টা আকাশের চরম ব্যস্ততার মধ্যে কাটে । একা মানুষ হলে যা হয় আর কি ।সারা সপ্তাহের বাজার করা , গাড়ি ধোয়া , জামা কাপড় লন্ড্রি তে দিয়ে আসা । সব মিলিয়ে মিশিয়ে একেবারে নাজেহাল অবস্থা । অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। সকলের মত এই আকাশ ও খুব যত্ন করে খুব আশা নিয়েই নিজের সংসার টা সাজিয়ে ছিল কিন্তু কেন যে টেকাতে পারল না তার সাধের সংসার টাকে সেইটা সেই কি বোঝে ? ! ইতির সাথে আকাশের আলাপ টা কিন্তু সেই নব্বই দশকের শেষ ভাগেই হয়েছিল শান্তিনিকেতনের বিনয় ভবনে বি. এড. করার সময় । তারপরে কি হল কি করে তাদের বিবাহ হল এবং কেন কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের আলাদা হয়ে যেতে হল সেই সব যতটা বলা সম্ভব ততটুকুই বলব না হয় । গল্পে কোথায় ছিলাম যেন ? হ্যাঁ মনে পড়েছে ...


সোমবার দিনটা এমনিতেই খুব চাপে কাটে আকাশের । অন্য সময় হলে সে ঐদিন নিশ্বাস ফেলতেও সময় পায় না, কিন্তু ওই দিন তার বেশ কটা ফ্রি পিরিয়ড । ক্লাস টুয়েলভ এর ব্যাচ টা পরীক্ষার জন্যে আর স্কুলে আসছে না । আকাশ আবার অফ পিরিয়ড পেলে নিজের ল্যাবে গিয়ে সময় কাটাতে ভালবাসে অহেতুক গল্প গুজবে তার চিরকালীন আপত্তি । আকাশের অবিশ্যি সহকর্মী দের এড়িয়ে যাওয়ার আরো একটা কারণ আছে ইদানীং প্রায় সকলেই তার হাঁড়ির খবর জানতে বড্ড উৎসাহী হয়ে পড়ছে ।দরদ দেখিয়ে কথা শুরু হয় তারপরেই ...


- আচ্ছা আপনার কেস টা ডিভোর্স অবধি ই গড়িয়ে গেল না... শেষ অবধি ?? তবে খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন মশাই !! আজকাল যে কত লোকের জীবন কোর্ট এর চক্করেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ।।


ক্লান্ত , অবসন্ন লাগে আকাশের । তবু মুখে হাসি ফুটিয়ে সে ক্লাস করে যতক্ষণ সে পড়ায় সব ভুলে যায় । পড়াতে পারলেই আকাশ বেঁচে যায় , ভুলে যেতে পারে তার সব জ্বালা যন্ত্রণা । সেই দিন টা ছিল একেবারেই আলাদা ... একে ক্লাস নেই তারপরে আজকের দিনেই তার সেই ভেঙ্গে যাওয়া বিয়ের ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল । মানুষ যে কেন ভুলতে পারে না !!


তিনটের দিকে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট বাবুয়া কায়দা করে কেটে পড়ল । অন্য কেমিস্ট্রির টিচার পাল স্যার ও আজকে অনুপস্থিত । অতবড় একটা ল্যাবে একা একা বোর লাগছে ঐদিকে ফ্ল্যাটে ফিরতেও ইচ্ছে করছে না অগত্যা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ! অনেক গুলো মেসেজ জমে আছে ... উত্তর দিতেও ইচ্ছে করছে না । ঘেঁটে থাকলে বোধহয় এমনই হয় মানুষের । অনিচ্ছে সহকারেই এক এক করে উত্তর দিতে শুরু আকাশ , যতক্ষণ একটু ব্যস্ত থাকা যায় । সকাল ১০ টার দিকে মেঘনা লিখেছে ...


- সুপ্রভাত । কেমন কাটল উইক এন্ড ?


আলগোছে উত্তর দেয় আকাশ ।

- ওই একরকম কাটল । তোমাদের কেমন কাটল ?


বেশ কিছুক্ষণ পরে জবাব এলো ...


- কোথায় ছিলেন সকাল থেকে ? যাইহোক আপনি ফ্রি

থাকলে বলবেন ।


- বলো কি বলছ ?


- কয়েকটা... প্রশ্ন ছিল , ভয়ে করব না নির্ভয়ে ?


- নির্ভয়ে ই করো ।


- আপনি রাগ করবেন না তো ?


- না না রাগ করবো কেন ? এত হেসিটেট করছ কেন বলো তো ? এই শিখিয়েছিলাম তোমাকে ?


লিখেই আকাশের মনে হল বেশী লিখে ফেললাম । ঠিক তাই ...কিছুক্ষণ চুপ করেই থাকল মেঘনা তারপরে বলল।


- সত্যিই কি সবটা শিখিয়ে গেছিলেন ? সেইটা গেলে আজকে তো ... এইভাবে ...


- আজকে এইভাবে কি ?


- কিছু না... প্রশ্নগুলো করি ?


- হুমম... করো কিন্তু তুমি অনেক বদলে গেছ । আগে আমার কথা কাটার সাহস দেখাতে না ।


- সেইটাই কি স্বাভাবিক নয় ? উনিশ বছর সময় টা কি বড় কম সময় বলুন ?


- হুমম ঠিক কথা । বলো কি জানতে চাও তুমি ?


- আপনার মনে আছে শেষ কবে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন ?


- ডেট টা মনে নেই । তবে মাঘ মেলার পরে একটা দিন হবে । ডেট টা পরে বলে দেব মনে করে ।


- যাক এইটুকু যে মনে আছে ... এই আমার কাছে অনেক । আচ্ছা বাদ দিন তার কিছুদিন আগে আপনি আমায় একজনের কথা বলেছিলেন , আপনার কি তার সাথেই বিয়ে হয়েছে ?


- হুমম হয়েছিল ।


- মানে ! কি বলছেন আপনি ? !!


- যেটা সত্যি সেইটাই বলছি ... মেঘনা ।এর বেশি আর কিছু জানতে চাইলে আমাকে লিখতে হবে । সেইটা পরে কোন দিন হোক ?না কি আজকেই সবটা জানতে চাও ?


- না না ... আপনার খারাপ লাগছে ...না ? আমি কেন যে জিজ্ঞেস করলাম ??


- না না ইটস ওকে । তুমি তো অনেক ভাল ভাবে জিজ্ঞেস করলে আমি আজকাল অনেক আক্রমণই সামলে নিচ্ছি । এ আর এমন কি ??


আবার একটা ভুল ...করল আকাশ কিন্তু মেসেজ একবার চলে গেলে আর তো ফেরানো যায় না ।


- আপনি আমাকে সবার সাথে এক করলেন ? আপনি জানেন আপনি আজও আমার কাছে ... থাক বাদ দিন ।


ভুলের পর ভুল ! এই সময় একজনের চুপ করে যাওয়া উচিৎ ছিল । মেঘনা হয়ত সেই চেষ্টা করেও ছিল কিন্তু আকাশ কিছু কিছু জায়গায় বড্ড একগুঁয়ে !!


- থাক বাদ দিন ... মানে ? কেন বাদ দেবো ? কি বলতে চাও তুমি ? কেন এমন আধখানা করে কথা বলো ? পুরোটা বলতে পার না তো ... সেইসব কথা বলো কেন ?


মেঘনা চুপ ।


- কি হল বলো ... এত কথা আজকে জিজ্ঞেস করছ সেইদিন কেন কিছু ই বলো নি ? বলো কেন চুপ করে থাকতে ?


মেঘনা এখনও চুপ ।।


- কি হল বলো ... চুপ করে গেলে কেন ? কেন কোন কথা বলো নি ? সেইদিন ? কেন ?


অনেকক্ষণ পরে টাইপ করা শুরু করল মেঘনা ।


- আপনার সব প্রশ্নের জবাব দেব আমি ,আমার আর একটা প্রশ্নের জবাব দিন ... আপনি । শেষ যেদিন আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন সেইদিন কি বলেছিলেন ওইদিনই আপনার আমাদের বাড়িতে শেষ বারের মত আসা । বলুন কি অপরাধ ছিল আমার যে আপনি আমাকে না বলে চলে গেছিলেন ? কি ভেবেছিলেন আপনি যে ওই কিশোরী মেয়ে আপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে ?? দয়া করে আজ আর কিছু লিখবেন না ? কাল কে ইচ্ছে করলে শুধু এই শেষ প্রশ্ন টার উত্তর দেবেন । আজকে রাখছি ।


- নাহ শুনে যাও ... কেন তোমাকে কিছু বলিনি । কেন বাধ্য হয়েছিলাম ... চলে যেতে ...


- প্লিস আজকে আর না । আমি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না । আমার মোবাইলের স্ক্রিন টা চোখের জলে বারবার পুরো ভিজে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে । প্লিস আমাকে একটু সামলে নেওয়ার সময় দিন... এতদিনের চাপা একটা কথা আজকে বেরিয়ে গেল তো । কালকে কথা হবে ... রাখছি।


- ওকে এসো ... ভাল থেকো ।।


ফোনটা সামনের টেবিল টায় রেখে মাথার চুল গুলো আঁকড়ে ধরে বসে থাকল ... আকাশ । তাই তো মেঘনা এত দিনের একটা কথা ... বেরিয়ে গেলে কান্না তো আসবেই । ঠিক কথা কিন্তু আমার মত মানুষের কি হবে বলো তো ? যারা কোনদিনই সব কথা বলে উঠতে পারে না সেইদিনেও না আজকেও না। আবার তোমার মত কেঁদে হালকা হতেও পারে না ।।






...... চলবে





লেখক পরিচিতি - সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম আর বেড়ে ওঠা আসানসোলে । কলেজ শান্তিনিকেতনে । চাকরি জীবন শুরু শিক্ষকতা দিয়ে । বর্তমানে বিদ্যুৎ সংস্থায় কর্মরত । নাটক ও খেলাধুলার সঙ্গে লেখা লেখি ও ছোটবেলার শহরেরই অবদান । লেখকের বদলে পরিবেশক বললেও সৌরভের আপত্তি নেই । প্রায় সব লেখাই বয়ে চলা সময়ের প্রতিচ্ছবি ।।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮