• চন্দন নন্দী

মুক্তগদ্য - এইসব সেরে গেলে..





একটা পাহাড় কিনবো পাবনা নদীর ধারে, একটা নদীও কিনবো। পাহাড়ের ধার ঘেঁষে একটা খামার বাড়ি থাকবে। বর্ষার সময়ে পাহাড়ের গা বেয়ে তীর তীর করে বর্ষার জল পড়বে , তা মিশে যাবে নদীতে। তার কিছুটা আগেই থাকবে আমার খামার বাড়ি। পুনেতে বর্ষার কি রূপ।


একটা পুকুর কাটার ইচ্ছে ছিল , কিন্তু পাহাড়ি মাটিতে সেটা কাটার উপায় আছে কি ? যদি পারি , পুকুরটাকে বাধিয়ে নেবো বেশ । ঘাট হবে লাল ইট বাঁধানো। বাড়ির একটা ঘর হবে পাকা , বাকিটা কাঠের। এরকম বেশ কয়েকটা ঘর থাকবে থাকার জন্য, সামনে বিস্তর জমি থাকবে, নিঙোনো , একটা তুলসীতলা।


সকাল সকাল চলে যাবো মাছ ধরতে , নদীতে। নৌকা থাকবে অনেকগুলো , দাঁড় বেয়ে দুপুর বেলা চলে যাবো অনেক দূরে, আর কিছুটা গেলেই একটা দ্বীপ। কাঠ কুটো তুলে নেবো যত , কিছু ফল। নদীর স্বচ্ছ জলে মাছ দেখা যাবে স্পষ্ট। পাবনা নদীর জলে কি মাছের কমতি ? কত রকমের মাছ ? মিষ্টি জলে রুই , কাতলা , বম্বিস , সুরমাই, সিলেন আরো কত কি। বুড়ো বাগুল হবে আমার সঙ্গী। এই বয়েসেও তার এলেম কমেনি এতটুকু।


সূয্যি যখন অস্তাচলে, ঠিক পাহাড়ের মাঝে, তখন ফিরে আসবো ঘরে. অনেক কাঠ নিয়ে। কাঠের চুলোয় রান্না করবেন গিন্নি। নিবু নিবু আঁচে যখন সারাদিনের পরিশ্রমের পর গিন্নির মুখ রাঙা হয়ে আসবে , তখন কত কথা বলবো দুজনায়। সূয্যি পাটে গেলে পাহাড়ের পাশে ঠাণ্ডা পড়বে খুব। লালপেড়ে শাড়ি পরে বেশ লাগবে , আমি খুঁজবো আমার দশ বছর আগের বিয়ে করা ছোট্ট বৌটিকে।


চা চাইবো তার কাছে চোদ্দবার। নকল রাগ করবে সে। বাঁশি বাজিয়ে সে অভিমান দূর করবো। হ্যাঁ হ্যাঁ জানি , বাঁশি শিখিনি এখনো , তবে শিখবো। বুড়ো বাগুলের কাছে। সে যে পাক্কা বাঁশুরিয়া, বড়ো সুন্দর বাঁশি বাজায় সে।


মানঅভিমানের পালা শেষ হলে , তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বলবে , নিকোনো উঠোনে প্রদীপের নিভু নিভু আলোতে এক অপূর্ব পরিবেশের সৃষ্টি হবে।


অনেক গুলো হাঁস থাকবে আমাদের , পুকুরে দিব্বি খেলে বেড়াবে। মেষপালক রাখবো আমি , ওই দূরের গ্রাম থেকে ওরা আসবে। ওদের সাথেই যাবো মেষ চড়াতে , পাহাড়ি পথ ধরে , সময় স্থির হয়ে থাকবে। কে বলে সময় আর স্রোত নাকি কারুর জন্য অপেক্ষা করে না ? ওরা ফিরে ফিরে আসে আমাদের জন্য , আমরা সবুর করি না।


রাতে হ্যারিকেনের আলোয় না পড়া বইগুলো শেষ করবো , জানি শেষ হবে না , তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।


আর কিছুদিন বাদে ঈশান কোণে দেখা দেবে কালো মেঘের সারি। আষাঢ় মাসের প্রথমেই কালো মেঘে ঢেকে যাবে আকাশ, ঝম ঝম করে শুরু হবে প্রবল বর্ষণ। প্রবল বর্ষায় পাবনা হবে বেগবতী , পূর্ণ যৌবনা। পাহাড়ি নদী , তাই বর্ষাতেই পাবনার বাড়বাড়ন্ত। খামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনের জঙ্গলটা পার করলেই নদী।


প্রথম বর্ষায় আমরা দুজনায় খুব ভিজবো। সোঁদা মাটির গন্ধ আসবে ,থাকবে পাহাড়ি ফুলের ঘ্রাণ। প্রাণ ভোরে শুষে নেবো সেই সেই গন্ধ - প্রাণবায়ু বাড়বে। আনন্দে হবো আত্মহারা।


বর্ষার এইসময় আমি আর আমার গিন্নি বেশিরভাগ সময়টা ঘরের মধ্যেই কাটাবো। টিনের চালে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ার একটা শব্দ। দিনের বেলায় ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেলে চারিদিকে নেমে আসবে অন্ধকার।


ঘরের চৌখাটটা পেরোলেই বড়োসড়ো রান্নাঘর। কাঠের চুলোয় বৌ পেঁয়াজি ভাজবে। এখানে মারাঠিরা একে কান্দাভাজি বলে। চায়ের সাথে বর্ষার ঝুম ঝুম শব্দ শুনতে শুনতে পেঁয়াজি খাওয়ার মজাই আলাদা।


আস্তে আস্তে আধার নেবে আসবে। কাছের জঙ্গল থেকে ভেসে আসবে নানারকম ব্যাঙের গ্যাংওর গ্যাং। সোনা ব্যাঙ , কোলা ব্যাঙ ছাড়াও আছে গেছো ব্যাঙ। আর ক্রমাগত ঝি ঝি পোকার আওয়াজ।


সময় পেলে ছুটি নিয়ে আসবে আমার দুই মেয়ে। মাম্মা আর পিনু। বাচ্চাদের কলরবে ভোরে উঠবে ঘর। দিনের বেলা ওদেরকে বেড়াতে নিয়ে যাবো সেই দ্বীপে যেখানে এখনো মানুষের পা পড়েনি। সারাদিন পাহাড়ের চারিদিকে ঘুরে বেড়াবো আমরা চার জনায়। আমি , মাম্মা , পিনু আর বুড়ো বাগুল। বুড়ো বাগুল ওদের বাঁশি শেখাবে। পাহাড়ের ধারে অনেক উঁচুতে বাঁশি বাজাতে বাজাতে তন্ময় হয়ে উঠবে সে। নিচের উপত্যকা থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসবে সেই মিঠে পাহাড়ি সুর।


পাহাড়ের নাম রাখিনি এখনো। পাহাড়ি গ্রামের লোকজনকে বলেছি একটা নাম দিতে। নাম দিতে পারে মাম্মাও। কল্পনায় ওর নিজের একটা রাজ্য রয়েছে - পালগুড়ি। ওদের ভাষার নাম পালগুড়ি ভাষা। ওর কল্পনায় দেবী দুর্গার নাম দুর্গা উটটু, মানে দেবী দুর্গা।আমি অবশ্য সেই ভাষা বিশেষ জানিনা। ও নিজেও জানে কিনা সন্দেহ।


রাতে দুই মেয়েকে নিয়ে বসবো আমার স্টাডি তে আরাম কেদারায়। ওদের শোনাবো দেশি বিদেশি গল্প। চায়ের আসর বসবে। রুমঝুম শব্দ বাজলে বুজতে পারবো গিন্নি এসেছে চা নিয়ে। অনেক রাত অবধি চলবে সেই আসর।



উজাড় করে ওদের ভালোবাসবো , শোনাবো আমার অভিজ্ঞতার কথা , আমার সাফল্য ব্যর্থতার কথা। জীবনের কথা , মানুষের কথা। আমার ঈশ্বর উপলব্ধি। জানি জানি , সব কি আর বুঝবে ? সে না বুঝুক। নতুন প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যাবো , যাতে ওরা মানুষের মতো মানুষ হয়।


ছুটির শেষ হলে ওরা ফিরে যাবে শহরে। আমরা থেকে যাবো পাহাড়ি মাটিতে, ঝরে পড়া পাতার মতো। পাহাড় , নদী কি কখনো ফিরে যেতে পারে ? ওরা যে শহুরে নয়।


এসব সেরে গেলে জীবনকে জড়িয়ে ধরবো দুই হাতে। তুমি কি থাকবে আমার সাথে ?












লেখক পরিচিতি - লেখক চন্দন নন্দী মনে করেন লেখকের পরিচিতি তাঁর লেখায় । বর্তমান নিবাস পুনায়। আদি নিবাস পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাসাত। ভালো খাবার খেতে বড্ডো ভালোবাসেন। আবার একই সাথে সুরসিক। গান বাজনা , বই , লেখালিখি নিয়েই থাকতে ভালোবাসেন। কোনোমতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে , তারপর আর ঐমুখো হননি। আড্ডা মারতে খুব ভালোবাসেন। আবার অনর্গল বকে যেতে পারেন , তবে শুনতে উৎসাহী নই । ঈশ্বরে প্রবল বিশ্বাস - মা ভবতারিণী , ঠাকুর রামকৃষ্ণ আর কানাইয়ের ভক্ত। খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসেন। সুগার হাই তাই ওই রস থেকে বেশিরভাগ সময় বঞ্চিত করে রেখেছেন গিন্নি।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮