• সায়ন এবং শুভাশিস

প্রচ্ছদ কাহিনী - সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব


সম্পাদক বললেন নীড়বাসনার এবারের বিষয় ‘সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব’। লিখতে বসে মনে হল, সাহিত্য তো জীবনেরই আয়না, তাই ‘সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব’ এর রেখাচিত্র আসলে ‘জীবনে অরণ্যের প্রভাব’ এরই প্রতিফলন। তাই আমাদের আজকের যাত্রাটা শুরু করি অনেক আগে মানব সভ্যতা শুরু হওয়ার সময় থেকে। অথবা হয়ত মানব সভ্যতা শুরু হওয়ারও আগে থেকে।


সাহিত্য আপাতত একটু দূরেই থাক, শুরুটা না হয় করি পৃথিবীর সাথে অরণ্যের আদিম সম্পর্ককে স্মরণ করে। বৈজ্ঞানিকদের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর সাথে অরণ্যের সম্পর্ক প্রায় চল্লিশ কোটি বছরের পুরনো। সেই আদিম অরণ্যের গল্প লেখা আছে মাটির নিচের কয়লায়, খনিজ তেলে আর উদ্ভিদ জগতের অশ্মীভূত নিদর্শন গুলিতে। উদ্ভিদ জগতের আবির্ভাবের আগে আমাদের পৃথিবী ছিল মূলত ধুলো, মাটি এবং পাথরে ভরা একটি মৃত গ্রহ। উদ্ভিদ জগতের আবির্ভাবের পর ধীরে ধীরে সালোকসংশ্লেষের অক্সিজেন পৃথিবীর আবহাওয়া এবং পরিবেশকে অন্যান্য জীবনের উপযুক্ত করে তুলল। তারপর কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পর আবির্ভাব হল আদিম মানুষের। তারা মূলত থাকত পাহাড়ের গুহায় এবং অরণ্যে। তাই এটা বলাই যায়, সেই সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই, মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে অরণ্য। আজকাল ছোট ছেলেমেয়েরা ছোট খাট পোকা-মাকড় দেখে ভয় পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। কিন্তু বিবর্তনবাদ এবং ইতিহাস দুইই সমান ভাবে সাক্ষী দেয় যে আমরা এক সময় বাঘ-সিংহের সঙ্গে অরণ্যে বাস করতাম। আর আরণ্যের বিভিন্ন জন্তুর সাথে রীতিমত যুদ্ধ করে আমরা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছিলাম। সুতরাং এটা স্বীকার করে নিতে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, মনুষ্যজাতি অবশ্যই ‘আদি আরণ্যক’। সেই আদি আরণ্যক’ মানুষ ছিল খাদ্য শৃঙ্খলের বেশ অনেকটাই নিচুতে, খাদ্য-পিরামিডের মাঝামাঝি। খাদ্য বলতে ছিল মূলত ফল-মূল, ছোট ছোট পশু-পাখি, অথবা বাঘ-সিংহের খাওয়া হয়ে গেলে পড়ে থাকা অবশিষ্ট হাড়-গোড় ভেঙ্গে তার শাঁস।


অবশ্য, এই অরণ্যর সাথে আমাদের সম্পর্ক কিন্তু সরল রেখায় এগোয়নি। খৃস্টের জন্মের প্রায় দশ হাজার বছর আগে প্রথম কৃষি বিপ্লব হওয়ার পর থেকেই আমরা আস্তে আস্তে অরণ্য থেকে দূরে সরে আসতে শুরু করি। প্রকৃতি যদি আমাদের ‘জন্মদাত্রী মা’ হন, তাহলে অরণ্য নিশ্চয় আমাদের ‘প্রথম শিক্ষক’। মানুষের মৌলিক চিন্তায়, যেমন প্রচণ্ড রেগে গেলে বা বিপদে পড়লে আমাদের প্রতিক্রিয়ায় আজও সেই হারিয়ে যাওয়া এই অরণ্য বর্তমান। ঠিক যেন আমাদের সুপ্ত অবচেতনে আমরা এই অরণ্যকে বয়ে বেড়াচ্ছি। আর তাকে সভ্যতার এক পর্দার ভেতর থেকে অন্য পর্দায় প্রকাশ করছি আজকের সমাজে।


আদিম মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল এই অরণ্য। তাই সাহিত্যের শুরু থেকেই তাতে অরণ্যের প্রভাব আসতে থাকে। বৈদিক সাহিত্য - বেদ, ব্রাহ্মণ আরণ্যক এবং পুরাণে, অরণ্যের বিশেষ প্রভাব দেখতে পাই। বৈদিক সভ্যতা ছিল মূলত গ্রামীণ এবং প্রকৃতি নির্ভর । বেদের নানা আচার অনুষ্ঠান ও যাগ-যজ্ঞ তে পাওয়া যায় অরণ্যর প্রতি প্রার্থনা এবং আহুতি দানের মন্ত্র। পুরাণে আটটি বিশেষ বনাঞ্চলের উল্লেখ পাই, যেগুলি হল - সৈন্ধব, দণ্ডকারণ্য, নৈমিষারণ্য, কুরু-জঙ্গল, উৎপলারণ্য, জম্বু-মার্গ, পুষ্করা এবং হিমালয়।


বৈদিগোত্তর যুগের মহাকাব্য রামায়ণে এবং মহাভারতেরও তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন বনাঞ্চলের চিত্র পেয়ে থাকি।


বাল্মীকির বর্ণনায়, রামায়ণের চিত্রকূট পর্বত এবং সেখানকার আরণ্যক পরিমণ্ডল মনোরম, স্নিগ্ধ এবং চৈতন্যময়। সেই কারণেই ভরদ্বাজ মুনি, বনবাসের প্রথম পর্যায়ে রামচন্দ্রকে চিত্রকূট পর্বতে বাস করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে রাম, লক্ষ্মণ এবং সীতা চিত্রকূট পর্বত থেকে দণ্ডকারণ্য যাত্রা করেন। এই যাত্রা পথের বর্ণনাও খুবই কাব্যিক এবং মনোমুগ্ধকর। রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডে সিতার খোঁজে এবং সুগ্রীবের সাথে দেখা করার জন্য রামচন্দ্র যে পথ পরিক্রমা করেন সেখানে পঞ্চবটিবন এবং কিষ্কিন্ধ্যার জঙ্গলের বর্ণনা পাই।


মহাভারতের আঠারোটি পর্বের মধ্যে অন্যতম পর্ব হল বনপর্ব। এই পর্বে পাণ্ডবদের বারো বছরের বনবাস এবং সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এই বনপর্বে, সময়ে সময়ে, অরণ্য এবং আরণ্যক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে হিড়িম্বার কাহিনী উল্লেখযোগ্য। বারণাবতের জতুগৃহ দাহের পর, পাণ্ডবরা গঙ্গার তীর ধরে দক্ষিণে চলতে চলতে এক গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। সেখানে আরণ্যক জনগোষ্ঠীর হিড়িম্বার সাথে ভীমের মোলাকাত এবং বিবাহ হয়। ভীম এবং হিড়িম্বার সন্তান ঘটোৎকচ ছিলেন পাণ্ডব সন্তানদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর অসীম বীরত্বের কথা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।


বেদ, ব্রাহ্মণ আরণ্যক এবং পুরাণের সময় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যের যে যাত্রা, সেই যাত্রাপথে রামায়ণ এবং মহাভারতের যুগ পার হয়ে কালিদাসের যুগে এসেও আমরা সাহিত্যে আরণ্যের বিশেষ প্রভাব দেখতে পাই। কালিদাসের ‘শকুন্তলায়’, শকুন্তলা এবং তপোবন যেন অভিন্ন হৃদয়। অরণ্য এবং বৃক্ষলতার মতই শকুন্তলা যেন তপোবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই শকুন্তলার বিরহে তপোবন কাতর হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন -


‘লতার সহিত ফুলের যেরূপ সম্বন্ধ, তপোবনের সহিত শকুন্তলার সেইরূপ স্বাভাবিক সম্বন্ধ। অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকে অনসূয়া-প্রিয়ংবদা যেমন, কণ্ব যেমন, দুষ্মন্ত যেমন, তপোবনপ্রকৃতিও তেমনি একজন বিশেষ পাত্র। এই মূক প্রকৃতিকে কোনো নাটকের ভিতরে যে এমন প্রধান, এমন অত্যাবশ্যক স্থান দেওয়া যাইতে পারে, তাহা বোধ করি সংস্কৃতসাহিত্য ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় নাই।’


সংস্কৃত সাহিত্য থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যাত্রাপথে, মঙ্গলকাব্যগুলির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গলে অরণ্য এবং আরণ্যক জীবনের কথা স্থান পেয়েছে। তবে মঙ্গলকাব্যেও আমরা সভ্যতার অগ্রগতির সাথে বনজ সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কথা এবং আগ্রাসী নাগরিক সভ্যতার সাথে আরণ্যক সভ্যতার দ্বন্দ্বের আভাষ পাই। যে দ্বন্দ্বের কথা আধুনিক যুগে মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘ব্যাধখণ্ড’ বা দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসে প্রধান উপজীব্য হয়ে ধরা দিয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর উত্তরসূরি বুদ্ধদেব গুহ যে ভালোবাসা এবং মমতার সাথে অরণ্যকে সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন তা অনন্য।



আবার ফিরে আসি জীবনের কথায়, সভ্যতার কথায়। আরণ্যক জীবন থেকে যাত্রা শুরু করে, কৃষি বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে, গ্রামীণ জীবন হয়ে এখন মূলত নাগরিক জীবনের যাত্রাপথে, আমরা অরণ্যের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছি অনেকখানি। আমাদের অতি প্রয়োজনীয় কিছু গাছ আর কিছু গৃহপালিত প্রাণী ছাড়া আমরা ‘অরণ্য’ নামের সেই পুরোনো মাস্টারমশাই সাথে আর সেরকম কোন সম্পর্ক রাখিনি। আর আজকে আমরা আরো অনেকটা এগিয়ে গিয়ে প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খলে প্রথম স্থান আলো করে বসেছি। কিন্তু অরণ্যকে কি কিছু আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি? বোধহয় খুব কম! বরং একটার পর একটা দেওয়াল তুলে যাচ্ছি মধ্যিখানে। অরণ্য ছেড়ে চলে আসার সময় সামান্য কিছু যা গাছ গাছালিদের আমরা প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছি, তাদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আমাদের বাড়ির আশে পাশে আড়ষ্টভাবে তারাও কেমন যেন ক্ষীণ হয়ে পড়ে আছে। কেমন অরণ্যের সাথে আমাদের বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।


মাস্টারমশাই কিছু চাননি, আর আমরা দুষ্ট ছাত্রদের মতো কিছু ‘গুরুদক্ষিণা’ দিই নি। স্বার্থ বুঝে, লোভের বশবর্তী হয়ে আমরা এই বনজ সম্পদ নষ্ট করে চলেছি প্রত্যেক দিন । কখনও খনি, কখনও কাঠ, কখনও নেহাতই শুধু ফুর্তির জন্য এই অরণ্য আর বাকি আরণ্যকদের ইচ্ছে মতন নিধন চালাচ্ছি। এর কুফল নিয়ে আলোচনা করব না! সেটার দরকার নেই আর সেটা বোধহয় সকলের জানাও। যারা জানেন না তাঁরা খরায় বা বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া কোন চাষিকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। অথবা কোন তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞানের বই নিয়ে দু পাতা উলটে দেখতে পারেন। উত্তর মিলবেই। সামান্য সংখ্যক কিছু পুঁজিবাদী মানুষের লোভ এবং বৃহৎ একটা জনসংখ্যার মানুষের অসচেতনতা, কুঁড়েমি আর অশিক্ষার জন্য আস্তে আস্তে শেষ সবুজটাও হারাতে চলেছে। এই অরণ্য হারানো মানে কিন্তু শুধু কিছু গাছ না, সেই অরণ্যের উপজাতিরা, আমাদের শেষ ‘আরণ্যক রাও’ হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন আফ্রিকা বা দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ উপজাতিরা। অরণ্যের ভাষা, আরণ্যক আচার আচরণ সব মিলিয়ে প্রকৃতি যে স্পন্দনের জন্ম দেয় সেটার বৈজ্ঞানিক নাম ‘ইকোলজি’। সেটাই যদি নষ্ট হয়ে যায়, আমরা কি মানবতাকে ধরে রাখতে পারব?


আমি প্রবন্ধ লিখতে বসিনি, আর তার চেয়েও দরকারি, আমি কিন্তু সভ্যতা বিরোধী নয়। তাই আমি কখনোই চাইনা, মানুষকে ঘর ছাড়া হতে ডাক দিতে। এই প্রবন্ধ শুধু একটি অণু-স্মারক মাত্র, যা মনে করায়, আমাদের ‘গুরুদক্ষিণা’ দেওয়া বাকি আছে। কি সেই ‘গুরুদক্ষিণা’? সেটি শ্রদ্ধা আর সংরক্ষণ। আজ যখন প্রকৃতির সেরা সন্তান বিশ্ব জয় করেছে, তখন কি তার উচিত নয় তার ‘আদি শিক্ষক’ এই অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখা বা তাঁর সংরক্ষণ করা? এরকম চেষ্টা যে আগেও হয়েছে, ইতিহাস যার সাক্ষী আছে যেমন উত্তরাখণ্ডের চিপকো আন্দোলন! তাহলে আমরা কি পারি না ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে? তবে এটা ঠিক, এই সংরক্ষণের জন্য আমাদের কিছু ত্যাগ করতে হবে। আমরা যদি ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে এই উদ্ধার কাজে হাত দিই, আমরা কিন্তু সফল হবই। যে মানুষ চাঁদে পৌঁছাতে পেরেছে তার কাছে এটাই প্রত্যাশিত। তাই আমরা সকলে মিলে হাতে হাত দিয়ে যদি একবার চেষ্টা করি আমরা অবশ্যই পারব এই পৃথিবীর ক্যানভাসে শেষ সবুজটাকে ধরে রাখতে। সেটাই হবে আমাদের সভ্যতা! আর তখনই হবে সাহিত্যের জয়!



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮