• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে


“মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,

দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা--

তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।“ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজ প্রায় ছয় মাস হল, আমরা এক দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। কোভিড১৯ নামের এক নতুন ভাইরাসের আক্রমণ পৃথিবী জুড়ে অতিমারির রূপ ধারণ করেছে। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় এক কোটি আশি লক্ষ মানুষ আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় সাত লক্ষ। এই বিপর্যয়ের ধাক্কায় সারা পৃথিবী জুড়ে নেমেছে অর্থনৈতিক ধ্বস।

শুধু ভারতবর্ষেই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় কুড়ি লাখ এবং মৃত প্রায় চল্লিশ হাজার। ভাইরাসের সংক্রমন নিয়ন্ত্রণ করতে ভারত সরকার লক-ডাউন ঘোষণা করেন মার্চ মাসে এবং আজ চার মাস পরেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আংশিক লক-ডাউন চালু আছে। কোভিড১৯ এর আক্রমণ আমাদের সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্যকে এবং স্বাস্থ্য সেবা চিকিৎসা পরিকাঠামোর স্বল্পতাকে আরো নগ্ন করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। দীর্ঘ লক-ডাউনের ফলে অসংখ্য মানুষ তাদের রুজি রোজগার হারিয়েছেন। বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা এবং দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষরা। লক-ডাউন ঘোষণা করার সময়, লক-ডাউনের কারণে রুজি রোজগার হারানো শ্রমিকদের আর্থিক সাহায্য, থাকা-খাওয়ার বা বাড়ি ফেরানোর পূর্ব-পরিকল্পিত সরকারী ব্যবস্থা না থাকায় এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ের অভাবে, প্রায় কয়েক কোটি রুজি রোজগারহীন শ্রমিক, বাড়ি থেকে অনেক দূরে অন্য রাজ্যে, আটকে পড়ে ছিলেন প্রায় দুমাস। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সরকারের তরফে তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। যদিও তাদের বেশীরভাগ এখন বাড়ি ফিরে যেতে পেরেছেন, কিন্তু রুজি রোজগার চলে যাওয়ায় তাদের অনেকেরই দু-বেলা খাবার জুটছে না। সরকার তাদের জন্য যে রেশনের ব্যবস্থা করেছেন, তার অনেকটাই মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না।

কোভিড১৯ ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই প্রকট হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা। সরকারী হাসপাতালের সাধারণ শয্যা সংখ্যা, আইসিইউ সংখ্যা, অক্সিজেন সরবরাহ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় অনেক কম, ফলে অনেক রোগাক্রান্ত মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আশা করব সরকার কোভিড১৯ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোর ব্যবস্থা এবং তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এই লড়াই বড় কঠিন লড়াই। এই লড়াই আমাদের সবাইকে এক সাথে লড়তে হবে। এই লড়াই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচানোর লড়াই। এই লড়াই মানুষের মুখে দু-বেলা খাবার পৌঁছে দেবার লড়াই। আশাহত হয়ে লড়াই বন্ধ করে দিলে চলবে না। বন্ধ করলে চলবে না আমাদের পাখা, জারি রাখতে হবে আমাদের উড়ান। লড়াই ছাড়া আমাদের কাছে অন্য কোনো উপায় নেই। তাই আলবেয়ার কামুর ভাষায় বলি “a fight must be put up, in this way or that, and there must be no bowing down."

আমাদের যে সব বন্ধুরা এই মুহূর্তে সরাসরি এই লড়াইয়ে যুক্ত তাঁদের এবং অন্য সমস্ত মানুষ যারা এই লড়াই লড়ছেন সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে, তাঁদের সবাইকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং শুভেচ্ছা।

আশা করব কোভিড১৯ এর বিপদ শীঘ্র কেটে যাবে। আর এও আশা করব, আপনারা সবাই, আপনাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন, শুভানুধ্যায়ীরা সবাই ভালো আছেন, নিরাপদে আছেন এবং রোগমুক্ত আছেন।

আমাদের বর্তমান সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী ‘সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব’। সভ্যতার শুরুতে মানুষর জীবন ছিল আরণ্যক। তারা অরণ্যে পশু শিকার করে বা ফল মূল সংগ্রহ করে মূলত ভ্রাম্যমাণ জীবন ধারণ করত। অরণ্য ছিল তাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সেই সময় লিখিত লিপি না থাকায় সাহিত্য ছিল মূলত কথ্য ভাষা নির্ভর। তাই সেই সব মানুষেরা দিনের শেষে বাসায় ফিরে তাদের সন্তানদের কোন গল্প শোনাতেন, তার কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, তবুও ভেবে নেয়া যায় যে, তাদের গল্পে স্বভাবতই এসে পড়ত তাদের আরণ্যক জীবনের প্রভাব। ক্রমশ মানুষ কৃষি কাজ শিখল। অরণ্যের প্রান্তে, নদীর তীরে গড়ে উঠল কৃষি নির্ভর ছোট ছোট জনপদ। কিন্তু অরণ্যের সাথে মানুষের যোগসূত্র রইল অবিচ্ছেদ্য।

বৈদিক সাহিত্যের রচয়িতা মুনি-ঋষিরা মূলত থাকতেন তপোবনে। সেখানে তাদের জীবন কাটত আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক চর্চায় এবং শিক্ষা দানে। বৈদিক যুগে অরণ্যের প্রভাব শুধু মাত্র মুনি-ঋষিদের জীবনে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। সাধারণ মানুষও, ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস, জীবনের এই চার আশ্রমের মধ্যে তিনটি আশ্রম ( ব্রহ্মচর্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস) কাটাতেন বন বা অরণ্যের সংস্পর্শে। তাই বৈদিক যুগে মানুষের জীবনে এবং সাহিত্যে অরণ্যের বিশেষ প্রভাব দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে বেদের ‘আরণ্যক’ অংশগুলির উল্লেখ করা যেতে পারে।

সংস্কৃত সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব বেদ পরবর্তী কালেও স্পষ্ট রূপে অনুভূত হয়। তাই আমরা দেখি রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডে অরণ্য নদী-পর্বত সকলেই সজীব সত্তা রূপে আত্মপ্রকাশ করে বা কালিদাসের শকুন্তলায় তপোবন শুধু পারিপার্শ্বিক হিসেবে না থেকে মূল কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে লিখেছেন -

“শকুন্তলা তপোবনের অঙ্গীভূত। তপোবনকে দূরে রাখিলে কেবল নাটকের আখ্যানভাগ ব্যাঘাত পায় তাহা নহে, স্বয়ং শকুন্তলাই অসম্পূর্ণ হয়। শকুন্তলা মিরান্দার মতো স্বতন্ত্র নহে, শকুন্তলা তাহার চতুর্দিকের সহিত একাত্মভাবে বিজড়িত। তাহার মধুর চরিত্রখানি অরণ্যের ছায়া ও মাধবীলতার পুষ্পমঞ্জরির সহিত ব্যাপ্ত ও বিকশিত, পশুপক্ষীদের অকৃত্রিম সৌহার্দের সহিত নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট। কালিদাস তাঁহার নাটকে যে বহিঃপ্রকৃতির বর্ণনা করিয়াছেন তাহাকে বাহিরে ফেলিয়া রাখেন নাই, তাহাকে শকুন্তলার চরিত্রের মধ্যে উন্মেষিত করিয়া তুলিয়াছেন।”

পরবর্তীকালে প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্য মঙ্গলকাব্য গুলিতে, যেমন মনসা মঙ্গল বা চণ্ডী মঙ্গল ইত্যাদিতে, বন জঙ্গলের কথা প্রাধান্য পেয়েছে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্য এবং অরণ্য এই দুইয়ের সমাবেশে যে নামগুলি প্রথমেই মনে আসে সেগুলি সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’, মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’। এছাড়াও আমাদের সময়ের অন্যতম লেখক বুদ্ধদেব গুহের বিভিন্ন লেখায় তাঁর প্রিয় বিষয় জঙ্গল নানা রূপে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে। তাঁর ‘জঙ্গলমহল’ , ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘লবঙ্গীর জঙ্গলে’ ইত্যাদি জনপ্রিয় উপন্যাসে আরণ্যক পটভূমি আমাদের আকর্ষণ করেছে।

যদিও আধুনিক বাংলা সাহিত্য আজ মূলত নাগরিক সভ্যতার প্রতিফলন এবং তাতে অরণ্যের পটভূমি সেরকম চোখে পড়ে না, তবুও এটা ভুললে চলবে না যে মনুষ্যজাতির জন্মলগ্ন থেকেই অরণ্যের সাথে মানুষের সম্পর্ক।আর সেই আদিম সম্পর্ক স্মরণ করেই নিয়ে এলাম এবারের নীড়বাসনার সংখ্যা, ‘সাহিত্যে অরণ্যের প্রভাব’। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

মানুষ আধুনিক শহর ভিত্তিক সভ্যতার প্রলোভনে, কল কারখানার প্রয়োজনে, নির্বিচারে ধ্বংস করেছে বন-জঙ্গল, ধ্বংস করেছে আদিম সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং মানুষের সাথে প্রকৃতির আদিম যোগ সূত্র। এভাবে যথেচ্ছ বন জঙ্গল কেটে ফেলার ফলে, পৃথিবীর ইকোলজিকাল ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে পৃথিবী এখন বিপন্ন অবস্থায়। আশা করব মানুষের শুভ বুদ্ধির বিজয় হবে এবং আমরা প্রকৃতির এই ধ্বংস লীলা বন্ধ করে আগামী প্রজন্মের জন্য এক সবুজ পৃথিবী রেখে যেতে পারবো।

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,

লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর

হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,

দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি”

প্রতিবারের মত এবারেও বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে অনুবাদ গল্প, কবিতা এবং অণু গল্প, কবিতা নিয়ে 'অনুস্বর্গ'। এছাড়া অন্যান্য গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ তো থাকছেই যেমন থাকে প্রতিবার।

গত সপ্তাহে আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন কবি, সাহিত্যিক এবং অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে আমরা বিশেষ ভাবে শোকাহত। তাঁকে প্রণাম জানিয়ে এবং বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর বিশেষ অবদান স্মরণ করে, শ্রদ্ধাঞ্জলিস্বরূপ আমরা নীড়বাসনার এই সংখ্যার 'অনুস্বর্গ' বিভাগটি তাঁকে উৎসর্গ করলাম।

আপনাদের শুভেচ্ছা, শুভকামনা, ভালোবাসাকে পাথেয় করে ২০১৬ সালের এপ্রিলে আমাদের যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ আমরা তার পঞ্চম বর্ষে এসে পড়েছি। ভালো লাগছে আজ আমাদের ত্রয়োদশ সংখ্যা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে। আমাদের সমস্ত লেখক, শিল্পী এবং সহযোগী বন্ধুদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ আমাদের সমস্ত পাঠক বন্ধুদের।

আশা করি আমাদের এবারের সংখ্যা আপনাদের ভাল লাগবে। আপনারা আপনাদের সাহিত্য-ভাবনা আমাদের সাথে ভাগ করে, আমাদের সমৃদ্ধ করে তুলবেন। আপনারা সঙ্গে থাকলে, আমরা আরো অনেকটা পথ এগোতে পারব এই আশাই রাখি।

আপনাদের সবাইকে জানাই স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সাহিত্যে থাকুন আর আমাদের সঙ্গে থাকুন।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮