• সূর্য সেনগুপ্ত

প্রবন্ধ- ফিরে এস চাকা : অনন্য,বৈচিত্র্যময় কবি বিনয় মজুমদার

ফিরে এস চাকা : অনন্য,বৈচিত্র্যময় কবি বিনয় মজুমদার






১৯৬১ সালে এক প্রতিভাধর, গবেষক অঙ্কবিদ তথা শিবপুর বি-ই কলেজের এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লেখা কবিতা সংকলন ‘ফিরে এস চাকা’ যখন প্রকাশিত হল তখন বাংলার সাহিত্য মহলে সাড়া পরে গিয়েছিল। নিমেষে নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল প্রথম সংস্করণ। পরের বছর, ১৯৬২ সালেই প্রকাশিত হল দ্বিতীয় সংস্করণ। বাংলা কবিতার বইয়ের ইতিহাসে দুই বছরের মধ্যে দুটি সংস্করণ প্রকাশের বড় একটা নজির নেই। পাঠক সমালোচকের মননে বিনয় ও ফিরে এস চাকা দুটি এক সত্ত্বা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে, যেমন জীবনানন্দ দাস ও ‘বনলতা সেন‘।


জন্মেছিলেন বর্মাতে, ১৯৩৪ সালে। তারপর পরিবারের সঙ্গে ফিরে এলেন পূববাংলা হয়ে কলকাতায়। তারও পর প্রেসিডেন্সি কলেজ – বি-ই কলেজ – কবিতা। দুর্বোধ্য কবি বলে বিনয়ের খ্যাতি আছে। সেই খ্যাতিকে বিনষ্ট করবার জন্য এই কবিতাটি শুনুন –


আমি গণিতাবিষ্কর্তা, আমার নিজের আবিষ্কৃত

ঘনমূল নির্ণয়ের পদ্ধতিটি বিদ্যালয়ের ঐচ্ছিক গণিতে


অন্তর্ভূক্ত আর পাঠ্য হয়ে গেছে, যেটি

ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর সব বিদ্যালয়ে

পাঠ্য হবে। এর ফলে কুড়ি কোটি ছাত্রছাত্রী আমার গণিত

পড়ে যাবে যতদিন পৃথিবীতে মানুষ ও দেবদেবী রবে।


ব্রহ্মদেশে জন্ম লাভ করে শেষে পূর্ববঙ্গে অজ পাড়াগাঁয়ে

একটি বিলের মধ্যে বাস করে, তারপর কলকাতা এসে

শিবপুর থেকে আমি ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে

এখন গণিতচর্চা এবং সাহিত্যচর্চা করি।

আমার ছেলের নাম কেলো, বৌ রাধা।


শিশুর আহার্যের মত সরল (এটি বিনয়েরই এক কবিতা থেকে নেওয়া) একটি চকিতে আঁকা জীবনচিত্র, কিন্তু কি ভয়ানক অ-বিনয় সুলভ কবিতা। যদিচ সম্পূর্ণ সত্যের প্রকাশ ঘটেছে পঙক্তিগুলিতে, শেষ পঙক্তিটি ব্যতিরেকে – বিনয় বিবাহ করেন নি।


বৈপ্লবিক আবিষ্কারক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খ্যাতির সমুদ্ভব গণিত থেকে হয় নি, ফিরে এস চাকা তাঁকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল কাব্য খ্যাতির সুউচ্চ শিখরে। সুতরাং ‘কে এই চাকা’ এই কৌতূহল কবিতা প্রিয় মানুষের অন্তরে জমে উঠেছিল। এই অতুল প্রতিভাশালী অথচ সিজোফ্রেনিক ব্যক্তিত্বের মানুষটির ভালবাসার পাত্রী ছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী (পরে স্পিভাক)। গায়ত্রীর পদবীর মাঝের ‘চক্র’ কবিতার মাঝে ‘চাকা’ হয়ে স্থিত হয়েছিল। কিন্তু চাকা ঘুরেই চলেছিল কবির জীবনে – চক্রবৎ পরিবর্তন্তে সুখানি চ দুখানি চ! কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যে যে নিভৃত আকুল আবেদন ছিল – ‘ফিরে এস’ – তা পাঠক-আবেগের অনুমোদন পেয়েছিল। সেই আর্তির পরিভাষা শুনুন :


আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছ, ফিরে এসো, ফিরে এসো, চাকা

রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো।

আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন

সুর হয়ে লিপ্ত হব পৃথিবীর সকল আকাশে।


কবি, সমালোচক জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাই) একদা ফিরে এসো চাকাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘গুপ্ত ও ক্লাসিক’। পঞ্চাশ বছরে কেটে গেছে, সেই ক্লাসিকত্ব আজও অম্লান আছে।


প্রথম কবিতার বই ‘নক্ষত্রের আলোয়’ ১৯৫৯ এ প্রকাশ পেল। যা মেধা ছিল মানুষটির তাতে তিনি এক বিরল আঙ্কিক প্রতিভা হয়ে গোটিংজেনে অধ্যাপনা করে ডয়েচে মার্ক্স এ রোজগার করে আর হাইনের কবিতা পড়ে কাটিয়ে দিতে পারতেন, নিদেন পক্ষে আর পাঁচটি পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারের মত কর্পোরেট দুনিয়ায় কর্ম করে ে সংসার পেতে সুখে ঘরকন্না করতে পারতেন। মধ্যবিত্ততা থেকে উচ্চবিত্তত্বেতে উত্তরণ হত হয়তো। কিন্তু, অন্তরের মাঝে কবিতার বসতি আর হৃদয় থেকে চাকার বিদায় তাঁকে এক বিচ্ছিন্ন মানুষে বানিয়ে তুলেছিল। একাধারে বোধগম্য ও দুর্বোধ্য কবিতা লিখেছেন। নিজের কথা লিখেছেন, প্রেমের কথা লিখেছেন, অন্যদের বেঁচে থাকার কথা লিখেছেন।


‘এ জীবন’ কবিতায় নিজেকে প্রকৃতি আর জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন এই ভাবে –

পৃথিবীর ঘাস, মাটি,মানুষ,পশু ও পাখি –

সবার জীবনী লেখা হলে আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা

না হলেও চ’লে যেত বেশ ।


কাব্য সমালোচকরা তাঁকে সুনীল, শক্তি, তারাপদ, সন্দীপনদের অতিক্রম করে জীবনানন্দের সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন “গ্রন্থি”[1]তে তাঁর একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়েছিল। প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উদ্ধৃত করলাম –


গ্রন্থিঃ একটা আলোচিত বিষয় হলো, আপনার কবিতায় জীবনানন্দের রচনারীতির প্রভাব। এই ব্যাপারটা স্বয়ং বিনয়ের মুখ থেকে শুনতে চাই।


বিনয়ঃ (হেসে ওঠেন) আরে, জীবনানন্দের প্রভাব তো থাকবেই। ওর মতো লিখতে পারলে ধন্য হয়ে যেতাম। শক্তি একসময় চেষ্টা করেছিলো, উৎপল কুমার বসুও। (আবার হাসেন) আমি একবার বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী, আলোক সোম আর বাপী সমাদ্দারের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিলাম যে জীবনানন্দ দাশ হলেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। সেটা আটলান্টিক লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেল। সন্দীপ দত্ত আমাকে দেখিয়েছিল তার এক কপি।


গ্রন্থিঃ তাহলে আপনার প্রকৃত মত কী? বাংলা ভাষার সার্থকতম কবি কে, জীবনানন্দ না রবীন্দ্রনাথ?


বিনয়ঃ জীবনানন্দ হলো জটিল......কিন্তু...

(চুপ করে যান একটু অস্বস্তি নিয়ে। তবে কি তার পক্ষপাত রবীন্দ্রনাথের দিকেই? আমরা প্রশ্ন করি কিন্তু আর উত্তর আসে না। কিছুক্ষণের অপেক্ষা। কাঁপা হাতে প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরান, টান দেন উপর্যুপরি।)


এই প্রসঙ্গেই “করুণ চিলের মত” কবিতার ক’টি লাইন বলি –


করুণ চিলের মত সারাদিন সারাদিন ঘুরি।

ব্যথিত সময় যায় শরীরের আর্তনাদে, যায়

জ্যোৎস্নার অনুনয়ে; হায় এই আহার্যসন্ধানে।

আরও একটি কবিতা যেটি এই একই যোগসূত্রে সম্পৃক্ত –

সকল সমুদ্র আর উদ্ভিদজগত আর মরুভূমি দিয়ে

প্রবাহিত হওয়া ভিন্ন বাতাসের অন্য কোন গতিবিধি নেই।

ফলে বহুকাল ধরে অভিজ্ঞ হবার পরে পাখিরা জেনেছে

নীড় নির্মাণের উপযুক্ত উপাদান ঘাস আর খড়।

প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলি জ্ঞান হয়ে ওঠে।


জীবনানন্দর বনলতা সেন যখন চোখ তুলে চেয়েছিলেন, তখন কবির মনে পড়েছিল পাখির নীড়ের কথা। তাঁরই প্রভাবে জারিত অনুজ কবি কাছে সেই পাখি নীড়কে বাস্তবের অভিজ্ঞান হয়েছে।


ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে বিনয়ের কবিতার ধারা খাত পালটাতে শুরু করেছিল। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কবিতার স্রোতে। জীবিকা নির্বাহ হত বিজ্ঞান-রচনার অনুবাদ করে। খুব যে একটা উত্তম নির্বাহ হত তা নয়। সেই সময় সময়ের স্বল্প পরিসরে তিনি হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের ‘হাংরিয়ালিস্ট’ (Hungryalist) পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করলেন। কিন্তু শক্তি, সন্দীপনের সাথে তাঁর পোষাল না। তিনি পরিত্যাগ করলেন হাংরি জেনারেশন। কিন্তু এদিকে হাংরিয়ালিস্টে প্রকাশিত কবিতার মাধ্যমে পাঠকরা এক নতুন

বিনয়ের সন্ধান পেল। এই সময়ের বিখ্যাত কবিতাটির ক’টি লাইন শুনুন –


একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে

দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে

পুনরায় ডুবে গেলো – এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে

বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হল ফল।


তিনি ক্রমশঃ দুর্বোধ্য হতে শুরু করেছিলেন। সিজোফ্রেনিয়া আস্তে আস্তে তাঁর মননকে গ্রাস করতে শুরু করছিল। জীবন ও মরণের ফারাকটা তাঁর কাছে ছোট হয়ে আসছিল। একাধিক আত্মহত্যার প্রয়াসে ব্যর্থ হলেও, সহজ ভাবে জীবনটাকে সঙ্গে করে রাখতেন। বিচলিত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেববাবুকে লিখলেন, “আমার বাঁ কান কালা গত ৩৫ বছর যাবত, আমার বাঁ চোখ কানা গত ৩৫ বছর যাবত, অধিকাংশ দাঁত ভাঙা, সেও গত ১৫ বছর যাবত, আমার কোমরে বাত আছে, আমি ডান চোখ দিয়ে দেখি। ...... আপনি আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। আমার বয়স এখন ৭১ বছর। আমার বয়স অনুযায়ী আমি সুস্থই আছি।


মনোবিজ্ঞান হাসপাতালে তাঁকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর ছাড়া পেয়ে ফিরে এসেছিলেন তাঁর শিমূলপুরের আস্তানায়।কবিতা লিখে চলেছেন, দুর্বোধ্যতা ছেড়ে নিজের জীবন উপজীব্য –


এই পৃথিবীতে আজ এ অবধি আমার সকল কীর্তি , কাজ ইত্যাদির বিষয় স্মরণে এসেছে এখন এই শ্রাবণ মাসের দ্বিপ্রহরে গ্রামাঞ্চলে -- শিমূলপুরের উদ্যানবাটীতে , তবে তার জীবনের বাল্যকাল থেকে এ অবধি যেমন নিচের থেকে খাল বিলে মাছ ধরা থেকে শুরু ক'রে শেষাবধি যে রকম উন্নতি করেছি তার কথা মনে পড়ে , দুপুরের অলস বেলায় । আমি এক কমিউনিস্ট -- এই কথা উচ্চারিত হোক দিকে দিকে পৃথিবীতে -- এ আমার সঙ্গত কামনা ।


২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ঐ শিমূলপুরের বাড়িতে তাঁর জীবনাবসান হয়। তার ঠিক এক বছর আগে তিনি ভারত সরকার প্রদত্ত ভারতের সর্বোত্তম সাহিত্য সম্মান, সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার পান। এর আগে পঃবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বাংলার শ্রেষ্ঠ সম্মান রবীন্দ্র পুরষ্কার পেয়েছিলেন। মানবজাতির প্রতি এর চেয়ে বড় ভালবাসার কথা খুব কম কবি লিখেছেন –


ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম? লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝ’রে যায় – হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না। এ আমার অভিজ্ঞতা। পারাবতগুলি জ্যোৎস্নায় কখনো ওড়ে না; তবু ভালোবাসা দিতে পারি।








নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮