• রূপম গুহ খাসনবীস

ধারাবাহিক বড়গল্প - রক্তাক্ত অর্কিড


পর্ব - ১



মোড়টা ঘুরতেই রজতের মুখে এসে ঝাপটা মারলো কুয়াশা ঘেরা দমকা বাতাস ! গাড়ির উইন্ড স্ক্রীনটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল ঘন কুয়াশায় ! আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথটা এগিয়ে চলেছে কার্সিয়াং এর ডাওহিল স্কুলের দিকে !


মাস ছয়েক হলো রজত বদলি হয়ে এসেছে কার্সিয়াং পুলিশ স্টেশনের বড়বাবুর পদে ! ছোট্ট পাহাড়ি শহর ! অসাধারণ সুন্দর ! সরল সাদাসিধে মানুষ জন ! ক্রাইম বলতে সেরকম কিছুই নেই কিছু পলিটিক্যাল অশান্তি ছাড়া ! কিন্তু মাস দুয়েক হলো অদ্ভুত এক সমস্যা খুব ভাবাচ্ছে ! এই দু মাসে চার জন নিখোঁজ ! সবাইকেই শেষ বারের মত দেখা গেছিলো ডাওহিল স্কুলের আশেপাশে !


এই নিখোঁজ লোকেদের খোঁজ করতে গিয়ে বেশ সমস্যায় পরতে হচ্ছিলো রজতকে ! কারণটা খুবই অবাক করার মত ! বেশীর ভাগ পুলিশকর্মীরাই ডাওহিল স্কুলের আশেপাশে যেতে নারাজ ! এমনকি সাসপেন্ড করলেও নয় ! কেন তা নিয়েও কেউ মুখ খুলছিলো না ! অবশেষে 'মোয়লা' নামে এক ড্রাইভারের কথা শুনে কারণটা কিছুটা বুঝতে পারে রজত ! ঘটনাটা বেশ চমকপ্রদ !


কার্সিয়াংয়ের ডাওহিল নাকি ভৌতিক এলাকা বলে পরিচিত সবার কাছে ! এই ডাওহিলের মধ্যেই রয়েছে ডাওহিল গার্লস স্কুল ! অসাধারণ সুন্দর এই স্কুল হেরিটেজ সম্মানপ্রাপ্ত ! ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ আমলে স্যার অ্যাশলে ইডেন এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ! প্রথমে এই স্কুলে শুধু ছেলেরা পড়ত ! তারপর সেই ছেলেদের ভিক্টোরিয়া স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয় ! আর এই স্কুল খুলে দেয়া হয় মেয়েদের জন্য ! পরবর্তী কালে নাকি একটা ছোট বাচ্চার মুণ্ডহীন শরীর মাঝে মধ্যেই দেখে অনেকে ! সে নাকি নাকি রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ায় ! অনেকের মতে এই রাস্তায় অনেকই পথ হারায় আর বেশিরভাগ সময়ই তারা আর ফিরে আসেনা না ! ডাওহিল স্কুল থেকে রাতে এখনও ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ !


এর পর অনেকের সঙ্গে কথা বলে রজত বুঝতে পারে এই গল্প সকলেরই জানা ! কেমন জানি রহস্যের গন্ধ পেতে থাকে সে ! অজান্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার ! নিশ্চই এই প্রচলিত ভৌতিক গল্পের আড়ালে কোন বড় ক্রাইম হচ্ছে !






পর্ব - ২



যে চারজন নিখোঁজ তাদের আত্মীয়-স্বজনদের জেরা করে কোনো ক্লু এখনও পায়নি রজত ! দুদিন ডাওহিল স্কুল এবং তার আশপাশের রাস্তা আর জঙ্গলেও বেশ খানিকটা খোঁজা খুঁজি করেছে ! কোন কিছুরই সন্ধান মেলেনি ! তবে শহর থেকে যে রাস্তাটা স্কুল অবধি গেছে সেটার আশপাশ খোঁজ করা গেলেও তার পর যে সরু সাপের মত রাস্তাটা একেবেঁকে জঙ্গলে হারিয়ে গেছে সেটায় যাওয়া সম্ভব হয়নি ! কারণ ওই রাস্তায় হাবিলদার থেকে ড্রাইভার কেউই যেতে নারাজ ! ওই রাস্তাটার নাম 'ডেথ রোড' ..... ! এবার সে পথেই যেতে হবে তাকে ! প্রয়োজনে একাই !


সবে পাহাড়ের কোণে দেখা দিয়েছেন বরুণদেব ! বিশাল বিশাল পাইনের জঙ্গলের মাঝে কালো পীচের রাস্তা আঁকা বাঁকা পথে উঠে গেছে উপরের পথে ! মেঘগুলো নেমে এসেছে অনেক নিচে যেন স্পর্শ করতে চাইছে রজতের শরীর ! ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়ালো রজত ! গভীর চিন্তায় মগ্ন ! সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি ! কেসটা সলভ না হওয়া অবধি এরকমই চলবে সে জানে ! এটা তার বরাবরের স্বভাব !


একটা বোলেরো এসে দাঁড়ালো বাড়ির সামনে ! গাড়ি থেকে নামলেন এই বাড়ির মালিক বিনয় গুরুং ! নামটা সার্থক ! ভদ্রলোক অসম্ভব বিনয়ী এবং স্বল্পভাষী ! খুবই ভদ্র ! বয়স ষাটের কোটায় তো হবেই !

"কেমোন আছেন রোজোতবাবু ?"

"ভালো ! আপনি ?"

"আমিও ভালো ! কুনো ওসুবিধা হচ্ছে না তো ? হোলে জানাইবেন কিন্তু !"

"না না .. কোন অসুবিধা নেই ! তা এতো ভোরে কোথা থেকে ?"

"আর বোলেন কি, রাতে দুকানের ঠিক পাশে ধস নেমেছে .. সেটোই দেখতে গেছিলাম !"

"সেকি ? সব ঠিক আছে তো ?"

"হ্যাঁ হ্যাঁ ! সোব ঠিকই আছে !"

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেন বিনয়বাবু ! গাড়িটাও পাহাড়ি পথে মিলিয়ে গেলো চোখের আড়ালে ! ভদ্রলোকের নার্সারীর ব্যবসা ! কার্সিয়াং মেন বাজারে ওনার দোকান আর পাহাড়ের বেশ কিছু এলাকায় জমি আছে যেগুলোতে গাছের চারা টারা তৈরী করা হয় !

হঠাৎই মোবাইলটা বেজে উঠলো ! এত ভোরে ? একটু অবাকই হলো রজত ! নম্বরটা কার্সিয়াং থানার ! "সাহাব, ডিয়ার পার্ক কে বগল মে এক বডি মিলি হ্যায় !" ..... গায়ে জড়ানো চাদরটাকে খুলতে খুলতে বারান্দা থেকে ঘরের দিকে এগিয়ে চললো রজত !




পর্ব - ৩




ডাওহিল স্কুল থেকে একটু এগিয়েই ডিয়ার পার্ক ! পাইনের পাতা বিছিয়ে আছে মাটিতে, স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা ধরা গুঁড়িতে সকালের নরম পাহাড়ি রোদ এসে আঁকড়ে রয়েছে ! নুয়ে থাকা ফার্নের দল যেন নতুন স্বপ্নের সন্ধান পেয়েছে সূর্যের আলোয় ! মাথার উপর নীল আকাশ আর পায়ের নিচে সিক্ত পাহাড়ি পথ ! জঙ্গলের মাঝে পরিতক্ত কাঠের এক জনশূন্য বাড়ি ! চারিদিকে ফুটে আছে নাম না জানা অসংখ্য রঙ বেরঙের পাহাড়ি ফুল ! সময় যেন কেমন থমকে গেছে হঠাৎ করেই !


"ইধর আইয়ে সাহাব" ..... হেড কনস্টেবল কুমারের গলার স্বরে সম্বিত ফিরে পেলো রজত ! পরিত্যক্ত বাড়ির পেছন দিকে শেওলা ভরা একটা জলাশয় ! বহু বছর যে এদিকে কেউ আসেনি তা চারিদিক দেখলেই বোঝা যায় ! লাশটা পড়ে আছে জলাশয়ের ঠিক পাশেই ! চেনার কোন উপায় নেই ! মুখটা যেন কিছুতে খুবলে নিয়েছে ! হাতটা মুঠো করা ! অনেক কষ্ট করে মুঠো খুলে সেরকম কিছুই পাওয়া গেলো না ! শুধু দলা পাকানো কোন পাহাড়ি ফুল বা পাতা হবে হয়তো ! এতো জোরে চেপে ধরা যে একদম চেপ্টে গেছে ! লাল, সবুজ আর সোনালী রঙের ! সেটার এক টুকরো পাউচ প্যাকে সংগ্রহ করে রজত ! লাশটা পোস্টমার্টমের জন্য পাঠিয়ে পরিতক্ত বাড়ির ভেতরটা খুঁজে দেখতে ঢুকে পরে রজত ! ভেতরটা অন্ধকার ! মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বেলে এগিয়ে চলে সে ! বিশাল বাড়ি ! ভেতরটা নানা আগাছায় জঙ্গল হয়ে উঠেছে ! কোন রকমের জঙ্গল সরিয়ে চলতে থাকে রজত ! প্রায় এগারোটা ঘর ! শেষ ঘরটায় এসে থমকে যায় ! ঘরটা যেন অন্য ঘর গুলোর তুলনায় একটু পরিষ্কার ! ফ্লাশ লাইটের আলোয় সারা ঘরে তল্লাশি চালায় রজত ! সেরকম কিছুই আধো আলোয় চোখে পড়ে না ! ওই ঘর থেকে বেড়িয়েই দেখে বাড়ির পিছনের দিকে অন্তত ৪০০ ফুট গভীর খাদ ! যেন সাক্ষাৎ গিলে খাবে ! টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে ! পাহাড়ে এমন হঠাৎ করে আবহাওয়া পরিবর্তন হয়েই থাকে ! ঘন কুয়াশায় সামনে কিছু দেখা যাচ্ছেনা ! দুপাশের ফার্ন গাছগুলো কেমন যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে ! পাইন গাছ থেকে ঝরে পড়া জলবিন্দুর শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে ! একটু দূরে পাথরের আড়ালে কিছু একটা যেন নড়ে উঠলো ! মনে হলো ছায়ার মত কিছু যেন সরে গেলো ! ছুটে সেই পাথরের আড়ালে গিয়ে কিছুই নজরে এলোনা রজতের ! তবে কি সত্যিই ভৌতিক কিছু ? না কি বড় কোন রহস্য লুকিয়ে আছে এই ডাওহিলের জঙ্গলে ?









...... চলবে





লেখক পরিচিতি - রূপম গুহ খাসনবীস ছোটবেলা কেটেছে আসানসোলে। সেখানে পড়াশোনা শেষ করে তারপর কর্ম সূত্রে কলকাতা নিবাসী। অবসর জীবনের সাহিত্য চর্চার সাথে রুপম একজন সংগীত শিল্পীও।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮