• অপরাজিতা

প্রচ্ছদ কাহিনী - বৃক্ষবৎ





(অলংকরণে রাজশেখর দে)


প্রথম পর্ব



সেদিনও ছিল অন্য দিনগুলোর মতন সাধারণ একটা দিন। শহরতলির পাড়ায় পাড়ায় তখন সকালের ব্যস্ততা। তৃণাও তৈরি হচ্ছিলো কলেজে যাওয়ার জন্য। সবে চুলগুলো উঁচু করে বেঁধে স্নান করতে ঢুকবে, এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। একটু বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলেই ওর মুখটা ঝলমলিয়ে উঠলো- ফোনের পর্দায় শ্যামলের ছবি দেখে।

“বল, তাড়াতাড়ি বল্, কলেজের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম।”

ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শ্যামলের- “আরে, আজও বোধহয় কলেজে যাওয়া হবে না রে। আমাদের পাশের পাড়ায় আজ সকাল থেকে রাস্তা প্রসারণের কাজ শুরু করেছে।”

“তার মানে রাস্তার দুধারের সারি বাঁধা দেবদারু- অশ্বত্থ- বটগুলোকে কেটে ফেলছে!” প্রায় ককিয়ে ওঠে তৃণা।

"হ্যাঁ রে, তুই আর দেরি না করে চলে আয়। আমি ছাড়ছি।"

“শোন শোন, প্রফেসর চ্যাটার্জিকে জানিয়েছিস?”

“ওঃ, ভালো কথা মনে করালি। তুই ই নাহয় একেবারে ফোন করে স্যারকে নিয়ে আয়।”

“ঠিক আছে। তুই কিন্তু একা যাস না। কিশলয় সঙ্ঘের বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যা।

“ওকে ম্যাডাম! যথা আজ্ঞা!” একটু লঘু স্বরে কথাগুলো বলেই ফোনটা কেটে দিল শ্যামল।

তৃণা চট্‌পট্‌ প্রফেসর চ্যাটার্জি মানে ওদের কলেজের বোটানির প্রফেসর অস্তিত্ব চ্যাটার্জিকে ফোন করে তৈরি থাকার কথা বলে দিল।

তারপরে কোনোরকমে কাকচান করে, নাকে মুখে দুটো গুঁজে স্কুটি নিয়ে ছুটল নতুনপল্লীর বড় রাস্তার দিকে।


এই তো কয়েক বছর আগের কথা। প্রতি রবিবার ওরা সদলবলে যেত নতুনপল্লীর তথাকথিত “planned highway”র ধারে। প্রতিটা বড় গাছের গায়ে এঁকে দিয়েছিল ওরা ব্যান্ডেজ জড়ানো ক্ষতস্থান ও তার থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তধারা। ওদের এই “Installation Art”-এর মূল কর্ণধার ছিলেন প্রফেসর চ্যাটার্জি। উনি এই পরিকল্পনা করেছিলেন মুম্বাই এর ‘ক্যুইন্স ওয়ে’ দেখে। প্রথমে বেশ সাড়া পড়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রে স্যারের সাক্ষাৎকার, গাছের গুঁড়িতে ওদের শিল্পকর্মের ছবি ছাপা হওয়ায় প্রশাসন ও নড়ে গিয়েছিল। মৌখিক প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায় যে বড় গাছগুলো শিকড় সমেত উপড়ে পুনরায় রোপণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে বোধহয় তা ঘটছে না। এইসব এলোমেলো চিন্তা করতে করতেই প্রফেসর চ্যাটার্জির একটেরে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল তৃণা। প্রফেসর তৈরিই ছিলেন। সময় নষ্ট না করে দুজনে বড় রাস্তার দিকে রওনা হলেন।


নতুনপল্লীর বড়রাস্তায় পৌঁছতেই ওরা মানুষের জটলা দেখতে পেল। পুরসভার কর্মীরা তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে গাছ কাটার জন্য তৈরি। আর শ্যামল উত্তেজিত হয়ে ওদের সাথে কথা বলে চলেছে- বোধহয় বোঝানোর চেষ্টা করছে। স্থানীয় সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও ফোটোগ্রাফারদেরও দেখা গেল ভিড়ের মধ্যে।


শ্যামল বিনম্র স্বরে বলে- “শুনুন, পুরসভার চেয়ারম্যান কথা দিয়েছিলেন যে গাছগুলো কাটা হবে না।“

একজন পুরকর্মীর কাটা কাটা উত্তর আসে- “আমরা অর্ডার পেয়েই কাজে নেমেছি। আপনাদের উনি কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা আমাদের জানা নেই।”


তৃণা এক নজরে চারিদিকটা দেখে নেয়। বড় গাছগুলো কাটার তোড়জোড় চলছে। ছোটগুলোর দিকে এখনও নজর যায়নি মনে হচ্ছে। অজস্র রাখী বাঁধা আছে ছোট চারাগুলোর কচি ডালে। এটাও স্যারের নেতৃত্বে করা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিশলয় সঙ্ঘের গোটা কুড়ি কিশোর কিশোরী দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাকি পথচলতি মানুষ, কেউ কৌতূহলে দাঁড়াচ্ছে কিছুক্ষণ- কেউ বা আড়চোখে তাকিয়ে চলে যাচ্ছে।


প্রফেসর চ্যাটার্জি মোবাইলটা নিয়ে বারবার ফোন করার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু চেয়ারম্যানের লাইন ব্যস্তই থাকে। শ্যামল কিশলয়ের সদস্যদের নিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আলোচনা শুরু করে। ‘কিরণ’ নাম্নী এক তন্বী কিশোরী বলে ওঠে- “চলো, আমরা চিপকো আন্দোলনের মতো গাছগুলোকে জড়িয়ে থাকি। তাহলে তো এরা কাটতে পারবে না।“ আলোক নামক কিশোর উত্তরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে- “বড় বড় কথা বলিস‌ না তো! খেজলির কথা মনে আছে?” তৃণা এগিয়ে আসে- “ভয় পেলে চলবে না ভাই। চলো, আমরা চিপ্‌কো আন্দোলনের মতো করে গাছগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করি।”


বেলা গড়িয়ে যায়। কিশলয়দের চেষ্টায় গোটা পাঁচেক গাছ বাঁচলেও অনেক প্রৌঢ় গাছ তাদের ডালপালা আর পাখীর বাসা নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। রক্ত ঝরার ছবিগুলো গোধূলির ম্লান আলোতে বিষণ্ণতা মেখে পড়ে থাকে। প্রফেসর চ্যাটার্জি ওইরকম একটা কেটে ফেলা গুঁড়িতে হাত রেখে নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নামে। দিনশেষে পাখীরা এসে ভেঙে যাওয়া বাসার খোঁজে ডানা ঝাপটিয়ে যায়।


ক্লান্ত পরাস্ত প্রফেসর উঠে দাঁড়ান। তৃণা-শ্যামলের দিকে তাকিয়ে ফিস‌ফিসিয়ে বলেন- “গন্ধ পাচ্ছ? তীব্র- মধুর- তিক্ত গন্ধ? ঘাম- রক্ত- ফুলের সুবাস মেশানো গন্ধ?”

দুজনেই অবাক হয় আকস্মিক এই বিষয় পরিবর্তনে। মাথা নেড়ে জানায় যে তারা কোনও গন্ধ পাচ্ছে না।

“বুঝছ না, কাটা গাছগুলো যন্ত্রণায় V.O.C. অর্থাৎ Volatile Organic Compounds ছড়াচ্ছে। ওরা আশেপাশের গাছেদের আগাম বিপদের সঙ্কেত পাঠাচ্ছে। কিন্তু পাঠালে কি হবে, ওদের কাছে তো অস্ত্র নেই। ওদের বোবা কান্না তাই একে অপরকে ছুঁয়ে হারিয়ে যায়, কোনও প্রতিকার হয় না।”

“স্যার, এখন বাড়ি চলুন। এখন তো আর কিছু হবে না। আজ সবাই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করি। কাল একটা কিছু উপায় বের করবই।“ এক নিঃশ্বাসে বলে যায় তৃণা।

“কাল!” একটা দীর্ঘনিঃশ্বাসের সাথে হাহাকারের মতন শোনায় স্যারের গলা। “চলো তাহলে।”

শ্যামল এবারে তার বাইকে প্রফেসরকে বসায়। আগে তৃণাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তারপরে স্যারকে তাঁর বাড়িতে ছাড়ে। কেউই বিশেষ কথা বলে না। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশ ভাসিয়ে নিস্তব্ধ জ্যোৎস্নায় যেন পৃথিবীর সব কান্না ধুয়ে ফেলতে চায়।

পরের দিন সকালে তৃণা-শ্যামল প্রফেসরকে আর খুঁজে পায় না। যেন এক রাত্রে হাওয়ায়ে মিলিয়ে গেছেন ভদ্রলোক। ফোন বন্ধ, social media-র সব account বিকল- এক নিমেষে যেন নিজের অস্তিত্বকেই নিশ্চিহ্ন করে হারিয়ে যান প্রফেসর অস্তিত্ব চ্যাটার্জি।

ওদিকে সামান্য বাধা সত্ত্বেও সব গাছ কেটে ফেলে ৮ লেনের হাইওয়ে তৈরির কাজ শুরু হয় জোরকদমে। শ্যামল সবুজ শহরতলি দ্রুতগতিতে ইট কংক্রিটের রুক্ষ উদীয়মান শহরে পরিণত হয়।




দ্বিতীয় পর্ব




কুড়ি বছর পরের কথা। সেদিনের শহরতলি আজ অত্যাধুনিক শহর বা তথাকথিত “স্মার্ট সিটি।” সেই শহরের আকাশচুম্বী এক আবাসিকের তিরিশ তলায় শ্যামল-তৃণার ভালোবাসার নীড়। সেই ফ্ল্যাটের একফালি বারান্দায় যেদিন এক চিলতে রোদ্দুর এসে পড়ে- সেদিন সাত বছরের ছোট্ট তৃষার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে কাঁচের দরজা খুলে এক দৌড়ে বারান্দায় দাঁড়ায়- যদি ধুলো- ধোঁয়ার আবছায়ার মাঝে একটুখানি নীল আকাশ দেখা যায়। কিন্তু তার তো উপায় নেই। ছোটবেলা থেকেই একরাশ বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয় তাকে। তার যে জন্ম থেকেই ফুসফুসের শ্বাসনালীগুলো ভারি লাজুক- এক কণা ধুলো/ particulate matter ঢুকলেই তার শ্বাসনালীর বিভিন্ন অংশ লজ্জায় সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে শুরু হয় হাঁপানির টান। পাতলা লাল ঠোঁট, লম্বা ফরসা গোলাপি নখ- সব নীল হয়ে যায়। আর নাকের পাটাদুটো ফুলে ফুলে ওঠে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টায়। তখন অক্সিজেন দাও, নেবুলাইজ করো, ইঞ্জেকশান দাও- হাজারো হ্যাপা। তাই তৃষাকে থাকতে হয় তুলোয় মোড়া হয়ে। বাইরে বেরনো তার কাছে তাই বিলাসিতা। শ্যামল-তৃণা অনেক চেষ্টা করেছে একটু দূষণ মুক্ত জায়গায় ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পৃথিবীতে আজ আড় সেরকম বাসযোগ্য দূষণহীন জায়গা নেই। যাদের সামর্থ্য আছে তারা মঙ্গলগ্রহের নতুন জনপদে চলে যাচ্ছে স্থায়ীভাবে। শ্যামল-তৃণার ধরাছোঁয়ার বাইরে এই সমাধান। তাই অগত্যা চরম সাবধানতা পালন করেই দূষিত পৃথিবীতে বেড়ে ওঠে ছোট্ট তৃষা।


কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু গোলমালটা শুরু হল কালীপূজোর পরে। AQI ৫০০র উপরে উঠে যাওয়ায় সুস্থ লোকেদেরও স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে শুরু করলো। বায়ু বিশোধক যন্ত্র লাগিয়ে, মুঠো ভরে ওষুধ খেয়েও তৃষার ফুসফুসের প্রবেশদ্বার অক্সিজেনের জন্য খুলতে নারাজ হয়েই রইল।

সেই রাতে শ্যামল ও তৃণা খুঁজতে শুরু করলো পৃথিবীর অবশিষ্ট জঙ্গল। মানুষের বাসযোগ্য না হলেও ওরা অস্থায়ী কিছু বন্দোবস্ত করে নেবে। সার্চে বেশী কিছু পাওয়া গেল না, গোটা পাঁচেক অবশিষ্ট জঙ্গলের মধ্যে শুধু বিদেশী জঙ্গলের নাম- Poland-এর Crooked Forest, Russia-র Dancing Forest… আরে, কি আশ্চর্য ! প্রায় সাড়ে চারশো মাইল দুরেই আছে দণ্ডকারণ্য। কিন্তু গুগল বলছে সেটা বড়ই দুর্গম জায়গা। বেশ কিছু বছর আগে কয়েকজন কাঠের চোরাকারবারি ওখানে ঢুকেছি, কিন্তু কেউই আর ফিরে আসে নি। ওই জঙ্গলের চারদিকে ছোট ছোট নদী ছিল- সেগুলো আজ শুকিয়ে ধূ ধূ মরুপ্রান্তরের রূপ নিয়েছে। দণ্ডকারণ্যের কাছে কোনও জনবসতিও নেই- নিকটতম উন্নয়নশীল গ্রাম প্রায় ৫০ মাইল দূরে। এরকম জায়গায় অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে যাওয়া এবং থাকা কি সম্ভব? সেই আলোচনা করতে করতেই আনমনে কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে থাকে দুজনে। নতুন ই-মেল দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা হারিয়ে যাওয়া কিন্তু অতিপরিচিত নাম- প্রফেসর অস্তিত্ব চ্যাটার্জি। এত বছর পরে! তাড়াতাড়ি ই-মেলটা খোলে শ্যামল। খুব সংক্ষিপ্ত নৈর্ব্যক্তিক লেখা-

“Time can never mend

The careless whispers of a good friend

To the heart and mind

Ignorance is kind.

There’s no comfort in the truth

Pain is all you’ll find.”

সত্যটা জানতে চাইলে দণ্ডকারণ্যে দেখা কর।– অ. চ্যাটার্জি

“এটা কি অলৌকিক ব্যাপার বলতো!” তৃণার গলায় অপার বিস্ময়। “এখনি আমরা দণ্ডকারণ্যের সন্ধান করছিলাম। আর এখনই সেখান থেকে এলো আমন্ত্রণ!”

“হুঁ, কিন্তু কিছু জোচ্চুরি নেই তো? আমরা এখনি ওয়েব এ সার্চ করছিলাম। সেই তথ্য তো ইন্টারনেট এ ছড়িয়ে গেছে” শ্যামলের গলায় ক্লান্তি ও সংশয় ফুটে ওঠে।

“আরেকবার মেলটা ভালো করে পড়‌, তো।”

“ঠিক আছে দেখি ” কিন্তু মেলটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না, অটো ডিলিট হয়ে গেছে!

“একটা কথা মনে হচ্ছে আমার,” তৃণা বলে; “Careless whisper তোর প্রিয় গান, কলেজ ফেস্টিভ্যালে গেয়েছিলি তুই- এটা তো আর ইন্টারনেট জানে না। কিন্তু স্যার জানতেন।“

“তা ঠিক”- শ্যামলের দ্বিধা কাটে না।

“আমাদের খোঁজা এবং স্যারের চিঠি পাওয়াটার যোগাযোগ নেই- কাকতালীয় ব্যাপার”- তৃণা নিজের সাথে সাথে শ্যামলকেও আশ্বাস দেয়।

“বলছিস? তাহলে একটা চান্স নিয়েই দেখি” শ্যামল নিমরাজি।

“অনেক রাত হলো, এখন শুয়ে পড়া যাক। কাল থেকে প্রস্তুতি শুরু।” তৃণা উঠে পড়ে শোয়ার তোড়জোড় করতে।




তৃতীয় পর্ব







কালো কাঁচে ঢাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল গাড়িটা ছুটে চলেছে দণ্ডকারণ্যের দিকে। অনেক ভেবে, অনেক বাদানুবাদের পরে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তৃষাকে সাথে নিয়ে এসেছে শ্যামল-তৃণা।

প্রায় এক ঘণ্টার উপর হয়ে গেছে, রাস্তা ছেড়ে এবড়ো খেবড়ো নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে চলছিল গাড়িটা। পোক্ত ড্রাইভার- অনেক খোশামোদের পরে রাজি হয়েছিল এই জনশূন্য প্রান্তরে আসতে। চড়া পড়ে যাওয়া নদীর স্মৃতিরেখার কাছে এসে গাড়ি থেমে যায়।

“গাড়ি আর যাবে না বাবু, বালির মধ্যে চাকা আটকে যাবে। কিংবা চোরাবালিতে আটকে যাবে। ওই তো দণ্ডকারণ্য দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে আপনারা হেঁটে যেতে পারেন।”


অগত্যা জিনিসপত্র নিয়ে নেমে পড়ে তিনজনে। অতি সাবধানে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে পার হয় শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালুচর। কিন্তু গাছের সারির কাছাকাছি এসে থমকে যায় শ্যামল। অদ্ভুত কিম্ভূত দেখতে গাছগুলো। গাছের গুঁড়িগুলোর পাশে অজস্র ঝুরি আর বুনো লতা একে অপরকে জড়িয়ে যেন অভেদ্য এক জাল বানিয়ে রেখেছে- ঠিক যেন এক প্রাকৃতিক বেড়া। গাছের সারির থেকে যখন এই তিনটি মানুষ প্রায় ফিট দশেক দূরে, তখন এক আজব কাণ্ড ঘটল। কোনোরকম হাওয়া ছাড়াই ঝুরিগুলো প্রবলভাবে দুলতে শুরু করলো। একটা তীব্র মিঠে কড়া গন্ধে ভরে গেল চারপাশ। একটা লম্বা কুঁকড়ে থাকা গুঁড়ি বেতের মতন সিধে হয়ে গিয়ে সপাটে আঘাত করলো শ্যামলের পায়ে। এই আকস্মিক আক্রমণে বিস্মিত শ্যামল আছড়ে পড়ল পাথুরে মাটিতে আর ওর অজান্তেই গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো ভয় ও যন্ত্রণা মিশ্রিত এক মর্মভেদী চিৎকার। প্রথম আকস্মিকতার ধাক্কা সামলে তৃণা তৃষাকে দুই হাতে জাপটে ধরে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল আরেক আশ্চর্য আক্রমণ- ঝুরিগুলো গাছের শক্ত ফল ও বীজ তুলে নিয়ে ছুঁড়তে লাগলো ওদের দিকে। কয়েক মুহূর্ত অসাড় হয়ে রইল ওরা তিনজন। যেমন হঠাৎ আক্রমণ শুরু হয়েছিল, তেমনই হঠাৎ সব উন্মাদনা- চঞ্চলতা বন্ধ হয়ে গেল। লতা আর ঝুরিগুলো হঠাৎ লজ্জাবতী লতার মত কুঁকড়ে সরে গেল। আর তখনই দেখা গেল অভেদ্য বেড়ার ওপাশের জঙ্গলের এক ঝলক, আর পায়ে চলা ক্ষীণ পথরেখা। আর সেই পথে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন এক সৌম্য বৃদ্ধ- কুড়ি বছর আগের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া প্রফেসর চ্যাটার্জি!


“ব্যথা পাওনি তো?” শ্যামলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। “আমি কিছুক্ষণ আগে জঙ্গলের অন্যদিকে গিয়েছিলাম একটা কাজে, তাই এরা ভুল করে তোমাদের শত্রু ভেবে আঘাত করেছে।”

“এরা মানে গাছেরা ভেবেছে?”তৃণার গলায় বিস্ময় ও অবিশ্বাস ঝরে পড়ে।

মৃদু হেসে প্রফেসর বলেন- “সব প্রশ্নের উত্তর দেব, জঙ্গলের ভিতরে চল।”


ঘণ্টা খানেক পরে প্রফেসরের বাসস্থান মানে বিশাল একটা অতিপ্রাচীন গাছের গুঁড়ির মধ্যে বসে ওরা তিনজন শোনে এক আজব রূপকথা।

“ যেদিন আমি চলে এলাম তোমাদের সভ্য জগৎ ছেড়ে, সেদিন আমি V.O.C.র কথা বলেছিলাম- মনে পড়ে? আমি আসলে ওই নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গবেষণা করছিলাম। ওই দিনের বৃক্ষ ধ্বংসের মাতন দেখে আমার টনক নড়ল- অঙ্গীকার করলাম, পৃথিবীর বুকে অন্ততঃ এক টুকরো জঙ্গল আমি বাঁচাবই। তাই এই নির্জন দুর্গম জঙ্গলে শুরু করলাম আমার প্রতিশ্রুতি পূরণের যজ্ঞ। আমি বুঝেছিলাম, ওদের বাঁচতে গেলে আক্রমণ করা শিখতে হবে। তাই বিভিন্নভাবে ওদের মিউটেশন করাতে লাগলাম। ধীরে ধীরে ওদের conditioned reflexes গড়ে তুললাম। এখন কোনও আগন্তুক এলে ওরা শুধু একে অপরকে জানিয়ে চুপ করে থাকে না- আগ্রাসী আক্রমণে আঘাত করে শত্রুকে। কিছু বেশী হিংস্র মাংসাশী গাছও আছে জঙ্গলের অন্য প্রান্তে।

কিন্তু এখনও ওরা প্রাণীদের pheromone-এর গন্ধ থেকে শত্রু - মিত্র বিচার করতে শেখেনি। তাই তোমাদেরও আঘাত করেছে। “

“কিন্তু এতদিন পরে আপনার আমাদের কথা মনে পড়ল স্যার?” তৃণার গলায় একরাশ অভিমান।

“আসলে কাজটা সরকার অনুমোদিত নয়। তার উপরে রাজনৈতিক মহলের নানান চাপ ও আছে। তাই খুব গোপনে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি আমি। কাউকে আর এর মধ্যে জড়াতে চাইনি। সত্যি বলতে কি, আমি শ্যামলের খোঁজ করছিলাম। তোমরা যে জুটি বেঁধেছ তা তো আমার জানা ছিল না। আমার বয়েস হচ্ছে- অথচ অনেক কাজ বাকি। অনেকগুলো experiment একসাথে শুরু করেছি। এই যেমন কয়েক বছর আগে কিছু চোরাকারবারি জোর করে জঙ্গলে ঢুকে আসে। ঝুরির বাঁধনে ওদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। আর ঝুরির সূক্ষ্ম tentacles-এর সাহায্যে ওদের দেহে মেশানো হচ্ছে chlorophyll এবং photosynthesis-এর প্রয়োজনীয় সব enzymes। দেখি মানুষকে খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী করা যায় কিনা!”

“কি বলছেন স্যার?” একসাথে অবাক হওয়ার পালা শ্যামল- তৃণার।

“হ্যাঁ, আমার যে উত্তরসূরি চাই যে এই পৃথিবী আর গাছ বাঁচানোর যুদ্ধটা চালিয়ে যাবে। আমি তো আমার মেল-এ আমার এই কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত ও দিয়েছিলাম।”

“The careless whispers of a good friend”- গাছেরা একে অপরের সত্যিকারের বন্ধু, V.O.C. দিয়ে ফিসফিসিয়ে বিপদের আগাম জানান দেয়।“

“Ignorance is kind……Pain is all you’ll find.- অজ্ঞানতা মানুষকে এই সত্যটা উপলব্ধি করতে দেয়নি, যে একদিন জড় স্থবির বৃক্ষরাও তাদের আক্রমণ করতে পারে, শুধু আক্রান্ত হয়ে তারা চিরকাল থাকবে না।“

“কিন্তু তোমরা কি পারবে?” সংশয় প্রফেসরের। “তোমাদের সংসার আছে, ছোট্ট কুঁড়ির মতন তৃষা আছে। পারবে কি তোমরা এই যজ্ঞে সামিল হতে?”

তৃষা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবারে সে উঠে দাঁড়ায়। মুখের মাস্কটা সরিয়ে প্রফেসরের মুখোমুখিহয়ে হেসে বলে “পারতে যে আমাদের হবেই স্যার দাদু! আমি যে বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে চাই।”










লেখক পরিচিতি - লেখিকা অপরাজিতা নীড়বাসনার শুরু থেকেই সাথে আছেন এই পত্রিকার সাথে। পশ্চিমবঙ্গে বড় হলেও কুড়ি বছরের বেশী সময় কেটেছে প্রবাসে। বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও সাহিত্যের প্রতি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। তাই শরদিন্দুর শহরে নোঙর গেঁথে সক্রিয়ভাবে বাংলা চর্চা ও বাংলা ভাষার প্রসারের নানা প্রয়াসে অংশ নেন তিনি। লেখা ছাড়াও নাটক ও আবৃত্তি এঁর অনেক শখের মধ্যে অন্যতম।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮